গোপন নদীর কিনারে – ২

আভিজাত্যের আলো পিছলে যাচ্ছে মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িদুটোর বনেটে লেগে। গাড়িটার নম্বরপ্লেট দেখে তাজ্জব হয়ে গেল চন্দ্রচূড়। জিগ্যেস করল, কবে রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল এই দুটো গাড়ির?

ল্যাটারাল রোড ধরে মালবাজার ছেড়ে চালসার উদ্দেশে বেরোতেই হাতের বাঁ-দিকে রয় অ্যান্ড কাজিনসের এই পেট্রল পাম্প। সেখানে পাশাপাশি দাঁড় করানো মার্সিডিজ বেঞ্জদুটো। তটিনী স্কুটিটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পাম্পের দিকে। মুখ ফিরিয়ে বলল, একটার রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল ১৯৬৬ সালে, অন্যটা ১৯৬৭ সালে। বহু সিনেমা আর সিরিয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে গাড়িদুটো। তুমি দ্যাখোনি? এখনও কি ঝকঝকে কন্ডিশনে রয়েছে গাড়িদুটো, তাই না?

তটিনী গড় বাঙালি মেয়েদের তুলনায় লম্বা। গায়ের রং মাঝারি। ঘন চুল, ছোট করে ছাঁটা। চেহারা অ্যাথলিটদের মতো। সে ডাকাবুকো স্বভাবের মেয়ে। স্কুল বা কলেজ স্পোর্টসে একশো মিটার স্প্রিন্টে বরাবর প্রাইজ পেয়ে এসেছে সে। বাস্কেটবল খেলেছে জেলা দলের হয়ে। সুন্দরী বলতে লোকে যেসব বৈশিষ্ট্যর কথা বলে তা তটিনীর রূপের সঙ্গে যায় না। তবে তার চোখদুটো বুদ্ধিদীপ্ত। সেটাই তার সৌন্দর্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

তটিনীর বাবার মালবাজারে বড় রাস্তার ওপর রেডিমেড পোশাকের দোকান। তার বাবা আর দাদা সেই দোকান সামলায়। দার্জিলিং কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে তটিনী বেরিয়েছে গতবছর। পাহাড়ে মার্শাল আর্টস জানা এক গুরুর সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল। সেই টিচারের কাছে দু’বছর মার্শাল আর্টস শিখেছিল সে। এখন কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়ে কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় বসার জন্য কোচিং নিচ্ছে কলকাতায় গিয়ে। তার ইচ্ছে পুলিশ সার্ভিসে যাওয়ার। মাঝেমধ্যে আসে মালবাজারের বাড়িতে। নিজস্ব দ্বিচক্রযান আছে। বাড়িতে এনে স্কুটি নিয়ে এদিক-ওদিক চষে বেড়ায়। ল্যাটারাল রোড ধরে এক-একদিন চলে যায় বাগরাকোট। নতুন তৈরি হওয়া লুপ পুল দিয়ে উঠে যায় চুইখিম অবধি। পথের ধারের কোনও ফুড জয়েন্ট থেকে মোমো কিংবা থুকপা খেয়ে বাড়ি ফিরে আসে সন্ধের আগে।

জলপাইগুড়ি হাকিমপাড়ায় তটিনীর ছোটমাসির বাড়ি। তার থেকে বয়সে বড় হলেও ছোটমাসি তার বন্ধুর মতোই। মেসো সরকারি চাকুরে। আড্ডাবাজ মানুষ। মাসতুতো ভাই ক্লাস এইটে পড়ে। এক-একদিন স্কুটি চালিয়ে তটিনী জলপাইগুড়ি চলে যায় ইচ্ছে হলে। তার সঙ্গে চন্দ্রচূড়ের পরিচয় খুব বেশি পুরোনো নয়। এবার দুর্গাপুজোর আগে দিয়ে কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি ফিরছিল চন্দ্রচূড়। ট্রেনে তার সহযাত্রী ছিল তটিনীর দাদা তিমির।

সেসময় টিকিটের ক্রাইসিস চলছিল। সেদিন চন্দ্রচূড় আর তিমির দু’জনের টিকিটই আরএসি। কারওর টিকিটই কনফার্মড হয়নি। একটা সাইড লোয়ার সিটে দুজন পাশাপাশি বসে আসছিল। সে সময় আলাপ। এক কথা থেকে দু’কথা। ট্রেনের আলাপ ট্রেন থেকে নামার পর আর এগোয় না। এক্ষেত্রে তা হয়নি। ট্রেনে বসেই ফেসবুকে চন্দ্রচূড়কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল তিমির। বন্ধুত্বের আহ্বান গ্রহণ করেছিল চন্দ্রচূড়।

এর ক’দিন পর তিমির একটা ছবি পোস্ট করেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। রানিচেরা চা বাগানের প্ল্যান্টারস বাংলোর সামনে দাঁড়ানো সস্ত্রীক তিমির। পেছনে সবুজ পাহাড়। ইরানি গালচের মতো উজ্জ্বল সবুজ ঘাসে ভরা খোলা মাঠ। ভারি সুন্দর জায়গাটা। তিমিরের স্ত্রী রুমেলার পাশে সাদা ফারের জ্যাকেট পরা তটিনীও দাঁড়িয়ে ছিল সেই ছবিতে। চন্দ্রচূড়ের চোখ টেনেছিল তটিনীর বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ। চন্দ্রচূড় ইংরেজিতে কমেন্ট করেছিল ‘চমৎকার পারিবারিক ছবি’। তাতে লাইক দিয়েছিল তিমির আর তটিনী দুজনই।

সেদিনের পর থেকে তিমির ফেসবুকে সাপ-ব্যাং যে পোস্টই করুক না কেন চন্দ্রচূড় তাতে কমেন্ট করতে শুরু করল। ‘খুব সুন্দর ছবি’, ‘অসাধারণ’ জাতীয় সবই অবশ্য বাঁধাগতের কমেন্ট। কিছুদিন এভাবে কাটল। তার পর একদিন বুক ঠুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল টিনীকে। দু-চারদিন চন্দ্রচূড়কে উদ্বেগে রাখার পর বন্ধুত্বের আহ্বানে সাড়া দেয় তটিনী। হাই, হ্যালো দিয়ে শুরু হয়েছিল কথোপকথন। কথার পিঠে কথা এগোতে থাকে।

তটিনী প্র্যাক্টিকাল মেয়ে। তিমিরকে বলেছিল, সে এখনই প্রেমসম্পর্কে জড়াতে রাজি নয়। তার এই মুহূর্তের প্রায়োরিটি হল নিজেকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। চন্দ্রচূড় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়র হতে চায়নি কখনও। চেয়েছিল টিচিং লাইনে যেতে। কলেজ হোক বা স্কুল, পড়ানোর খুব ইচ্ছে ছিল তার। ইংরেজিতে মাস্টারস করে বিএড-টা করে রেখেছিল সে কারণে। কিন্তু স্কুলে-কলেজে লোক নেওয়া হচ্ছে না বহুদিন। অথচ বসে থাকলে তো চলবে না। তাই চন্দ্রচূড় একের পর এক চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চলেছে এক বছর ধরে। কোনওটাই ক্র্যাক করতে পারেনি। তাই বলে হালও ছাড়েনি। কিন্তু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে সময়ের মতো। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। ফলে এখন একটা দমচাপা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে। লিমিটেড ওভারের ক্রিকেট ম্যাচে বড় রান চেজ করতে গিয়ে আস্কিং রানরেট বাড়তে থাকলে ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যানের যেমন নার্ভের অবস্থা হয়, তারও এখন তেমন দশা।

বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল যে সম্পর্ক তা এগিয়েছে আরও কিছুটা। কলকাতা থেকে মালবাজারে এলে তটিনী জলপাইগুড়ি ঢুঁ মারে একবার হলেও। ছোটমাসির বাড়ি ঘুরে যায়। চন্দ্রচূড়ের সঙ্গে দেখা করে, চা আর টা খায় একসঙ্গে। সেদিনটা তার ভালো কাটে। তাদের প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে তটিনীর বাবা-মা এখনও কিছু জানে না। তবে তিমির জানে সবটাই। তিমিরের বউ রুমেলাও সব শুনেছে তটিনীর কাছে। দুজনের কারওরই চন্দ্রচূড়কে অপছন্দ নয়। তবে মুখে কিছু না বললেও সকলেই জানে এই সম্পর্কে তখনই বিয়ের সিলমোহর পড়বে যখন চন্দ্রচূড় রোজগেরে হবে। চন্দ্রচূড় গত মাসে একবার এসেছিল তটিনীদের বাড়িতে। তিমির বাবা-মায়ের কাছে চন্দ্রচূড়ের পরিচয় দিয়েছিল তার বন্ধু হিসেবে। এর বেশি কিছু ভেঙে বলেনি।

চন্দ্রচূড়ের কাজিন নীলাদ্রিদা নিদাম টি এস্টেটের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার বউ আর বছর তিনেকের ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে চা বাগানের কোয়ার্টারসে থাকে সে। চন্দ্রচূড় তার পিসতুতো দাদাটির ডেরায় যায় মাঝেমধ্যে। ম্যানেজারস কোয়ার্টারস বলে কথা, হাত পা ছড়িয়ে থাকা যায়। দু-একটা দিন কাটিয়ে আসে সেখানে গিয়ে। চা বাগানের পরিবেশ তার ফুসফুসে খানিকটা বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভরে দেয়।

পরশু নীলাদ্রিদার আস্তানায় এসেছিল চন্দ্রচূড়। আজ ফিরছে। নীলাদ্রিদা তাকে জিপে বসিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল মালবাজার বাস স্ট্যান্ডে। নীলাদ্রিদা ফিরে যেতেই বাস থেকে নেমে পড়েছিল চন্দ্রচূড়। একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিল। তখনই স্কুটি চালিয়ে এসে পড়েছিল তটিনী।

তটিনী স্কুটিতে বসে মাথায় হেলমেট চাপিয়ে নিল। ইগনিশনে চাবি দিয়ে বলল, চায়ের বুটিকটা দেখেছ? ওখানে মিশন হিলস চা বাগানের দার্জিলিং চা পাওয়া যায়। ভারতের টি বোর্ড হাতে গোনা কিছু চা বাগানকেই শুধু দার্জিলিং চায়ের লোগো ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। তার মধ্যে মিশন হিলসও পড়ে।

চন্দ্রচূড় বলল, এরপর মালবাজার এলে এখানে একবার ঢুঁ মারতে হবে।

ডান! আগেরবার তুমি কফি খাইয়েছিলে। এবার পে কিন্তু আমি করব।

মার্চ মাসের সাত তারিখ। বাংলা মতে ফাল্গুনের ছাব্বিশ, কিংবা সাতাশ। ঋতুর হিসেবে বসন্ত। কংক্রিটের জঙ্গলে বসন্ত বলে আলাদা কোনও ঋতু হয় না। কলকাতায় এ সময় ফ্যান চালাতে হয়। তবে এসব দিকে এখনও কিছু গাছগাছালি আছে বলেই হয়তো বসন্তের পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। টিলাবাড়ি নামে একটা জায়গা ছাড়াল তটিনীর স্কুটি। রাস্তার পাশে গাছগাছালি। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। তটিনী জিনস আর একটা লাল উইন্ডচিটার পরে আছে। হাওয়া লেগে ফুলে ফুলে উঠছে উইন্ডচিটারটা। বেশ লাগছে চন্দ্রচূড়ের পড়ে পাওয়া এই দুপুরটাকে। হাওয়ার শব্দ হচ্ছে শনশন। দু’জনকেই কথা বলতে হচ্ছে উঁচুগ্রামে।

তটিনী বলল, লোকে বলে বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয় না। আমি সে কথা মানি না।

চন্দ্রচূড় বলল, আমিও না। তোমার বাবার কথাই ধরো। তোমাদের মালবাজারে রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান। চারজন কর্মচারী আছে। তোমার বাবা শুনেছি একা হাতে দাঁড় করিয়েছেন দোকানটাকে।

তটিনী হেসে ফেলল, কী যে বলো! আমরা তো চুনোপুঁটি! হাতে গোনা যে দু-চারজন বাঙালি ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাংলা গর্ব বোধ করে নীলমণি রায় তাঁদের মধ্যে একজন। যে পাম্পে তেল ভরলাম ওটা তাঁরই। তিনিই ছিলেন রয় অ্যান্ড কাজিনসের প্রাণভোমরা।

দেশভাগের সময় ওঁকে মালবাজার চলে আসতে হয়েছিল খালি হাতে। শূন্য থেকে শুরু করে এক এক করে তৈরি করেছিলেন বটলিং প্ল্যান্ট, পেট্রল পাম্প। পরে মিশন হিলস টি এস্টেটের কর্ণধার হয়েছিলেন। একটা সময় নিজে নাকি পেট্রল পাম্পে তেল নিতে আসা গাড়িতে তেল ভরে দিতেন। ভাবা যায়?

চন্দ্রচূড় গলায় প্রশংসা মিশিয়ে বলল, সেজন্যই ভদ্রলোক এত ওপরে উঠতে পেরেছেন।

তটিনী বলল, পশ্চিম ডুয়ার্সের অঘোষিত রাজধানী মালবাজার। লোকে সংক্ষেপে মাল বলে। দ্রাবিড় ভাষায় মাল মানে উঁচু জমি। সেখান থেকে মাল নামটা এসেছে বলে অনেকের মত।

চন্দ্রচূড় বলল, একসময় কি দ্রাবিড়রা এই অঞ্চলে থাকত?

তটিনী বলল, অনেকে এমন বলে থাকেন। তবে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা মাল নদী মালার মতো ঘিরে রেখেছে এই শহরকে। সংস্কৃতে ‘মাল’ শব্দের অর্থ হল মাল্য বা মালা। এই রুট দিয়ে ভুটানিরা পণ্য আনা-নেওয়া করত একটা সময়। এখানকার মাটি আশেপাশের অন্য জায়গার থেকে উঁচু বলে ভুটানি ব্যবসায়ীরা বন্যার ভয়ে এখানে মাল রাখত। মাল নাম সেখান থেকেও এসে থাকতে পারে। কেউ কেউ বলেন, একবার ব্রিটিশ সারভেয়ার ম্যালকম সাহেব এখানে এসেছিলেন জমি জরিপ করার কাজে। তাঁর নাম থেকেই এই নাম পেয়েছে মালবাজার। আসল সত্যিটা যে কী, কে জানে!

চন্দ্রচূড় বলল, তুমি এই শহরটাকে খুব ভালোবাসো তাই না?

তটিনী হাসল, ভালোবাসার মতোই তো শহর। ঢেউ খেলানো সমুদ্রের মতো চা বাগান, হাতের কাছেই নীল পাহাড়, রুপোলি নদী দেখে ছোট থেকে বড় হয়েছি। মালবাজার মানেই আমার কাছে ম্যাজিক। নানা জাতি-উপজাতির মানুষের সহাবস্থান এখানে। তোমার শহর নিয়ে তুমিও নিশ্চয়ই প্যাশনেট?

চন্দ্রচূড় বলল, আলবাত। এর মধ্যে গুয়াহাটিতে ‘জোনাথন অ্যান্ড জোনাথন’ নামে একটা কোম্পানিতে গিয়েছিলাম ইন্টারভিউ দিতে। একজন ইন্টারভিউয়ার জলপাইগুড়িতে ছোটবেলা কাটিয়েছেন। তিনি আমাকে বাজিয়ে দেখছিলেন আমি আমার শহর সম্পর্কে কতটুকু জানি।

তাঁকে বলছিলাম আমার শহরের পুরোনো নাম ছিল বৈকুণ্ঠপুর। বৈকুণ্ঠপুর কোম্পানির করদ রাজ্যে পরিণত হলে সেখানকার রাজা তাঁর রাজ্যপাট বৈকুণ্ঠপুর থেকে জলপাইগুড়িতে সরিয়ে আনেন। এই শহরের পুরোনো নাম ছিল ফকিরগঞ্জ। তখন জলপাইগুড়ি ছিল গঞ্জের মতো। দুঃখের কথা এটাই যে, এর পরও অবশ্য আমার চাকরিটা হয়নি। যা হয় এসব জায়গায়, আগেই অন্য লোক ঠিক করা ছিল হয়তো।

তটিনী বলল, এই চাকরি হয়নি, অন্য চাকরি হবে। আচ্ছা, তুমি হুকার সাহেব তাঁর জার্নালে জলপাইগুড়ি সম্বন্ধে কী লিখেছিলেন জানো?

চন্দ্রচূড় বলল, ইংরেজি ভারসান পড়িনি। বাংলা তর্জমা পড়েছি। সেখানে হুকার বলছেন, জলপাইগুড়ি তখন ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বড়সড় গ্রাম। সেই শহর গড়ে ওঠবার কারণই ছিল ইংরেজদের সেনানিবাস তৈরি করা। তারপর তৈরি হল একের পর এক চা বাগান। বদলে গেল এদিকের অর্থনীতি। ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগে, তাই না?

তটিনী বলল, তুমি যে একজন শিক্ষিত মানুষ সেটা বোঝা যায় তোমার সঙ্গে দু’মিনিট কথা বললেই। তোমার কি মনে হয় না, যারা দু’দশক আগে জন্মেছে, তারা আমাদের তুলনায় লাকি? তখন পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছে বহু মেধাবী ছেলেমেয়ে। কিন্তু এখন যেদিকে তাকাই শুধু অন্ধকার। চাকরিই নেই।

চন্দ্রচূড় বলল, আমার মাধ্যমিক থেকে মাস্টার্স অবধি কোনও রেজাল্টই মন্দ নয়। তবুও দ্যাখো, চাকরি জুটছে না কিছুতেই। বাবার পেনশনের টাকায় আমাদের তিনজনের সংসার চলে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন!

তটিনী বলল, একটু ধৈর্য ধরো। যা হবে, ভালোই হবে। আচ্ছা, তুমি বলেছিলে গ্রামীণ ব্যাংকের পরীক্ষাটা ভালো হয়েছে। তার রেজাল্ট এর মধ্যে বেরোবার কথা ছিল না?

চন্দ্রচূড় বলল, রেজাল্ট তো বেরিয়েছে গত সপ্তাহে। তোমাকে বলিনি। দুঃখের কথা জেনে কী করবে। আমার নামও ছিল লিস্টে। বাবা সকালবেলা দোকান থেকে মিষ্টি কিনে এনেছিল। আত্মীয়স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে রসগোল্লার হাঁড়ি পাঠিয়েছিল আমার হাত দিয়ে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই জানতে পারলাম কারা যেন কোর্টে গিয়ে ইনজাংশন জারি করিয়েছে। সেই চাকরি এখন বিশ বাঁও জলে।

তটিনী বলল, ইনজাংশন তো আর অনন্তকাল ধরে জারি থাকতে পারে না। আজ না হোক কাল উঠে যাবে নিশ্চয়ই। অপেক্ষা করো কিছুদিন, সবুরে মেওয়া ফলবে ঠিকই।

তিস্তা ব্রিজ ছাড়িয়ে বালাপাড়ার মোড় দিয়ে বাঁ-দিকে টার্ন নিল তটিনীর স্কুটি। আগে এখানে বাঁধ ছিল, এখন পিচঢালা রাস্তা হয়েছে। এই রাস্তা বাঁ-হাতে তিস্তা নদীকে রেখে সোজা চলে গেছে জুবিলি পার্ক ছাড়িয়ে তিস্তা-করলা সংযোগস্থলের দিকে। সেই রাস্তা দিয়ে চলছে স্কুটি। চন্দ্রচূড় বলল, একটু দাঁড়াবে? একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছে খুব।

স্কুটি দাঁড় করাল তটিনী। সিগারেট ধরিয়েছে চন্দ্রচূড়। ফোন বাজল পকেটে। ফোনের ওপারে বাবা। চন্দ্রচূড় ঘড়িটা দেখল। আড়াইটে বাজে। সে বাড়ি না আসা অবধি বয়স্ক মানুষদুটো না খেয়ে বসে আছে। দুজনেরই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়েছে। অপরাধবোধ হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। চন্দ্রচূড় বলল, বাবা, আমি তিস্তা ব্রিজ ছাড়িয়ে জলপাইগুড়ি চলে এসেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুকছি। তোমরা খেয়ে নাও। আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না।

চন্দ্রচূড়ের বাবার গলার স্বরটা অন্যরকম শোনাল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, শোন, তোর নামে একটা চিঠি এসেছে রেজিস্টার্ড পোস্টে। আমি সই করে নিয়ে নিয়েছি। বাদামি এনভেলপ দেখে কৌতূহল সামলাতে পারিনি। খাম খুলে ভেতরে দেখি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। শুনতে পাচ্ছিস কী বলছি?

চন্দ্রচূড়ের মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, কীসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার?

তোদের সেই গ্রামীণ ব্যাংকের রিক্রুটমেন্টের ওপর জারি করা ইনজাংশন উঠে গেছে। তোকে চিঠি পাঠিয়েছে ওরা। ব্যাংকের রিজিওনাল অফিস থেকে চিঠিটা এসেছে।

চন্দ্রচূড় বুঝেও যেন কিছু বুঝতে পারছিল না। অবিশ্বাসী গলায় বলল, তুমি পড়েছ চিঠিটা?

পড়েছি বলেই তো ফোন করছি। এক পৃষ্ঠার চিঠি। লেখা আছে হেমগুড়ি ব্রাঞ্চে পোস্টিং দিয়েছে তোকে। এক সপ্তাহের মধ্যে জয়েন করতে হবে। বাড়ি আয় শিগগিরই।