সময়ের সমুদ্রের পারে

সময়ের সমুদ্রের পারে

‘যেতে চাই বৃন্দাবন পথ দেখাবে কে?
কেকা রবে কোকিল ডাকে
পথে এদিকে না ওদিকে।
পথ দেখাবে কে?’

আনিস গান গাইছিল চোখ বুজে। ভাবের গভীরতাই তার গানের আশ্চর্য সম্পদ। গান যেন আনিসের কাছে শুধু গান নয়, প্রাণের মুক্তি। আত্মার শান্তি। গান থামিয়ে আনিস আবছা হেসে বলল, বৃন্দাবনের পথ খুঁজে সারা জীবন কেটে যায় আমাদের। কিন্তু সেখানে পৌঁছনো আর হয় না কিছুতেই।

যমুনার জলের কলতান কানে আসে বহু দূর থেকে। শুধু জলের শব্দ নয়, বাঁশির শব্দও ভেসে আসে। কোকিল আর ময়ূরে কোনও ভেদ নেই সেই হৃদি-বৃন্দাবনে। আমাদের সকলেরই মনের ভেতরে একটা করে বৃন্দাবন থাকে। সেখানে আর পৌঁছনো হয় না।

আমি তারিফ করে বললাম, সে তো বটেই। তবে তোমার গানের গলা আরও খোলতাই হয়েছে। রেওয়াজ করো রোজ?

আনিস স্মিতমুখে বলল, গান তো আমার কাছে নিঃশ্বাস-প্ৰশ্বাস নেওয়ার মতোই। তুমি তো চেনো আমাকে। গান ছাড়া আমি থাকতে পারব না। আচ্ছা জাফর, তুমি জয়দেবের মেলায় কখনও গেছ? বীরভূমের কেঁদুলিতে? জানো হয়তো, এ হল আট শতকের পুরোনো বাউল মেলা। বাংলার প্রাচীনতম লোক উৎসব।

আমি বললাম, না যাইনি। শুনেছি বোলপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ। তোমার মুখেই একবার শুনেছিলাম, সেখানে তিনদিন ধরে চলে অবিরাম গান। গাছতলায় গান গাইছে বাউল, নাচছে বাউল। সকলেই আপন ভাবে মাতোয়ারা।

আনিস বলল, আমি বাবার হাত ধরে মকরসংক্রান্তির সময় একবার গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি ডুগি, খমক, আনন্দলহরী, একতারা, দোতারার ঝংকারে মেতে উঠেছে চারদিক। পরেও গিয়েছি বার দুয়েক। ওখানে গেলে বুঝত পারা যায়, বাংলার প্রাণশক্তির শিকড় কত গভীরে।

জয়দেব ছিলেন রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি। দ্বাদশ শতকের শেষ দিকের কথা। ‘গীতগোবিন্দম’ লিখেছেন যিনি। রাধাকৃষ্ণের প্রেমের অভিসার যার উপজীব্য। ‘গীতগোবিন্দম’-এর পাঠ শুনতে শুনতে নাকি ভাবসমাধি হতো শ্রীচৈতন্যর। সেই জয়দেব আর তাঁর স্ত্রী পদ্মাবতীকে ঘিরে এই মেলার উৎসব। বাউলের প্রতিবাদী সত্তা আর শিল্পী সত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে সেখানে।

আমি বললাম, শুনেছি তিনদিনের এই মেলায় ধনী-দরিদ্র, হিন্দু- মুসলমান, জাত-অজাত সকলে পাশাপাশি বসে পক্তিভোজন করে। দূর-দূরান্ত থেকে লাখো মানুষ এসে জড়ো হয় সেখানে। তিনদিন তিনরাত্রি পর অজয়ের জলে পুণ্যস্নান সেরে ঘরে ফেরে মানুষ।

আনিস বলল, সময় যদি নদী হয়, তবে জেনে রেখো সময়ের সেই নদী বিশাল এক সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। ঘন নীল তার জলের রং। কখনও তুমি সময়ের সমুদ্রের পারে এসে দাঁড়ালে দেখবে, সময় সেখানে নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে না, থমকে গেছে সমুদ্রের মতো। সুরের পাখিরা একসঙ্গে ডানা মেলে উড়ছে সেই আকাশে।

আমি চুপ করে আনিসকে দেখছি। আনিস বলল, বাউল ফকিরদের আমার সেলাম। কখনও কেঁদুলির মেলায় গেলে দেখতে পাবে মন্দির মসজিদকে দূরে সরিয়ে, জাতপাতে জীর্ণ সমাজকে অস্বীকার করে, অসাম্য আর অবিচারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে মনুষ্যত্বের জয়গান গাইছে বাংলার বাউল ফকিররা। ইহবাদী, দেহবাদী, জীবনমুখী যে দর্শন তারা গড়তে চেয়েছে এই মেলা তারই প্রতিচ্ছবি। যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ থেকে বাংলাকে বাঁচাতে চেয়েছে লোকসাধকদের এই দর্শন।

জরি চলে এসেছে লঘু পায়ে। আমাকে দেখে খুব যে অবাক হল তেমন মনে হল না। যেন আমার আসার কথাই ছিল এখানে। সামান্য হেসে বলল, আরে জাফর ভাই যে! বসুন একটু, আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।

আনিস ওর পাশের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে ইঙ্গিতে বসতে বলল আমাকে। ভুরু তুলে বলল, তারপর বলো কী খবর? শুনলাম তুমি নাকি চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে গেছ?

আমি আনিসের পাশের চেয়ারটায় বসতে বসতে বললাম, ঠিকই শুনেছ। ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ দিয়ে একটা ক্যাটল ফিড কোম্পানিতে ঢুকেছি। বেলগাছিয়ায় অফিস। বাড়ি থেকে খুব বেশি দূর নয়। মাইনে- টাইনে মন্দ নয়।

আনিস জিগ্যেস করল, হর্ষ, তরুণ ওরা সব কেমন আছে?

আমি ঘাড় নাড়লাম, সোশাল মিডিয়ায় আমার অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে শুধু ওরা কেন, পুরনো কলিগদের কারওর সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই। কাজের চাপে কাউকে ফোন-টোনও করা হয় না। তুমি এবার বলো, কেমন আছ তোমরা?

আনিসের মুখটা ম্লান হল। শুকনো গলায় বলল, সে বিড়ম্বনার কথা আর বলো কেন। আমাদের ডেথ সার্টিফিকেট অবধি ইস্যু হয়ে গিয়েছিল। কাগজে কলমে মৃত মানুষকে সরকারি নথিতে জীবিত প্রমাণ করা যে কী ঝক্কির ব্যাপার তা যদি জানতে! সরকারি প্রকল্পের সুযোগ সুবিধেই বলো কিংবা ব্যাংক লোন নেওয়া—কিছুই পাওয়া যায় না।

আমি বললাম, তোমার চাকরিটা কী হল? ওই ফার্মে আর জয়েন করোনি?

আনিস বলল, সে চাকরিও তো বিশ বাঁও জলে। সেদিন সাদা কাগজে সই করে তোমার হাতে দিয়ে এসেছিলাম। কথা ছিল তুমি ছুটির দরখাস্ত লিখে ডিপার্টমেন্টে জমা করবে। তুমি তা করোনি। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার লম্বা অ্যাবসেন্সকে হেড অফিস থেকে ট্রিট করা হয়েছে আনঅথারাইজড লিভ হিসেবে। ছাঁটাই করে দিয়েছে চাকরি থেকে।

আমি চিঠিচাপাটি করেছি বিস্তর। এফিডেভিট অবধি করতে হয়েছে কোর্টে গিয়ে। কিন্তু সেই যে জট লাগল, এখনও তা খোলেনি। ফি- মাসে একবার খোঁজ নিই। প্রতিবারই একটাই কথা শুনি, লাল ফিতের ফাঁসে আটকে আছে সব।

জরি চা নিয়ে এসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ছুটির দরখাস্তটা আপনি জমা করেননি কেন জাফর ভাই? ভেবেছিলেন আপনার বন্ধু বেহেস্তে চলে গেছে?

আমি বিব্রত মুখে বললাম, তুমি ভুল বুঝছ জরি।

আনিসের সইকরা সেই সাদা কাগজ আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাছাড়া আমাদের অফিসে অনলাইনে ছুটির দরখাস্ত দিতে হয়। আনিসের ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এসব আমার জানা ছিল না। আমি বললাম, কিন্তু আনিস, তুমি বলো তো ঘটনাটা কী, তোমরা রামপুরের রেল কোয়ার্টার্স থেকে কাউকে কিছু না বলে-কয়ে বেরিয়ে এসেছিলে কেন?

আনিস বলল, সেদিন হুমায়ূন ভাই সকালবেলা রেল কোয়ার্টার্স ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তার খানিক পর কেউ ডোরবেল বাজিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম হুমায়ূন ভাই কোনও জরুরি কাগজ-টাগজ ফেলে গেছে, সেটা নিতে ফিরে এসেছে। আমরা যে ওখানে আছি তা তো কারওর জানার কথা নয়…।

জরি মাঝখান থেকে বলল, আমিই দরজা খুলেছিলাম। তাকিয়ে দেখি দুজন যণ্ডাগণ্ডা লোক। গলায় মোটা সোনার চেন। হাতে সোনার বালা। আমার নাম জিগ্যেস করল। লোকদুটোকে দেখে আমার সন্দেহ হল। আমি বানিয়ে বানিয়ে অন্য একটা নাম বললাম। লোকদুটো নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথা বলে চলে গেল। ওরা বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মন বলল এই ডেরা আমাদের পক্ষে আর নিরাপদ নয়।

আনিস বলল, সঙ্গে ফোন ছিল না যে, হুমায়ূন ভাইকে জানাব ব্যাপারটা। চিঠি লেখার সময় ছিল না। ঝটপট পোশাক বদলে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। অসমগামী একটা বাস ধরে চলে গেলাম গুয়াহাটিতে।

কাজ খুঁজলাম ক’দিন। পল্টনবাজারে একটা জুতোর দোকানে সেলসম্যানের কাজ জুটল। খোঁজাখুঁজি করে সস্তায় একটা দুকামরার ঘর ভাড়া নিলাম পান্ডুতে। কিন্তু অসমে মন বসল না। ভেবেছিলাম এতদিনে নিশ্চয়ই সব থিতিয়ে গেছে। একদিন শিলিগুড়িগামী বাস ধরে চলে এলাম এদিকে। কিন্তু এসে দেখলাম পরিস্থিতি তখনও ঘোরালো হয়ে আছে।

আমি বললাম, তোমরা দুজন মহিষবাথান এলে, আমাকে একবার জানালে না কেন?

আনিস বলল, জানানোর উপায় ছিল না। তুমি শুনলাম চাকরি ছেড়ে ফিরে গেছ কলকাতায়। হর্ষ আর তরুণও বদলি হয়ে গেছে আরামবাগ ইউনিটে। মহিষবাথান ছেড়ে চলে যাবার সময় ফোন নিয়ে যাইনি সঙ্গে। ফলে কারওর সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল না। অসমে কাজ করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। তা দিয়েই এই বাড়িটা দাঁড় করানো গেছে। কিন্তু খাব কী? তাই হোমস্টে সার্ভিস চালু করেছি। টুরিস্ট আসে টুকটাক। চলে যাচ্ছে আর কী।

জরি বলল, যতদিন ফার্মের চাকরিটা ফিরে না পাওয়া যাচ্ছে ততদিন এভাবেই চালাতে হবে। বর্ষার সময় জঙ্গল বন্ধ থাকে বলে টুরিস্ট আসে না এদিকে। তবে বছরের অন্য সময় অসুবিধে হয় না।

কথাটা বলব কি না ভাবছিলাম। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বললাম, মহিষবাথানে শ্যামল বর্মণের এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টের দোকান আছে। যারা কৃষিকাজ করে তারা জমিতে দেওয়ার সার-টার কেনে সেখান থেকে। শুনেছিলাম, তুমি নাকি বোরখায় মুখ ঢেকে ফলিডল কিনেছিলে সেই দোকান থেকে? কথাটা কি তবে মিথ্যে

জরি অবাক গলায় বলল, আমি এক পোশাকে বেরিয়েছিলাম মহিষবাথান থেকে। আমার ব্যাগে শুধু ইনার গার্মেন্টস আর ঘরে পরার এক সেট পোশাক ছিল। আমি বোরখা পাব কোথায়? তাছাড়া আমি ফলিডল কিনতেই বা যাব কেন?

আনিস বলল, এই না বলছিলে মহিষবাথান ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এদিকের কারও সঙ্গে তোমার আর কোনও যোগাযোগ নেই। তবে এসব উড়ো খবর তোমাকে কে দিল?

আমি ইতস্তত করে বললাম, এখন ঠিক মনে পড়ছে না, কার মুখে যেন শুনেছিলাম…। আচ্ছা আর একটা কথা জিগ্যেস করি? এই জঙ্গলের কোর এরিয়ার মধ্যে হোমস্টে করার পারমিশন তোমরা পেলে কী করে?

জরি হেসে বলল, ইচ্ছের জোর থাকলে বাঘের দুধ অবধি জোগাড় হয়ে যায়, হোমস্টের পারমিশন কেন হবে না!

আনিস বলল, এটা জঙ্গলের কোর এরিয়া নয়। তাই পারমিশন পেতে অসুবিধে হয়নি। কোর এরিয়া শুরু হচ্ছে আরও এক কিলোমিটার সামনে থেকে।

আমি মুখে কিছু বললাম না। কিন্তু সন্দেহ হল সরকারি অ্যাপ্রুভাল ছাড়াই এই বাড়িটা বানানো হয়েছে। হয়তো স্থানীয় নেতা-টেতাকে বা অফিস-টফিসে ঘুষ খাইয়েছে আনিস।

তার মানে এই দু’বছরে ভালই টাকাপয়সা উপার্জন করেছে দুজন। জুতোর দোকানে সেলসম্যানগিরি করে তা সম্ভব নয়। তবে কীভাবে এত টাকা হাতে এল দুজনের? কিছু রহস্য আছে এর মধ্যে। এসবই ভাবছিলাম আপনমনে।

ভাবনার তাল কেটে গেল। জরি জানতে চাইল, একটা কথা জিগ্যেস করি জাফর ভাই? মহিষবাথান ফার্মের চাকরিটা তো খারাপ ছিল না। তাহলে ছাড়লেন কেন?

আমি বললাম, তোমরা মহিষবাথান ছেড়ে যাওয়ার বেশ ক’দিন পর তাতাসি নদীর জলে ভেসে এসেছিল দুটো লাশ। একজন পুরুষ, একজন মহিলা। লাশদুটো এতই পচে গলে গিয়েছিল যে, শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না। পুলিশ বলল ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে সে দুটো তোমাদের দুজনেরই দেহ। সেই দৃশ্য দেখার পর পুরনো সব স্মৃতি ভিড় করে এল মাথার মধ্যে। তোমরাই বলো, এর পর আর মহিষবাথান থাকা যায়!

আনিস বলল, দু’বছর আগে সেই লাশদুটো নদীর জলে ভেসে আসার কারণেই তো আমাদের কাগজে কলমে মৃত দেখানো হয়েছে। নাম বাদ গেছে ভোটার লিস্ট থেকে। আমি যে সরকারি অফিসে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার জন্য ছুটোছুটি করছি সে তো দু’বছর আগের সেই ভুলের কারণেই।

জরি মুচকি হেসে বলল, জাফর ভাই, একটা কথা জানতে খুব ইচ্ছে করছে। যখন সেই লাশদুটো নদীতে ভেসে এসেছিল, তার পর থেকে কি আপনি কোয়ার্টার্সে থাকতে ভয় পেতেন?

আমি অস্বস্তি এড়াবার চেষ্টা করেও পারলাম না। বিব্রত মুখে বললাম, একটা ইরি ফিলিং যে হতো, সেটা অস্বীকার করব না। পাশাপাশি এটাও ভাবতাম যে, তোমরা যদি সূক্ষ্ম দেহে আমার কাছে আসো তবে তোমাদের কাছে আমি জানতে চাইব কী এমন ঘটল যে, আত্মাহুতির মতো চরম একটা সিদ্ধান্ত নিতে হল তোমাদের?

জরি মুখ থেকে হাসিটা মুছে নিল। সিরিয়াস গলায় বলল, সূক্ষ্ম দেহের কী দরকার, স্থূল দেহেই তো দাঁড়িয়ে আছি আপনার সামনে। আপনি তো জানেন সবটাই। প্রথমে আমার আব্বা গেল, তারপর আম্মি। দুজনকে গোর দিয়ে আসার পর শুরু করেছিলাম নতুন করে বাঁচার লড়াই। অনেক কষ্ট করেছি জীবনে। আমি যেমন জীবনটাকে ভালবাসি, তেমনি আনিসও ভালোবাসে। আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে অকারণে আত্মহত্যা করতে যাব কেন বলতে পারেন।

আমি আমতা আমতা করছিলাম। আনিস প্রসঙ্গ বদলে বলল, জাফর, তোমার চেহারায় একটা চেকনাই এসেছে। কী ব্যাপার বলো তো? বিয়ে থা করেছ নাকি এর মধ্যে?

আমি অল্প হেসে বললাম, হ্যাঁ। ঠিকই ধরেছ।

জরি খুশি হয়ে বলল, আরে বাহ। এ তো দারুণ খবর! কিন্তু দাওয়াতটা যে মিস হয়ে গেল আমাদের দুজনের! এবার কী হবে?

আমি গভীর গলায় বললাম, দাওয়াত খাইয়ে দেওয়া যাবে যেদিন তুমি বলবে। এ আর বেশি কথা কী। তাছাড়া তুমি আমার কাছে কিছু চাইলে আমি কি কখনও তা দিইনি?

আনিস বলল, তুমি কি মহিষবাথানে একাই এসেছ?

আমি বললাম, না, সঙ্গে পারভিন আছে। বেড়াতে আসার উদ্দেশ্যেই আসা এদিকে। আমরা ট্রেন জার্নি করে এসে পৌঁছেছি মহিষবাথানে। স্টেশন থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে যাচ্ছিলাম মাথা গোঁজার জায়গার খোঁজে। জঙ্গলের মধ্যে ট্যাক্সি গেল বিগড়ে। আমি গাড়ি থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। তখনই চোখ পড়ল এই বাড়িটার দিকে। পায়ে পায়ে চলে এসেছি এদিকে।

পারভিন গাড়িতে বসে বোর হচ্ছে। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই বলে রক্ষে। নইলে এতক্ষণে আমাকে ফোন করে পাগল করে দিত। যাই গিয়ে নিয়ে আসি ওকে।

আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। আনিস কেমন একটা গলায় বলল, তোমার সঙ্গে আমার দু-চারটে ব্যক্তিগত কথা আছে জাফর। কারওর সামনে আমি সেসব আলোচনা করতে চাইছি না। এমনকী, তোমার বিবির সামনেও না। তোমার সেটা হয়তো ভালো লাগবে না।

আমি ভেবে পেলাম না, কী এমন কথা বলতে চাইছে আনিস, যা পারভিনের সামনে বলা যাবে না? তবে কি সেদিনের সেই ঘটনার পর্দার আড়ালের গল্প জানতে পেরে গেছে ও? আমি ভুরু টান করে বললাম, কী কথা, তাড়াতাড়ি বলো। জঙ্গলের মধ্যে পারভিন গাড়িতে একা বসে আছে। ড্রাইভার ছাড়া আশেপাশে আর কেউ নেই।

আনিস বলল, দুশ্চিন্তা কোরো না। এই জঙ্গলে তোমার বউয়ের গায়ে টোকাও দেবে না কেউ।

আমি প্লাস্টিক হাসি হেসে বললাম, তুমি এমন করে অ্যাশিওরেন্স দিচ্ছ যেন এই জঙ্গলে বাঘ-ভাল্লুক থেকে চোর-ডাকাত তোমার হুকুম ছাড়া কেউ এক পা-ও চলাচল করে না। তারা কাউকে আক্রমণ করার আগে তোমার কাছে এসে বলে, জাহাঁপনা, আপনি অনুমতি দিলে আমরা নিজেদের কাজ করতে পারি…!

আনিস হেসে ফেলল হো হো করে। হাসছে জরিও। হাসির বেগ থামলে জরি বলল, আপনার সেন্স অফ হিউমার বরাবরই খুব ভালো। আচ্ছা, কেরামন আর কতেমিনের কথা কখনও শুনেছেন জাফর ভাই?

জরির মুখ দেখে ওর ভেতরে কী চলছে ঠাহর করতে পারছি না। আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়েই আছে। আমার ভেতরটা হাওয়া লেগে দুলতে থাকা বাঁশপাতার মতো থিরথির করে কাঁপছে। পেটের মধ্যে হাজার প্রজাপতি নাচতে শুরু করেছে। হঠাৎ এ কথা তুলল কেন জরি? কী মতলব ওর?

জরির চোখের মণিদুটো স্থির। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। আমার ভেতরের হাড়গোড় মাংসমজ্জা সুদ্ধু কেঁপে উঠল। আনিসের দিকে তাকালাম। আনিসের চোখে খেলা করছে কৌতুক। সে-ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক চোখে। যেন আমার ভেতর অবধি দেখতে পাচ্ছে। অজানা আশঙ্কায় গা ছমছম করে উঠল আমার।