১৩
গোপন নদীতে জল নেই এখন। একদিন যেমন হঠাৎ করে জল চলে এসেছিল, তেমনি হঠাৎ করেই জল সরে গেছে। নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রচূড় আর তটিনী। তটিনী বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে। হেমগুড়ি জায়গাটা অদ্ভুত। সন্ধের পর থেকে জায়গাটা অন্যরকম হয়ে যায়।
চন্দ্রচূড় বলল, এই বাড়ির পেছনদিকে গাছগাছালি আছে নানারকম সন্ধে গভীর হলে শনশন করতে থাকে বাতাস। গাছপালাগুলো দুলতে থাকে। পুরোনো জানলাটা খটখট শব্দ করে। প্যাঁচা ডাকে ক্র্যাও-ক্র্যাও শব্দ করে। শেয়ালের দল ডাকে হোউ হুয়া-হোউ হুয়া করে। পরিবেশটাই বদলে যায়। এখানে এসে যে কিছুদিন না থেকেছে সে বুঝবে না।
তটিনী বলল, যা-ই বলো না কেন, শহরের সঙ্গে এদিকের পরিবেশ মিলবে না। দিনের বেলা, যতক্ষণ সূর্যের আলো থাকে, মানুষজন চলাচল করে পথে-ঘাটে, তখনও নির্জনতার আসল চেহারাটা স্পষ্ট হয় না। সেটা ভালো বোঝা যায় সূর্য ডুবলে। সাঁঝবেলার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে সব।
চন্দ্রচূড় বলল, আমি এক-একদিন অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে গোপন নদীর কিনারে চলে আসি। এত্ত ভালো লাগে! চারদিকে ঘাস, গাছপালা, পোকামাকড়, শিশির, কৃষ্ণপক্ষের জ্যোৎস্না আর কুয়াশার ভেতর থেকে স্মৃতি-বিস্মৃতির শ্বাস-প্রশ্বাস মেশানো কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসে।
তুলকালাম বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর এসেছিলাম একবার। নদীর ওপারের জঙ্গল থেকে ভেসে আসছিল নোনা বাদাড়ের গন্ধ। ভেসে আসছিল আবছা সোঁদা মাটির গন্ধ। পাখির বাসার মতো একটা গন্ধ ঘাই মারছিল নাকে। একটা অদ্ভুত মন কেমন আমাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। খৈরি যখন আসে আমি দেখতে পাই না কিছু, কিন্তু অনুমান করতে পারি সব। বুঝতে পারি ফুলকি আধশোয়া হয়ে আছে চৌকিটার ওপর। দু’হাতে বুকের সঙ্গে লাগিয়ে চেপে ধরেছে কুকুরটাকে। অস্ফুট শব্দ করে আদর করছে খৈরিকে। কুকুরটাকে আমি চোখে দেখতে না পেলেও তার গলার আওয়াজ কানে আসে। বুঝতে পারি, আরামে কুকুরটা গলায় ঘরঘরে শব্দ তুলছে। আন্দাজ করতে পারি লাল রঙের সোয়েটারের মতো কিছু একটা দিয়ে ফুলকি ঢেকে দিচ্ছে কুকুরটাকে।
তটিনী বলল, তোমার ভয় করে না?
চন্দ্রচূড় হাসল, ভয় করে না। মায়া জাগে বুকের ভেতর। আমি অনুভব করতে পারি এসব যখন ঘটতে থাকে তখন বুনো ঘাসের মতো… না ঠিক বুনো ঘাস নয়, পাখির বাসার মতো তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধটা ছড়িয়ে পড়তে থাকে আশপাশ দিয়ে।
তটিনী দু’চোখে বিস্ময় মাখিয়ে তাকিয়ে আছে চন্দ্রচূড়ের দিকে। সে যাকে চিনে এসেছে এই মানুষ সে নয়। জ্যোৎস্না জড়ানো হাওয়া ভেসে আসছে। চন্দ্রচূড় তটিনীর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, শুনতে পাচ্ছ কিছু?
তটিনী বলল, কী শুনব?
চন্দ্রচূড় কেমন একটা গলায় বলল, ওই শোনো, গোপন নদীর কিনার থেকে ঘুমজড়ানো গলায় পোকামাকড়ের দল গান গাইছে। স্তব্ধতার গান। আর মাসকয়েকের অপেক্ষা। তারপর শীত আসছে। এই পোকামাকড়েরা তখন ঘুম থেকে আরও গভীর ঘুমের দিকে চলে যাবে। জানো তটিনী, সেদিন গৌরব বসাকের ওপর দিয়ে কত যে ট্রেন এসেছিল আর গিয়েছিল তার হিসেব নেই। রেল লাইনের ধারে পড়ে ছিল তার টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া শরীর। সেই ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীরের পুরোটা জড়ো করে দাহ করা যায়নি। এখনও ওই জায়গাটায় গেলে তুমি দেখতে পাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাংসের দলা, হাড়ের টুকরো।
তটিনী অপলক চোখে দেখছে চন্দ্রচূড়কে। অনুনয় করে বলল, কথা দাও আমাকে, এবার জলপাইগুড়ি ফিরলে তুমি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবে। বলো যাবে? প্লিজ?
চন্দ্রচূড় গলায় কুয়াশা মাখিয়ে বলল, তুমি অবাক হচ্ছ? কিন্তু বিশ্বাস করো, হেমগুড়িতে এতগুলো দিন কাটাবার পর এখন আমি টের পাই সব। রেল লাইনের ধারে জঙ্গলের মধ্যে কোথাও ঘুমিয়ে আছে খৈরি। যত দিন যাচ্ছে তত ওর হাড়-মজ্জা রক্ত-মাংস সব মিশে যাচ্ছে মাটির মধ্যে। প্রকৃতির মধ্যে খৈরি ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। সেখান থেকে নিজেকে কুড়িয়ে আনতে বেচারির বড় কষ্ট হয়। দুলু মণ্ডলকেও অনেক শক্তি খরচ করতে হয় খৈরিকে আবাহন করে আনতে। আচ্ছা তটিনী, এই জগতে সবচাইতে বেশি জোর কীসের জানো?
তটিনী তাকায় সামনে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে। কেমন অচেনা ঠেকে। অস্ফুটে জিগ্যেস করে, কীসের?
চন্দ্রচূড় হাসে, ভালোবাসার জোর। ভালোবাসার চাইতে বড় জোর আর কিছুর নেই। খৈরি ছিল ভালোবাসার কাঙাল। ফুলকি ওকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তা আর কেউ ওকে দেয়নি। সেই ঋণ কুকুরটা আজও ভোলেনি।
চতুষ্পদ সেই অবোলা জীব ভালোবাসার টান আজও অগ্রাহ্য করতে পারে না। এই সব মোহ-মায়ার জগতের ওপারে থাকে সে। সেখান থেকে ছুটে আসে ফুলকির কাছে। তার মালকিন যা ভেট পেলে সবচাইতে খুশি হবে সেই উপহার মুখে করে নিয়ে। কিছুক্ষণ থাকে। ফুলকির শরীরের ওম নেয়। আবার ফিরে যায় প্রকৃতির ভেতরে। বড্ড শীত যে সেখানে!
***
