অন্ধকারের ঘুম

অন্ধকারের ঘুম

সেই ঘটনার পর টানা ক’দিন খেতে পারতাম না, ঘুমোতে পারতাম না ঠিক করে। মনে হতো অন্ধকারের ঘুম থেকে কেউ সজোরে ধাক্কা দিয়ে যেন তুলে দিয়েছে আমাকে। তাতাসি নদীর ধারে পড়ে থাকা দুটো লাশ আমার দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফিরে আসত। ঘুম ভেঙে থরথর করে কেঁপে উঠতাম বোবা আতঙ্কে। জরি আর আনিসকে শেষবার দেখার মুহূর্তটার কথা মনে পড়ত। জানতাম ওরা যে পথ বেছে নিয়েছে তা বিপজ্জনক। কিন্তু এমন কিছু যে হতে পারে তা কল্পনাও করিনি।

ছুটির দিন ছিল। নিম্নচাপের কারণে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন ধরে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কোয়ার্টারে বসে তাস পিটছিলাম আমরা। বিরাট তক্তপোশের ওপর পুরু গদি পাতা। তার ওপর বসে তাস খেলতে খেলতে খোসগল্প চলছিল নিজেদের মধ্যে

এমন সময় জরি এল। পরনে সবুজ চুড়িদার, সবুজ ওড়না। ছাতা আছে হাতে, কিন্তু খোলেনি। বৃষ্টিতে গা মাথা একটু ভেজা। আনিস তাস ফেলে উঠে এল। গলায় উদ্বেগ মিশিয়ে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে?

জরি কেঁদে ফেলল ফুঁপিয়ে। চোখের জল মুছে বলল, তুমি তো জানো, মুসাফিরগঞ্জে আমার ছোট চাচির দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় আছে। সিরাজুল ইসলাম নাম। তার সঙ্গে আমার জোর করে নিকে দিতে চাইছে বাড়ি থেকে। লোকটা মানুষ নয়, জানোয়ার। চরিত্রের ঠিক নেই। খারাপ মেয়েদের ঘরে যাতায়াত আছে।

বিয়ে করেছিল দু’বছর আগে। প্রেমের বিয়ে। কিন্তু প্রেম কেটে গেল ক’মাসের মধ্যে। রোজ রাতে নেশা করে বউকে বেল্ট দিয়ে মারত, সিগারেটের আগুন দিয়ে ছ্যাঁকা দিত। সে আর কত সহ্য করবে? শ্বশুরবাড়ি থেকে একদিন ভোররাতে বেরিয়ে গিয়েছিল। বাপের বাড়িতেও ফেরেনি। লোকে বলে সিরাজুলই নাকি তাকে গুম করে দিয়েছে।

তরুণ বিস্মিত হয়ে বলল, কোনও পুলিশ কেস রুজু হয়নি?

জরি বলল, সিরাজুল রাজনীতির লোক। নদী থেকে বেআইনি বালু পাথর তোলার ব্যবসা আছে। সিন্ডিকেট চালায়। আরও কী কী বিজনেস আছে জানি না। নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে সাট আছে বলে পুলিশ কিছু বলে না। গলায় দড়ি দিতে হয় তবুও ভালো, কিন্তু এই নিকে আমি করব না।

আমি উত্তেজিত গলায় বললাম, জোর করে নিকে দিলেই হল! তোমার বাড়ির লোক কি তোমার পর? তাদের কাছে তোমার মতামতের কোনও মূল্য নেই!

জরি ভেঙে পড়া গলায় বলল, না নেই। গরিব বাড়ির বাপ-মা মরা মেয়ের মতামতের কোনও দাম থাকে না। আমার আব্বা-আম্মি বেঁচে থাকলে আমাকে এমন দিন দেখতে হতো না। চাচা-চাচিদের ঘাড়ের ওপর বসে খাচ্ছি। ওরা আমাকে পার করতে পারলেই বাঁচে।

হর্ষ বলল, সিরাজুল তোমাকে চিনল কী করে?

জরি বলল, মুসাফিরগঞ্জে গিয়েছিলাম শাদির নেমন্তন্ন খেতে। সিরাজুল ও ছিল সেই অনুষ্ঠানে। আমাকে দেখে মাথা ঘুরে যায়। আম্মিকে বলেছিল আমাকে নিকে করবে, অনেক টাকাও দেবে। কিন্তু আম্মি কড়া গলায় বলে দিয়েছিল এমন লোকের ঘরে আমাকে নিকে দেবে না। মরে গেলেও না। সে কথা শুনে মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল সিরাজুলের। জোরজার যে করেনি আমার কপাল ভাল।

কিন্তু আম্মি মারা যাওয়ার পর সিরাজুল নড়েচড়ে বসেছে। আমার ছোট চাচাকে টাকার লোভ দেখিয়েছে। টাকা পাবে বলেই ওরা আমাকে তুলে দিতে চাইছে শয়তানটার হাতে। আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে সিরাজুলকে নিকে করলে।

আমরা এতগুলো পুরুষ, সব চুপ। স্তব্ধতার মধ্যে জরির ফোঁপানির শব্দ শুধু ভেসে আসছে। আমি আনিসের উদ্দেশে বললাম, চলো তো, আমরা সবাই মিলে যাই জরিদের বাড়ি। কথা বলি ওর চাচা-চাচিদের সঙ্গে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিলেই হল! দেশে কি আইনকানুন বলতে কিছু নেই?

আনিসের কপালের একটা পেশি থিরথির করে কাঁপছিল। চোখদুটো ফোলা ফোলা। যেন গভীর ঘুমের মধ্যে ছিল সে। এবার ঘুম ভেঙে জেগে উঠল। এতক্ষণের নীরবতা ভেঙে বলল, থানা পুলিশ করে লাভ হবে না। সিরাজুলের সেটিং আছে নিশ্চয়ই। তাছাড়া জরির চাচা-চাচিরা তক্কে তক্কে থাকবে। সুযোগ বুঝে ধরেবেঁধে আজ না হোক কাল ঠিক নিকে দিয়ে দেবে জরিকে। তা আমি হতে দেব না কিছুতেই।

আমি বললাম, তাহলে?

আনিস কী ভাবল। জরির একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরে চোয়াল শক্ত করে বলল, আমি বেঁচে থাকতে কিছুতেই সিরাজুলের হাতে জরিকে তুলে দেব না। আজই আমরা পালাব। জাফর, আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পারো? আমার পকেট একেবারে খালি। আমি মাইনে পেলেই শোধ করে দেব।

আমি স্তব্ধ হয়ে থাকলাম একটু। উঠলাম। একটা শ্বাস ফেললাম বড় করে। কিছু পাঁচশো টাকার নোট পেলাম আমার ব্যাগ হাঁটকে। একটা নোট রেখে বাকি টাকা দিয়ে দিলাম আনিসকে। হর্ষ আর তরুণও ওদের পার্স থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসে তুলে দিল জরির হাতে। আনিস এক এক করে আমাদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরল। আমি ওর হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি বললাম, এটা তোমাকে শোধ দিতে হবে না।

আনিস টি-শার্ট আর বারমুডা পরে ছিল। পোশাক বদলে নীল জামা আর কালো ফুল-প্যান্ট পরে নিল। একটা ব্যাগে ভরে নিল ঘরে পরার এক সেট জামাকাপড়। আমার হাতটা চেপে ধরে কৃতজ্ঞ গলায় বলল, তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ। সে ঋণ এই জন্মে আমি শোধ দিতে পারব না।

আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, ঋণ আবার কী, এটা বন্ধুকৃত্য।

আনিসদের কোনও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সেভাবে যোগাযোগ নেই। সে যদি জরিকে নিয়ে ইলোপ করে তাহলে সেই দুঃসাহসিক কাজে বাধা দেবার মতো কেউ নেই তার পরিবারে। কিন্তু জরির বাড়ির লোকেরা সাংঘাতিক গোঁড়া। সিরাজুলের মতো প্রভাবশালী এক টাকার কুমিরের সঙ্গে যার নিকে তারা ঠিক করেছে, সেই মেয়ে যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে পালায় তাহলে সেই অনাচার জরির বাড়ির লোক মানবে না। কাজেই যা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই হল। ক’দিন পর তাতাসি নদীর জলে ভেসে এল দুটো পচেগলে যাওয়া লাশ।

ক’দিন কেটে গেল এভাবে। পুজো এল। চলেও গেল একসময়। কিন্তু আমাদের কারওর মনে কোনও আনন্দ নেই। এমন বর্ণহীন দুর্গাপুজো আর কখনও আমাদের জীবনে কাটেনি। সেদিন অফিস করছিলাম, মেজোবাবু ফোন করে বললেন আমরা তিনজন যেন আউটপোস্টে চলে আসি একবার।

গণেশের গাড়িতে চেপে আমি হর্ষ আর তরুণ পৌঁছে গেলাম পুলিশ ফাঁড়িতে। গিয়ে দেখি মেজোবাবু নিজের চেয়ারে বসা। হাতে খালি চায়ের গ্লাস। তিনজন বসলাম তাঁর মুখোমুখি।

মেজোবাবু বললেন, ফরেনসিক রিপোর্ট চলে এসেছে। লাশদুটো আনিস আর জরিরই। দুজনের পাকস্থলীতেই ছিল বিষ। ধানখেতে পোকা মারার যে বিষ স্প্রে করা হয়, সেই জিনিস। দুজনই বিষ খেয়েছিল অনেকটা করে। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঝাঁপ দিয়েছিল তাতাসি নদীর জলে। জলে স্রোত ছিল। বডিদুটো ভেসে গিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। জোড়া ডুমুরগাছের ওদিকটায় নদীর ওপর ঝড়ে ভেঙে পড়া কাঁঠালগাছটায় আটকে যায় বডিদুটো। নইলে লাশ খুঁজে পেতে আরও দেরি হতো।

হর্ষ ইতস্তত করে বলল, একটা কথা জিগ্যেস করি? হুমায়ূন শেখের রেল কোয়ার্টার্স তো দুজনের সেফ হাউস ছিল। তাহলে শুধু শুধু ওরা সেখান থেকে বেরোতে গেল কেন? বিষই বা খেল কেন?

মেজোবাবু চায়ের গেলাসটা ঠকাস করে টেবিলে রেখে বললেন, ওরা দুজন টেররিস্ট নয়। পোড়-খাওয়া ক্রিমিনালও নয়। সূর্যের আলো না দেখে দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা নেই কারওরই। ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। সেই হতাশা থেকেই দুজন ডিসিশন নিয়েছিল নিজেদের শেষ করে দেওয়ার। ঠিক আছে?

আমি বললাম, বিষই যদি খেতে হয় তবে তো রামপুরেই খেতে পারত! এতটা উজিয়ে মহিষবাথানে আসতে গেল কেন?

মেজোবাবু বললেন, ওরা রামপুর থেকে শিলিগুড়ি রুটের কোনও বাস-টাসে উঠেছিল। রেল স্টেশন যায়নি। রেল স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হয়েছে। সেখানে ওদের দেখা যায়নি। মহিষবাথান এসে ওরা খোঁজখবর নেয়। জানতে পারে জরি ইসলামের বাড়ির লোক তখনও হন্যে হয়ে দুজনকে খুঁজছে। তারা গোটা মহল্লাকে এমন তাতিয়ে দিয়েছিল যে, আনিসকে পেলে পিটিয়েই মেরে ফেলত স্থানীয় লোকজন, জরিকে তুলে দিত সিরাজুলের হাতে। সেই মানসিক চাপ নিতে পারেনি ওরা। বিষ খেয়ে নদীতে দুজন ঝাঁপ দেয়। আচ্ছা জাফরবাবু, আনিসবাবু কি সাঁতার জানত?

আমি বললাম, আনিস একবার আমাকে কথায় কথায় বলেছিল, ওদের গ্রামের বাড়ির সামনেই নাকি নদী। পুকুর-টুকুরেরও অভাব নেই। কিন্তু ও সাঁতার শেখেনি কখনও।

মেজোবাবু বললেন, আমিও ঠিক তাই আন্দাজ করছিলাম। খোঁজ নিয়ে জেনেছি জরিও সাঁতার জানত না। লাশদুটো যেদিন উদ্ধার হয় তার ষাট থেকে সত্তর ঘণ্টা আগে মারা গিয়েছিল দুজন। একে আশ্বিন মাসের গরম, তার মধ্যে এতটা সময়। মাছ বা অন্য জলচর জীবেরা খাবলে খুবলে খেয়েছিল পচাগলা লাশদুটোকে।

তরুণ বলল, এমনও তো হতে পারে যে, ওরা স্বেচ্ছায় বিষ খায়নি। কেউ বিষ খাইয়ে ওদের নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল?

মেজোবাবু বললেন, চাষের জমিতে যে পেস্টিসাইড বা সার-টার ব্যবহার হয় তার একটাই দোকান আছে মহিষবাথানে। রেল স্টেশনের কাছে অশোক বর্মণের দোকান। যেদিন জোড়া লাশ উদ্ধার হয় তার দিন তিনেক আগে বোরখায় মুখ ঢাকা কোনও মহিলা ফলিডল কিনেছিল সেখান থেকে। অশোক সেই মহিলার যেমন বিবরণ দিচ্ছে তা জরি ইসলামের সঙ্গে মিলে যায়। আচ্ছা জাফরবাবু, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল আর একবার শুরু থেকে বলুন তো?

সেই বিকেলের কথা নতুন করে খুলে বললাম। কিছুই লুকোলাম না।

মেজোবাবু বললেন, জরি ইসলামের ছোট চাচা কাদের আলির গলব্লাডার অপারেশন হয়েছিল মুসাফিরগঞ্জ হাসপাতালে। গলব্লাডার বার্স্ট করে গিয়েছিল বলে পিত্তকোষের পাথর ছড়িয়ে পড়েছিল তলপেটে। ক্রিটিকাল অপারেশন সন্দেহ নেই। সেই অপারেশন করার মতো ইনফ্রাস্ট্রাকচার মহিষবাথানে নেই। তাই মুসাফিরগঞ্জে নিয়ে যেতে হয়েছিল পেশেন্টকে।

সেখানে ক’দিন ধরে পড়ে ছিল জরির ছোট চাচা, চাচি আর তাদের ক্লাস নাইনে পড়া ছেলে। মুসাফিরগঞ্জ হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি। কথা বলেছি ডক্টর কিব্রিয়ার সঙ্গে। উনিই অপারেশনটা করেছিলেন।

তরুণ বলল, জরি ইসলামের বড় চাচা? তিনি?

মেজোবাবু বললেন, জুলফিকার? সে তো অসুস্থ একেবারে। বাতের ব্যথায় কাহিল। অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় ব্যথা বাড়ে। তখন বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারে না। যেদিন দুজনের লাশ পাওয়া যায় তার দু’দিন আগে অমাবস্যা ছিল। জুলফিকারের ব্যথা বেড়েছিল সে সময়। তিনটে করে ক’দিন পেনকিলার খেতে হয়েছিল তাকে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখে যাচাই করে নিয়েছি। কথাটা মিথ্যে নয়। সে কারণে ভাইয়ের অপারেশনের সময় জুলফিকার মুসাফিরগঞ্জে যেতে পারেনি।

মেজোবাবু আমাদের জন্য চা আনতে বললেন। আপনমনেই যেন একটু হেসে বললেন, জুলফিকারের বিবিকে দেখেছেন? মহিলার ওজন একশো কেজির ওপর। নানারকম আধিব্যাধি আছে। পাইলস তো আছেই। সুগার, প্রেশারেও জর্জরিত। শারীরিক কারণে বাড়ি ছেড়ে বেরোতে পারে না। এদের কারও পক্ষে আনিস আর জরিকে বিষ খাইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া কঠিন।

জরি ইসলামের বাড়ির লোকের অ্যালিবাই শক্ত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে। অনার কিলিংয়ের তত্ত্ব দাঁড়াচ্ছে না। এটা যে সুইসাইড কেস তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ঠিক আছে?