৩
বনবিহারির জীবনে ফুলকিই সব। তার বউ শোভা নিখোঁজ হবার সময় রেখে গিয়েছিল ফুলকিকে। সেদিনের শিশুকন্যা আজ যুবতী। তবে শরীরের বয়স বাড়লেও ফুলকির মনের বয়স বাড়েনি। বনবিহারি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে। আর পাঁচজনের মতো ছিল না তার বউ শোভা। ফুলকির জন্মের পর আরও অচেনা হয়ে যেতে লাগল সে। শেষে তো একদিন হারিয়েই গেল শোভা। ফুলকি মায়ের মতো হয়নি। কিন্তু তার বোধবুদ্ধি আজও বারো বছরের কিশোরীর মতো। বনবিহারি চেষ্টার কসুর করেনি। কিন্তু ডাক্তার বেটে খেয়েও লাভ হয়নি। ফুলকি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও প্রাপ্তমনস্ক হয়নি।
বনবিহারির বয়স যখন ছিল বত্রিশ বা চৌত্রিশ তখন সে তেজি ঘোড়ার মতো ঘুরে বেড়াত। আজ এই মুলুক, কাল সেই মুলুক কতরকমভাবেই না টাকা রোজগার করেছে সে। দুর্গাপুর গিয়ে কনট্রাকটরের সাগরেদগিরি করেছে। পার্টনার জোগাড় করে কালচিনি থেকে কুমারগ্রামদুয়ারের চা বাগানগুলিতে পেস্টিসাইড সাপ্লাই দেওয়ার ব্যবসা করেছে। বর্ধমানের এক হোটেলে ম্যানেজারি করেছে। শিলিগুড়ির সিনেমা হলে আশারের কাজ করেছে। তবে কোনও চাকরিই সে বেশিদিন করতে পারেনি। বনিবনা না হলেই কাজ ছেড়ে দিয়েছে দুম করে। মদ্যপানের অভ্যাস চেপে ধরেছিল একসময়। জুয়ার নেশা ছিল। অকাতরে পয়সা উড়িয়েছে সেসবের পেছনে। তবে একেবারেই যে কিছু সঞ্চয় করতে পারেনি তা নয়। বাস্তুভিটের ওপর এই কাঠের দোতলা বাড়িটা সে সময়ের রোজগার থেকেই বানানো।
বনবিহারির বিয়ে হয়েছিল শোভার সঙ্গে। কাছেই বামনটারি গ্রামে শোভাদের বাড়ি। বাবা প্রাইমারি ইশকুলে পড়াত, মারা গিয়েছিল বুকের রোগে। বাপ-মায়ের সে একমাত্র মেয়ে। এক বিয়েবাড়িতে শোভাকে দেখে পছন্দ করেছিল বনবিহারির মা। সুন্দরী নয়, তবে সুশ্রী। বনবিহারি মায়ের পছন্দে আপত্তি করেনি। শুরুতে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকে অল্প অল্প করে পরিবর্তন ঘটতে লাগল শোভার মধ্যে। বাইরে থেকে বোঝা যেত না, কিন্তু শোভার আচরণ ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। কেমন একটা যেন ঘোরের মধ্যে থাকত।
সকলে ভেবেছিল ছেলেপুলে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের কয়েক বছর বাদে ফুলকি জন্মাল। কিন্তু বাচ্চা হবার পর শোভা তো ভালো হলই না, উল্টে আরও গভীর অবসাদে তলিয়ে যেতে লাগল। এক বর্ষার রাতে বনবিহারিকে না জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। আর বাড়ি ফিরল না। পুলিশের অনুমান দোলনা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল শোভা। বর্ষার প্রমত্ত নদী তাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, কে জানে!
বনবিহারিরর লাগামবিহীন জীবনযাপন সুদে-আসলে পাওনা বুঝে নিয়েছিল। সময়ের আগে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল যৌবন। শরীরে বাসা বেঁধেছিল নানারকম রোগ। শোভা তার চাইতে বয়সে ছোট। বনবিহারির বন্ধুদের অনেকেই তার বাড়িতে আসত। তাদের কারও সঙ্গেই কি আশনাই ছিল তার বউয়ের? কিন্তু বহু জেরা করেও সে কিছু বের করতে পারেনি শোভার পেট থেকে।
শোভার একটা শক্ত খোল ছিল শামুকের মতো। কিছু জিগ্যেস করতে গেলেই সে নিজেকে ঢুকিয়ে নিত দুর্ভেদ্য খোলের ভেতর।
বনবিহারির বিশ্রী একটা কাশি হয়েছিল ক’বছর আগে। ডাক্তার বলেছিল বিড়ি খাওয়া ছাড়তে হবে, নইলে কাশি যাবে না। এখন মদ খায় না, তবে মুঠো মুঠো বিড়ি খায় বনবিহারি। সে কারণেই কাশিটা গেল না। রয়েই গেল তার সঙ্গী হয়ে। বয়সের কারণে তার চোখের জ্যোতি কমেছে। চশমা ছাড়া ভালো দেখতে পায় না। আগের মতো খাটাখাটনিও করতে পারে না। ডাক্তার দেখাতে গেলে কী কী রোগ ধরা পড়বে, কত ওষুধ খেতে হবে, কে জানে। টাকা খরচ হবে বলে নয়, আলস্যের কারণেই যেতে ইচ্ছে করে না ডাক্তারের কাছে। বনবিহারি অপেক্ষায় আছে। ওপর থেকে ডাক আসবে কবে তার অপেক্ষায়। তবে চোখ বোজার আগে ফুলকিকে পাত্রস্থ করে যেতে পারলে নিশ্চিন্ত হয় সে।
এসব দিকে কুড়ি-একুশের মধ্যেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয় বাড়ির লোক। কিন্তু বহু চেষ্টা-চরিত্র করেও ফুলকিকে পার করতে পারেনি বনবিহারি। বাপের কিছু জায়গাজমি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে সে। জমিতে মুনিশ খাটে। সারা বছরের চাল হয়ে যায় জমি থেকে। বাকি চাল বিক্রি করে কিছু টাকা আসে। ব্যাংক আর পোস্ট অফিসে কিছু সার্টিফিকেট আছে। সেসব ভেঙে কোনও গেরস্ত বাড়িতে ফুলকির বিয়ে দিতে পারলেই বর্তে যেত সে। ঘটকের কল্যাণে বেশ কিছু পাত্রপক্ষ এসে দেখে গেছে ফুলকিকে। তাদের দেদার মাছ-মাংস আর মিষ্টিমাষ্টা খাইয়েছে বনবিহারি। কার্পণ্য করেনি কখনও। কিন্তু ফিরে গিয়ে মুখে রা কাড়েনি কেউ।
নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে আজকাল, ফুলকির একটা গতি না হলে কী করে ভাতের গরাস মুখে তোলে বনবিহারি! কিন্তু এই মেয়েকে বিয়েই বা করবে কে! মুখের তুলনায় কপাল উঁচু। দাঁতের সেটিং ঠিক নেই। গায়ের রং পরিষ্কার নয়। তবে বুদ্ধি না পাকলেও মেয়েদের জন্মগত একটা ক্ষমতা থাকে মানুষ চেনার। তা দিয়ে এলাকার সব মদ্দকে চিনে নিয়েছে ফুলকি। সবক’টা শ্মশানের দাঁড়কাক। সুযোগ পেলেই ঠুকরে-ঠুকরে মাংস খাওয়া। মাংস ছাড়া মেয়েমানুষের গতরে যেন আর কিছু নেই।
ফুলকির বিয়ের সম্বন্ধ যে একেবারেই আসেনি তা নয়। সাপের চামড়ার পাইকার কেষ্ট সর্দার বিয়ে করতে চেয়েছিল তাকে। কেষ্টর বয়স ফুলকির দ্বিগুণ। তার বউ মরেছিল ক্যানসারে। বউয়ের বাৎসরিক যেতে না যেতেই একদিন কেষ্ট গুটিগুটি বনবিহারির বাড়ি এসে হাজির। বাবার হুকুম, তাই ইচ্ছের বিরুদ্ধে রান্নাঘরে গিয়ে কেষ্টর জন্য একবাটি মুড়ি আর নারকোল কোরা নিয়ে এসেছিল ফুলকি। এই বাড়িতে অতিথি এলে এটাই নিয়ম। নারকোল কোরা আর মুড়ির সঙ্গে কাচের গেলাসে জল। সঙ্গে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট।
বাইরের উঠোনে দুটো মোড়ায় বসে কথা হচ্ছিল বনবিহারি আর কেষ্টর। রান্নাঘরের আড়াল থেকে সব কথা কানে আসছিল ফুলকির। বিয়ের পর তাকে কেষ্ট নাকি রাজরানি করে রাখবে। খাবার নিয়ে যখন সে এসেছিল ফুলকি বুঝতে পেরেছিল চোখ দিয়ে তাকে চাটছিল কেষ্ট। ফুলকির হাড়মাস জ্বলছিল অসহ্য রাগে। কেষ্ট চলে যাওয়ার পরে সে বলে দিয়েছিল বনবিহারিকে। বাবা, একটা কথা পষ্ট বলে রাখি, এই বুড়ো-হাবড়া দোজবরের সঙ্গে বিয়ে দিলে আমি মায়ের মতোই নদীতে ঝাঁপ দেব। বনবিহারি হতাশ গলায় বলেছিল, বেশ, তোর যখন ইচ্ছে নেই তবে থাক…।
হেমগুড়িতে রিকশা চালায় হামিদুল। কাঁকলাসের মতো চেহারা। তার বউ পালিয়ে গেছে অন্য একজনের সঙ্গে। হামিদুল একদিন ফুলকিকে রাস্তায় একলা পেয়ে কাছে ঘনিয়ে এসেছিল। প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। ঠাস করে হামিদুলকে থাপ্পড় কষিয়ে দিয়েছিল ফুলকি। চিৎকার করে জড়ো করেছিল লোক। শুধু কি হামিদুল? গালামালের দোকানি নিধু হাজরা তার বাপের বয়সি। চাল-তেল-নুন আনতে গেলে নিধু কোনও না কোনও অছিলায় দাঁড় করিয়ে রাখে তাকে। রসের কথা বলে। আর আছে সূর্য সরকার। পার্টির যুবনেতা সূর্যর নাকি ঘরে বউ ছাড়াও শিলিগুড়ি আর জলপাইগুড়িতে দুজন পোষা রাখেল আছে। সেই সূর্যরও নজর আছে ফুলকির ওপর। বিয়ে করবে না, কিন্তু ফুলকিকে একান্তে বিছানায় পেতে চায়।
বোধবুদ্ধি যতই অপরিণত হোক, ফুলকি সার বোঝা বুঝে গেছে। তাকে বিয়ে করার দায়িত্ব নিতে রাজি না হলেও ভোগ করার লোকের অভাব নেই। তবে কি হেমগুড়ির সব পুরুষই এমন? মোটেই না। ফুলকিদের বাড়িতে যে পেয়িং গেস্ট থাকে, সেই গৌরব বসাকই তো অন্যরকম মানুষ। গায়ের রং শ্যামলা, ক্যালেন্ডারের কৃষ্ণঠাকুরের মতো। একমাথা চুল। গ্রামীণ ব্যাংকে যারা কাজের সূত্রে যায় প্রত্যেকে তার গুণগান করে। মানুষটা যেমন কাজে চটপটে তেমনি অমায়িক ব্যবহার।
এই গ্রামে হোটেল বা লজ নেই। মাথা গোঁজার মতো বাড়িও বেশি নেই। বনবিহারির বাড়িতে পেয়িং গেস্ট ছিল সুবোধ দত্ত। সে রিটায়ার করায় তার জায়গায় বদলি হয়ে এসেছিল গৌরব। ইসলামপুরে বাড়ি। ফ্যামিলি থাকে সেখানে। সুবোধ দত্ত যা দিত বনবিহারি তার খানিক বেশি চাইল গৌরবের কাছে। মাগ্যিগন্ডার বাজার। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। এর কমে পারা যায় না। এককথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল গৌরব। সুবোধ দত্ত তল্পিতল্পা নিয়ে চলে যাওয়ার পর তার ছেড়ে যাওয়া ঘরে থাকতে শুরু করেছে গৌরব। পেমেন্ট নিয়ে ঝামেলা নেই। মাসের প্রথম সপ্তাহেই টাকা বুঝিয়ে দেয় বনবিহারির হাতে।
বনবিহারি রান্না জানত না। শোভা চলে যাওয়ার পর হাত পুড়িয়ে খেতে শিখেছে। ভাত-ডাল তো বটেই, ডিম, মাছ কিংবা মাংসের ঝোলও নামাতে পারে দিব্যি। সুবোধ দত্তকে চা, জলখাবার থেকে ভাত, ডাল, তরকারি বা রুটি-সবজি বনবিহারিই রান্না করে খাওয়াত। এখানে ফোনের টাওয়ার বেশিরভাগ সময় থাকে না। সকালের খবরের কাগজ এসে পৌঁছয় দুপুরের পর যখন সেসব খবর বাসি হয়ে যায়। সন্ধের পর গল্পের বই আর বাসি কাগজ পড়ে কাঁহাতক সময় কাটানো যায়? সুবোধ দত্ত প্রায়ই রান্নাঘরে এসে সাহায্য করত বনবিহারিকে।
বনবিহারির একমাত্র দিদি তার থেকে বছর সাতেকের বড়। চিদির বিয়ে হয়েছিল হান্টাপাড়ায়। ভাড়াবাড়িতে থাকত চিদি আর জামাইবাবু। গুরুপদদা বাউন্ডুলে মানুষ। যাত্রাদলে পালাগান লিখত। উপার্জন বলতে কিছু ছিল না। একমাত্র ছেলের যখন চোদ্দো বছর বয়স, বল খেলতে গিয়ে পায়ে জং ধরা পেরেক ঢুকেছিল, ধনুষ্টংকার রোগে মারা যায়।
চিনুদির বেহাল সংসার টানত বনবিহারি। গুরুপদদা মারা যাওয়ার পর বনবিহারি দিদিকে নিয়ে এসেছে হেমগুড়িতে। এখন এই বাড়ির হেঁশেলের ভার সামলায় চিনুদি। সুবোধ দত্ত পেয়িং গেস্ট থাকাকালীন একদিনের জন্যও রান্নাঘরের ছায়া মাড়ায়নি ফুলকি। বনবিহারিই হাত পুড়িয়ে রান্না করেছে। কিন্তু বনবিহারি লক্ষ করছে, গৌরব আসার পর ইদানীং ফুলকি মাঝেমধ্যেই হেঁশেলে আসে। আগ্রহ নিয়ে রান্না শেখে পিসির কাছ থেকে।
গৌরবের বয়স চল্লিশের আশপাশ দিয়ে। বাড়িতে তার বউ আর এক ছেলে আছে। ছেলে নার্সারিতে পড়ে। মোবাইলের সিগনাল ভালো থাকলে গৌরব বাড়িতে ফোন করে। বনবিহারি বিড়িতে টান দিতে দিতে শুনতে পায় গৌরব হেসে হেসে কথা বলছে তার বউ-বাচ্চার সঙ্গে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেন যে তার মন তপতপে হয়ে ওঠে কে জানে! সে বেঁচে থাকতে থাকতে ফুলকির কি আদৌ বিয়ে হবে? মরার আগে কি নাতি-নাতনির মুখ দেখে যেতে পারবে সে? বনবিহারি জানে না।
ব্যাংক শনিবার-রবিবার বন্ধ। শুক্রবার বিকেল নাগাদ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে বা সস্ট্যান্ডে চলে যায় গৌরব। শিলিগুড়ির বাস ধরে। সন্ধে নাগাদ শিলিগুড়ি পৌঁছে বাস বদলে ইসলামপুর পৌঁছয় রাতে। সোমবার কাকভোরের বাস ধরে শিলিগুড়ি হয়ে হেমগুড়ি ফিরে আসে। ব্যাংকের এই ব্রাঞ্চে ম্যানেজার ছাড়া মোটে চারটে মাত্র লোক। বাকিরা সবাই ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। গৌরব বসে টেলার কাউন্টারে। উঁচু গলায় কী করে কথা বলতে হয় তা সে শেখেনি। বনবিহারি দেখে আর মুগ্ধ হয়। গৌরবের মতো এমন আর একটা ছেলে যদি পাওয়া যেত!
হেমগুড়িতে সবই একতলা বাড়ি। জঙ্গল লাগোয়া বলে কাঠের বাড়িই বেশি। এখানে হাতেগোনা যে ক’টা দোতলা বাড়ি আছে বনবিহারির বাড়ি তার মধ্যে একটা। কাঠের বাড়িটার দোতলায় দুটো ঘর। একটা ঘরে শোভা আর বনবিহারি থাকত আগে। শোভা নিখোঁজ হবার পর বনবিহারি বেশিদিন এই ঘরে একা থাকতে পারেনি। রাতে ঘুমোতে গেলেই দম বন্ধ হয়ে আসত তার। মনে হতো কেউ যেন চলে ফিরে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে। ঘুম ভেঙে যেত ভয়ে। কাউকে দেখতে পেত না ঠিকই কিন্তু অদৃশ্য কারওর শ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনত সে। সারা রাত ঘুমোতে পারত না।
বনবিহারির সঙ্গে ছোটবেলায় দুলু মণ্ডল এক পাঠশালায় পড়েছে। সাপ ধরত আগে। এখন সে তন্ত্রমন্ত্র করে। এদিকের লোক বলে ‘কারিগর’। দুজনের বন্ধুত্বে চিড় ধরেছিল। কিন্তু না পেরে তার কাছেই যেতে হল বনবিহারিকে।
দুলু এল ঝোলার মধ্যে সরষের দানা, পশুপাখির হাড়, শেকড়- বাকড়ের মতো কিছু গুহ্য জিনিসপত্তর নিয়ে। দরজা বন্ধ করে শোভার ফোটো রাখল ঘরের মাঝখানে। মোমবাতি জ্বালাল। আসন পেতে ছবির সামনে বসল। সাদা কাগজে মন্ত্র লিখল পেনসিল দিয়ে। দুর্বোধ্য উচ্চারণে মন্ত্র পড়ল। নিজের আঙুলের তর্জনী কেটে একফোঁটা রক্ত, মন্ত্ৰ লেখা কাগজে ফেলে মোমবাতির আগুন দিয়ে কাগজটা পুড়িয়ে সেই ছাই ছড়িয়ে দিল গোটা ঘরে। বলল আর কোনও সমস্যা নেই। বনবিহারি অবশ্য তার পরও দোতলায় থাকার ঝুঁকি নেয়নি। চলে এসেছিল নীচে। তবে দোতলার ওই পরিত্যক্ত ঘরটায় ফুলকি যায় মাঝেমধ্যে। চৌকিতে বসে সাদা কাগজে রংপেনসিল দিয়ে আঁকিবুকি কাটে। কারওর আপত্তি কানে নেয় না। বনবিহারি মনকে বোঝায়, যদি শোভার বিদেহী আত্মা এখনও থেকেই থাকে তবে সে কি আর নিজের মেয়ের ক্ষতি করবে?
দোতলায় যে ঘরটা একসময় বনবিহারি আর শোভার বেডরুম ছিল তার পাশের ঘরটাতে থাকে গৌরব। নিচতলায় রান্নাঘর ছাড়া রয়েছে দুটো ঘর। একটা ঘরে থাকে ফুলকি আর তার বিধবা পিসি। পাশের ঘরটা বনবিহারির। অফিস থেকে ফিরে গৌরব দোতলায় চলে যায়। পোশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে চৌকির ওপর আধশোয়া হয়ে ম্যাগাজিন পড়ে। এতদিন গৌরবকে চা-জলখাবার দিয়ে আসত চিনুদি। ইদানীং চায়ের কাপ বা জলখাবারের প্লেট নিয়ে গৌরবের ঘরে যায় ফুলকি। গৌরব ম্যাগাজিনের পাতা থেকে চোখ তুলে কাপ বা প্লেট হাতে নেয়, হাসে অল্প। ফুলকির নাকের ডগায় ঘাম জমে।
এক রাতে বৃষ্টি হয়েছিল জব্বর। গৌরব তখন সদ্য এই বাড়িতে এসেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুলকি শুনতে পেয়েছিল কুকুরের ডাক। বেরিয়ে এসে দেখে একটা কুকুরছানা বৃষ্টির জলে ভিজে কাঁপছে আর কুঁইকুঁই করছে। এদিক-সেদিক ঘুরে এসেছিল ফুলকি। আর কোনও কুকুরছানা দেখতে পায়নি। খুঁজে পায়নি বাচ্চাটার মাকেও। ভালো করে স্নান করিয়ে, ঘরে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটাকে গরম দুধ খেতে দিয়েছিল ফুলকি।
চুকচুক করে দুধ চেটে চেটে খেতে লাগল কুকুরছানাটা। নেড়ি কুকুরের মতো নয়, এর কানদুটো অন্যরকম। লাল টুকটুকে জিভ। সাদা ধবধবে শ্বদস্ত। ল্যাজ নেই বললেই চলে। গায়ের রং শেয়ালের মতো। তার ওপর ছিটছিট দাগ। লোমশ চামড়া। পায়ের থাবা থ্যাবড়া। নখ ধারালো। বনবিহারি মেয়েকে বলেছিল, দেশি কুকুর এটা নয়। আমি কম মুলুক তো ঘুরিনি, কিন্তু এমন জাতের কুকুর দেখিনি কখনও। এটা শেয়ালের বাচ্চা-টাচ্চা নয়তো?
ফুলকি কুকুরছানাটাকে কোলে তুলে কান-নাক ঠেকিয়ে আদর করল। দাঁত বের করে হেসে বলল, শেয়াল হতে যাবে কোন দুঃখে! এটা কুকুর। কী সুন্দর না দেখতে? এর গায়ের রং খয়েরি। তাই আমি এর নাম দিলাম খৈরি। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এটাকে আমি পুষব। তুমি না করবে না কিন্তু।
বনবিহারি আপত্তি জানিয়ে বলল, একে খাওয়াব কী? আমাদের টানাটানির সংসার। তোর বিয়ের জন্য টাকা সরিয়ে রাখতে হয়। একে বাজার থেকে দুধ কিংবা মাংসের ছাট এনে আমি খাওয়াতে পারব না। ফুলকি হাসল, আলাদা করে কিছু করতে হবে না। আমাদের এঁটোকাঁটা খাবে। দুধ বা মাংসের ছাঁট আনার দরকার নেই।
বনবিহারি আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, আদিখ্যেতা রাখ। আমাকে দে, আমি এটাকে বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসি।
ফুলকি জেদ ধরে বলল, খৈরিকে পুষতে না দিলে আমি বাড়ি মাথায় করব।
বনবিহারির হাঁকডাকে চলে এল চিনুদি। কোমরে হাত দিয়ে দেখল কুকুরছানাটাকে। বলল, শেয়াল-টেয়াল নয়, কুকুরই। তবে বুনো কুকুর। মনে হচ্ছে আশেপাশের জঙ্গল থেকে ঢোল এসে জুটেছে। ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
ফুলকি বলল, আমি একে পুষব যখন বলেছি তখন পুষবই। কয়েক মাস পর শীত আসছে। আমি উলকাটা বুনতে শিখে গিয়েছি। খৈরির জন্য আমি গরম জামা বানাব উল দিয়ে। লাল রঙের। লাল আমার পছন্দের রং।
বনবিহারি আর তার দিদি দুজন দুজনের দিকে তাকাল অসহায় চোখে। বিয়ের বয়স ছাড়িয়ে যেতে চলল, অথচ এখনও বুদ্ধি পাকেনি। কে বিয়ে করবে এই মেয়েকে!
