গোপন নদীর কিনারে – ১২

১২

মাথাটা ধরেছিল বড্ড। আক্কাশ স্যারিডন নিয়ে এসেছিল। ওষুধ খেয়েও কাজ হয়নি। মাথার ভেতর দপদপানিটা রয়েই গেছে। কাজ কম ছিল। আজ একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছে চন্দ্রচূড়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকাল। পাশের ঘরের দরজা খোলা। বন্ধ জানলাটাও খোলা।

এ বাড়িতে এসেছে এতদিন হল, এই প্রথম ওই ঘরের জানলাটাকে খোলা অবস্থায় দেখল সে। শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। বোঝা যাচ্ছে কেউ একজন লাল ম্যাক্সি পরে দরজার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে ঘরের চৌকিটার ওপর। হাতে উলকাটা। একটা উলের বল গড়াগড়ি খাচ্ছে কাঠের মেঝের ওপর। ঘরে একটা ঘষা কাচের আয়না আছে। সেই আয়নায় ফুটে উঠেছে লাল ম্যাক্সি পরা মেয়েটির প্রতিবিম্ব।

নিঃশব্দে দু’পা এগিয়ে খোলা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল চন্দ্রচূড়। যা ভেবেছিল, তাই। ফুলকি। গভীর মনোযোগের সাথে উলকাঁটা দিয়ে সোয়েটারের মতো কিছু বানাবার চেষ্টা করছে। কার জন্য সোয়েটার বানাচ্ছে ফুলকি?

মে মাস চলছে। বাংলায় জ্যৈষ্ঠ। ক্যালেন্ডারের হিসেবে গ্রীষ্মকাল। এই সময় কি কেউ উলকাঁটা বোনে? এই বাড়িতে আসা ইস্তক এখনও ফুলকির সঙ্গে তার আলাপ হয়নি। দূর থেকেই সে শুধু দেখেছে মেয়েটাকে। তাকেও দেখেছে ফুলকি। কাছে আসেনি।

ফুলকি চন্দ্রচূড়ের অস্তিত্ব টের পায়নি। পেছন ফিরে বসা। তার মন উলকাঁটায়। কিন্তু কী এক আঠায় আটকে গেছে চন্দ্রচূড়ের পা-দুটো। নড়তে পারছে না জায়গা ছেড়ে। তাকিয়ে আছে ফুলকির খোলা পিঠের দিকে। দেওয়ালে ঝোলানো ঘষা কাচের আয়নায় ফুটে ওঠা ফুলকির ছবির দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা অস্থির অস্থির করছে।

ফুলকির গায়ের রং চাপা। ঈষৎ পুরু ঠোঁট। একমাথা ঘন কালো চুল খোলা। নাক ধারালো নয়। চোখজোড়াও অভিব্যক্তিহীন। কিন্তু একটা বুনো আকর্ষণ আছে মেয়েটার শরীরের মধ্যে। ম্যাক্সির নীচে কোনও অন্তর্বাস পরেনি ফুলকি। চৌকিতে বসে বেশ খানিকটা ঝুঁকে সোয়েটার বুনছে বলে তার ভারী বুকের অনেকটাই দৃশ্যমান। সেই ছবি ফুটে উঠেছে উল্টোদিকের ঘষা কাচের আয়নায়। কী এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে সেদিকে তাকিয়ে আছে চন্দ্রচূড়। চোখ সরাতে পারছে না।

তটিনীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়েছে বছরখানেক হতে চলল। আড্ডা দিয়েছে বহুদিন, রেস্টুরেন্টে বসে চা-কফি খেয়েছে বিস্তর। সে সময় একদিন ভয়ে ভয়ে তার আঙুলে আঙুল ছুঁয়েছিল চন্দ্রচূড়। তটিনী তার হাত সরিয়ে দেয়নি। সেদিনের পর তার সাহস একটু বেড়েছে। তটিনীর স্কুটির পিলিয়নে বসে রাস্তায় স্পিড-ব্রেকার এলে বা ঝাঁকুনি খেলে তটিনীর কোমর আলতো করে জড়িয়ে ধরে চন্দ্রচূড়। তটিনী বোঝে সব। লুকিং গ্লাস দিয়ে তাকে দেখে। মুখ টিপে হাসে। কিন্তু ওই অতটুকুই। দুজনের ঘনিষ্ঠতা তার বেশি এগোয়নি এখনও।

তটিনীর চেহারা অ্যাথলিটদের মতো। কিন্তু ফুলকি জান্তব। ওল্টানো বাটির মতো ভারী স্তন, গুরু নিতম্ব। চন্দ্রচূড় পারছিল না চোখ সরাতে। কতক্ষণ ফুলকির দিকে তাকিয়ে ছিল জানে না সে। আচমকা তার চোখ আটকে গেল এক জায়গায়। ফুলকির ম্যাক্সির পিঠের দিকে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। অনেকটা জায়গা জুড়ে।

কোত্থেকে এল এই রক্ত? ফুলকির রক্ত তো মনে হচ্ছে না। তাহলে কীসের রক্ত এটা? খৈরি কি খরগোশ-টরগোশ মেরে খেয়ে মুখ ঘষেছিল ফুলকির পিঠে? অন্যমনস্ক চন্দ্রচূড়ের পিঠে হাত পড়ল কার। খকখক কাশির শব্দ।

চমকে মুখ ফেরাল চন্দ্রচূড়। বনবিহারি কখন যে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে দোতলায় চলে এসেছে বুঝতে পারেনি সে। লোকটা কেমন একটা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একটা হাত তার কাঁধে রাখল বনবিহারি।

চাপা গলায় বলল, চন্দ্রচূড়বাবু, কী দেখছেন এত মন দিয়ে? উঁ?

চন্দ্রচূড় আমতা আমতা করে বলল, আমি? কই, কিছু না তো।

বনবিহারির ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি। হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল গোটা মুখে। ফিসফিস করে বলল, ফুলকিকে আপনার পছন্দ?

ধরা পড়ে যাওয়া মুখে স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রচূড়। কী বলবে এর উত্তরে? আমতা আমতা করছে। এদিকে ফুলকি টের পেয়ে গেছে চন্দ্রচূড় আর বনবিহারির অস্তিত্ব। হরিণীর মতো সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নীচে।

বনবিহারির সামনে থেকে ছিটকে সরে গেল চন্দ্রচূড়। নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে কথা হাতড়াতে হাতড়াতে বলল, আমি… ইয়ে মানে ঠিক বুঝতে পারিনি…। খুব মাথাব্যথা করছিল বলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম…।

যেসব কথা বলছে তার যে কোনও মানেই দাঁড়াচ্ছে না সেটা নিজেও বুঝতে পারছিল চন্দ্রচূড়। কিন্তু কী করবে সে! মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার।

বনবিহারি এগিয়ে এল দু’পা। তার ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভেতরে এল। খকখক কাশল। কপালে ছুরির দাগের মতো মোটা দাগ ফুটে উঠল লোকটার। চাপা গলায় বলল, ফুলকি খুব ভালো মেয়ে। আমি লিখে দিচ্ছি কাগজে। ওকে বিয়ে করলে সুখী হবেন আপনি।

চন্দ্রচূড় তার সারা জীবনে এমন অবস্থায় পড়েনি। বনবিহারি আরও এক পা এগিয়ে এল ভেতরে। চাপা গলায় বলল, আমার বাইশ বিঘার মতো ধানিজমি আছে। ব্যাংক আর পোস্ট অফিসে ফিক্সড ডিপোজিট আছে কিছু। সব মিলিয়ে খুব কম হবে না। লাখ দশেকের বেশি। সব দিয়ে দেব আপনাকে। আমার বউ নেই। একটাই মেয়ে। আমার যা কিছু সব মেয়ে জামাই পাবে। বিয়ে করবেন আমার মেয়েকে?

চন্দ্রচূড় কী বলবে কিছু বুঝতে না পেরে বলে বসল, না, আসলে ইয়ে মানে আমার একজন বান্ধবী আছে। এই শীতেই তার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।

বনবিহারির দু’চোখে দুর্জ্ঞেয় কুয়াশার মতো কিছু একটা লেগে আছে। তার কণ্ঠস্বর যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে এমন একটা গলায় বনবিহারি বলল, ছয় রিপুর প্রথম রিপু কী জানেন তো?

চন্দ্রচূড় চুপ। বনবিহারি নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে বলল, কাম। জানেন তো চন্দ্রচূড়বাবু, গৌরব বসাক কিন্তু লোক খারাপ ছিল না। এক বছরেরও বেশি ছিল এ বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হয়ে। আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, কোনওদিন ফুলকির দিকে কুদৃষ্টিতে তাকায়নি। কিন্তু একদিন, একদিন তাকে আমি ঠিক এই অবস্থায় দেখেছিলাম।

চন্দ্রচূড়ের মুখে কোনও কথা নেই। বনবিহারি কেটে কেটে বলল, কামনার রং কী আমি তা জানি। সেদিন গৌরবের চোখে আমি ঠিক এই রংটাই দেখেছিলাম। সাবধান করেছিলাম তাকে। সে শুনল না। আর পরিণতি কী হল দেখলেন তো?

বনবিহারি খকখক কাশছে। কাশি থামলে বলল, খৈরি ছিল ফুলকির ন্যাওটা। খৈরি সেদিন ফুলকির সঙ্গে যায়নি। কুকুরটা থাকলে কি আর গৌরব এমন দুষ্কর্ম করার সুযোগ পেত? খৈরি টুটি চিপে মেরেই ফেলত গৌরবকে। তখন বুঝিনি, এখন মনে হয় খৈরিকে দিনের পর দিন কোনও ওষুধ খাইয়ে গেছে গৌরব। তাই সুস্থসবল কুকুরটা ঝিমিয়ে পড়ছিল দিন দিন।

একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলে একটু দম নিল বনবিহারি। বলল, খৈরি দেশি কুকুর নয়, বুনো কুকুর। জাতে শিকারি। সেদিন খৈরির তাড়া খেয়ে গৌরব ছুটতে শুরু করেছিল। তখন তার মাথার ঠিক নেই। খৈরি গৌরবকে আঁচড়ে-কামড়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। প্রাণভয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গিয়েছিল রেল লাইনে। কখন যে একটা ট্রেন এসে পড়েছে বুঝতে পারেনি। সেদিন ট্রেনে কাটা না পড়লে খৈরিই ছিড়ে খেয়ে ফেলত গৌরবকে। হাজার হোক বুনো কুকুরের রক্ত ছিল তো ওর শরীরে।

চন্দ্রচূড় ফিসফিস করে বলল, রক্ত ছিল মানে?

বনবিহারির মুখে চাপা বিষাদ। অস্ফুটে বলল, খৈরি আর নেই।

চন্দ্রচূড়ের কথাটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল। থতমত খেয়ে গিয়ে বলল, নেই মানে? তাহলে এক-একদিন গভীর রাতে যে কুকুরটা আপনার বাড়িতে রাংচিতের বেড়া ডিঙিয়ে ঢোকে, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসে নিঃশব্দে, সে কে? আমি তো খৈরির পায়ের আওয়াজ, শ্বাসের শব্দ শুনতে পাই। শুধু তা-ই নয়, খৈরির গায়ের বোটকা গন্ধ অবধি আমার নাকে আসে।

বনবিহারির কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল। দু’পা এগিয়ে এল সামনে। চন্দ্রচূড়ের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, শব্দ আর গন্ধই তো পেয়েছেন। কুকুরটাকে কি কখনও নিজের চোখে দেখেছেন?

চন্দ্রচূড় বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে। এ কথা তো মাথায় আসেনি কখনও ঢোক গিলে বলল, না… না তো!

বনবিহারি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, খৈরি আজও ফুলকির মায়া ছাড়তে পারেনি। রেললাইনের ধারে নুড়ি-পাথর আর ঘাস-পাতার মধ্যে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে মরে পড়ে ছিল গৌরব বসাক। ওর টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া শরীর ব্যাগে ভরে নিয়ে গেছে পুলিশ। দাহ করে দিয়েছে। কিন্তু খৈরি?

তার কী হল?

সে-ও আর বাঁচেনি। গৌরবের দেওয়া ওষুধ খেয়ে খেয়ে তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে গিয়েছিল। কুকুরটা হয়তো একদিন না একদিন মারাই যেত, কিন্তু গৌরবকে মরতে বাধ্য করে তবে নিজে মরল। ঘন জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও আজও পড়ে আছে সে।

কোথায়?

খৈরির পচে-গলে যাওয়া শরীরটাকে ঢেকে দিয়েছে জঙ্গলের লতা- পাতা, গাছের শিকড় বাকড়। কিন্তু আপনিই বলুন চন্দ্রচূড়বাবু, কুকুরটা তো ভালোবেসেছিল আমার মেয়েকে। সে তো আজও আসতে চায় ফুলকির কাছে। ওর কাছে আদর খেতে চায়। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো আর আসতে পারে না। তার জন্য বিশেষ বিশেষ তিথি লাগে। তাকে আবাহন করে আনার যোগ্য লোক লাগে।

চন্দ্রচূড়ের হাঁ-মুখ বন্ধ হচ্ছে না। ভুরু জড়ো করে বলল, আবাহন করার লোক বলতে?

বনবিহারি রায় তাকিয়ে আছে চন্দ্রচূড়ের মুখের দিকে। মুখে রহস্যময় কুয়াশা। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, দুলু মণ্ডল সেই লোক। তান্ত্রিকমতে যা ক্রিয়াকর্ম করার সে করে। তার জন্যই তো দেহ ধারণ করতে পারে খৈরি। দেখা করতে আসে ফুলকির সঙ্গে। চন্দ্রচূড়বাবু, মা-মরা মেয়েটার জন্য কিছুই তো করতে পারলাম না। এটুকু আনন্দ যদি দিতে পারি তবে ক্ষতি কী বলুন।

এবার বুঝতে পারছি। তাই যে রাতে খৈরি আপনার বাড়িতে আসে দোতলার কোনার ঘরটা পচা গন্ধে ভরে যায়!

বনবিহারি দু’দিকে মাথা নেড়ে বলল, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। গৌরব বসাকের লাশ রেলে কাটা পড়ে এত টুকরো হয়েছিল যে, পুলিশ সব নিয়ে যেতে পারেনি। আজও রেল লাইনের ধারে পড়ে আছে তার পচা-গলা মাংসের কণা, হাড়ের টুকরো। খৈরি যখন আসে তখন মুখে করে লাশের বা হাড়ের টুকরো নিয়ে আসে। ভাবে এটাই ফুলকির জন্য তার উপহার। ফুলকি খুশি হবে খুব। চন্দ্রচূড়বাবু, আপনি শুধুই খৈরির আসা যাওয়ার শব্দ পান। তাকে দেখতে পান না। কুকুরটাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসত যে, সেই ফুলকিই একমাত্র তাকে দেখতে পায়। এমনকী, আমি আর আমার দিদিও খৈরিকে দেখতে পাই না। বুঝতে পারলেন?