৪
গোপন নদীতে জল দেখার পর থেকেই কনকচাঁদের কু ডাকছিল। তার আশংকাই সত্যি হল।
ধানখেতের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা নিথর ফুলকিকে দেখার পর থেকে মাথাটা ঘেঁটে আছে তার। কয়েক হাত দূরে একটা লাল রঙের ম্যাক্সি আর লাল অন্তর্বাস ভিজছে বৃষ্টিতে। এই মজা খাতে এমনিতে জল থাকে না। এখন আছে বটে তবে তাতে স্রোত নেই। মরানি কোটাল যেমন হয়। রোগা গতরে নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলেছে দোলনা নদীর সঙ্গে মিশবে বলে। কনকচাঁদ শ্বাস ফেলল। তার জীবনও তো এই নদীটার মতোই। শব্দহীন শুধু বয়ে যাওয়া অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
হেমগুড়িতে ডাকঘর, গ্রামীণ ব্যাংক, পঞ্চায়েত অফিস আছে। দোকানপাট হাতে গোনা। হাট বসে সপ্তাহে একদিন। কয়েকঘর বাঙালি যেমন আছে, আদিবাসী আর নেপালি মানুষজনও কিছু রয়েছে। কনকচাঁদ যখন ছোট, তার বাপ তাকে জুতে দিয়েছিল পাঠশালায়। তার সহপাঠীদের বেশিরভাগই এখন কৃষিকাজ করে। হাবু বিড়ি বাঁধে। রাত জেগে দোলনা নদীর বুকে নৌকায় ঠায় বসে থেকে মাছ ধরে বিনু আর রফিকুল। জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠকুটো কুড়িয়ে আনে জিতেন আর রোশন। কনকচাঁদ ছাড়া কালীচরণ, জুলফিকার আর মাসুদ, এই তিনজন সাপ ধরে। কনকচাঁদ বাপের কাছ থেকে কাজ শিখেছে। সাপ ধরায় তার মতো পটু আর কেউ নয়।
কনকচাঁদ, কালীচরণ, জুলফিকার আর মাসুদ— এই চারজনের মধ্যে এলাকা ভাগ করা আছে। একজন অন্যজনের সীমানায় ঢোকে না। তাদের দেখা হয় পাইকার কেষ্ট সর্দারের ডেরায় কিংবা নুনঘরে। চালাচালি হয় বিড়ি। গল্প-টল্প হয়।
গোপন নদীর ধারের ধানখেত লাগোয়া জায়গাটা কনকচাঁদের অলিখিত ইজারা নেওয়া। এদিকটায় বাকিরা আসে না। কনকচাঁদ আজ একটা সরেস মাল পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে গেছে জিনিসটা। এর জন্য কেষ্ট কী দাম দেবে কে জানে! ফিরিয়ে দিলে মুশকিল। তখন মাল বেচতে যেতে হবে বামনটারিতে। সে মেলা ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার।
ফুলকিকে কনকচাঁদ চেনে ভালো করেই। মেয়েটার গায়ের রং পরিষ্কার নয়। মুখশ্রীও যে সুন্দর তা বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, শরীরের বাঁধুনি দারুণ। বাতাবিলেবুর মতো যৌবন থম ধরে আছে ফুলকির সুপুষ্ট শরীরে। একবার তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। সেক্স-টেক্সের ব্যাপারে কনকচাঁদের বন্ধুদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তারা টাউনে যায় প্রায়ই। বিয়ার টানে। বিলিতি মাল খায়। রাপচিক মেয়েদের সঙ্গে রাতও কাটিয়ে আসে কেউ কেউ।
পাটের আড়তদার রাজু প্রধানের ছেলে রোশন প্রধান যেমন। রোশন মোবাইল ফোনের গ্যালারি ঘেঁটে তাকে ছবি দেখিয়েছে তিনটে মেয়ের। এই তিনজনের সঙ্গে নাকি সেক্স করেছে সে। সেই খুল্লামখুল্লা বর্ণনা শুনে গায়ে কাঁটা দিয়েছে কনকচাঁদের। শক্ত হয়েছে পৌরুষ। স্বমেহন করেছে দরজা বন্ধ করে। ফুলকিকে দূর থেকে এতদিন শুধু দেখেই গেছে কনকচাঁদ। মনে মনে কতবার যে রমণ করেছে তার হিসেব নেই। সেই ফুলকি এখন উলঙ্গ অবস্থায় পড়ে রয়েছে তার সামনে।
কনকচাঁদ একাই শুধু নয়, হেমগুড়ির কত লোক যে ফুলকিকে ভোগ করার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছে তার হদিশ কে রাখে! যত বয়সই হোক না কেন, হেমগুড়ির সব হারামি যেন গাঙ-পারের শ্মশানজাগা দাঁড়কাক। ফুলকি পথে বেরোলে তার দিকে বকের মতো তাকিয়ে থাকে সবক’টা, গিলতে থাকে হাঁ করে। অথচ সেই মেয়ে এখন উপুড় হয়ে উদোম শরীরে পড়ে আছে ধানখেতের মধ্যে। মুখটা কাত হয়ে আছে একদিকে। চোখদুটো খোলা। চোখের তারা স্থির। ঠোঁট থেকে গড়িয়ে নামা কষ ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে।
কনকচাঁদ ভেবে তল পাচ্ছিল না, এমন দুঃসাহসের কাজ কে করল? হেমগুড়ির কোনও পুরুষ, না কি বাইরের কেউ? যাদের মুখগুলো তার চোখে ভাসছে তারা কি? এদের বাইরে আর কার নজর ছিল মেয়েটার ওপর? ফুলকি যেখানে যেখানে যেত, ওর বাঘের মতো চেহারার কুকুরটা সঙ্গে সঙ্গে যেত। যে রেপ করেছে তাকেই কি তাড়া করছিল কুকুরটা? বৃষ্টি পড়ছে মুলধারে। চোখের পাতা খুলে রাখাই কঠিন। কনকচাঁদ বসল হাঁটু গেড়ে। এদিক-ওদিক দেখল একবার। কাঁধের জায়গাটা ডান হাত দিয়ে টেনে চিৎ করে দিল ফুলকিকে।
ফুলকি এখন কনকচাঁদকে দেখছে। আসলে দেখছে না। দুই চোখের তারা স্থির। নড়ছে না একটুও। কেমন ভয় ভয় করছে কনকচাঁদের। তার মধ্যেই ফুলকির ওল্টানো বাটির মতো জোড়া স্তনের দিকে তার চোখ গেল। কী নিটোল দুটো বুক! বাদামি বোঁটা। উঠছে না, নামছে ও না। শ্বাস নিচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না। বুক থেকে আরও একটু নীচে নেমে এল কনকচাঁদের চোখ। ফুলকির পুরুষ্টু কলাগাছের মতো দুই উরু আর যোনিপথের দিকে তার নজর গেল। শিরশির করে উঠল ভেতরটা। জীবনে এই প্রথম কোনও যুবতীকে নগ্ন অবস্থায় দেখল সে। কিন্তু এ তো আর জ্যান্ত নয়, মরা মানুষ। এলোমেলো হয়ে থাকা চুলে কানের অর্ধেকটা ঢাকা পড়েছে। নিঃসাড় অবস্থায় পড়ে থাকা ফুলকিকে দেখে কনকচাঁদের কামবোধ হল না। উল্টে এই গরমের মধ্যেও কেমন শীত শীত করতে লাগল।
একরাশ চুল দিয়ে ঢাকা ছিল বলে খেয়াল করেনি। এবার ফুলকির গলার কাছে কনকচাঁদের নজর গেল। নীলচে মতো দাগ। কেউ কি শক্ত হাতে চেপে ধরেছিল ফুলকির গলা? তার মানে যে রেপ করেছে সে ফূর্তি মারার পর গলা টিপে ফুলকিকে খুন করেছে। কে হতে পারে? সূর্য সরকার নয়তো? সে আবার দলবল নিয়ে তার মতো কোনও বোকা বলদের অপেক্ষায় বসে নেই তো আড়ালে? দেখা গেল রেপ আর মার্ডার কেসে কনকচাঁদকেই ফাঁসিয়ে দিল। পার্টির লোক পারে না হেন কাজ নেই। পার্টির নেতা চাইলে ডাক্তারি রিপোর্টে ফুলকির যোনিতে কনকচাঁদেরই বীর্য পাওয়া যাবে। তখন হয় যাবজ্জীবন জেল খাটো কিংবা ফাঁসিকাঠে ঝুলে যাও। কেউ বাঁচাতে পারবে না।
এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে না তো? ঘামতে লাগল কনকচাঁদ। কাদামাখা আলপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল জোরকদমে। তারপর দৌড়। হাঁফাতে হাঁফাতে এল বড় রাস্তায়। তখনই কথাটা মনে হল। ফুলকি যে মরে গেছে এমন তো না-ও হতে পারে। সে তো আর নাড়ি ধরে দেখেনি। যদি এখনও প্রাণ থাকে? হয়তো এখনও হাসপাতালে নিয়ে গেলে বাঁচার আশা আছে। বৃষ্টিটা ধরেছে। পাশাপাশি কয়েকটা ঝাঁকড়া আমগাছ। তার আড়ালে কালীমন্দির চাতাল। প্রত্যেক অমাবস্যায় ঘটা করে পুজো হয়। ভিড় জমে সেসব তিথিতে। হেমগুড়ির বাইরে থেকেও লোক আসে। খিচুড়ি-লাবড়া প্রসাদ হয়। কনকচাঁদ নিজেও বহুবার প্রসাদ নিয়ে গেছে।
মন্দির চাতালে দাঁড়িয়ে ছিল যুগলকিশোর চক্রবর্তী। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। ঠিকুজি-কোষ্ঠী বানায়। হাত-টাত দেখে। সমস্যা-সমাধানের জন্য প্রতিবিধান দেয়। দুলু মণ্ডলের সঙ্গে এক পাঠশালায় পড়েছে ছোটবেলায়। মুরুব্বি গোছের লোকের মধ্যে একজন। তিনশো লোক যুগলকিশোরের বলে দেওয়া চিহ্নে ভোট দেয়। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে সূর্য সরকার, কেউই লোকটাকে ঘাটায় না। হেমগুড়ির এমএলএ অবধি এদিকে এলে যুগলকিশোরের সঙ্গে একবার দেখা না করে যায় না।
কনকচাঁদের সারা শরীর ভিজে চুপচুপে। দৌড়তে গিয়ে একবার জোর আছাড় খেয়েছিল কাদামাখা আলপথে। প্যান্ট কাদামাখা। যুগলকিশোর ভুরু কুঁচকে বলল, কী হয়েছে তোর? এমন ঘামছিস কেন?
সোঁদা হাওয়া দিচ্ছে। বৃষ্টি হওয়াতে এক ধাক্কায় গরমটা কমে গেছে অনেকটা। কিন্তু কনকচাঁদের সারা শরীরে বিজবিজ করছে ঘাম। দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা নেই। একটু আগে দেখা দৃশ্যটা তাকে তাড়া করছে এখনও। কনকচাঁদ কোমরে হাত দিয়ে বসে পড়ল মাটিতে। ফ্যাকাসে গলায় বলল, যুগলকাকা, গোপন নদীতে জল এসেছে।
যুগলকিশোর কথাটা ৰুঝতে সময় নিল। বিস্মিত হয়ে বলল, কী বলছিস তুই?
কনকচাঁদ তড়বড় করে বলল, হ্যাঁ যুগলকাকা। আমি সাপ ধরতে গিয়েছিলাম মজা খাতের ওদিকটায়। তখনই দেখেছি নিজের চোখে। ভাবছিলাম এই তল্লাটের কারও না কারও বিপদ হবে। আর কপাল এমন, হলও ঠিক তাই…
যুগলকিশোর ভুরু ধনুক করে বলল, কেন! কার কী হয়েছে?
আপনি বনবিহারি রায়ের মেয়ে ফুলকিকে চেনেন তো? ফুলকিকে কেউ মেরে ফেলে রেখে গেছে গোপন নদীর ধারে।
যুগলকিশোরের কপালে ফুটে উঠেছে ছুরির দাগের মতো দুটো দাগ। বলল, কী হাবিজাবি বলছিস তুই! তোর দুটো চোখ লাল হয়ে আছে কেন? নেশা-টেশা করে আসিসনি তো?
কনকচাঁদ আহত গলায় বলল, কী বলছেন যুগলকাকা! ভাত খাওয়ারই পয়সা জোটে না, তার আবার নেশাভাং। বৃষ্টিতে ভিজেছি বলে হয়তো চোখ লাল হয়েছে।
ছিঁচকে চুরি-টুরির বাইরে হেমগুড়িতে বড় অপরাধ হয়নি বহুদিন। গ্রাম থেকে খানিক দূরে জঙ্গল। ওপারে ভুটান পাহাড়। জঙ্গলে চোরাশিকারি বা কাঠ পাচারকারীদের উপদ্রব যে নেই তা নয়। কিন্তু এখানকার লোক শান্তশিষ্ট। তাদের রক্তের মধ্যে বড় ধরনের অপরাধ করার মতো ধক নেই। কনকচাঁদের কথা সত্যি হয়ে থাকলে এই কাজ এদিকের কোনও লোক করেনি।
থানার আউটপোস্ট বেশ দূরে। পুলিশের গাড়ি এদিকে বড় একটা আসে না। দরকারও পড়ে না। যুগলকিশোর কনকচাঁদের কাঁধদুটো চেপে ধরল। চাপা গলায় বলল, গোড়া থেকে বল, শুনি। গুছিয়ে কথা বলার মতো অবস্থা নেই। এলোমেলো ভাবে পুরো বৃত্তান্তটা বলল কনকচাঁদ। যুগলকিশোর থমকে থাকল একটু। জিগ্যেস করল, যে লোকটা পালাচ্ছিল তাকে চিনতে পেরেছিস?
দু’দিকে ঘাড় নাড়ল কনকচাঁদ। হড়বড় করে বলল, নীল জামা, কালো প্যান্ট। একটু লম্বা গোছের চেহারা। পেছন থেকে এটুকুই দেখতে পেয়েছি। বৃষ্টির মধ্যে এর বেশি কিছু বুঝতে পারিনি।
যুগলকিশোর হাঁক দিল। এই বয়সেও বাঘের ডাকের মতো গলা। পলকে মাটি ফুঁড়ে হাজির হয়ে গেল কয়েকজন। এদের চেনে কনকচাঁদ। বেচু ঘোষ, নিধুরাম, ন্যাড়া আর গদাকৃষ্ণ, কিন্তু আর নয়ন। কেউ আনাজের দোকানি, কেউ বিমা কোম্পানির এজেন্ট, কেউ সাইকেলে চেপে দাঁতের মাজন, মাথায় দেওয়ার তেল, সাবান, পাউডার বেচে।
সকলেই কালীমন্দির কমিটির লোক। যুগলকিশোরের বন্ধুস্থানীয়। সন্ধের পর তাস খেলে একসঙ্গে। গাঁজার ছিলিমেও টান দেয় কেউ কেউ। কনকচাঁদ শুনেছে একসময় এরা নাকি বাহুবলী ছিল। কাজিয়া বেঁধেই থাকত নিজেদের মধ্যে। বয়সের কারণে গরম রক্ত ঠান্ডা হলেও আজও লোকজন ভয় খায় এদের।
যুগলকিশোর হুংকার দিল, চল তো আমার সঙ্গে সকলে।
গদাকৃষ্ণ জিজ্ঞাসু মুখে বলল, কোথায় যাব? কী হয়েছে যুগলদা? যুগলকিশোর বলল, কনকচাঁদ দেখে এসেছে। ফের জল এসেছে গোপন নদীতে।
সকলে মুখ তাকাতাকি করে নিল একবার। নিধুরাম কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলল, সে কী! তাহলে তো…।
নিধুরামকে কথা শেষ করতে না দিয়ে যুগলকিশোর বলল, সর্বনাশ যা ঘটার ঘটে গেছে। বনবিহারির মেয়ে ফুলকিকে কেউ মেরে ফেলে রেখে গেছে গোপন নদীর ধারে, ধানখেতে। অমল দাসের ইটভাটার ওদিকটায়। তোরা হাতের কাছে লাঠি, টাঙ্গি, কুড়ুল যা পাস নিয়ে আয় এখনই। দেরি করা যাবে না একটুও।
বৃষ্টি থেমে গেছে। কাদার মধ্যে হাটতে হচ্ছে সাবধানে। আগে আগে কনকচাঁদ। পেছন পেছন বাকিরা। দূর থেকে ভেসে আসছে ভেজা বাতাস। খানিক বাদে পা চালিয়ে সকলে এসে পড়েছে সেই জায়গাটায়। ধানখেতের মধ্যে ফুলকি চিৎ হয়ে শুয়ে আছে উদোম শরীরে। চোখদুটো খোলা। হাঁ করা মুখ। কয়েকটা মাছি ভনভন করছে ফুলকির মুখের কাছে। যুগলকিশোরের হাতে ধরা লাঠিটা খসে পড়ল।
গদাকৃষ্ণ আর ন্যাড়া অদূরে পড়ে থাকা ম্যাক্সিটা দিয়ে ঢেকে দিল ফুলকির শরীর। উবু হয়ে বসে ফুলকির নাড়িটা ধরল যুগলকিশোর। কোনও স্পন্দন নেই। নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে দেখল শ্বাস পড়ছে কি না। সবাই মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকাল যুগলকিশোরের দিকে। কপালে ভাঁজ পড়ল অনেকগুলো। মুখে ফুটে উঠল আশঙ্কার ছায়া। যুগলকিশোর ডুকরে উঠল, হে ঈশ্বর!
