শরীরে মমির ঘ্রাণ

শরীরে মমির ঘ্রাণ

কেউ আসছে এদিকে। পারভিনের গলা। নাম ধরে ডাকছে আমাকে। অন্য গলাটা বোধ হয় আমাদের সেই ড্রাইভারের। আমি দ্রুত পা চালালাম। হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই। পারভিন আমার খোঁজে চলে এসেছে এখানে। তার পেছন পেছন সিরিঙ্গে চেহারার সেই ড্রাইভার।

আমার মাথাটা কেমন কেমন করছে। আকন্ঠ মদ খেলে যেমন হয়, তেমন টলমল করছে মাথা। কেন এমন হচ্ছে জানি না। জিনে ধরা মানুষের মতো বললাম, এখানে এই জঙ্গলের মধ্যে একটা সাদা বাড়ি ছিল। কাঠের বাড়ি। তাতাসি নদীর ঠিক ধারে। কোথায় গেল সেটা?

পারভিন চোখ সরু করে দেখছে আমাকে। বলল, এই জঙ্গলের মধ্যে সাদা কাঠের বাড়ি আসবে কোত্থেকে? তাছাড়া তোমার গা থেকে একটা বোটকা গন্ধ আসছে কেন বলো তো? মর্গের ডেডবডি থেকে পচাগলা যে বিশ্রী একটা গন্ধ বেরোয়, অবিকল তেমন গন্ধ।

আমি নিজের হাতের তালু নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম। মনে হচ্ছে যেন হাজার বছর আগের কোনও মমির শরীরের ঘ্রাণ এসে বাসা বেঁধেছে আমার শরীরে। কেন এমন হচ্ছে? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?

পারভিন আর গাড়ির চালক দাঁড়িয়ে থাকল। আমি পা টিপে টিপে এগোচ্ছি নদীটার দিকে। কৃষ্ণপক্ষের হাড় জিরজিরে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মেঘের ফাঁক দিয়ে। থোকা থোকা হাসনুহানা ফুটে আছে নদীর ধারে। নদীর জলের রং সীসের মতো। যত এগোচ্ছি ঝিমঝিম গন্ধটা নাকে ঝাপটা মারছে। চোখ কচলালাম। যা দেখছি তা কি সত্যি!

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার থেকে ত্রিশ-বত্রিশ গজ দূরে মাঝনদীতে নির্বিকার ভঙ্গিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে জরি। চোখদুটো খোলা। আনিস শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। একে অন্যের হাত আঁকড়ে পরম নিশ্চিন্তে যেন চোখ বুজে ঘুমিয়ে আছে দুজন।

এতক্ষণ নদীতে ঢেউ ছিল না। এবার জলের স্রোত বাড়তে লাগল ক্রমশ। জলের রংটাও বদলে সীসে থেকে ঘন নীল হয়ে যেতে লাগল। আমি বিহ্বল হয়ে চোখ কচলালাম। আমার বুকের রক্ত চলকে উঠল। তাকিয়ে দেখি তাতাসি নদীর নীল জলে রক্তের স্রোতের মতো ঢেউ উঠছে। সমুদ্রে যেমন হয়। এক-একটা ঢেউ এক মানুষ সমান উঁচু।

নদীর জলে এখন তুমুল স্রোত। জঙ্গল থেকে ভেসে আসা কাঠকুটোর টুকরো ভেসে যাচ্ছে জলের স্রোতে। অথচ কী আশ্চর্য, ওদের লাশদুটো বিজ্ঞানের সূত্র অস্বীকার করে একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। নড়ছে না, চড়ছে না, ভেসে যাচ্ছে না জলের টানে।

আমার পা থেকে মাথা অবধি কাঁপতে লাগল প্রবল আতঙ্কে। একটু আগে যে আনিস আর জরিকে দেখলাম, ওদের সঙ্গে কথা বললাম, সেসব কি আমার মনের ভুল?

আমার মন ছুটে যাচ্ছিল দু’বছর আগের সেই দিনটায়। তাতাসি নদীর জলে ভেসে উঠেছিল দুজনের লাশ। ঠিক এভাবেই তো শুয়ে ছিল দুজন। একজন চিৎ হয়ে, অন্যজন উপুড় হয়ে। মৃতদেহদুটো দেখার পর অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। আমি সিরাজুলকে খবর না দিলে ওদের খোঁজ এত সহজে পাওয়া যেত না। ওরা রামপুরে হুমায়ূনের নিশ্চিন্ত ডেরায় হয়তো নিজেদের মতো করে সুখ খুঁজে নিত।

ভেতরে একটা কাঁপুনি চলছিল আমার। প্রবল একটা অপরাধবোধ আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছিল মহিষবাথান ফাঁড়ির মেজোবাবু টের পেয়ে যাবেন না তো সব? যারা লাশ দেখতে এসে দাঁড়িয়েছে নদীর পাড়ে তারা আমাকে দেখে কিছু বুঝতে পারছে না তো? আমিও তো অপরাধী। এই দুজনের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি বিশ্বাসঘাতকতা না করলে ওরা দুজন তো নিজেদের মতো করে সংসার করতে পারত।

সেদিন টেনে হিঁচড়ে নিজের ধ্বশরীরটাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম অফিস কোয়ার্টার্সে। সেদিন আর কাজে যাইনি। সারাদিন ধরে দৃশ্যটা এসে বিরক্ত করছিল আমাকে। ঘরে এসেও আরও কয়েকবার বমি করেছিলাম। শরীর খারাপ লাগছিল খুব

সেই দৃশ্যটা সারা জীবনের মতো গেঁথে গিয়েছিল মস্তিষ্কে। তারপর দুঃস্বপ্ন দেখে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেত বারবার। সিরাজুল খুন হবার ঘটনাটা শোনার পর ভয়ে ভয়ে ছিলাম ক’দিন। পুলিশ নিশ্চয়ই ওর মোবাইলের কল রেকর্ড চেক করে দেখবে কার কার সঙ্গে ও কতক্ষণ কথা বলেছিল। আমার সঙ্গে যে ওর কথা হয়েছিল ফোনে, সেটা পুলিশ টের পেয়ে যাবে না তো? আমি যে মুসাফিরগঞ্জে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করেছিলাম, ওর মাথার ভেতর ভরে দিয়েছিলাম আক্রোশের বিষ, সেসব পুলিশ জেনে যাবে না তো?

না, সেসব কিছু হয়নি। দু’বছর গড়িয়ে গেছে সেই ঘটনার পর। কিন্তু আজ এমন অতর্কিতে যে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ব সেটা আমার কষ্টকল্পনাতেও ছিল না। আমার সম্বিৎ এল। আমি মুখ ফিরিয়ে ডাকলাম পারভিনকে। চিৎকার করে বললাম, এদিকে এসো। দেখে যাও দুটো লাশ ভেসে আছে নদীর জলে।

পারভিন কৌতূহলী পায়ে চলে এসেছে আমার পাশে। চোখ কুঁচকে সামনের দিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে বলল, কী আবোলতাবোল কথা বলছ? কোথাও তো কিছু নেই!

আমি মুখ ফেরালাম তাতাসি নদীর দিকে। আমার দুটো পা তির দিয়ে কেউ গেঁথে দিয়েছে মাটিতে। এতক্ষণ দেখছিলাম আনিস আর জরি স্থির ভেসে আছে নদীর নীল জলে। তাতে সমুদ্রের মতো লাল ঢেউ।

এবার দেখলাম হাসনুহানার ঝোপের আড়ালে নদীর ওপারে জোড়া ডুমুরগাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আছে একজন। না না, একজন নয়, পাশাপাশি দুজন। হাওয়া দিচ্ছে খুব। ঝুলে থাকা দেহদুটো দুলছে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। ঢোক গিললাম ভয়ে

চাঁদের ম্লান আলো ডুমুর গাছদুটোর ডালপালার ওদিকে পৌঁছচ্ছে না। ঝুলন্ত লোকদুটোর মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু দুজনের সিল্যুয়েট দেখা যাচ্ছে। অনুমানশক্তির ওপর ভর করে অস্পষ্ট আলোয় চেনা চেষ্টা করছি। লম্বা দশাসই চেহারার ওই শরীরটা কার? সিরাজুল ইসলামের না? আমি একবারই দেখেছি সিরাজুলকে। সেই সা-জোয়ান চেহারা, শয়তানি মাখা নৃশংস দুটো চোখ আমি ভুলতে পারব না কখনও।

কিন্তু সিরাজুলের পাশে ডেনিম জিনস আর সাদা জামা পরা কে ওটা?

আমার মেরুদণ্ডে বরফ ছুঁইয়ে দিল কেউ। ওই চিবুক, ওই নাকের আদল আর প্রশস্ত কপাল, ওই দোহারা শরীরের কাঠামো সব ভীষণ চেনা আমার। ওটা তো আমি নিজেই! বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এসব কী হচ্ছে? বিভ্রম কোনও? নাকি মাথাটাই গেছে আমার! অন্ধকার এক টানেলের মধ্যে ঢুকে বসে আছি যেন। পারভিন আর ট্যাক্সিচালকের গলার স্বর যেন গভীর কোনও সুড়ঙ্গের ওপার থেকে ভেসে আসছে। হাঁ করে দেখছি ফাঁসি দেওয়া নিজের স্থির হয়ে যাওয়া শরীরটাকে!

স্থাণুর মতো কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। এবার দেখলাম সদ্য আঁকতে শেখা কোনও শিশু যেমন করে কালো স্লেটে সাদা চক দিয়ে অপটু হাতে কিছু আঁকা মকশো করে আবার মুছে দেয় ঠিক তেমনি করে অলৌকিক দৃশ্যটা মুছে দিচ্ছে কেউ। এতক্ষণ যা দেখছিলাম তা আর দেখতে পাচ্ছি না। আর তখনই প্রচণ্ড শব্দ করে জঙ্গলের ভেতর থেকে ডেকে উঠল কোনও বুনো জন্তু। হাতির ডাক? কী জানি!