ভিজে মেঘের দুপুরে

ভিজে মেঘের দুপুরে

আনিসের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ভেটেরিনারি পড়ার সময় থেকে। আমাদের মধ্যে মিল ছিল অনেক। পড়াশোনায় আমরা আহামরি কিছু ছিলাম না। তার মানে যে ব্যাকবেঞ্চার ছিলাম তা নয়। আমরা মাঝারি গোছের ছাত্র।

কলেজ থেকে পাশ করে বেরোতে না বেরোতেই দুজন একসঙ্গে চাকরি পেয়ে গিয়েছিলাম মহিষবাথান ফার্মে। কাজে যোগ দেবার পর আমাদের ঠাঁই হয়েছিল ওখানকার ট্রেনিজ হোস্টেলে। সেখানেই একটু একটু করে গভীর হয়েছিল আমাদের বন্ধুত্ব যেখানে ক্ষুদ্র স্বার্থের কোনও জায়গা নেই।

কয়েক মাস থাকলাম হোস্টেলে। একসঙ্গে হইহই করে বাঁচার সে এক মজাদার অভিজ্ঞতা। সেখানে থেকে একটু একটু করে কাজ শেখা হল। ততদিনে জমাট বেঁধে গেছে আমাদের সখ্য। কাজ শেখার পর আমাদের জুড়ে দেওয়া হল মিল্ক কলোনিতে। সেখানে মোট চারটে ইউনিট। আমি আর আনিস দুটো ইউনিটের সুপারভাইজার। জলপাইগুড়ির হর্ষ আর মালদার তরুণ ছিল অন্য দুটো ইউনিটের দায়িত্বে। প্রায় একইরকম আমাদের বয়স। পছন্দ-অপছন্দও অনেকটা একরকম। ওদের সঙ্গেও ভাব হতে সময় লাগল না।

একসঙ্গে এত সবুজ আমি বড় একটা দেখিনি। ফার্মের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পড়ত দিগন্তজোড়া সবুজ ঘাস। পরে জেনেছিলাম তাকে বলে নেপিয়ার, যা আসলে একরকম গোখাদ্য।

ফার্মে কাজ হত ঘড়ির কাঁটা ধরে। ভোর চারটেয় উঠতে হতো ঘুম থেকে। দু’চোখ থেকে ঘুম তাড়াতে তাড়াতে হোসপাইপ দিয়ে মোষ ধোয়ানো দিয়ে শুরু। ছ’টা থেকে দুধ দোয়া। সে এক অন্যরকম জীবন।

গোয়ালারা আমাদের ক্যাম্পাসেই থাকতেন। দশটা মোষ রাখলে তবেই একটা করে কোয়ার্টার পেতেন ওঁরা। আমাদের ক্যাম্পাসে যেসব গোয়ালা থাকতেন, তাঁরা এবং তাঁদের স্ত্রী পুত্র কন্যা ছিল আমাদেরই বৃহত্তর পরিবারের সদস্য। আমরা কাটা খড় বিক্রি করতাম গোয়ালাদের। মোষ ভাড়া আর খড়ের বিল করতে হতো। দশদিন অন্তর দেওয়া হতো দুধের দাম। এসব খরচা দুধের দাম থেকে বাদ যাবে, তাই সময়ে বিল পাঠানোটা ছিল জরুরি।

এ ছাড়াও আমাদের কাজ ছিল জল তো বটেই, ইলেকট্রিসিটি ঠিক আছে কি না সেসব দেখা। সারাদিন নিজেদের কাজ নিয়েই মগ্ন থাকতাম আমরা। কাজটাও মজার। ফলে সময় কেটে যেত হুস করে।

হোস্টেলে আমাদের খাওয়া-দাওয়া ছিল রাজা বাদশাহদের মতো। সে একেবারে এলাহি বন্দোবস্ত। নিজেদের ডেয়ারির খাঁটি ঘি, সেই উমদা ঘি দিয়েই ভাজা পরোটা, ওমলেট, সুগন্ধি চালের ভাত আর ডিমসেদ্ধ। গোটারি থেকে আসত কচি পাঁঠার মাংস। কোয়ার্টার্সে কার বউ বেশি সুন্দরী, কোন বউদি একটু বেশি মিশুকে আর গায়ে-পড়া, কার ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস কত, এসব ছিল আমাদের রসালো আলোচনার বিষয়বস্তু।

মরশুম অনুযায়ী ফুটবল পেটানো আর ক্রিকেট খেলাও হতো ছুটির বিকেলে। শীতের সন্ধেবেলা দুশো পাওয়ারের দশটা বাতি জ্বেলে নেট টাঙিয়ে খেলা হতো ব্যাডমিন্টন। কখনও খেলতাম ভলিবল। বৃষ্টির দিন দুপুরবেলা কিংবা অন্যদিন কাজের পর রাত্তিরে হতো তাস। ব্রিজ খেলতে জানতাম না। আমরা খেলতাম হাজারি, ব্রে, কল ব্রে, রামি। বিনে পয়সায় খেললে উত্তেজনা কম, তাই এক টাকা বাজি। দু-তিন ঘণ্টা ধরে তাস খেলার পর কেউ কুড়ি বা তিরিশ টাকা জিতত, কিংবা হারত। কিন্তু সময় কাটত জেটবিমানের গতিতে।

মুসাফিরগঞ্জে ছিল মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। মহিষবাথানে থাকতে থাকতে চেনাজানা হয়ে গিয়েছিল অনেকের সঙ্গে। তাদের মধ্যেই ছিল একজন এক্স-আর্মি। তাকে ধরে-টরে ক্যান্টনমেন্ট থেকে মাঝেমধ্যেই জোগাড় করে আনা হতো সস্তার রাম। শীতকাল তো বটেই, গ্রীষ্ম বা বর্ষাতেও আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল সেই ঘোড়ায় খাওয়া কড়া স্বাদের পানীয়। এক-একদিন গলা অবধি খেয়ে বেহেড মাতাল হয়ে যেত কেউ কেউ। মুড ভাল থাকলে আনিস গান গাইত নেচে নেচে। তাল দিতাম আমরা সকলে। সে ছিল আমাদের এক অনন্ত চড়ুইভাতি।

ফার্মের কাছেই ছিল একটা ছোটখাটো মসজিদ। ফি-শুক্রবার দরগায় মোমবাতি জ্বালাতে আসত সব ধর্মের মানুষজন। স্থানীয় লোক তো বটেই, দূরের জনপদ থেকেও অনেকে আসত। আমি আর আনিসও যেতাম শুক্রবার করে। হর্ষ আর তরুণ এক-একদিন আমাদের সঙ্গ দিত। ওরাও সেখানে জ্বালাত মোমবাতি। মসজিদের বাইরে বসে থাকা গরিব মানুষগুলোকে খুচরো পয়সা দান করতাম আমরা। মন ভরে যেত আনন্দে।

সপ্তাহে একদিন বসত হাট। হাটবারে আমি আর আনিস যেতাম ঘুরতে। চায়ের দোকানে এক কাপ কড়া করে বানানো দুধ চা আর লেড়ো বিস্কুট খেয়ে সেই দোকানের বাইরেই আমাদের সাইকেল রেখে ঘুরে বেড়াতাম ইতিউতি। সবুজ শাকসবজি, নধর চেহারার লাউ কুমড়ো দেখে চোখের আরাম হতো। তাতাসি নদীর সুস্বাদু মাছ কিংবা তাগড়াই চেহারার মোরগ কিনতাম একেবারে জলের দরে।

হাটে ঘুগনি বিক্রি করতে আসত আশ্চর্য এক মেয়ে। যেমন শরীরের বাঁধুনি, তেমনই মুখের ডৌল। ডাগর ডাগর নিষ্পাপ চোখদুটো দেখে মনে হতো গহন অরণ্যের কোনও ঘাইহরিণী। তার বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা ঘুগনি খেতাম শালপাতার দোনায় করে, লেবু আর বিটনুন দিয়ে। এমন সুস্বাদু ঘুগনি আগে আমরা খাইনি।

মেয়েটির সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল ধীরে ধীরে। জানা গেল, তার নাম জরি। ফি-শুক্রবার করে আনিস আর আমার হাটে যাবার মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াল এই মেয়েটি। জরিকে দেখে মনে হতো জান্নাত থেকে নেমে আসা এক হুরি। ডানাদুটোই শুধু নেই। ভারি মিষ্টি করে কথা বলত সে। মনে হতো ‘আলিফ লায়লা’ বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা লায়লা, কিংবা ‘হাজার এক আরব্য রজনী’-র কোনও শাহজাদি ভুল করে চলে এসেছে মহিষবাথানে, শাপগ্রস্ত হয়ে জন্মেছে গরিবের ঘরে।

জরির প্রেমে পড়ে গেল আনিস। তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। প্রেমে পড়ার মতোই মেয়ে ছিল সে। শালপাতার দোনায় ঘুগনি খেতে খেতে পাশাপাশি বসে তার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করত আনিস।

আমিও থাকতাম ওদের সঙ্গে। গল্পে গল্পে কেটে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সন্ধে ঘনালে যখন আমরা দুজন ফিরে আসতাম, তখন আনিসের মুখে যে ঘন ছায়া ঘনাত সেটা চোখ এড়াত না আমার।

জরির সঙ্গে ক’দিন দেখা না হলে আমার নিজেরও ফাঁকা ফাঁকা লাগত। মনে হতো কী যেন হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। ফিলাটেলি যাদের শখ তারা যেমন ডাকটিকিট সংগ্রহ করে, আমিও সেই ভিজে মেঘের দুপুরগুলোকে জমিয়ে রাখতাম আমার মনের ভেতর সঙ্গোপনে রাখা নিজস্ব এক অ্যালবামে।

ফার্ম থেকে মাইলখানেক দূরে জরিদের মাটির নিকনো বাড়ি। ওর আব্বা সালামত ইসলামের ছোট্ট দর্জির দোকান ছিল বাস স্ট্যান্ডের কাছে। জরির আম্মির নাম রুকাইয়া। মুর্শিদাবাদ জেলার মেয়ে। অসাধারণ ছবি আঁকেন। কারওর কাছে আঁকা শেখেননি। জরিদের বাড়ির মাটির দেওয়ালে সাদা রঙে চমৎকার সব নকশা তৈরি করেছেন তিনি। সে নাকি দেখার মতো ব্যাপার। জরি আমাদের বলত ওদের বাড়িতে একবার যেতে। আমরা বলতাম, যাব নিশ্চয়ই। কী খাওয়াবে গেলে? জরি মিষ্টি করে হেসে বলত, এসেই দেখুন না একবার। এটুকু কথা দিতে পারি যে, খালি মুখে ফেরাব না।

একদিন সত্যি সত্যিই আমি আর আনিস চলে গেলাম জরিদের বাড়ি। একটু ঘিঞ্জি। প্যাঁচপ্যাচে। নিবু নিবু আলো জ্বলে।

জরি বলল, এখন এমন দেখছেন, ইদের দিন এলে চিনতে পারবেন না আমাদের বাড়িটাকে। সেদিন এই মহল্লার সব বাড়িতে এলইডি আলো জ্বলে। খুশি গলে গলে পড়ে। সাবানের ফেনার মতো পিছলে যায় পথঘাট। আতরের গন্ধ পাক খেয়ে ঘুরে বেড়ায় আমাদের মহল্লায়।

আমাদের সঙ্গে খানিক গল্প করে জরির আম্মি উঠে পড়লেন। আমরা মেহমান, যতই অভাব থাকুক মেহমানদারি তো করতেই হবে। প্যাকেটের দুধ আর সেমাই চাপল উনুনে। একটু বাদেই আমাদের জন্য দুটো আলাদা কাচের বাটিতে লাচ্ছা সেমাই এল। ওপরে কাজু আর কিশমিশের টুকরো। একটা খেজুর। জরির আব্বা সালামত ইসলাম বললেন, সামনের মাসেই তো ইদ। সেদিন এসো তোমরা। দাওয়াত দেওয়া রইল আগে থেকেই।

ঘরের কাছেই এমন এক আরশি নগরের সন্ধান পাব তা আমরা কখনও ভাবিনি। না আমি, না আনিস। সত্যি সত্যিই আমাদের পড়শি হয়ে উঠেছিল ওরা। জরি আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এমন এক এক উপকূলে যেখানকার বাতাসে নোনা বাদাড়ের ঘ্রাণ।

সেবার ইদের সময় বাড়িতে মিথ্যে কথা বললাম। অফিসের কাজের অজুহাত দিয়ে কলকাতা ফিরলাম না। আনিসও একজনকে দিয়ে খবর পাঠাল ওর বাবার কাছে। জ্বর হয়েছিল, এখনও শরীরটা যুতে নেই ইত্যাদি জানিয়ে নদিয়া গেল না।

ইদের দিন জরিদের বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন ছিল দুপুরবেলা। নতুন কেনা কুর্তা আর পাজামা পরে সেদিন সকালবেলা মহিষবাথানের মসজিদ গেলাম আমরা। সেখান থেকে সরাসরি ওদের বাড়ি। ঝাল ঝাল দেশি মুরগির মাংস আর পোলাও খেলাম পেট ভরে। সঙ্গে ফিরনি। কী চমৎকার রান্না। দামি হোটেলের থেকেও ভালো। সেদিনের পর থেকে অবরে-সবরে জরিদের বাড়িতে আমাদের যাওয়া শুরু হল।