গোপন নদীর কিনারে – ৫

লালচে ইট বিছানো পথের দু’ধারে শিরীষ গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে। ওপারে ধানখেত। নির্জনতা ভেঙে ঘুঘুর ডাক ভেসে আসছে। চৈত্রের দুপুর ক্লান্ত হয়ে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছে এখানে। গাছের ছায়ায় ঢাকা পথটুকু দিয়ে ছুটোছুটি করছে একজোড়া কাঠবেড়ালি। সামনে গাছের ছায়ায় চাদরে ঢাকা কোনও পিরের কবর। সাদা রং ছিল কোনও একসময়। শিরীষ ফুল পড়ে আছে কবরের ওপর। পাশেই বিশাল একজোড়া বুড়ো বটগাছ দাঁড়ানো, তাদের বয়সের সীমা-পরিসীমা নেই।

দোলনা নদী বয়ে যাচ্ছে খানিক দূর দিয়ে। গাছগাছালির দঙ্গল। ধোঁয়া উড়ছে পাক খেতে খেতে। নাকে ভেসে আসছে চামড়াপোড়া গন্ধ। চন্দ্রচূড় এই গন্ধ চেনে। তার মানে এটা স্থানীয় শ্মশান। মনটা হু-হু করে ওঠে এমন পরিবেশে এলে। কোনও ক্লান্ত পথিক এই রাস্তায় এলে তার মন উদাস হয়ে যাবে। সে মনে মনে উপলব্ধি করবে আমাদের পবিত্রতম যাত্রা শুরু হয় মৃত্যুর পর।

রিকশাওয়ালার নাম হামিদুল। অপুষ্ট শরীর। ঝাঁকড়া চুল। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কণ্ঠার হাড় উঁচু হয়ে আছে। যতবার প্যাডলে চাপ দিচ্ছে ততবার ‘অক’ করে তার গলা দিয়ে একটা শব্দ উঠে আসছে। ফুল-প্যান্ট যাতে হড়কে নীচে নেমে না আসে তার জন্য কোমরে পাটের দড়ি বাঁধা। লাল নাইলনের গেঞ্জির পিঠে সিমেন্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপন। জগতে বকবক করা মানুষ থাকে কিছু। যারা দু’মুঠো ভাত না পেলেও হয়তো চালিয়ে নেবে কিন্তু কথা বলতে না পারলে তাদের চলবে না— হামিদুল তেমন শ্রেণির লোক।

হেমগুড়ির ভেতর বাস ঢোকে না। গ্রাম থেকে কিলোমিটার চারেক দূরে বড় রাস্তার মোড়ে একটা বটগাছে টিনের সাইনবোর্ড লাগানো। গাছের গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ওটাই যাত্রীদের বসার জায়গা। জং ধরা সাইনবোর্ডে ট্যাবট্যাবে লাল কালিতে হাতে লেখা ‘এখানে বাস দাঁড়াইবে’।

বটগাছের সামনে একটা ধ্যান্ধেরে বাস নামিয়ে দিয়েছিল চন্দ্ৰচূড়কে। বাস থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল সে। কাঁধে ব্যাকপ্যাক। হাতে বিগশপার। একজন রিকশাওয়ালা এগিয়ে এসেছিল তার দিকে। চন্দ্রচূড় বলল, কায়েতপাড়ার বনবিহারি রায়ের বাড়ি যাব। চেনো?

রিকশার সিটের নিচ থেকে একটা শতচ্ছিন্ন গামছা দিয়ে সিটটা ঝেড়েঝুড়ে রিকশাচালক বলল, কায়েতপাড়া মেলা দূর। ভাড়া এমনিতে পঁচিশ টাকা, তবে আপনি না হয় বিশ টাকা দিবেন। আমার নাম হামিদুল। বসেন ছার, বসেন।

চন্দ্রচূড় রিকশায় বসতে বসতে হেসে বলল, ভাই হামিদুল, আমি তো তোমার কোনও উপকার করিনি কখনও! তাহলে আমার জন্য পাঁচ টাকা ছাড় কেন?

হামিদুল দাঁত বের করে বলল, পরশুদিন সকালে আক্কাশ আলির সঙ্গে বাজারে দেখা। আক্কাশ বিড়ি খাচ্ছিল। আমাকেও দিল একটা। তার মুখে শুনলাম গ্রামীণ ব্যাংকে নতুন ছার আসবে। দেখে মনে হল আপনিই সেই ছার হবেন।

চন্দ্রচূড় অবাক হয়ে বলল, আক্কাশ আলি আবার কে?

গ্রামীণ ব্যাংকের নাইটগার্ড। আক্কাশের আব্বা কুতুবউদ্দিন আগে চাকরি করত ওই ব্যাংকে। দিন-রাত মদ গিলত। বিদেশি নয়, বাংলা। একদিন লিভারের রোগ ধরল। পেটের ব্যথায় মাঝে-মাঝেই কুতুবউদ্দিন ভর্তি হতো হাসপাতালে। পরের দিকে রক্তবমি হতো। রক্ত দিতে হতো। আমি নিজেই তো রক্ত দিয়েছি দু’বার। লিভার পচিয়েই লোকটা মরল। বাপের চাকরিটা পেয়েছে আক্কাশ।

রিকশা চলছে ঝ্যাকর ঝ্যাকর করে। হামিদুল গয়ের তুলে কফ ফেলল। লোকটার গায়ের ঘেমো গন্ধ নাকে আসছে। মানুষটা প্রচুর বকবক করতে পারে বটে। হামিদুল প্যাডলে চাপ দিয়ে আবার ‘অঁক’ করে উঠল। মুখ ফিরিয়ে বলল, কী ভেবেছেন ছার, আমি কি নিরক্ষতা? আমি কিন্তু নিজের নাম সই করতে জানি।

চন্দ্রচূড় বলল, বাঃ খুব ভালো।

একটা ছোট্ট বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছে রিকশাটা। সেই বাড়িটা দেখিয়ে হামিদুল বলল, হার, ওটা পোস্ট অফিস। একটা ‘আরটি’ খুলেছি দু’বছর আগে। মাসে মাসে হাজার টাকা জমা করি। দুই বৎসরে কত টাকা হয় হিসাব করেন ছার। তার সঙ্গে ইন্টারেস্ট আছে। সেটাও ধরেন।

লোকটা রেকারিং ডিপোজিটের কথা বলতে চাইছে কি? চন্দ্রচূড় বলল, তুমি তো বেশ হিসেবি মানুষ দেখছি।

হামিদুল ব্যাখ্যা করে বলল, টাকা আমি নিজের জন্য জমাই না ছার। আমার বিবি পালিয়ে গেছে এক মিঞার সঙ্গে। কোর্ট-কাছারি করতে গিয়ে আমি ফতুর। কিন্তু কতদিন আর এভাবে একলা একলা থাকব? ঠিক করেছি আবার বিয়েশাদি করব। আন্ডাবাচ্চাও হবে একদিন। টাকা জমাই সেই কারণে। একটা কথা বলব, আপনি আবার কাউকে বলবেন না ছার। আপনি যে বাড়িতে যাচ্ছেন সেই বাড়ির মেয়ে ফুলকিকে আমি চাই। কিন্তু ফুলকি আমাকে চায় না। আমি একে রিকশা চালাই, তার মধ্যে আবার জাত-ধর্মেরও ব্যাপার আছে…। অচেনা প্যাসেঞ্জারকে যে এসব বলতে পারে তার মাথার সমস্যা আছে। চন্দ্রচূড় নিরাসক্ত গলায় বলল, ও আচ্ছা।

একটা মসজিদ পার করে একটা একটেরে লম্বা বিল্ডিং পড়ল পথের ধারে। পাশে টিনের চাল দেওয়া একটা ঘর। উন্নতদেহী পূর্বপুরুষদের মতো ঋজু চেহারার কিছু তালগাছ দাঁড়িয়ে এক পাশে। হাওয়ায় তাদের পাতা দুলছে অল্প অল্প। মোবাইল ফোন থেকে একটা ফোটো তুলে রাখল চন্দ্রচূড়। পরে একসময় তটিনীকে পাঠাবে।

রিকশার গতি একটু ঢিমে করল হামিদুল। ‘অঁক’ করে একটা শব্দ করে বলল, ওই দূরের বিল্ডিংটা দেখেছেন ছার? ওটা হাসপাতাল। আর ওই যে টিনের চাল দেওয়া ঘরটা দেখতে পাচ্ছেন ছার, ওটা জানঘর।

চন্দ্রচূড় এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে হামিদুলের কথা বের করে দিচ্ছিল। এবার বলল, কী ঘর?

হামিদুল বলল, জানঘর।

হাসপাতালের পুরুষ আর মহিলাদের ওয়ার্ড আলাদা। বাচ্চাদের ওয়ার্ড কোণের দিকে। এখানে কোনও পেশেন্ট খারাপ হলেই ডাক্তার তাকে টাউনের হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। তার পরও মানুষ বাঁচানো যায় না। বুঝলেন ছার, আল্লাতালার মার দুনিয়ার বার। হাসপাতালে কেউ মারা গেলে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় জানঘরে। চন্দ্রচূড় এমন তাজ্জব কথা শোনেনি কখনও। বলল, জানঘরে লাশ কেন নিয়ে যাওয়া হয়?

অন্য পেশেন্টরা যাতে ভয় না পায় তাই। যে মারা গেছে তার বাড়ির লোক না থাকলে তাদের খবর দেওয়া হয়। চার ঘণ্টা জানঘরে লাশ রাখার পর ডাক্তার সাট্রিফিটি দিয়ে মরা ছাড়ে। কখনও আবার সুরতহাল করতে পাঠায় টাউনে। গেল বছর ওই ঘরটাতেই ঘটেছিল অশৈলী কাণ্ড। ফুলকির মরা জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল জানঘরে। এই লোকটার কথা সিরিয়াসলি নেবার কোনও মানে হয় না। চন্দ্রচূড় তবুও জানতে চাইল, কে ফুলকি?

হামিদুল বলল, আপনি যার বাড়িতে যাচ্ছেন সেই বনবিহারি রায়ের মেয়ে। এইমাত্র যার কথা বললাম আপনাকে।

কনকচাঁদ সাপ ধরে। এই যে বড় রাস্তা, তার ওপাশের গাছপালা দেখছেন ছার? তারও ওদিকে একটা মরা খাত আছে, লোকে বলে গোপন নদী। এমনিতে জল থাকে না। গেল বছর কনকচাঁদ গিয়েছিল সাপ মারতে। দেখে নদীতে জল এসেছে। শুনলে অবাক মানবেন ছার, এই নদীতে যদি কখনও জল আসে তবে বুঝতে হবে খুব বিপদ। কনকচাঁদ দেখে ফুলকি পড়ে আছে ধানখেতে। শরীরে কাপড়চোপড় নেই। কেউ রেপ করে গলা টিপে খুন করে রেখে গেছে।

চন্দ্রচূড় সবিস্ময়ে বলল, বলো কী!

হামিদুল বলল, সত্যি ছার। কনকচাঁদ লোক ডেকে আনে। ফুলকিকে ভ্যানরিকশায় চাপিয়ে নিয়ে আসে হাসপাতালে। হাসপাতালে মোটে দুজন ডাক্তার। একজন গিয়েছিল কলকাতা। আর একজন অসুস্থ বোধ করায় চলে গিয়েছিল বাড়িতে। নার্স এসে বলে পুলিশে খবর দিতে হবে, লাশ মুর্দাঘরে নিতে হবে। সূর্য ডুবে গেলে সুরতহাল হয় না। রাতটুকু জানঘরেই রাখতে হবে বডি। তখন কেউ গিয়ে দুলু মণ্ডলকে ডেকে নিয়ে আসে।

সেদিন হাসপাতালে অন্য একজন পেশেন্টের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সবাই ব্যস্ত ছিল তাকে নিয়ে। জানঘরে কী হচ্ছে কারও নজর ছিল না। দুলু মন্ত্র পড়তে শুরু করে। খানিক বাদে ধড়ফড় করে উঠে বসে ফুলকি। প্রথমে ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সকলে। পা টিপে টিপে ফিরে আসে খানিক বাদে। খবর পেয়ে নার্স আসে। ফুলকির নাড়ি ধরে অবাক। বলে, পেশেন্ট বেঁচে আছে।

চন্দ্রচূড় বলল, তাই নাকি?

হামিদুল মুখ ফিরিয়ে বলল, সেদিনের পর থেকে ফুলকি বদলে গেছে। আগে পাড়ার ছোট-ছোট ছেলেদের সঙ্গে ব্যাটবল খেলত। দুপুর হলেই ফল চুরি করতে যেত আশেপাশের বাড়িতে। এখন বাড়ি থেকে বেরোয় না। শুধু তাই নয়, ফুলকির গলার আওয়াজও কেমন বদলে গেছে। সবাই বলে, ফুলকির আত্মা সেদিন শরীর ছেড়ে বেরিয়ে গেছিল। দুলু মণ্ডল ভুল মন্ত্র পড়েছে। অন্য কোনও আত্মা এসে ঢুকেছে ফুলকির খোলের ভেতরে।

চন্দ্রচূড় হাসি চাপতে না পেরে বলল, সত্যি?

হামিদুল বলল, আপনি হাসছেন ছার? আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি না একটুও। হেমগুড়ির যে কোনও লোককে জিগ্যেস করলেই আপনি জানতে পারবেন। ফুলকি কথা বলতে শিখেছিল দেরিতে। বনবিহারি মেয়েকে ইশকুলে দেয়নি। ওর জ্ঞানবুদ্ধিও পাকেনি। একটা কুকুরের বাচ্চা পুষেছিল। বাচ্চাটার গায়ের রং শেয়ালের মতো। তবে শেয়াল নয়, কুকুরই। ফুলকি ওটাকে ডাকত খৈরি বলে।

দুটো নেড়ি কুকুর রাস্তায় দাঁড়ানো। প্যাডলে চাপ দিয়ে ‘অক’ করে একটা শব্দ করল হামিদুল। আঙুল উঁচিয়ে বলল, এমন দুবলা চেহারা ছিল না খৈরির। আদরযত্ন পেয়ে চিতাবাঘের মতো হয়ে উঠেছিল। ছার, ঢোল কাকে বলে জানেন?

চন্দ্রচূড় বলল, ঢাক যেমন, তেমনই ঢোল। একরকম বাদ্যযন্ত্র।

হামিদুল বলল, না ছার, বুনো কুকুরকে বলে ঢোল। খৈরির মধ্যে বুনো কুকুরের রক্ত আছে।

জঙ্গল থেকে ঢোলের বাচ্চাটা কোনওভাবে চলে এসেছিল বনবিহারির বাড়িতে। ফুলকি পুষেছিল ওটাকে। যেখানে যেখানে যেত খৈরি পিছন পিছন যেত। ফুলকি এর ওর বাড়ির ফল চুরি করতে গেলে সেই বাড়ির লোক যদি বকাঝকা করত ফুলকিকে, খৈরি তেড়ে যেত তার দিকে। সকলে নালিশ করত ফুলকির নামে। বনবিহারি রেগে যেত। কিন্তু ফুলকি কি আর বাপের কথা শোনে?

চন্দ্রচূড় বলল, যেদিন ঘটনাটা ঘটে সেদিন কুকুরটা ফুলকির সঙ্গে ছিল না?

হামিদুল প্যাডল করা বন্ধ করে লুঙ্গির কষি থেকে একটা বিড়ি বের আগুন ধরাল। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, কুকুরটার কোনও রোগ হয়েছিল। ক’দিন ধরেই নাকি ঝিমোচ্ছিল। সেদিন ছার, ভর দুপুরবেলাতেই খুব অন্ধকার করে এসেছিল, পাখিরা ওড়াউড়ি শুরু করে দিয়েছিল ডানা ঝটপটিয়ে। ভুল করে ভেবেছিল বুঝি সাঁঝ নেমে এসেছে। ওর মধ্যে ফুলকি আম কুড়োতে বেরিয়েছিল। শিল কুড়োতেও বেরোতে পারে। খৈরি যায়নি। কিন্তু ছার, সেদিন কুকুরটা সঙ্গে থাকলে ফুলকির ক্ষতি কেউ করতে পারত না।

চন্দ্রচূড় বলল, ওরকম ঝড়-বাদলের মধ্যে ফুলকিকে বাড়ির লোক বেরোতে দিল?

হামিদুল ‘অঁক’ করে একটা শব্দ করে বলল, ফুলকি কি আর অন্যের কথা শোনার মানুষ? কিন্তু যখন ঝড়-বৃষ্টি থামার পরও ফুলকি ফিরল না, বনবিহারি বেরোল মেয়ের খোঁজে। প্রতিবেশীরা কেউ হদিশ দিতে পারল না। তখন বনবিহারি দেখে কনকচাঁদ, মন্দিরের পুরোহিত যুগলকিশোর আর তার সঙ্গী-সাথিরা একটা ভ্যানরিকশায় ফুলকিকে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালে। এর পরের ঘটনা তো শুনলেন ছার।

চন্দ্রচূড় বলল, এমন কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। আমার জানা একটা ঘটনার কথা তোমাকে বলি। ঘরে একজন মারা গেছে, উঠোনে তুলসীতলায় মৃতদেহ এনে রাখা হয়েছে, বাড়ির লোক কান্নাকাটি করছে, শ্মশানযাত্রী চলে এসেছে খবর পেয়ে, তখন সেই মরা মানুষ উঠে বসেছে। সকলে প্রথমে ভয়ে পড়িমড়ি দৌড়। এদিকে যে মারা গেছে বলে ভাবা হয়েছিল, সে চোখ পিটপিট করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। এমনও শুনেছি যে, চোখে তুলসীপাতা দিয়ে খাটিয়ায় শুইয়ে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া কোনও মৃতদেহকে যেই চিতায় তোলা হয়েছে, আগুনের তাপ গায়ে লাগাতে সেই মরা উঠে বসেছে।

হামিদুল সবিস্ময়ে বলল, এমন হয় নাকি!

চন্দ্রচূড় বলল, বছর দুয়েক আগের কথা বলি। আমাদের গলির মোড়ে এক ডাক্তারের চেম্বারে এক বয়স্ক ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছিল তার ছেলে। ভদ্রলোকের জ্ঞান ছিল না। ডাক্তার পেশেন্টের বুকে স্টেথো লাগিয়ে দেখেন হার্টবিট নেই। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। স্ট্রেচারে শোয়াতেই তিনি চোখ মেলে তাকান।

হামিদুল, আমাদের মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে তবেই বলা যায় মৃত। বুকে স্টেথো লাগিয়ে হৃৎপিণ্ডের সাড়া না পেয়েও নিশ্চিত হওয়া যায় না সবসময়। সে কারণেই মৃত্যু সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে অপেক্ষা করেন ডাক্তার।

সেদিন ফুলকির এমন ক্ষতি কে করেছিল সেটা জানা যায়নি?

হামিদুল প্যাডলে চাপ দিয়ে ‘অঁক’ করে একটা শব্দ করল। বলল, কাণ্ডটা ঘটিয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংকের ক্যাশিয়ার গৌরব বসাক। বনবিহারি রায়ের বাড়িতেই থাকত। তার জায়গাতেই বদলি হয়ে এসেছেন আপনি। চন্দ্রচূড় রীতিমতো অবাক। একটা অজানা অস্বস্তি চেপে ধরল তাকে। অফিসে এই লোকটার ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে বসতে হবে তাকে। সে যেখানে থাকত সেই বাড়িতেই পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকতে হবে তাকে। মুখে বলল, পুলিশ কি এসেছিল বনবিহারি রায়ের বাড়িতে? ফুলকির জবানবন্দি নিয়েছিল?

হামিদুল বলল, এসেছিল তো। কিন্তু ফুলকি মুখে কুলুপ এঁটে ছিল। কিছুই বলেনি পুলিশকে। জবানবন্দি দিয়েছিল আমাদের রঘু। সে গরু পোষে। এক ডজনেরও বেশি গরু আছে ওর। সেদিন রঘুর একটা গরু ঘরে ফেরেনি। রঘু বেরিয়েছিল গরুর খোঁজে। অমল দাসের ইটভাটার ওদিকে দেখতে পায় গৌরবকে। সারা গায়ে কাদা মাখা, গৌরব প্রাণভয়ে দৌড়ে তার দিকেই ছুটে আসছে। তাকে তাড়া করেছে খৈরি। সে রঘুকে পাশ কাটিয়েই আছাড় খেয়ে পড়ল জলকাদার রাস্তায়। উঠে আবার পড়ি কি মরি ছুট। পরদিন জানা যায় গৌরব কাটা পড়েছে রেল লাইনে। কিন্তু ছার, বডি এত টুকরো হয়ে গিয়েছিল যে গুনে শেষ করা যেত না।