নির্জন জলের রং
ক্যালেন্ডারের হিসেবে শরৎকাল। ক’দিন ধরে গভীর নিম্নচাপের কারণে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল উত্তরবঙ্গ জুড়ে। আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি ছিল সময়টা। আকাশ মেঘে ঢাকা। উত্তরবঙ্গের প্রান্তে অসম সীমান্তে জঙ্গল অধ্যুষিত একফালি এক গ্রাম মহিষবাথান। মূলত গরিব মানুষের বাস। একতলা টিনের চালওয়ালা বাড়িই বেশি। পাকা বাড়ি কম। কৃষিকাজ এদিকের লোকের মূল পেশা।
সেই জনপদের ওপর দিয়ে বয়ে চলা তাতাসি নদীর জলে সেদিন ভেসে উঠেছিল জোড়া লাশ। একজন পুরুষ। অন্যজন মহিলা। পুলিশ খবর পেয়ে দেরি করেনি একটুও। ঘটনাস্থলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছিল জিপ নিয়ে। মহিষবাথান শান্তিপ্রিয় এলাকা। রাজনৈতিক সংঘর্ষ যে হয় না তা নয়, তবে হাতাহাতি মারামারির বেশি তা গড়ায় না। ছিচকে চুরি-টুরি হলেও বড়সড় অপরাধ তেমন হয় না। ক্রাইমচার্টে এখানকার নাম থাকে না কখনও। খুনখারাপি এখানে বিরলতম ঘটনা।
মহিষবাথানে থানা নেই। পুলিশ ফাঁড়ি আছে। আউটপোস্টের মেজোবাবু এই কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার। বয়স পঞ্চাশের আশপাশ দিয়ে। তামাটে গায়ের রং। মাথার অর্ধেকটা টাক। কলপ করা পুরু গোঁফ। নো-ননসেন্স ধাঁচের লোক। তাঁকে কেউ কখনও হাসতে দেখেছে কি না সন্দেহ আছে। মেজোবাবু নিজের পরিচয় দিয়ে আমাকে ফোন করে বললেন, কোথায় আছেন এখন আপনি?
ভদ্রলোকের গলায় পুলিশি কর্তৃত্ব। আমি একটু থমকে গিয়ে বললাম, অফিসে। মেজোবাবু চাঁচাছোলা গলায় বললেন, তাতাসি নদীর ধারে একবার চলে আসুন তো এখনই। দেরি করবেন না। আর হ্যাঁ, আপনাদের ফার্মের হর্ষবাবু আর তরুণবাবুকেও আসতে বলুন। ঠিক আছে?
মেজোবাবুর একটা মুদ্রাদোষ আছে। প্রতি কথার শেষে একবার করে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিতে ‘ঠিক আছে’ বলেন। আমি বললাম, লোকেশনটা কাইন্ডলি বলবেন?
মেজোবাবু বললেন, অফিস থেকে বেরিয়ে মসজিদ ছাড়িয়ে তাতাসি নদীর ব্রিজটা ক্রস করুন। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে চলতে থাকুন অসমের দিকে। জঙ্গল যেখানে শুরু হচ্ছে সেখানে সেই জোড়া ডুমুরগাছটা চেনেন তো? তাতাসি নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে, হ্যাঁ ঠিক ওখানেই চলে আসুন। আর্জেন্ট। ঠিক আছে?
বর্ষায় সেবার তেমন বৃষ্টিবাদল হয়নি এদিকে। সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিতেই হয়তো আশ্বিন মাস জুড়ে চলছিল দুর্যোগ। নিম্নচাপের কারণে টানা বৃষ্টি হচ্ছিল মহিষবাথানে। গরিব মানুষের বাড়িঘর বা খেতের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে সেই দুর্যোগ কেটেছিল অবশেষে।
আগেরদিন থেকেই নিম্নচাপের মেঘ সরতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের দিকে। সোমবার সকালে অফিস গিয়ে এক কাপ চা খেয়ে অ্যাকাউন্টসের ফাইল নিয়ে সবে বসেছিলাম। হেড অফিস থেকে কিছু রিপোর্ট চেয়েছিল। সেসব তৈরি করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আর ঠিক তখনই মেজোবাবুর ফোন।
অফিসের ড্রাইভার গণেশকে তলব করলাম। আমাদের অফিসে একটাই গাড়ি। পুরোনো মডেলের। প্রায়ই এটা-সেটা খারাপ হয়। গণেশ গ্যারাজে গিয়েছিল ইঞ্জিনের কাজ করাতে। আমার জরুরি বার্তা পেয়ে মাঝরাস্তা থেকেই ফিরে এল অফিসে।
আমি ফার্মের একটা ইউনিটের সুপারভাইজার। অন্য দুই ইউনিট দেখভাল করার দায়িত্ব হর্ষ আর তরুণের। ওদেরকে ডেকে নিলাম। ওরা হাতের কাজ ফেলে চলে এল শশব্যস্ত হয়ে। বাঘে ছুঁলে কী হয় জানি না, তবে পুলিশ ছুঁলে যে একশো আঠারো ঘা সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দুজন ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। তিনজনেরই মুখে কুলুপ। মুখ থমথমে। আন্দাজ করতে পারছিলাম, আজকের দিনটা ঘটনাবহুল হতে চলেছে।
অসমের দিকে চলে গেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে। খানিক এগোবার পর শুরু হচ্ছে শাল সেগুন চিকরাশি ওদালের জঙ্গল। জঙ্গলের ওপারে ভুটান। জঙ্গিদের লুকিয়ে থাকার পক্ষে আদর্শ জায়গা। কাঠচোর আর চোরাশিকারিদেরও নাকি আনাগোনা আছে। কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পর জঙ্গলের মধ্যে নদীর ওপারে রয়েছে জোড়া ডুমুরগাছ, যাদের বয়সের সীমা পরিসীমা নেই। দুটো ডুমুর গাছ বেশ খানিকটা উঁচুতে উঠে গিয়ে মিশে গেছে একে অন্যের সঙ্গে। প্রকৃতির এ এক ব্যাখ্যাতীত লীলা। জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে গেছে ভুটান থেকে নেমে আসা তাতাসি নদী। জঙ্গল অগভীর বলে বড় রাস্তা থেকে নদীটাকে দেখা যায়। জঙ্গল ঘন হয়েছে আর একটু পর থেকে। সেখান থেকেই কোর এরিয়া শুরু।
মেজোবাবুর কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল, আমার ভেতর অবধি কুঁকড়ে ছিল অজানা আশঙ্কায়। জোড়া ডুমুরগাছ অবধি পৌঁছে দেখি লোকজন ভেঙে পড়েছে নদীর ধারে। বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের কয়েকজন ছেলে ঘিরে রেখেছে মেজোবাবুকে। খাকি ইউনিফর্ম পরা পুলিশও রয়েছে কিছু। কয়েকজন বনকর্মীকেও দেখতে পেলাম।
নদীটা এখানে তেমন চওড়া নয়। নিম্নচাপের সময় ঝড় হয়েছিল। একটা ঝাঁকড়া কাঁঠালগাছ আড়াআড়ি ভেঙে পড়েছিল নদীর ওপর। জলে ভেসে আসতে আসতে গাছের ডালে আটকে গেছে দুটো শবদেহ। একটা লাশ চিত অবস্থায়, অন্যটা উপুড় হয়ে ভেসে আছে।
আমাদের তিনজনের ওপর পুলিশি নজর বুলিয়ে নিলেন মেজোবাবু। আমাকে খর চোখে জরিপ করে বললেন, আপনার মুখচোখ এমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন? জল খাবেন একটু?
আমার হাত-পা কাঁপছিল। বোধ কাজ করছিল না। নির্জন জলের রং ছড়িয়ে পড়ছিল আমার চেতনা জুড়ে। দখল করে নিচ্ছিল আমার সমগ্র অস্তিত্ব। আমি ঢোক গিলে বললাম, না থাক, ঠিক আছে।
আলিউল নামে বছর ত্রিশের এক যুবক কোমরে দড়ি বেঁধে মুখে মাস্ক পরে নদীতে নামার জন্য তৈরি হচ্ছিল। সে নাকি এই অঞ্চলের সেরা সাঁতারু। আলিউল মেজোবাবুর উদ্দেশে বলছিল, তাতাসি অদ্ভুত এক নদী। ওপর থেকে বোঝা যায় না, তবে জলে একবার নামলে টের পাওয়া যায় একটা চোরা স্রোত আছে তলায়। নদীর যত গভীরে যাওয়া যায়, তত জনের চাপ বাড়ে। মাঝেমধ্যে নাক দিয়ে রক্তও বেরিয়ে যায়। একবার আমারই যা অবস্থা হয়েছিল…।
এক স্থানীয় বয়স্ক গ্রামবাসী অধৈর্য গলায় বলছিল, তাড়াতাড়ি জলে নামো ভাই, গিয়ে দ্যাখো এখনও প্রাণ আছে কি না।
আলিউলের তাপ উত্তাপ দেখা গেল না। আলগোছে বলল, চার মিনিটের বেশি জলের ভেতর হাবুডুবু খেলে যে কোনও মানুষ লাশ হয়ে যায়। সেখানে এই বডিদুটো নদীর ওপর ভেসে আছে বহুক্ষণ হয়ে গেল। কোনও আশা নেই কাকা।
আলিউল মুখে মাস্ক লাগিয়ে নেমে পড়ল নদীতে। তার সঙ্গে জলে নামল আরও জনাকয়েক যুবক। তাতাসি নদী শীত বা গ্রীষ্মকালে নিরীহ হলে কী হবে, বর্ষায় তার রূপ অন্যরকম। পাড় উপচে পড়ে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা জলে। ফি-বছর বানভাসি হয় নিচু এলাকা।
সময়টা আশ্বিন হলেও নিম্নচাপের বৃষ্টির কারণে নদীতে জলের স্রোত কম নয়। তার মধ্যেও আলিউল লড়ে যাচ্ছিল প্রাণপণে। বহুক্ষণের চেষ্টায় পাড়ে টেনে নিয়ে এল ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া দুটো লাশ। লাশদুটো দেখার পর থেকেই একটা অস্বস্তি পাক খাচ্ছিল আমার তলপেট দিয়ে। মেজোবাবু জিগ্যেস করলেন, ভালো করে দেখুন, এরাই কি সেই দুজন?
পুরুষটির পরনে কালো ফুল-প্যান্ট আর নীল জামা। মহিলাটি পরে আছে সবুজ সালোয়ার। দুজনেরই গায়ে লেপটে থাকা জলে ভেজা পোশাক ছিঁড়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। মাছ আর জলচর প্রাণীরা খেয়ে নিয়েছে শরীরের বেশ কিছুটা অংশ। দুজনের মুখ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, চেনা দুঃসাধ্য।
ভ্যাপসা একটা দুর্গন্ধে ভারী হয়ে ছিল নদীর তট। আমি নাকে রুমাল চাপা দিয়ে এগোলাম সামনে। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছিল। মেজোবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম, আনিসের গায়ের রং কালোর দিকে। এটা আনিস হতে পারে না। আর তাছাড়া জরিও এতটা ফর্সা নয়।
আলিউল মাস্ক খুলে ফেলেছে। পিচিক করে এক দলা থুতু ফেলে বলল, গায়ের রং দেখে বিচার করবেন না। জলের তলায় সব লাশ ফর্সা। কুচকুচে কালো মানুষও জলের তলে কয়েক ঘণ্টা কাটালে ফর্সা হয়ে যায়।
দুটো লাশ পচেগলে এমন কিম্ভূতকিমাকার হয়ে গিয়েছিল যে, শনাক্ত করা সম্ভব ছিল না কাউকে। শারীরিক চিহ্ন দেখে একজন পুরুষ, অন্যজন মহিলা—এটুকুই শুধু বোঝা যাচ্ছিল, তার বেশি কিছু নয়।
একটা লাশকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে চেষ্টা করছিল আলিউলরা। কিছুতেই বাঁধা যাচ্ছিল না। খসে খসে পড়ছিল চামড়া। ওদিকে পুরুষ লাশটার পেটের ভেতর আলিউলের আঙুল লেগে গিয়েছিল। চামড়া ভেদ করে ভেতরের খোঁদলে ঢুকে গেল ওর আঙুল। শিউরে উঠলাম সেই দৃশ্য দেখে। এদিকে দেখি মহিলার দু’হাতের দশটা আঙুলের মধ্যে চারটেই খেয়ে নিয়েছে জলচর জীবেরা। পায়ের আঙুলেরও একই অবস্থা। জীবনে এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখিনি।
তরুণের জামা ভিজে গিয়েছিল ঘামে। আমিও দরদর করে ঘামছিলাম। এই দুজন যদি আনিস আর জরি হয়ে থাকে, যা হবার সম্ভাবনাই বেশি, তবে সেই বিকৃত দুটো শবদেহ আমাদের তিনজনের মনের ওপর কতটা গভীর ছাপ ফেলতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
যার সঙ্গে এক অফিসে চাকরি করতাম, এক কোয়ার্টারে থাকতাম, আড্ডা দিতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সেই আনিসকে এমন অবস্থায় দেখে নিজেকে স্বাভাবিক রাখা কঠিন। আর জরি? তাকেও তো কাছ থেকে দেখেছি দিনের পর দিন। গল্প করেছি কত! এই নিশ্চল জড়পদার্থের মতো পচা-গলা লাশ কি সেই যুবতীর? এটা বিশ্বাস করা যায়?
হর্ষ আমার আর তরুণের তুলনায় স্টেডি। তরুণকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিল। আমার কাছে এসে বলল, শরীর খারাপ লাগছে জাফরদা? আপনি বসুন এখানে। আমি জল নিয়ে আসছি আপনার জন্য।
নদীর ধারে শুকনো কাদামাখা মাটির মধ্যে বসে পড়লাম ধ্বস্ত অবস্থায়। আলিউল দেখি মেজোবাবুর উদ্দেশে বলছে, শীতকালে লাশ তাড়াতাড়ি ভেসে ওঠে ওপরে, তখন খোঁজার কিছু নেই। বাঁশ দিয়ে বা দড়ি দিয়ে টেনে আনলেই হয়। জলের স্রোত থাকলে কাজ করা মুশকিল।
সমস্যা আরও কঠিন হয়ে যায় গরমকালে। লাশ ভেসে উঠতে বেশি সময় লাগে। কোথাও যদি নদীর খাঁজে বডি আটকে যায় তাহলে আর এক ঝামেলা। লাশ খুঁজতে গিয়ে মাছের কামড়ও খেতে হয়। কখনও সাপের গর্তে হাত পড়ে যায়। বেশি বড় গর্তের মধ্যে হাতড়াতে গিয়ে হাতে পাথর চাপা পড়ে যায় কখনও। আমাদের যে কীভাবে কাজ করতে হয়!
মেজোবাবু একটা ব-কারান্ত গালি দিয়ে বললেন, তুই মাছের কামড়ে ভয় পাস?
আলিউল বলল, ভয় কি আর সাধে পাই স্যার! নদীতে মাগুর থাকে, শাল থাকে, কোনও কোনও নদীতে বাগদা মাছ থাকে। শুধু মাছ কেন, সাপও থাকে। যদিও সাপের মধ্যে ঢোঁড়াই বেশি। ওসব নিয়ে চাপ নেই। তবে কিছু কিছু মাছ সাংঘাতিক হয়। বড় বড় মাগুর কামড় দিলে অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যায়। সবচাইতে ভয়ের হল শাল মাছের কাঁটা। নাক মুখ টিপ করে মোটা কাঁটা ফুটিয়ে দেয়। একবার লাগলে আর দেখতে হবে না। জ্বর এসে যাবে ব্যথায়। একবার আমি যা ভুগেছিলাম। কোবরেজের ওষুধ খেয়েও জ্বর যায় না…।
বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের আর এক যুবক, শ্যামল নাম বোধ হয়, সে বলল, শুধু কি মাছের কাঁটা স্যার? আর চাইতেও বড় বিপদ আছে। গঙ্গার মতো বড় নদী হলে জলের ওপর দিয়ে লঞ্চ চলে। লঞ্চে থাকে প্রপেলর। একটু অসাবধানে সেই প্রপেলারের ব্লেড যদি গায়ে বা মাথায় লাগে তবে লাশ খুঁজতে গিয়ে আপনি নিজেই কুচি কুচি হয়ে যাবেন। আমার এক বন্ধুই তো মাঝগঙ্গায় এভাবে মারা গিয়েছিল। টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল বডি। রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল জল।
মেজোবাবু হেসে বললেন, তোদের কাজটায় হাঙ্গামা থাকলেও ইনকামও কম নয়। জলে ডোবা লাশ খুঁজে পেলেই তো পোয়া বারো! তখন পার্টির কাছ থেকে দেদারসে পয়সা লুটে নিস।
আলিউল বলল, না স্যার, আল্লা কসম। এ তো আর জলের নীচে গুপ্তধন খুঁজে পাওয়া নয়। হাড়ভাঙা খাটনি করার পর লাশ খুঁজে পেলেও পার্টির কাছে সবসময় টাকা চাওয়া যায় না।
এই সেদিনই তো বৈদ্যপাড়ার একটা ছয় বছরের বাচ্চা ছেলে, সবে ইশকুলে ভর্তি হয়েছে, নদীতে স্নান করতে নেমে পা পিছলে তলিয়ে গেল জলে। সারাদিন বিস্তর খাটাখাটনি করে বিকেলের দিকে খুঁজে পেয়েছিলাম বাচ্চাটাকে। পাড়ের কাছে বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। ওরকমই কোনও গর্তে পা পড়ে গিয়েছিল। উঠতে পারেনি। ছেলেটার বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করে। মা বাড়িতে বিড়ি বাঁধে। গরিব ফ্যামিলি। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তার বাবা-মা হাউমাউ করে কাঁদছিল। এদের কাছে পয়সা চাওয়া যায়?
মেজোবাবু ধমক দিয়ে বললেন, আমাকে শোনাস না এসব। অন্য কারওর কাছে ভাট বকিস। ঠিক আছে?
আনিসের বাড়ি নদিয়ার গোরভাঙা গ্রামে। কমিউনিকেশন ভালো নয়। ট্রেন নেই। বাস বদলে বদলে যেতে হয়। জন্মের বছর দুয়েক বাদে আনিসের মা মারা গিয়েছিল। আনিসের বাবা বাউল ফকিরদের সঙ্গ করত আগেই। বউ মারা যাওয়ার পর আরও বেশি বিবাগি হয়ে যায়। এই মেলা সেই মেলা, এই আখড়ায় সেই আখড়ায় গান গেয়ে বেড়াতে থাকে।
আনিস স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল বাবাকে। ব্যবহার করতে শেখেনি। ফোন বাড়িতেই রেখে বেরোয়। নদিয়া থানায় শুনলাম ফোন করা হয়েছিল, কিন্তু আনিসের বাবা ঘরে নেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না। তাকে খবর দেওয়া যায়নি।
আনিসের পিসির ছেলে হুমায়ূন শেখ থাকে অসম বর্ডারের রামপুরে রেলে চাকরি করে। বয়স চল্লিশ ছাড়িয়ে গেলেও বিয়েশাদি করেনি, কোয়ার্টারে একা থাকে, হাত পুড়িয়ে খায়। মহিষবাথান থেকে রামপুরের দূরত্ব বেশি নয়। ট্রেনে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। ফোন নম্বর জোগাড় করে হুমায়ূনকে ফোন করেছিলেন মেজোবাবু। হুমায়ূন এসে পৌঁছল বিকেল নাগাদ। মেজোবাবু আদেশের গলায় বললেন, বডিদুটোর কাছে যান। দেখুন ভালো করে। চিনতে পারছেন এদের দুজনকে?
হুমায়ূন এগোল গুটিগুটি পায়ে। দুটো লাশ দেখে হাঁটু মুড়ে ‘দ’ হয়ে বসে পড়ল মাটিতে। হাউমাউ করে ভেঙে পড়ল কান্নায়।
নিজেকে সামলে নেওয়ার পর চোখ মুছে সে যা জানাল তার সারমর্ম হল— আনিস আর জরি তার ডেরাতেই আত্মগোপন করে ছিল কয়েকদিন। ঘর থেকে বেরোত না। ডমেস্টিক হেল্প নেই হুমায়ূনের। যতদিন তার আস্তানায় ছিল, রান্নাবান্না জরিই করত। সেদিন হুমায়ূন সাতসকালে বেরিয়ে গিয়েছিল ডিউটিতে। রাতে ফিরে দেখে আনিস আর জরি ঘরে নেই। দুজন এসেছিল যৎসামান্য লাগেজ নিয়ে। সেসবেরও কোনও চিহ্ন নেই। মোবাইল ফোন ওদের কারও কাছেই ছিল না বলে আনিস আর জরির সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় ছিল না।
মেজোবাবু জিগ্যেস করলেন, এরা দুজন যে আপনার আস্তানায় ক’দিনের জন্য লুকিয়ে থাকতে এল, কোনও খোঁজখবর না দিয়ে লা- পাতা হয়ে গেল, সেটা লোকাল থানায় জানিয়েছিলেন?
হুমায়ূন ইতস্তত করে বলল, না স্যার, জানাইনি। আনিস কাকুতি মিনতি করে বলেছিল, ওরা আমার বাড়িতে লুকিয়ে আছে জানতে পারলে ওদের বিপদ হতে পারে। সেদিন যখন আমি ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরে দেখলাম ওরা নেই, তখন ভেবেছিলাম ওরা যে আমার বাড়িতে আছে সেটা কেউ টের পেয়ে গেছে। সে কারণেই ওরা ডেরা বদলেছে।
তবে তিনদিন পরও যখন ওদের খোঁজ পেলাম না, তখন দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। থানায় যাব ভাবছিলাম। আজ আপনার থেকে ফোন পেয়েই পড়িমরি করে চলে এসেছি।
আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি আনিসের সহকর্মী। আমি জানি এই শোকের কোনও সান্ত্বনা হয় না। তবুও বলব, আপনি শক্ত থাকতে চেষ্টা করুন হুমায়ূন ভাই।
হুমায়ূন নিঃশব্দে কাঁদছিল। মেজোবাবু বললেন, কান্নাকাটি থামান। লাশদুটো ভাল করে দেখে কনফার্ম করুন।
হুমায়ূন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ওরা যখন আমার রেল কোয়ার্টার্সে এসেছিল ওরা এই পোশাকই পরে ছিল। আনিসের পরনে ছিল কালো ফুল-প্যান্ট আর নীল জামা। জরি পরেছিল সবুজ সালোয়ার। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ ছিল ওদের। ঘরে পরার পোশাক ছাড়া ওদের সঙ্গে দ্বিতীয় কোনও পোশাক ছিল বলে মনে হয় না।
মেজোবাবু তিরিক্ষি মেজাজে বললেন, মনীষ মালহোত্রার নাম শুনেছেন? শোনেননি তো! তিনি এই দেশের একজন নামি ড্রেস ডিজাইনার। তাঁর বানানো লক্ষ টাকা দামের পোশাক সেলেব্রিটিরা পরে। আপনার কি মনে হয় যে, সারা বাজারে এই এক পিসই সবুজ চুড়িদার বিক্রি হয়েছে? তাছাড়া কালো ফুল-প্যান্ট আর নীল হাফ-শার্ট পরা কোনও পুরুষকে আপনি রাস্তাঘাটে বা হাটেবাজারে কখনও দেখেননি?
হুমায়ূন ইতস্তত করে বলল, দেখেছি। কিন্তু আনিস আর জরি ঠিক এই পোশাকেই আমার ডেরায় এসেছিল। আর ঠিক সেই পোশাকেই এই দুটো লাশ পাওয়া গেল, তাই ভাবলাম…।
একটা কালো স্করপিও গাড়ি এল ধোঁয়া উড়িয়ে। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা একজন নামলেন গাড়ি থেকে। ষাটের ওপর বয়স। মাথার চুল কাঁচাপাকা। চিনি এঁকে। ইনি জরির দুলাভাই মাসুদ খন্দকার। বিধানসভার ভোটে গতবার দাঁড়িয়েছিলেন, অল্পের জন্য হেরে যান। এলাকায় দাপট আছে। দুর্গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে নদীতট জুড়ে, অথচ মাসুদ ভাই একবারও নাকে রুমাল দিলেন না।
মেজোবাবুর উদ্দেশে বললেন, লাশ তো আইডেন্টিফাই করাই মুশকিল। ম্যাজিস্ট্রেটকে খবর দিয়েছেন? ইনকোয়েস্ট হবে না?
মেজোবাবু বললেন, এখন বডিদুটো নিয়ে যাওয়া হবে মুসাফিরগঞ্জে। চারটে বেজে যাবে সব অ্যারেঞ্জ করতে করতে। সূর্য ডুবে যাবে ততক্ষণে। আজ আর হবে না। কাল সকালে ইনকোয়েস্ট হবে। ঠিক আছে?
মাসুদ ভাই বললেন, ডিএনএ টেস্ট হবে তো?
মেজোবাবু এক পলক দেখলেন মাসুদ খন্দকারকে। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, হবে।
আমার গা বমি বমি করছিল। একটু সরে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেললাম। হর্ষ আশেপাশের কোনও বাড়ি থেকে প্লাস্টিকের বোতলে জল এনে দিল। মুখেচোখে জল ছিটিয়ে স্বস্তি হল। মাথার মধ্যে চলছিল ভাবনার প্রবাহ। এই তল্লাটে এর মধ্যে আর কেউ মিসিং হয়নি। লাশদুটো যতই বিকৃত হয়ে থাকুক, এই দুটো শবদেহ আনিস আর জরির হবার সম্ভাবনাই বেশি।
মাসুদ ভাই মেজোবাবুর উদ্দেশে বললেন, শুনুন সাহেব, জরি অনেক কষ্ট করেছে জীবনে। ও লড়াকু মেয়ে। এত সহজে সুইসাইড করার মেয়ে ও নয়।
মেজোবাবু ভুরুদুটো থার্ড ব্র্যাকেট করে বললেন, সুইসাইড তো বলিনি একবারও। হোমিসাইডও হতে পারে।
মাসুদ ভাই অবাক গলায় বললেন, মানে মার্ডার? যে খুন করবে তার মোটিভ কী?
মেজোবাবু বাঁকা হাসি হেসে বললেন, সেটা খুঁড়ে বের করার জন্য আমাদের ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। পুলিশকে একটু সময় দিন। ইন ফ্যাক্ট, অনার কিলিংয়ের সম্ভাবনাও রুল আউট করছি না আমরা। ঠিক আছে?
মাসুদ ভাই বললেন, অনার কিলিং?
মেজোবাবু একটা সিগারেট ধরালেন। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, পরিবারের মুখে কালি পড়ে এমন কাজ বাড়ির কেউ করলে তাকে তার নিজের লোকই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারে। এমন তো কতই হয়। তাই না?
মাসুদ ভাই বললেন, মহিষবাথানে এমন ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি।
মেজোবাবু বললেন, আগে ঘটেনি বলে কখনও ঘটবে না এমন কোনও কথা নেই। ঠিক আছে?
মাসুদ ভাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, মেজোবাবু হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, মহিষবাথান হল গন্ডগ্রাম। একটা ভাল প্যাথ ল্যাব নেই। সুগার-টুগারের বাইরে কোনও রক্ত পরীক্ষা করাতে হলে যেতে হয় মুসাফিরগঞ্জে। সিটি স্ক্যান বা এমআরআই-এর কথা তো ছেড়েই দিলাম।
লিকার শপ একটা আছে বটে কিন্তু দামি মাল রাখে না। খাওয়ার মতো লোকই তো নেই। সিংগল মল্ট কাকে বলে জানেই না কেউ স্কচ হুইস্কির কথা ছেড়েই দিলাম, একটা বিরিয়ানির দোকান অবধি এই গ্রামে নেই। বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করলে যেতে হয় মুসাফিরগঞ্জে। কী, ঠিক কি না?
আমরা চুপ। মেজোবাবু বললেন, টুরিস্ট কেন আসবে এখানে বলুন তো? বেসিক অ্যামেনিটিজই তো নেই। টুরিস্ট দুদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যায় সিন-সিনারি দেখতে আর মাল খেতে। সে কারণেই তো টুরিস্ট স্পট হিসেবে মহিষবাথান হিট করল না আজও।
কী জানেন, গ্রাম্য জায়গার মানুষ উদারমনস্ক হবে এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। দিল্লি মুম্বইয়ের মতো বড় বড় মেট্রো সিটির তুলনায় গ্রামেগঞ্জেই অনার কিলিং বেশি হতে দেখা যায়। ঠিক আছে?
মাসুদ ভাই ভুরু জড়ো করে বললেন, আপনি বলতে চাইছেন বাড়িরই কেউ…।
মেজোবাবু বললেন, আমি শুধু এটুকুই বলতে চাইছি, ক’দিন ধৈর্য ধরুন। ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট একবার দেখে নিই। ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে রিপোর্ট আসতে দিন। তাহলেই দুধ আর জল আলাদা করা যাবে। আপাতত আপনারা কেউ মহিষবাথান ছেড়ে যাবেন না। একান্তই যদি কোথাও যেতে হয়, তবে পুলিশ ফাঁড়িতে জানিয়ে মহিষবাথান লিভ করবেন। আপনারা সকলেই এই কেসে সাসপেক্টেড। ঠিক আছে?
