১০
সকালে ঘন সরতোলা দুধের চা আর বিস্কুট চলে আসে সময়মতো। একটু পরে আসে দুধ, মুড়ি আর কলা। কোনও কোনও দিন বাটার টোস্ট, গাছের পাকা পেঁপে আর সেদ্ধ ডিম। ব্রেকফাস্ট করে সাতটার মধ্যে, দশটায় স্নান-টান সেরে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ে চন্দ্রচূড়। যাবার সময় একটা টিফিনবক্সে দুপুরের খাবার দিয়ে দেয় চিনুদি। রুটি-সবজি কিংবা চাউমিন। অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে আসে এক জামবাটিভর্তি দুধের সঙ্গে সেঁকা পাউরুটি। রাত ন’টার মধ্যে ডিনার। বনবিহারির দিদি রান্নায় তেল-মশলা বেশি দেয় না। সেটা পেটের দিক দিয়ে ভালো। স্বাদ যে আহামরি তা নয়, তবে খারাপও নয়।
শুক্রবার একটু আগে অফিস কেটে বেরিয়ে পড়ে চন্দ্রচূড়। সোমবার ভোরবেলা হেমগুড়ি আসার বাস ধরে। দুটো গাড়ি বদলে আসতে হয় এখানে। এগারোটা বেজে যায় পৌঁছতে পৌঁছতে। হামিদুলকে বলা থাকে আগে থাকতে। সে অন্য প্যাসেঞ্জার তোলে না। বাস স্ট্যান্ড থেকে চন্দ্রচূড়কে নিয়ে সরাসরি ব্যাংকে চলে যায়। বনবিহারি দুপুরবেলা অফিসে চলে আসে টিফিনবক্স হাতে। ভাত, ডাল, সবজি আর মাছের ঝোল থাকে তাতে। যতক্ষণ অফিসে থাকে ততক্ষণ চন্দ্রচূড় কাজে ফাঁকি দেয় না। স্থানীয় মানুষের মন সে জয় করে নিয়েছে অল্পদিনের মধ্যে।
পুরোহিত যুগলকিশোর চক্রবর্তী গ্রামীণ ব্যাংকে আসে মাঝেমধ্যে। আজও এসেছে। আক্কাশ আলিকে দিয়ে চা আনিয়েছে চন্দ্রচূড়। সঙ্গে লোকাল বেকারির বিস্কুট। যুগলকিশোর চায়ে চুমুক দিয়ে বলছিল, আপনার যা শিক্ষাগত যোগ্যতা তাতে আপনার আরও বড় চাকরি করা উচিত ছিল। আপনি ডব্লুবিসিএস পরীক্ষা দেননি কেন?
চন্দ্রচূড় হাসল, আমি তেমন কিছু মেধাবী নই। ডব্লুবিসিএস দিলেও ক্র্যাক করার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। এই চাকরিটা যে পেয়েছি তার জন্য ভাগ্যদেবতার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার থেকেও বহু মেধাবী ছেলে-মেয়ে চাকরি পায়নি এখনও। তবে ওপরওয়ালার কাছে আমার প্লেস অফ পোস্টিং নিয়ে অনুযোগ আছে। আমাদের বাড়ির কাছাকাছিও তো গ্রামীণ ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ছিল। তেমন কোনও একটা জায়গায় পোস্টিং হলে বেশি খুশি হতাম।
হেমগুড়ি জায়গাটা আর এখানকার মানুষ সম্পর্কে চন্দ্রচূড় যা জেনেছে সবই হামিদুল আর আক্কাশ আলির কল্যাণে। দুজনই পুলিশের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে অনায়াসে কাজ করতে পারত। আক্কাশ চায়ের কাপ নিয়ে এল হাতে করে। এক কাপ চা দিল চন্দ্রচূড়কে। দ্বিতীয় কাপটা যুগলকিশোরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, দেখুন তো যুগলজেঠু, চিনি ঠিক আছে কি না?
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যুগলকিশোর চোখের ইশারায় বোঝাল, ঠিক আছে। তার পর চন্দ্রচূড়ের উদ্দেশে বলল, হেমগুড়ি জায়গাটা আপনার যে পছন্দ হয়নি সেটা বুঝতে পারছি। তবে এখানকার লোকজন কিন্তু খারাপ নয় কেউ।
চন্দ্রচূড় বলল, পছন্দ হয়নি সে কথা বলিনি মোটেই। জলপাইগুড়ি থেকে হেমগুড়ির দূরত্ব কম নয়। কমিউনিকেশনটাও ভালো নয়। আমি সেটাই মিন করেছি। তবে কাজের সূত্রে যত মানুষ আমার কাছে আসেন আমি হার্ট অ্যান্ড সোল দিয়ে চেষ্টা করি তাদের সকলের কাজ করে দিতে।
যুগলকিশোর বলল, লেখাপড়ার সুযোগ জোটেনি এমন অনেকেই তো ব্যাংকে আসে। ফর্ম ফিল-আপ করতে পারে না। আপনি তাদের ফর্ম ভরে দেন হাসিমুখে। সে আমি জানি। তাই তো এদিকের মানুষ আপনাকে আপন করে নিয়েছে। হেমগুড়ির মানুষের ধর্মই তাই। তারা গৌরব বসাককেও আপন করে নিয়েছিল। সেই সংসারী লোকের যে কেন মাথা ঘুরে গেল ফুলকিকে দেখে কে জানে। সবই নিয়তি।
চন্দ্রচূড় বলল, একটা অদ্ভুত কথা শুনেছি এখানে এসে। গোপন নদীতে জল এলে হেমগুড়িতে কেউ না কেউ মারা যায় অপঘাতে। আপনি তো পুরোনো মানুষ। এই মিথ কি বিশ্বাসযোগ্য?
যুগলকিশোরের বলল, বহু জায়গায় বহুরকম মিথ থাকে। লোকের মুখে মুখে তিল থেকে তাল হয়ে ওঠে। কিংবদন্তি তো এভাবেই মুখে মুখে ছড়ায়। গোপন নদীতে জল আসা নিয়েও এদিকের মানুষের কিছু বিশ্বাস আছে। কী জানেন, প্রকৃতির রহস্য বোঝা দায়। আপনি কখনও গেছেন গোপন নদীর ওদিকটায়?
চন্দ্রচূড় বলল, গিয়েছি কয়েকবার। ওদিকে গিয়েই তো দুলু মণ্ডলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। শুনলাম তিনি আপনার ছোটবেলার বন্ধু। আমি যে বাড়িতে আছি সেই বনবিহারি রায়ও আপনাদের কমন ফ্রেন্ড।
ঠিকই শুনেছেন। বনবিহারির বিয়েতে আমি আর দুলু দুজন বরযাত্রী গিয়েছিলাম।
দুলু মণ্ডলের ছেলে কনকচাঁদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। পেটের দায়ে তাকে সাপ মারতে হয়। যেদিন সাপ মারে সেদিন রাতে ছটফট করে, বেচারির বিবেক তাকে ঘুমোতে দেয় না। সারা রাত জাগিয়ে রাখে। রুজি-রোজগারের অন্য কিছু ব্যবস্থা হলে সাপ মারা ছেড়ে দেবে। আপনি তো ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষ। আপনি দেখুন না ছেলেটার কিছু গতি করা যায় কি না। আপনার বন্ধুরই তো ছেলে।
আমি ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষ নই। দুলু যদিও কখনও আমাকে কিছু বলেনি। আপনি বলছেন যখন নিশ্চয়ই দেখব।
চন্দ্রচূড় বলল, একটা কথা বলুন, আপনি তো গৌরবকে কাছ থেকে দেখেছেন। কেমন লোক ছিল সে?
যুগলকিশোর বলল, গৌরব কারও সঙ্গেই উঁচু গলায় কথা বলত না। সবার সঙ্গেই নম্র ব্যবহার করত। এমন বিনয়ী মানুষ দেখা যায় না। অনুমান করি, ফুলকির সঙ্গেও নিশ্চয়ই মিষ্টি করেই কথা বলত। ফুলকির বয়স বাড়লেও বুদ্ধিশুদ্ধি পাকেনি এখনও, দুনিয়াদারির কিছুই বোঝে না। গৌরব যে তার সর্বনাশ করার ষড়যন্ত্র করছিল সেটা বেচারি বুঝবে কী করে!
চন্দ্রচূড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, গৌরবের লাশের পোস্টমর্টেম হয়নি?
যুগলকিশোর নিচু গলায় বলল, গভীর জঙ্গলের মধ্যে রেল লাইন। আগেরদিন সন্ধেবেলা ট্রেনে কাটা পড়ে গৌরব। লাশ উদ্ধার হয় পরদিন সন্ধের পর। ততক্ষণে অসংখ্য রেলগাড়ি চলে গেছে গৌরবের শরীরের ওপর দিয়ে। বডি যে কত টুকরো হয়েছিল তার ঠিক নেই। পুলিশ এল পরদিন। চব্বিশ ঘণ্টারও পরে।
চন্দ্রচূড় বলল, থানায় ডায়েরি করতে বোধ হয় দেরিই হয়ে গিয়েছিল। তাই না?
যুগলকিশোর বলল, সেই রাতে ফুলকিকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম আমরা। পরদিন আমি আপনাদের গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার অজিতাভবাবুর কাছে আসি। থানার আউটপোস্ট এখান থেকে দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। এদিকে আবার ব্যাংকের গাড়িটার ফ্যানবেল্ট ছিড়ে গিয়েছিল তার আগেরদিন। গাড়িটা গ্যারাজে দেওয়া হয়েছিল। তখন কেষ্ট সর্দার জানতে পেরে যোগাযোগ করে। তার অ্যামবাসেডর আছে একটা। সেই গাড়িতে চেপে আমরা আউটপোস্টে যাই। মিসিং ডায়েরি করি। পুলিশ আসে সন্ধের পর।
আক্কাশ এসেছিল চায়ের কাপ নিতে। বলল, ততক্ষণে পচা গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে লাশ থেকে। বডির কিছু অংশ বুনো জন্তু- জানোয়ারের পেটেও গিয়ে থাকবে। পুলিশ একটা ভ্যানরিকশা নিয়ে এসেছিল, সঙ্গে একজন ডোমকে নিয়ে। টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া লাশ একটা বস্তার মধ্যে ভরে সেই ডোম নিয়ে যায় সুরতহাল করতে।
চন্দ্রচূড় বলল, পুলিশ এসেছিল বনবিহারি রায়ের বাড়িতে?
আক্কাশ বলল, এসেছিল পরদিন। ফুলকিকে জিজ্ঞাসা করেছিল কী হয়েছিল। ফুলকি নখ কামড়াচ্ছিল দাঁত দিয়ে। কিছুই বলেনি মুখ ফুটে। যে ঘরে গৌরব থাকত সে ঘরে গিয়ে পুলিশ তল্লাশি করে। কিছু টাকাপয়সা, আধার, ভোটার কার্ড, এটিএম কার্ড আর কিছু ওষুধপত্র ছাড়া বলার মতো কিছুই পায়নি।
চন্দ্রচূড় জিগ্যেস করল, গৌরবের বাড়ির লোক আসেনি খবর পেয়ে আক্কাশ বলল, পুলিশ খবর দিয়েছিল। গৌরব বসাকের বউ এসেছিল পরদিন। সঙ্গে একজন বয়স্ক রিলেটিভ। গৌরবের কাকা খুব সম্ভবত। ছেলে নাকি খুব ছোট। সে আসেনি। ওরা দুজন সারাক্ষণ মুখ গম্ভীর করে ছিল। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল। গৌরবের ব্যাগ-ট্যাগ আর জামাকাপড় ঘাঁটাঘাঁটি করে টাকাপয়সা আর কিছু কাগজপত্র নিয়ে ওরা চলে গেল। গৌরবের পোশাক-আশাক আলনা থেকে তুলে দুটো ব্যাগে পুরে নিয়ে গিয়েছিল বাইরে। বাস স্ট্যান্ড যাবার আগে একটা ফাঁকা মাঠ মতো আছে। রিকশা দাঁড় করিয়ে গৌরবের সমস্ত জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল ওরা। ওদের এতটাই ঘৃণা জন্মেছিল স্বামীর ওপর।
