গোপন নদীর কিনারে – ১১

১১

উঠোন ঘিরে রাঙচিতের বেড়া। বেড়ার পাশে খেজুর গাছের জট। একটা গাছের গায়ে টিনের সাইনবোর্ড। শ্রীযুক্ত যুগলকিশোর চক্রবর্তী। জ্যোতিষার্ণব। তার নীচে লেখা ‘এখানে হস্তরেখা বিচার, কোষ্ঠী বিচার, যত্ন সহকারে কোষ্ঠী ও ঠিকুজি প্রস্তুত করা হয়।’ চশমা এঁটে মন দিয়ে একটা কোষ্ঠী দেখছিল যুগলকিশোর। কপালে চন্দনের ফোঁটা। গায়ে ফতুয়া। তেল দেওয়া সাদা চুল পরিপাটি আঁচড়ানো। অদূরে গোয়ালঘর। খড়ের ছাউনি, দরমার বেড়া। মাঝে মাঝে সেদিকে অন্যমনস্ক চোখে তাকাচ্ছিল।

যে বারান্দায় বসে আছে যুগলকিশোর তার মেঝেটা ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। পাকা দেওয়াল। ওপরে টিনের চাল। বিয়ে-থা করেননি। স্বপাকে খায় যুগলকিশোর। রান্নার সব হাতের কাছে গুছিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে ঘর সংসারের সব কাজ সামলায় বিনু নামে একটি ছটফটে কিশোরী।

বিনু যুগলকিশোরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। থাকত পাশের গ্রামে। বাপ-মা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর দু’বছর হল বিনু তার জ্যাঠাদাদুর বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে আছে। বিনুর আগ্রহেই সম্প্রতি কালো গরুটা কেনা হয়েছে। কপালে সাদা চাঁদের মতো চিহ্ন। তাতে ভালোই হয়েছে। দু’বেলা দু’সের দুধ পাওয়া যায়। নিজেদের জন্য খানিকটা রেখে বাকিটা প্রতিবেশীদের জোগান দেয় বিনু। সে হিসেবি মেয়ে। ঘর সংসারের কাজেও দড়। বাসন ধোয়া-মোছা, উনুন ধরানো, মশলা পেষা, কুটনো কোটা সব সামলায় বিনু। সেলাই-ফোঁড়াই থেকে ঘুঁটে দেওয়া সবই করতে পারে অবলীলায়।

যুগলকিশোর তিন পুরুষের জ্যোতিষী। ঘর কেটে কেটে বিংশোত্তরী মতে দশা-অন্ত্রদশা বিচার করে। বাপ-ঠাকুরদা বিচার করতেন অষ্টোত্তরী মতে। পূর্ব বাংলায় তেমনই চল। পশ্চিম বাংলায় বিংশোত্তরী বিচার করেন সকলে। এদিকের জ্যোতিষীরা বলেন, ‘কলৌ বিংশোত্তরী’। অর্থাৎ কলিযুগে বিংশোত্তরী বিচার করাই ঠিক। রাশি চক্র ছাড়াও পতাকীচক্ৰ, ষগ্নাড়ি চক্র, নবাংশ চক্র, ত্রিপাপ চক্রের ছক আঁকেন।

যুগলকিশোরের বয়স্য গদাকৃষ্ণর নাতনি হয়েছে। মেয়েটির জন্মছক নিয়ে ব্যস্ত ছিল। চন্দ্রচূড়কে দেখে কোষ্ঠীটা নামিয়ে রেখে বলল, আরে, কী সৌভাগ্য! আসুন আসুন।

একটা প্লাস্টিকের চেয়ার এনে দিল বিনু। তাতে বসল চন্দ্রচূড়। হেসে বলল, কার কোষ্ঠী তৈরি করছিলেন?

যুগলকিশোর বলল, গদাকৃষ্ণর নাতনি হয়েছে, তার। ভালো কোষ্ঠী হয়েছে। দীর্ঘায়ু যোগ আছে। পড়াশোনাতেও ভালো হবে মেয়ে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অর্থ উপার্জন করবে। শুধু তাই নয়, সদ্বংশে ভালো বিয়েও হবে।

বিনু চা করে এনেছে। সঙ্গে মুড়িমাখা। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চন্দ্রচূড় বলল, বাঃ! খুব ভালো। আচ্ছা, বনবিহারি রায় তো আপনার বন্ধু তাই না?

যুগলকিশোর বলল, ছেলেবেলার বন্ধু। ওর স্ত্রী শোভার সঙ্গেও আলাপ-টালাপ ছিল। সকলে বলে শোভার মধ্যে নাকি পাগলামির চিহ্ন ছিল। মায়ের ধারা পেয়েছে বলে ফুলকি জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়েছে। বাস্তবে তা নয়। শোভার মাথা একদম পরিষ্কার ছিল। কথাও বলত গুছিয়ে। কী বলুন তো চন্দ্রচূড়বাবু, ফুলকির কোষ্ঠী আমি বিচার করেছিলাম। ওর তুলারাশি, মকরলগ্ন। লগ্নে অর্থাৎ কেন্দ্রে শনি। ওর বছর তিনেক বয়সে একবার জলে ডুবে যাওয়ার ফাঁড়া আছে আমি জানতাম। তার জন্য সর্বমঙ্গলা কবচ করে দিয়েছিলাম। রুপোর মাদুলিতে ধারণ করেছিল ফুলকি। সেই ফাঁড়াটা কেটে গিয়েছিল।

চন্দ্রচূড় বলল, ফুলকির এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটবে তা কি আঁচ করতে পেরেছিলেন?

যুগলকিশোর বলল, ফাঁড়া আছে জানতাম। বলেও ছিলাম বনবিহারিকে কিন্তু আমার কথায় আমল দেয়নি। ফুলকি আসত আমার কাছে। সেই ঘটনার আগেও এসেছিল একদিন। ওকে বলেছিলাম এই সময়টায় সাবধানে থাকতে। শ্বেতবেড়েলার মূল ধারণ করতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু ফুলকি কি সে কথা শোনার মেয়ে?

চন্দ্রচূড় বলল, হেমগুড়ির মানুষজন বলে ফুলকিকে অপদেবতা ভর করেছে। আপনার কি তা মনে হয়?

দূরের বাঁশবন থেকে সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে। যুগলকিশোর অস্পষ্ট গলায় বলল, মানুষের ধরা-ছোঁয়ার সীমার বাইরে, ধরে নিন অন্তরিক্ষে, দেবতাদের বাস। আর দেবতা যদি থেকে থাকে তবে অপদেবতা ও আছে। আপনি তো বনবিহারির বাড়িতে আছেন বেশ কিছুদিন হল। আপনার চোখে অসামঞ্জস্য কিছু ধরা পড়েনি কখনও?

চন্দ্রচূড় বলল, অসামঞ্জস্য বলতে?

যুগলকিশোর বলল, ফুলকির পোষা কুকুরটাকে কি আপনি দেখেছেন? চন্দ্রচূড় বলল, না, দেখিনি। তবে রাতের দিকে এক-একদিন টের পাই কুকুরটা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আসে। আমি যে ঘরে থাকি তার পাশের ঘরটায় চলে যায়।

যুগলকিশোর প্রসঙ্গ বদলে বলল, আমার বাড়িতে এসেছেন কি পায়ে হেঁটে?

চন্দ্রচূড় বলল, না, রিকশায় এসেছি। হামিদুলকে চেনেন তো? সে নিয়ে এসেছে আমাকে। ওকে বলেছি ঘণ্টাখানেক বাদে এসে আমাকে নিয়ে যেতে।

যুগলকিশোর বলল, এখান থেকে কোথায় যাবেন? সোজা বাড়ি ফিরে যাবেন?

চন্দ্রচূড় হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আজ হাতে সময় আছে। গোপন নদীর ওদিকটা আমার বেশ লাগে বেড়াতে। আজও ভাবছি যাই ঘুরে আসি এক চক্কর। আপনি যাবেন নাকি?

যুগলকিশোর বলল, ওদিকটায় যাইনি বহুদিন। চলুন, যাওয়াই যায়।

হামিদুলের রিকশার ঘণ্টির শব্দ কানে এল। চন্দ্রচূড় হেসে বলল, ওই যে, চলে এসেছে হামিদুল।

রিকশা এগোচ্ছে সরু কাঁচা পথ ধরে। একটা রাস্তা বাঁক নিয়ে চলে গেছে দোলনা নদীর দিকে। আর একটা রাস্তা গেছে সোজা। দু’পাশে বনতুলসীর ঝোপ। মাঝে মাঝে কাঁটা গোলাপ। জংলা টুসি। গন্ধ উঠছে ঝোপ-ঝাড় থেকে। পাতলা নয়, একটু ভারী বনজ গন্ধ। আবছা আলোয় অনুমান করা যাচ্ছে খানিকটা তফাতে ধানখেত। আল দিয়ে একটা ক্ষেতের সঙ্গে আর একটা খেত আলাদা করা।

সূর্য ডুবে গেল এইমাত্র। ফ্যাকাসে চাঁদ উঠেছে আকাশে। দলছুট সেই পরিযায়ী সারস পাখিটা বড় বড় পা ফেলে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে মজা নদীর খাত দিয়ে।

হাওয়া দিচ্ছিল বেশ। ধুলো উড়ছিল। কিছু চোখে পড়ছিল না ভালো। ধুলো, বালি, চাঁদের আলো মিশে গিয়ে সব কিছু কেমন ঝাপসা কালো। হামিদুল রিকশা থামাল। নামল দুজন। হামিদুল দাঁড়িয়ে রইল।

আলপথ ধরে এগোতে লাগল যুগলকিশোর আর চন্দ্রচূড়। যুগলকিশোর আঙুল উঁচিয়ে বলল, নদীর এদিকটায় মাঘ মাসে মেলা বসে। ওদিকে শ্মশান। ইলেকট্রিক চুল্লি এদিকে আসতে আরও পঞ্চাশ বছর। হেমগুড়ির মানুষজন মারা গেলে কাঠ জড়ো করে দাহ করা হয় ওই শ্মশানে। একদিন আমাকেও তো মরতে হবে। তখন আমাকেও পোড়ানো হবে ওই শ্মশানে।

নদীর ওদিকে ঢালু জমি। গাছপালা। চন্দ্রচূড় আন্তরিক গলায় বলল, কেন এসব বলছেন। আপনি এখনও বহু বছর বাঁচবেন।

যুগলকিশোর বলল, সে সব ঈশ্বরের হাতে। তবে বয়সের কথা বিচার করলে আমি আপনার আগে আগে যাচ্ছি। সেই হিসেবে পরলোকে আমাকেই যেতে হবে আগে। আচ্ছা, ভালো কথা, আপনার তো বিয়ে হয়নি।

চন্দ্রচূড় বলল, না, হয়নি। তবে মেয়ে ঠিক করা আছে বাড়ি থেকে।

সামনের বছরই বিয়ে হবে আমাদের। কেন বলুন তো?

যুগলকিশোর বলল, না, এমনি বললাম। আচ্ছা, আপনার বাড়ি তো জলপাইগুড়ি? বাবা-মা কী করতেন?

চন্দ্রচূড় বলল, বাবা চাকরি করতেন সরকারি অফিসে। মা স্কুল টিচার ছিলেন।

যুগলকিশোর বলল, আপনার বন্ধুদের মধ্যে কি সকলেই বিয়ে করে ফেলেছে? যদি আপনার সন্ধানে কোনও উপযুক্ত পাত্র থাকে তবে ফুলকির জন্য একটু দেখবেন তো। মা-মরা মেয়ে, আজও বিয়ে হল না, এদিকে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যার জন্য মেয়েটার কোনও দোষই নেই। বেচারির কথা ভেবে খারাপ লাগে।

চন্দ্রচূড় মাথা হেলিয়ে বলল, আচ্ছা দেখব।

যুগলকিশোর বলল, হেমগুড়িতে আপনি এসেছেন কম দিন হল না। এদিকের লোকজনের সঙ্গে আপনার চেনা-জানা হয়ে গেছে এই ক’দিনে। বনবিহারি রায়ের স্ত্রী শোভার কথা কিছু শুনেছেন?

চন্দ্রচূড় বলল, আবছা আবছা শুনেছি। ভদ্রমহিলা নাকি আত্মহত্যা করেছিলেন।

যুগলকিশোর একটা শ্বাস ফেলে বলল, কবে আছি কবে নেই জানি না। ভাবছি যে কথাগুলো বুকের মধ্যে পুষে রেখেছি এত বছর ধরে তা কাউকে বলে যাই। আপনি হয়তো শুনেছেন যে, শোভা বনবিহারির স্ত্রী। বাড়ি থেকে সম্বন্ধ করে দুজনের বিয়ে।

শোভাকে বনবিহারি দেখে শুনে বিয়ে করেনি। ওর মায়ের পছন্দেই বিয়ে হয়েছিল। সুন্দরী না হলেও শোভা ছিল সুশ্রী। আচার-ব্যবহার কথাবার্তা সবই বাইরে থেকে ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকে বনবিহারি বুঝতে পারে বাইরের শোভা আর ভেতরের শোভা এক নয়। আলাদা। যে শোভাকে দেখা যায় সেটা তার খোলস মাত্র।

চন্দ্রচূড় চুপ করে আছে। তাকে এই কথাগুলো কেন বলছে মানুষটা সেটা ধরতে পারছে না। যুগলকিশোর বলল, বনবিহারির বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল একটা সময়। কিন্তু এখন আর নেই। বনবিহারির সঙ্গে আমার মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল শোভাকে নিয়ে। এটা কি জানতেন?

চন্দ্রচূড় বলল, না, জানতাম না।

যুগলকিশোর বলল, শোভার চেহারায় একটা চটক ছিল। ওকে আমি কাছ থেকে দেখেছি বলেই জানি, ভেতরের শোভা ছিল উদাসীন, নির্লিপ্ত। আয়নার কাচে যেমন ছায়া ভেসে ওঠে ঠিক তেমনি ছিল শোভা। মনে হচ্ছে আছে, কিন্তু আসলে নেই। তাকে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।

তাকে বনবিহারি যত কাছে টেনে নিতে গেছে সে তত দূরে সরে গেছে। তাকে বনবিহারি ছুঁতে পারেনি। এক-একদিন এমন হতো, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখত পাশে শোভা নেই। বারান্দায় গিয়ে চুপচাপ বসে আছে। পরের দিকে উঠোনে গিয়ে শোভা একটা লোহার শিক দিয়ে গর্ত খুঁড়ত। স্তূপ করা মাটি দিয়ে পাহাড় বানাত। এমনিই। কোনও কারণ নেই। রোগ জটিল হল এর পর। মাঝে মাঝে ফিট আসতে শুরু করল শোভার। ডাক্তার দেখানো হল টাউনে গিয়ে। ডাক্তার বলল হিস্টিরিয়া। এসবের জন্য বনবিহারি অনেকটাই দায়ী।

কেন?

বউয়ের সঙ্গে বনবিহারির নানা কারণে খিটমিট লেগেই থাকত। আসলে দুজন ছিল দু’রকম মেরুর মানুষ। বনবিহারির ছেলে-মেয়ে হচ্ছিল না। সে কারণে দূষত শোভাকে। বলত বাঁজা। কিন্তু সমস্যাটা শোভার নয়, সমস্যাটা ছিল বনবিহারির।

রাস্তার ওপর গাছের ডাল পড়ে আছে বেয়াড়াভাবে। আধ-শুকনো ডাল। পাতা রয়েছে। চন্দ্রচূড় এতক্ষণ গাছের পাতাটা দেখছিল। মুখ তুলে তাকাল যুগলকিশোরের দিকে।

যুগলকিশোর বলল, আমি জানি আপনি ভদ্রতার বশে প্রশ্নটা করতে পারছেন না। আমি নিজেই বলছি শুনুন। বনবিহারির বাড়ি যেতে যেতে শোভার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তার মধ্যে শরীর ছিল না। এভাবেই ক’বছর কাটল। শোভা আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। আমি তাতেই ভেসে গেলাম। শোভার মধ্যে এমন একটা দেহজ আকর্ষণ ছিল, আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।

মুচকুন্দ, শেয়াকুল, বাবলার সারি আর ফণীমনসা, বনতুলসী, বাসকের ঝোপ-ঝাড়। বাবলা, লিচু আর আমগাছের মতো দুটো একটা বড় গাছও রয়েছে সামনে। সেদিকে তাকিয়ে যুগলকিশোর চুপ করে থাকল খানিকক্ষণ। একটু কাশল। কাশি থামলে বলল, একদিন বনবিহারির বাড়ি গিয়েছিলাম, এমনিই। গিয়ে শুনি ও কলকাতা গিয়েছে কাজে। সেদিন শোভা আমার সঙ্গে অনেক কথা বলেছিল। আমিও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সেদিন আমাদের শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তার জেরে সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়ে শোভা। বনবিহারি সে কথা জানার পর ওর মনে ঢুকে যায় সন্দেহের বীজ। শোভার ওপর শুরু করে মানসিক নির্যাতন। ফুলকি জন্মায়। তার পরও কয়েক বছর সহ্য করেছিল শোভা। আর পারেনি। একদিন ভোররাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল দোলনা নদীর জলে।

চন্দ্রচূড় বলল, বুঝতে পারছি।

বোঝেননি। সব বীজ থেকে ফল হয় না। আমার আর শোভার ক্ষেত্রে তা হয়নি। আপনি কি খুঁটিয়ে দেখেছেন কখনও ফুলকিকে? এর

পর যখন দেখবেন তখন লক্ষ করবেন, আমার সঙ্গে ওর মুখের অনেক মিল। ফুলকি যত বড় হচ্ছিল তত সেই মিল স্পষ্ট হচ্ছিল। সে নিয়েই অশান্তি।

যুগলকিশোরের মুখচোখ বদলে যাচ্ছে। কপালের দু’পাশের দুটো রগ লাফাচ্ছে পাগলা ঘোড়ার মতো। কেমন একটা গলায় বলল, ফুলকি আমার মেয়ে। গৌরব বসাক মরে গিয়ে বেঁচেছে। নইলে আমি ওর কী হাল করতাম তা আমিই জানি…। আমি ওর জন্মদাতা, আমার রক্ত ওর শরীরে, ওকে দেখে আমার যে কী কষ্ট হয় তা আমিই জানি।

নদীর দিক থেকে ভেসে আসছে হাওয়া। একটা সিগারেট ধরাল চন্দ্রচূড়। ধোঁয়া ছাড়ল। মৃদু গলায় বলল, যে ঝড়ের মুখোমুখি ওকে হতে হয়েছে তাতে এটাই স্বাভাবিক। ওর তো কোনও দোষ নেই।

যুগলকিশোর কাছে ঘনিয়ে এল। নিচু গলায় বলল, এটা একটা দামি কথা বলেছেন আপনি। গৌরব যা করেছে তার জন্য ফুলকির কোনও দোষ নেই।

একটা কথা বলি? আপনি বিয়ে করবেন ফুলকিকে? দেখুন, আমার কুড়ি-বাইশ লাখ টাকার জায়গাজমি আছে। বিনুকে কিছু দেব। বাকি যা আছে সব লিখে দেব আপনাদের দুজনের নামে। আমার প্রস্তাবটা কি খুব খারাপ, চন্দ্রচূড়বাবু?