৬
পরীক্ষার সব বাধা টপকেছে তটিনী। তার স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্ক্ষা পৌঁছেছে পূর্ণ হবার দোরগোড়ায়। বাকি শুধু ভাইভা। তার আগে মালবাজার এসেছে ক’দিনের জন্য। সকালে ব্রেকফাস্ট করে সেই যে বই নিয়ে বসছে, সারাদিন বইমুখোই থাকছে। এই খবরটা বিশেষ একজনকে না জানানো অবধি শাস্তি নেই। কিন্তু কিছুতেই ফোনে পাচ্ছে না চন্দ্ৰচূড়কে। যখনই ফোন করে তখনই যান্ত্রিক গলায় কেউ বলে ওঠে—আপনি যাঁকে ফোন করেছেন তিনি এখন পরিষেবা সীমার বাইরে। গতকাল একবার লাইন পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু কথা কেটে যাচ্ছিল বারবার।
রাতের দিকে ফোন এল চন্দ্রচূড়ের। তটিনী বলল, গতকাল হেমগুড়ি পৌঁছেছ। আমাকে একটা ফোন অবধি করলে না!
চন্দ্রচূড় বলল, এখানে নেটওয়ার্কের দশা খুব খারাপ। বহু চেষ্টা করেও তোমাকে লাইনে পাইনি। যাক গে, হুট করে কল ড্রপ হবার আগে কাজের কথা বলি। হেমগুড়ি পৌঁছতে কোনও অসুবিধে হয়নি। অফিসেও জয়েন করে গেছি আজ সকালে। এভরিথিং ইজ ফাইন। এখানে আসার আগে ইউনিয়নের সেক্রেটারির কাছ থেকে ফোন নম্বর জোগাড় করে সুবোধ দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ভদ্রলোক এই গ্রামীণ ব্যাংকেই কাজ করতেন। তাঁকে রিপ্লেস করেছিল গৌরব বসাক। সুবোধদা বলে দিয়েছিলেন হেমগুড়িতে মাথা গুঁজতে গেলে এই বাড়ির চাইতে বেটার অপশন আর নেই। এখানে এসে দেখছি কথাটা উনি ভুল বলেননি।
তটিনী জানতে চাইল, রান্নাবান্না কেমন? আর ঘরদোর? পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন?
চন্দ্রচূড় বলল, এটা একটা কাঠের দোতলা বাড়ি। ওপরে টিনের চাল। দোতলায় আমি থাকি। বাড়ির মালিক, তার মেয়ে আর দিদি থাকে নিচতলায়। একটাই মুশকিল, অ্যাটাচড টয়লেট নেই। তার জন্য নীচে নামতে হয়। তবে এখানে শাক-সবজি ফ্রেশ। মাছ-টাছও টাটকা পাওয়া যায়। তুমি আর তিমির একবার এসে ঘুরে যেও। তিমির ছবি তোলার রসদ পাবে। জঙ্গল আর নদী তো আছেই, একটু দূরেই ভুটান পাহাড়। আমার ঘরের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যায়।
তটিনী বলল, জঙ্গল-নদী-পাহাড় সবই আছে অথচ ট্র্যাভেল ম্যাগাজিন- ট্যাগাজিনে হেমগুড়ির নাম তো শুনিনি কখনও!
চন্দ্রচূড় বলল, এটা হদ্দ গ্রাম। মাথা গোঁজার মতো হোটেল নেই। হোমস্টে কী, সেটা কেউ জানে না। কৃষিকাজ, মাছধরা এদিকের লোকের মূল জীবিকা। জঙ্গলে থেকে কাঠকুটো জোগাড় করে এনে বিক্রি করে অনেকে। তুমি এলে তোমার মনে হবে এখনও আটের দশকে পড়ে আছে জায়গাটা। রাজ্যের ক্রাইম চার্টে হেমগুড়ির নাম থাকে না কখনও।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো, এমন শান্তশিষ্ট জায়গায় একটা আনটুয়ার্ড ইন্সিডেন্ট ঘটেছিল গত বছর। আমি যার বাড়িতে এসে উঠেছি তার মেয়েকে একজন রেপ করেছিল ধানখেতে নিয়ে গিয়ে। খুনও করতে গিয়েছিল গলা টিপে। তবে কপাল ভালো, মেয়েটা বেঁচে গিয়েছিল শেষ অবধি।
কে ঘটিয়েছিল এই ঘটনা? সে ধরা পড়েনি?
যে রেপ করেছিল তার নাম গৌরব বসাক। ইসলামপুরের লোক। সেখানে তার ফ্যামিলি আছে। সে কুকুরের তাড়া খেয়ে পালাতে গিয়ে কাটা পড়েছিল রেল লাইনে। তুমি জানলে অবাক হবে, যে কুকর্মটা করেছিল সে হেমগুড়ি গ্রামীণ ব্যাংকেই চাকরি করত। সে মারা যাওয়ায় যে ভ্যাকেন্সি তৈরি হয় আমি সে জায়গাতেই এখানে এসেছি। নট ওনলি দ্যাট, সেই লোকটাও এই বাড়িতে এই ঘরেই থাকত যে ঘরে আমি আছি।
ও মাই গড! তোমার কথা শুনে তো আমারই বুক ধুকধুক করছে। তোমার ভয় করছে না?
সত্যি কথা বলতে কী, কাল ঘরে ঢুকে কেমন আঁশটে একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম। মাছপচা গন্ধ। প্রথমে একটু ইয়ে ইয়ে লাগছিল। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার হল, আমি ঢোকার আগে গিয়ে ঘরটা সাফসুতরো করে দিয়েছিল বনবিহারির দিদি। ফিনাইল জল দিয়ে মুছে দিয়েছিল মেঝে। অথচ তার পরও গন্ধটা যায়নি। আমি বলার পর আরও এক প্রস্থ ঘর মোছা হয়েছে। তার পর গন্ধটা গেছে। আমিও অস্বস্তিটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।
টয়লেট তো দোতলায় নেই বললে। তাহলে?
কিছু তো করার নেই। মোগলের হাতে পড়লে খানা তো একসাথেই খেতে হবে। হা হা, শাস্ত্রেই তো বলেছে। আসলে দিনের বেলা ঠিক আছে কিন্তু রাতে নীচে নামাটাই একটু চাপ। কাছেই জঙ্গল। মাঝেমধ্যেই নাকি বুনো জানোয়ার চলে আসে এসব দিকে। কয়েক মাস আগে একটা লেপার্ড পায়ের ধুলো দিতে চলে এসেছিল এই বাড়ির উঠোনে।
বলো কী!
বনবিহারি রায় তো সেটাই বলছিল। তবে হাতি বা লেপার্ড নয়, আমি ভাবছি গৌরব বসাকের কথা। বছরখানেক ছিল হেমগুড়িতে। সকলে তাকে ভালোমানুষ বলে জানত, কিন্তু লোকটার পেটে পেটে যে এসব ছিল সেটা কেউ বুঝতেই পারেনি। কী জানো, এই বাড়িটা একটু ইয়ে। কোনও কোনও বাড়ি থাকে না, যেখানে ঢুকলেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে, কেমন একটা ইরি ফিলিং হয়, এটাও ঠিক তেমন ধাঁচের বাড়ি।
হন্টেড বাড়ি নাকি?
তা জানি না। সে তো কিছুদিন থাকলেই বুঝতে পারব। দ্যাখো, বনবিহারি রায়ের বউ বহু বছর আগে নদীতে ডুবে মরেছিল। একটাই মেয়ে, ফুলকি। তার সঙ্গেও মিসহ্যাপ হয়েছিল গত বছর। আমি দোতলা থেকে শুনেছি মেয়েটার গলা। একটু হাস্কি মতো গলা। অথচ আগে নাকি এমন ছিল না।
ওই ফুলকি না কী নাম বললে, তার সঙ্গে কথা তোমার বলতে হবে না। ঠিক আছে? ভালো কথা, তোমাকে একবার রাস্তার কুকুর কামড়েছিল না? তখন তুমি স্কুলে পড়তে। সিক্স না সেভেনে। তোমাকে রেবিসের ইঞ্জেকশন নিতে হয়েছিল না? তুমিই তো একবার গল্পে-গল্পে বলেছিলে। মাইন্ড ইট, এই বাড়ির কুকুরটার থেকে সাবধান। হেমগুড়ির মতো অজ-গ্রামে অ্যান্টি রেবিস ইঞ্জেকশন কিন্তু তুমি মরে গেলেও পাবে না।
কুকুরটাকে আমি এখনও চোখে দেখিনি। দোতলায় আমার পাশের ঘরটা কোনও এককালে ছিল বনবিহারির বেডরুম। ফুলকি এই ঘরে আসত। ছবি-টবি আঁকত। পোষা কুকুরটা ঘুরঘুর করত ওর পেছন পেছন। ফুলকি কুকুরটাকে গলায় বকলস পরিয়ে রাখত। কিন্তু গত বছরের সেই ঘটনার পর বকলস খুলে কুকুরটাকে ছেড়ে দিয়েছে। হয়তো সেদিন বিপদের সময় কুকুরটা ফুলকিকে বাঁচাতে আসেনি সেই অভিমানে।
কুকুরটা আর আসে না?
শুনলাম এখন নাকি বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। পুরোনো জায়গার টানেই হয়তো এক-একদিন আসে। গতকাল রাতেই যেমন এসেছিল। এই বাড়ির সিঁড়িটা বাইরের দিকে। কাল তখন অনেক রাত। কুকুরটা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এসেছিল শব্দ না করে। খৈরি এলে ফুলকিও সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছিল ওপরে। কিছুক্ষণ থেকে কুকুরটা ফিরে গিয়েছিল। ফুলকিও নেমে গিয়েছিল নিজের ঘরে।
ফুলকি মাঝরাতে চুপিচুপি দোতলায় উঠে এসেছিল, ওর বাবা আর পিসি টের পায়নি?
না পাওয়ার তো কিছু নেই। কিন্তু আমি এদের দুজনের মতো উদাসীন মানুষ আর দেখিনি। দুজনের কারওরই তো কোনও হেলদোল দেখলাম না।
কুকুরটা ফুলকির ন্যাওটা বলছিলে। যেদিন ঘটনাটা ঘটে সেদিন কুকুরটা ফুলকির সঙ্গে ছিল না?
হামিদুলের মুখেই শুনছিলাম কুকুরটার কোনও রোগ হয়েছিল। সেদিন ফুলকি যখন ঝড়-বাদলের মধ্যে বেরোয় তখন কুকুরটা ঘরেই বসে বসে ঝিমোচ্ছিল। কিন্তু কুকুরের তো সিক্সথ সেন্স খুব স্ট্রং থাকে। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে কিছু একটা হয়তো আঁচ করেছিল খৈরি। মোক্ষম সময়ে এসে পড়েছিল ধানখেতে। সে সময় ফুলকিকে গলা টিপে মারতে যাচ্ছিল গৌরব। খৈরি তাড়া করতে থাকে গৌরবকে। গৌরব পালাচ্ছিল ঘন জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন। গৌরব খেয়াল করেনি কখন দৈত্যের মতো একটা ট্রেন চলে এসেছে লাইনে।
তুমি কি মিট করেছ ফুলকিকে? তোমার সঙ্গে কি ওর কথা হয়েছে?
না, হয়নি। তবে আমার ঘর থেকে ফুলকির গলা শুনেছি। একটু হাস্কি গলা। ছেলেদের মতো। শুনলাম গত বছর সেই ঘটনার দিন হাসপাতালের দুই ডাক্তারের কেউই ছিল না। একজন গিয়েছিল কলকাতা অন্যজন হাসপাতাল এসেও অসুস্থ বোধ করায় বাড়ি চলে গিয়েছিল রেস্ট নিতে। নার্স এসে ফুলকির নাড়ি খুঁজে পায়নি। ফুলকিকে রেখে দিয়েছিল একটা ঘরে, পোস্টমর্টেম করার জন্য পরদিন শহরে পাঠাবে বলে। কেউ তখন তান্ত্রিক গোছের একজনকে ডেকে আনে। সে এসে ঝাড়-ফুঁক করে। ঘটনাচক্রে তার পরই জ্ঞান ফেরে ফুলকির। কিন্তু গলার আওয়াজ থেকে বেসিক বিহেভিয়ার বদলে যাওয়ায় এদিকের লোকের ধারণা ফুলকির মধ্যে অন্য কোনও আত্মা এসে ঢুকেছে। গ্রাম হলে যা হয় আর কী।
বোগাস!
সে তো বটেই। তবে গ্রামের লোকের ভাবনা-চিন্তা আমাদের সঙ্গে মিলবে না। সুবোধদা যখন এ বাড়িতে ছিল সে সময় ফুলকি রান্নাঘরে ঢোকেনি কখনও। কিন্তু গৌরব আসার পর ফুলকির মধ্যে বদল এল। গৌরবের জন্য চা-জলখাবার নিয়ে দোতলায় যেতে শুরু করল ফুলকি। ওর সঙ্গে সঙ্গে দোতলায় যেত ওর কুকুরটাও। গৌরব কুকুর ভালোবাসে। ওর নিজের জলখাবারের থেকে খৈরিকে খেতে দিত গৌরব।
আমার মনে হচ্ছে এটা গৌরবের ট্যাকটিকস। সে আদৌ ডগলাভার ছিল না। নিজের অভিসন্ধির জন্য খৈরিকে প্যামপার করে ফুলকির মন ভেজাচ্ছিল। তোমাকে আবার ফুলকি দোতলার ঘরে এসে চা জলখাবার দিচ্ছে না তো?
তুমি কি পাগল হলে? আমার সামনে আসা তো পরের কথা, নিজের ঘর থেকেই তো ফুলকি বেরোয় না।
সেই ঘটনাটার ক’দিন আগে থেকে কুকুরটা ঝিমোচ্ছিল। তার কী কারণ হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?
কী আর কারণ হবে। পার্ভোজাতীয় কোনও সংক্রামক রোগ হয়ে থাকতে পারে।
উঁহু, আমি অন্য একটা অ্যাঙ্গেল ভাবছি। এমনও তো হতে পারে যে, গৌরব জানত ফুলকির সঙ্গে সে যদি জোর করে শুতে যায়, ফুলকি তাকে বাধা দেবে। হইচই করবে। সেক্ষেত্রে কুকুরটা তার টুটি চিপে ধরবে। সে কারণে ইসলামপুরে কোনও চেনা ওষুধের দোকান থেকে এমন কোনও মেডিসিন কিনে এনেছিল যা দিয়ে গৌরব যা খৈরির নার্ভ কিংবা মাসল, বা দুটোই শিথিল করে দিচ্ছিল। যখন চা- জলখাবার নিয়ে ফুলকি যেত, তখন গৌরব ফুলকিকে লুকিয়ে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খৈরিকে সেই ওষুধ খাওয়াত। সে কারণেই হয়তো নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল খৈরি।
তুমি তো মিস মার্পলের শিষ্য দেখছি! ঘরে বসেই জিগ-স পাজলের জট খুলে ফেলছ। পুলিশ সার্ভিসই তোমার জায়গা। তবে একটা খটকা আছে। শুধু খৈরিকে সিভেটিভ কেন খাওয়চ্ছিল গৌরব? ফুলকিকে নয় কেন?
সে তো গৌরবের বশ হয়েই আছে। তাকে কেন সিডেটিভ খাওয়াবে? গৌরব জানত ফুলকি তার প্রতি দুর্বল। তার সঙ্গে সেক্স করে ভুজুং- ভাজুং বোঝালে সেটা সে পাঁচকান করবে না। শুধু নিশ্চিত করতে হবে বনবিহারি বা তার দিদি যেন কিছু জানতে না পারে। চায়ের কাপ বা জলখাবারের প্লেট নিয়ে দোতলায় আসা আর এঁটো কাপ-প্লেট নিয়ে নেমে যাওয়ার মধ্যেকার সময়টুকু ফুলকি থাকত গৌরবের ঘরে। বনবিহারি বা তার দিদি দোতলায় সে সময় হয়তো উঠত না। গৌরব ভালোমানুষি দেখিয়ে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছিল।
তোমার যুক্তি অকাট্য। কোনও একদিন সুযোগ বুঝে ফুলকির সঙ্গে শোয়ার ছক কষে রেখেছিল গৌরব। একটাই বাধা ছিল। সেটা হল ফুলকির কুকুরটা। একমাত্র খৈরি কেঁচে গণ্ডূষ করে দিতে পারত তার প্ল্যান। তাই খৈরিকে দিনের পর দিন ধরে কোনও সিডেটিভ জাতীয় ওষুধ খাইয়ে যাচ্ছিল গৌরব। গৌরব জানত যে, হেমগুড়ির মতো জায়গায় কেউ টের পাবে না কেন খৈরি নির্জীব হয়ে পড়ছে দিন দিন। তোমার ব্যাংকেই তো চাকরি করত গৌরব। তার সম্পর্কে কী শুনলে?
অজিতাভদা আমাদের ম্যানেজার। আক্কাশ আলি নামে একজন সাব- স্টাফ আছে ব্যাংকে। নাইটগার্ড। তবে দিনের বেলাতেও থাকে। দুজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম সেদিন দুপুরবেলাই অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল গৌরব। হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল। রাস্তায় দেখতে পায় ফুলকিকে। সেদিন পথঘাটও ছিল নির্জন। সপসপে ভেজা ম্যাক্সি পরে থাকা ফুলকিকে দেখে গৌরব নিজেকে সামলাতে পারেনি। জড়িয়ে-টড়িয়ে ফুলকিকে নিয়ে গিয়েছিল গোপন নদীর কিনারে। সচরাচর ওদিকটায় কেউ যায় না। তার মধ্যে সেদিন তো এমনিতেই ওয়েদার খারাপ।
গৌরব বেশ কিছুদিন ধরেই হয়তো সুযোগ খুঁজছিল। সেই ঝড় বাদলের দুপুর তাকে সুযোগ তৈরি করে দেয়। ভেবেছিল ওই দুর্যোগের দিনে ওরকম নির্জন জায়গায় কোনও অপকর্ম করলে কেউ তার সাক্ষী থাকবে না। কী ঘটেছে সেটা ফুলকি কাউকে বুঝিয়ে বলতেও পারবে কি না সন্দেহ। গৌরব ভেবেছিল ফুলকিকে অ্যান্টি-প্রেগন্যান্সি টাইপ কোনও ওষুধ খাইয়ে দেবে যাতে প্রেগন্যান্সি না আসে। তেমন ওষুধ হয়তো সঙ্গেই রাখত যদি কখনও দরকার পড়ে সে কথা ভেবে।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এবার তোমাকে ডাকল বলে। তবে ফুলকির বোধবুদ্ধি না পাকলেও মেয়েদের জন্মগত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে সে কিছু একটা আঁচ করেছিল। গৌরবকে ফুলকি বাধা দিয়েছিল নিশ্চয়ই। চিৎকার-চেঁচামেচি ও করেছিল। তখন ভয় পেয়ে ফুলকির গলা টিপে ধরে গৌরব। নইলে ফুলকির গলায় নীলচে দাগটা থাকত না। তবে গৌরব হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি খৈরি গন্ধ শুঁকে শুঁকে এসে পড়বে মোক্ষম সময়ে।
ঠিক। তবে ফুলকি যে সেক্স-সাইরেন সেটা তো একবারও বলোনি!
তুমিও পারো। সেক্স-সাইরেন না আরও কিছু! তবে হ্যাঁ, ফিগার-টিগার ভালো।
ভালো বলতে? ছত্রিশ-চব্বিশ-ছত্রিশ? ফিতে দিয়ে মেপে দেখেছ? একদম হেসো না। কাল তুমি ফুলকির ছবি তুলবে তোমার মোবাইলে। আমাকে পাঠিয়ে রাখবে হোয়াটসঅ্যাপে। আজ হোক কাল হোক, পাব। মেয়েটাকে দেখার কৌতূহল হচ্ছে বড্ড। আর তুমি নিচতলায় নেমে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার খাবে। আমি যদি শুনি ফুলকি তোমার ঘরে আসছে চা-জলখাবার নিয়ে, তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন।
চন্দ্রচূড় একচোট হেসে বলল, আক্কাশ আলির কথা বলছিলাম একটু আগে। সে আবার লোকাল পিটিআই। দুনিয়ার খোঁজখবর রাখে। তার মুখেই শুনলাম হেমগুড়ির বহু লোকেরই নাকি কুনজর ছিল ফুলকির ওপর। এদের কেউ সাপের চামড়ার পাইকার, কেউ গালামালের দোকানি, কেউ পার্টির যুবনেতা
তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে সরেস লোক হল হামিদুল। বাস স্ট্যান্ড থেকে যার রিকশায় এ বাড়িতে এসেছিলাম। কাল সে বনবিহারি রায়ের বাড়ির গেট অবধি এল না। খানিক দূরে এসে রিকশা থামিয়ে দিয়ে আমাকে নামিয়ে দিল। বলল, রিকশা আর যাবে না। ছার, আপনি হেঁটে চলে যান।
তটিনী অবাক গলায় বলল, কেন?
আমি গালমন্দ করতে যাচ্ছিলাম, হামিদুল লজ্জা-লজ্জা মুখে বলল, সে ফুলকির আশিক। কিন্তু বেচারির দুঃখ, ফুলকি তাকে একেবারেই পছন্দ করে না। রিকশা নিয়ে কারণে-অকারণে কায়েতপাড়া দিয়েই ঘোরাফেরা করে। যদি একবার ফুলকির দেখা পায়। সাহস করে একবার প্রোপোজ করতে গিয়েছিল। ভরা বাজারে ফুলকির থাপ্পড় খেয়েছিল হামিদুল। সেই থেকে ফুলকির সামনে যেতে লজ্জা পায়।
কিন্তু তুমি লাগেজ ঘাড়ে নিয়ে অতটা পথ হাঁটলে?
চন্দ্রচূড় হাসল, অতটা পথ বলতে খুব বেশি কিছু নয়, ওই কুড়ি- বাইশ গজ আর কী। কিন্তু সেটা ব্যাপার নয়, আসল কথা তোমাকে বলা হয়নি। খানিকটা হেঁটে এসে বনবিহারি রায়ের বাড়ির টিনের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যেতেই মাটির দিকে আমার চোখ আটকে গিয়েছিল। তাকিয়ে দেখি হলদে মতো কী একটা পড়ে আছে মাটিতে। বিকেলের হলদে রোদ এসে পড়েছিল জিনিসটার ওপর। নিচু হয়ে তাকাতে বুঝলাম ওটা হাড়ের ছোট্ট টুকরো। পশুপাখির হাড় ওটা নয়।
তটিনী বলল, তবে কী?
চন্দ্রচূড় বলল, সেটা নিয়েই তো আমার খটকা। আমি বনবিহারিকে জিগ্যেস করলাম। লোকটার দেখি কোনও তাপ-উত্তাপ হল না। খকখক কেশে ক্যাজুয়ালি বলল, ফুলকি পোষা কুকুরটাকে ছেড়ে দিয়েছে সেই ঘটনার পর। এখন কুকুরটা বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন। রাতের বেলা খরগোশ বা মেছো বেড়াল মেরে তার হাড়গোড় নিয়ে আসে। কিন্তু আমার গাট ফিলিং বলছে ওটা খরগোশ নয়, মানুষেরই হাড়ের টুকরো।
