রাত্রির কিনার দিয়ে

রাত্রির কিনার দিয়ে

এবার হুঁশ ফিরল আমার। চোখ কচলে তাকিয়ে দেখি সীসে রঙের তাতাসি নদী বয়ে চলেছে। নদী যেখানে বড় একটা বাঁক নিয়েছে সেখানে হাসনুহানার ঝোপের আড়ালে জোড়া ডুমুরগাছের দিকে তাকালাম। না, কিছু চোখে পড়ছে না তো। তবে এতক্ষণ ধরে যা দেখছিলাম তা কি ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন ছিল?

আমার শরীরটা অস্থির অস্থির করছে। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল। এবার ঘনিয়ে এসেছে কাছে। আমার দিকে তাকিয়ে থাকল খানিকক্ষণ। সন্দিগ্ধ গলায় বলল, মদের গন্ধ তো পাচ্ছি না। স্যার, আপনার কি শুকনো নেশা করার অভ্যেস আছে?

আমি এখনও ঘেঁটে আছি। থতমত খেয়ে নিজের মধ্যে ফিরে আসার চেষ্টা করছিলাম। ড্রাইভার হিন্দিতে বলল, রাত হয়েছে। এরপর মহিষবাথানে মাথা গোঁজার জায়গা পাওয়া যাবে না। ম্যাডাম, আপনি স্যারকে তাড়া দিন। এই জঙ্গল একটুও সেফ নয়। এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া যায় তত ভাল।

পারভিন আমার হাত ধরে টানছে। আমি ফিরে যাচ্ছি। তবুও ফিরে যেতে যেতে কী এক অমোঘ টানে মুখ ফেরালাম পেছনদিকে। মরা মাছের চোখের মতো চাঁদের ফ্যাকাসে আলো মেখে স্নান করা তাতাসি নদী, নদীর ওপাশে হাসনুহানা ঝোপের আড়ালে থাকা জোড়া ডুমুরগাছ আমাকে টানছে তীব্র এক আকর্ষণে। ঘাড় ঘুরিয়ে অসাবধানে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেলাম একবার। মুখ থুবড়ে পড়লাম। আবার উঠলাম সামলে নিয়ে।

আনিসের বাবা মনসুর আনসারি ফকির গোছের মানুষ। আনিস ও কি তার বাবার কাছ থেকে কিছু করণকৌশল আয়ত্ত করেছে? তিনদিনের মহাযোগ, রসরতি তত্ত্ব, রূপস্বরূপ তত্ত্ব—এসব কিছুই বাউল বা ফকিরদের রহস্যময় সাধনজগতের ব্যাপার। চন্দ্রসাধনের কথাও আবছা আবছা শুনেছিলাম আনিসের মুখে। সবই নাকি দেহযোগাত্মক সাধনা। রূপক প্রতীকের আড়ালে এখানে গোপন রাখা হয় সাধনতত্ত্বকে।

আনিস বলেছিল, এ এক বহুমাত্রিক ভাণ্ডার। কাম, প্রেম, সম্ভোগ, নিষ্কামী হওয়ার সাধনা, বিন্দুধারণের রহস্য, রজঃবীজের গতিপ্রকৃতি, রজঃস্রোতে মীনরূপে অধর মানুষের আবির্ভাব, শ্বাসপ্রশ্বাস বা হাওয়ার খেলা নিয়ন্ত্রণ—নাগরিক মানসিকতা দিয়ে এসবের তল খুঁজে পাওয়া যাবে না।

একটা শ্বাস ফেললাম। এই রহস্য রহস্যই থেকে যাবে। মানুষরতনের খোঁজে পথচলা একজন বাউল বা ফকিরের জীবন ফুরিয়ে যায়, কিন্তু পথ ফুরোয় না। আনিস আর জরি যেন সেই অনন্ত পথের যাত্রী। মনে মনে ভেবেই চলেছি কথাগুলো। সিরাজুল কি সত্যিই আত্মহত্যা করেছিল? নাকি তাকে কেউ খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ওই জোড়া ডুমুরগাছের ডালে? আমার কপালেও কি এমনই ভয়ানক কোনও মৃত্যু নাচছে? আমার জন্যও কি এমনই পরিণতি লিখে রেখেছে আমার ভাগ্যদেবতা?

জরির কথাগুলো মনে পড়ছে। সেই কেরামন আর কতেমিনের কথা। আমার পাপস্খলনের ভার, অনিশ্চিত ভবিতব্যের ভার এবার ফেরেশতার এই দূতের হাতে। তারাই ঠিক করে দেবে আমার আগামী। সিরাজুলের পর এবার আমাকেও শাস্তি পেতে হবে কি না তা ঠিক করবে তারা। সে কারণেই কি অলীক এক রাত্রির কিনার দিয়ে আমার নিয়তি আমাকে টেনে নিয়ে এসেছে তাতাসি নদীর ধারে?

মাথা কাজ করছে না ঠিক করে। তবে এটুকু অনুমান করতে পারছি, অনুশোচনার আগুনে পুড়তে পুড়তে আমি যতদিন বাঁচব ততদিন কেন্নোর মতো বাঁচব। বাঁচব ত্রাসে জড়োসড়ো হয়ে, ভয়ংকর এক মৃত্যুভয় বুকে নিয়ে। মৃত্যুর ধূসর মুখের প্রতীক্ষায়। যতদিন না আজরাইলের ডাক আসে।