অনন্ত রৌদ্রের অন্ধকার
এতদিন সংসারের খরচ টানতে জরি ঘুগনি বিক্রি করত, আব্বাকে গোর দিয়ে আসার পর জরির শুরু হল নতুন এক লড়াই। গ্রামের কয়েকজন ধানভর্তি বস্তা দিয়ে যেত। জরির আম্মি বড় কড়ায় খড়ের জ্বালে সেই ধান ভাপিয়ে নিতেন। দুদিন শুকোবার পর মাথায় করে জরি নিয়ে যেত রাইস মিলে। অনন্ত রৌদ্রের আড়ালে কখনও কখনও থাকে প্রগাঢ় অন্ধকার। যে জানে সে জানে। আব্বা চলে যাওয়ায় এবার সেই অচেনা অন্ধকারের মুখোমুখি হল জরি।
সংসার চালাতে তখন দিশেহারা ওদের পরিবার। ঘুগনির পাশাপাশি চানা, মুড়কি, নিমকিও বানাতে শুরু করলেন জরির আম্মি। মহল্লার লোক মুখ বেঁকিয়ে বলত, এমন ধিঙ্গি মেয়েকে কে নিকে করবে! জরির চোখ ভরে যেত জলে।
ওর আম্মি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, এসব লোকের কথা তুই গায়ে নিস না। মা, তুই জান দিয়ে পড়। তোকে জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
মহিষবাথানে দোকানপাট হাতে গোনা। সরকারি অফিস দুটো-একটা। লোকজন গরিবের থেকেও বেশি গরিব। টাকা নেই, শিক্ষা নেই, খাবার নেই। পুরুষগুলো সব একেবারে অপদার্থ। কেউ কোনও কাজ করতে চায় না। বেশিরভাগই মাতাল। খেটে মরে বাড়ির মেয়েরা। তারা মাঠে খাটে, বাড়িতে খাটে। তারাই বাচ্চা মানুষ করে। এত কিছুর পরও তারা পুরুষের মুখঝামটা খায় আর এলোপাথাড়ি মার খায়।
এর মধ্যে একদিন হল আর এক কাণ্ড। জরির মুখেই শুনছিলাম যে, ক’দিন ধরেই ওর মায়ের শরীরটা যুত ছিল না। বিছানা থেকে উঠতে পারেনি জরির আম্মি। এক কোবরেজ ওষুধ দিয়েছিল, সেই জড়িবুটি খেয়ে একটু নাকি ভালোও বোধ করছিল, কিন্তু সেদিন যে কী হল কে জানে, মাথায় রক্ত উঠে অজ্ঞান হয়ে গেল জরির আম্মি।
আমাদের অফিস টানা চারদিন ছুটি ছিল। জরি যখন ফোন করল তখন আমি আর আনিস দুজনই যে যার বাড়িতে। হর্ষ আর তরুণের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। ওরাও মহিষবাথানে নেই। ছুটিতে যে যার বাড়িতে গেছে।
প্রমাদ গুনলাম। দিন চারেক পরে আমার ফেরার কথা। আনিসেরও কিছু কাজ ছিল নদিয়ায়। ওদের বাড়ির চাল ফুটো হয়ে গিয়েছিল জায়গায় জায়গায়। সেসব ঠিকঠাক করানোর কাজ করাতে হতো। তাতে সপ্তাহ দুয়েক লাগার কথা। জরির ফোন পেয়ে আনিস চলে এল আগেভাগেই। মহিষবাথান পৌঁছে ঘরে ব্যাগপত্তর রেখেই ছুটলাম জরিদের বাড়িতে।
ঘরের দাওয়ায় একটা ছোট বেতের মোড়ায় জরি বসে ছিল শুকনো মুখে। আমাদের দেখে কেঁদে উঠল ফুঁপিয়ে। শুনলাম আত্মীয়দের হাতে পায়ে ধরেও অ্যালোপ্যাথি ডাক্তার ডাকতে পারেনি জরি। একরকম বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে ঘরের মধ্যেই মারা গিয়েছিল ওর আম্মি। গরিব মানুষের মৃত্যু যেমন হয়, তেমন করে চলে গিয়েছিল রুকসানা নামের সেই দুর্ভাগা মহিলা। সকলের অগোচরে, অনাদরে। জরির আম্মিকে গোর দিয়ে আসার সময়ও লোক ছিল না। হাতে গোনা জনা কয়েক লোকই শুধু গিয়েছিল সঙ্গে।
মাথার ওপর থেকে ছায়া সরে গেল। এবার সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ল জরির ওপর। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পড়ে সে। বাড়ি নিকোয়। পুকুরে যায়। বাসন মাজে পুকুরের জলে। বাড়ি ফিরে মাটির উনুনে খড় দিয়ে আগুন জ্বালায়। এক হাতে জ্বলন্ত খড় ধরে থাকতে হয়, অন্য হাতে হাতা নাড়ে। রান্না করার পর জোটে একটু অবসর। তার মধ্যেই পড়াশোনা। খানিক পড়ে নিয়ে আধঘণ্টা পায়ে হেঁটে কলেজ। কলেজ থেকে ফিরে আবার রাতের রান্না। তখন উনুনের পাশে পড়ার বই খোলা থাকে।
সন্ধ্যায় টিউশন পড়তে যেতে হয়। বাড়ি ফিরে হ্যারিকেনের আলোয় খাতা-বই খুলে আবার ঘণ্টাখানেক পড়ে। তারপর চোখ খুলে থাকতে পারে না। এতই ক্লান্ত থাকে, ঘুম জড়িয়ে ধরে তাকে। এক ঘুমে সকাল।
আব্বার বন্ধ হয়ে থাকা দর্জির দোকানটা জরি খুলতে চেয়েছিল। একজন ওস্তাগরের সঙ্গে কথাও হয়েছিল প্রাথমিকভাবে।
কিন্তু তার দুই চাচা আর চাচি তাকে সাফ সাফ জানিয়ে দিল, তার আব্বার দোকান যেহেতু পৈতৃক জমিতে তাই সেই দোকান এখন থেকে তাদের। সে মেয়ে। মেয়েদের আবার পৈতৃক জমিতে কীসের অধিকার? জরি চোখ মুছে বের হল ধারে কিছু পয়সা জোগাড় করতে। তা দিয়ে ফের আগের মতো ঘুগনি তৈরি করে বেচবে হাটে।
মহিষবাথান হাটে আমাদের সঙ্গে জরির প্রথম দেখা হয়েছিল। ও ঘুগনি বিক্রি করতে আসত হাটে। আলাপ থেকে ধীরে ধীরে দুজনের ভালোবাসা হল। প্রেমে পড়া মানুষ আকাশকুসুম ভাবে। ওরা দুজনও ভাবত। নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে বলাবলি করত, তাতাসি নদীর ধারে একটা ছোট বাড়ি বানাবে ওরা। সাদা রঙের কাঠের বাড়ি। সেখানেই থাকবে বাকি জীবন। আমি হেসে বলতাম, স্বপ্নেই যখন বিরিয়ানি রাঁধছ তখন আরও একটু ডেয়ারির ঘি দাও। দু’কামরার বাড়ি কেন বানাবে, আলিশান ইমারত বানাও। তাজমহলের মতো কিছু।
আনিস বাড়ি যেত কয়েক মাস বাদে বাদে। সেবার নদিয়া থেকে ঘুরে আসার পর দেখি আনিসের মুখ কালো। জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে? আনিস জানাল, ওর বাবার ফুসফুসের রোগ ধরা পড়েছে। এদিকে মানুষটা জীবনে কখনও বিড়ি সিগারেট খায়নি।
আনিসের বাবা আখড়ায় আখরায় গান গায়। কৃষিকাজ করত একসময় সেসব ছেড়ে দিয়েছে। রোজগারপাতি বলে কিছু নেই। মাইনের একটা বড় অংশ আনিসকে পাঠাতে হয় বাড়িতে। তখন ওর হাত একেবারে খালি। আনিসের বাবার চিকিৎসার জন্য আমি কিছু টাকা দিলাম। জানা গেল ক্যান্সার নয়, সিওপিডি হয়েছে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলল কিছুদিন, তবে প্রাণে বেঁচে গেল ওর বাবা।
আনিসের হাত একেবারে খালি। ও আমার থেকে টাকা নিল জরিকে দেবে বলে। সেই টাকা দিয়েই ধার করা জমিতে ধান চাষ করিয়েছিল জরি। ট্র্যাক্টর ভাড়া করে জমিতে লাঙল দিয়ে শ্যালোতে জল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। বীজধান কিনে এনেছিল মুসাফিরগঞ্জ থেকে। তারপর সেই ধান সেদ্ধ করে খড়ের গাদায় ঢুকিয়ে বের করেছিল অঙ্কুর।
শুধু কি তাই, কলাগাছ দিয়ে মাড়াই করে বীজ ছড়িয়েছিল জমিতে। গাছ বার হলে সেগুলো ভালো করে ধুয়ে লাঙল দিয়ে জমিতে পুঁতেই তার কাজ শেষ হয়নি। সার দেওয়া, ওষুধ দেওয়া, ধান কাটা, ঝাড়াই, ধানকলে নিয়ে যাওয়া—সব করেছিল একা হাতে।
কলেজে বলে কিছুদিন ছুটি নিয়েছিল মাঠের কাজ করতে। ফসল হওয়ার পর কিছু চাল বিক্রি করে, জমি-ট্র্যাক্টর ও শ্যালোর জলের ধার শোধ করেছিল। বাকি চাল বেচেনি। রেখে দিয়েছিল বাড়িতে। সারা বছর নিজেদের খাওয়ার চাল আর কিনতে হবে না। এর মধ্যেই ঘটল সেই ঘটনা।
জরির চাচি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, এই কাঁচা বয়সে এভাবে একা বাঁচতে পারবি না রে মেয়ে। তোকে ছিঁড়ে খাবে সকলে। আমার খোঁজে একজন ভালো পাত্র আছে। সিরাজুল নাম। অনেকরকম ব্যবসা। পার্টি করে। নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে ওঠাবসা আছে।
তুই মুসাফিরগঞ্জে গিয়েছিলি একটা শাদিতে, মনে আছে? সেখানে সিরাজুল তোকে দেখে মজে গেছে। এমন ফিদা হয়েছে, নিজে থেকে প্রস্তাব দিয়েছে তোকে নিকে করবে বলে। সিরাজুলের টাকার অভাব নেই। আমার কথা শোন মা, তুই না করিস না। রাজি হয়ে যা। তুই খুব সুখী হবি, দেখিস। আমি সব বন্দোবস্ত করে রাখছি। পরের সপ্তাহেই তোর নিকে দেব আমি।
সারাদিন ধরে কেঁদেছিল জরি। সন্ধেবেলা চোখভর্তি জল নিয়ে ছুটে এসেছিল আমাদের কাছে। আনিস থমথমে মুখে সব কথা শুনল। কিছু জামাকাপড় একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। একটা সাদা কাগজের ডানদিকে নীচে সই করে দিয়ে আমাকে বলল, এটা আমার ছুটির দরখাস্ত। তুমি ওপরে যা লেখার লিখে অফিসে জমা দিয়ে দিও। আমি সন্দিগ্ধ গলায় জিগ্যেস করলাম, কোথায় যাচ্ছ?
আনিস গলা নামিয়ে বলল, কথাটা পাঁচকান কোরো না। রামপুরের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই? বাংলা আসাম বর্ডারের কাছে ছোট এক জায়গা। আমার পিসির ছেলে হুমায়ূন রেলে চাকরি করে। রামপুরেই পোস্টেড। বিয়ে থা করেনি। থাকে রেল কোয়ার্টার্সে। তার ডেরাতেই আপাতত উঠব। কেউ যাতে লোকেশন ট্র্যাক করতে না পারে, এই ফোনের সিম ফেলে দেব। নতুন ফোন নম্বর নিয়ে তোমাকেই সবচাইতে আগে জানাব। এদিকে কী হচ্ছে না হচ্ছে তুমি আমাকে সব জানিও।
আমার বুক ঢিবঢিব করছিল। আনিসের হাত চেপে ধরে বললাম, তোমরা পালালে তুমুল গন্ডগোল হবে। আমাদের ওপরও তার আঁচ এসে পড়বে। সে নিয়ে অবশ্য ভাবি না। তবে তুমি যা করতে যাচ্ছ সেটা কতটা দুঃসাহসের কাজ সেটা বুঝতে পারছ নিশ্চয়ই? এর পরিণাম কী হতে পারে সেটা ভেবে দ্যাখো। পরে কিন্তু ফিরে আসার রাস্তা থাকবে না।
আনিস বলল, পুকুরে ঢিল পড়লে ঢেউ ওঠে। ধীরে ধীরে জল শান্ত হয়ে যায়। এই ব্যাপারটাও তেমনি। ক’দিন ঝড় বইবে। আবার শান্ত হয়ে যাবে সব। তুমি পরিস্থিতির ওপর নজর রেখো। স্বাভাবিক হলে আমাকে জানিও। আমরা ফিরে আসব মহিষবাথানে। তুমি দোয়া কোরো আমাদের জন্য। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, সাবধানে থেকো। দেখা হবে।
ওদের দু’জনের সঙ্গে সেই দেখা হল ঠিকই তবে পাক্কা দু’বছর পর। তাও এমন একটা পরিবেশে। এদিকে গত দু’বছরে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। আমি মহিষবাথান ফার্ম ছেড়ে অন্য একটা চাকরি নিয়ে চলে এসেছি কলকাতায়। এখানে মাইনে আগের থেকে বেশি।
পারভিনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট থেকে আমাদের আলাপ। কসবায় ওদের নিজস্ব দোতলা বাড়ি। পারভিন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া মেয়ে। বাবা পাটুলির ওদিকে একটা হাইস্কুলের হেডমাস্টার। পারভিনের মা-ও লেখাপড়া জানা। অনার্স গ্র্যাজুয়েট। ভালো ফ্যামিলি।
হানিমুনে আমরা দুজন গিয়েছিলাম রিকিসুম পাহাড়ে। একটা মহার্ঘ কটেজে ছিলাম। পাহাড়ে তখন জব্বর ঠান্ডা। রাতে ফায়ারপ্লেস জ্বালানো হয়েছিল। একটা স্কচের বোতল নিয়ে গিয়েছিলাম সঙ্গে করে।
সেই নেশাতুর রাতে পারভিনকে আরও অন্তরঙ্গভাবে জানলাম। উদগ্র ভালোবাসায় ভরিয়ে দিলাম পারভিনকে। আমার আদরে আশ্লিষ্ট হয়ে আমার বুকে-পিঠে নখ দিয়ে অজস্র আঁচড় কাটল পারভিন। পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বলল, কী সাংঘাতিক লোক গো তুমি! এ তো দেখছি ডাকাত!
আমি ওর নরম দুটো ঠোঁট নিজের ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে নিলাম। পারভিনের কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে বললাম, কেন? কী করেছি আমি?
পারভিন লাজুক গলায় বলল, তোমাকে দেখে মনে হয় ভালোমানুষ, ভাজা মাছ উলটে খেতে জানো না, কিন্তু তোমার পেটে যে এমন রাক্ষসের মতো খিদে সেটা বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না!
মহিষবাথানের কথা পারভিন জেনেছে আমার কাছে। আমার মুখে গল্প শুনে ওর শখ হয়েছে মহিষবাথানের জঙ্গল দেখার। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর অনুরোধ রাখা সব স্বামীর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমার সেটা করা হয়ে উঠছিল না নানা চাপের কারণে।
গত মাসে চেন্নাই গিয়েছিলাম একটা বিজনেস মিটিং অ্যাটেন্ড করতে। সেসব ঝামেলা মিটিয়ে কলকাতা ফেরার পর মনে হল, মহিষবাথান যদি যেতেই হয় তবে এটাই হল হাই-টাইম। পারভিন এখন প্রেগন্যান্ট। এরপর ওর পক্ষে এতটা জার্নি করা সম্ভব হবে না।
