কুয়াশায় যাত্রা সকলের

কুয়াশায় যাত্রা সকলের

মহিষবাথানে যখন ছিলাম সে সময় এই জঙ্গল টুরিস্টদের কাছে পরিচিত জায়গা ছিল না। এই সৌন্দর্যখনির নাম ভ্রমণবিলাসী মানুষের কাছে তখনও পৌঁছয়নি সেভাবে। তাছাড়া টুরিস্ট আসবে কী, মাথা গোঁজার মতো আস্তানাই তো ছিল না!

ইদানীং শুনছিলাম দু-চারটে সরকারি লজ আর কটেজ তৈরি হয়েছে এদিকে। বেসরকারি উদ্যোগে হোমস্টে সার্ভিস চালু হয়েছে কিছু। ফলে ঢল না নামলেও টুকটুক করে আসতে শুরু করেছে পর্যটকরাও। কোনও ট্র্যাভেল ম্যাগাজিনে এই জায়গাটার কথা লেখা হয়েছিল। সেই বর্ণনা পরে পারভিন আমার কাছে বায়না করেছিল, চলো, তোমার পুরনো কাজের জায়গাটা একবার দেখে আসি। এখনও এই জঙ্গল ভার্জিন আছে। দু-এক বছরের মধ্যে দেখবে লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে। তখন আর ভালো লাগবে না।

আমি পারভিনকে আদর করতে করতে বলেছিলাম, জো হুকুম মেরি জান।

বর্ষাকাল হল পশুপাখিদের মেটিং সিজন। জুনের পনেরো তারিখ থেকে জঙ্গলের দরজা বন্ধ থাকে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি খোলে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহেই যাওয়া স্থির করলাম। ইন্টারনেট ঘেঁটে কোনও রিসর্ট খালি পাওয়া গেল না। সবই দেখি বুকড।

তবুও জরুর আবদার বলে কথা, প্রিমিয়াম তৎকালে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম। এটুকু ভরসা ছিল, একবার গিয়ে পড়লে মাথা গোঁজার ঠাই একটা ঠিকই জুটে যাবে।

শিয়ালদা থেকে ভোরবেলার ট্রেনে চেপে মহিষবাথানে যখন এসে পৌঁছলাম তখন বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। সন্ধে নামছে ধীর পায়ে। আশ্বিন মাস। শীত পড়তে ঢের দেরি। অথচ স্টেশনে নেমে দেখি সূক্ষ্ম সাদা জরির মতো কুয়াশা বিছিয়ে আছে গোটা চৌহদ্দি জুড়ে। এমন অদ্ভুত আশ্বিন আগে কখনও দেখিনি।

জঙ্গলের প্রান্ত ছুঁয়ে নির্জন রেল স্টেশন। দু-চারজন স্টাফ। হাতে গোনা কিছু যাত্রী নামল স্টেশনে। সঙ্গে লাগেজ নেই কারওর। চেহারা আর শরীরী ভাষা দেখে মনে হয় সকলেই স্থানীয় মানুষ। সকলেই ঝাড়া হাত-পা। দু-একজনের সঙ্গে একটা ঝোলা, কিংবা ছোট ফোলিও ব্যাগ। হন্তদন্ত হয়ে যাত্রীরা হাঁটা দিল বাইরের দিকে। গেটের কাছে সাদা পোশাক পরা একজন টিকিট চেক করছে। আমি আর পারভিন নিজেদের টিকিট দেখিয়ে বেরোলাম বাইরে।

স্টেশনের বাইরে দু-তিনটে অটোরিকশা ছিল। আমরা পৌঁছবার আগেই যাত্রী নিয়ে সেসব বেরিয়ে গেল ধোঁয়া উড়িয়ে। এই স্টেশন থেকেই যাতায়াত করতাম একটা সময়। তখন স্টেশনের বাইরে পায়ে টানা রিকশা থাকে দেখেছি। এবার এসে একটাও রিকশা পেলাম না।

স্টেশন চত্বরের একটু বাইরে দেখি একটা হলদে ট্যাক্সি দাঁড়ানো। মাঝবয়সি একজন লোক ড্রাইভিং সিটে বসে বিড়িতে সুখটান দিচ্ছে। কাছে গিয়ে বললাম, কোনও লজ বা হোটেল কিছু আছে আপনার চেনা?

সিরিঙ্গে চেহারার লোকটা মুখ ফেরাল। টকটকে লাল দুটো চোখ। আমাদের দেখে এক টুসকিতে বিড়িটা ফেলে দিয়ে ঘষঘষে গলায় বলল, আইয়ে, বৈঠ যাইয়ে।

পারভিন ফিসফিস করে বলল, লোকটা গলা অবধি মদ খেয়ে আছে। চাউনিও সুবিধের ঠেকছে না। আমি এই মাতাল ড্রাইভারের গাড়িতে উঠব না।

লোকটার মুখে সস্তার হুইস্কির গন্ধ আমিও পেয়েছি। আমি নিচু গলায় বললাম, আর তো কোনও গাড়ি দেখছি না। এখান থেকে লোকালিটি চার কিলোমিটা দূরে। অতটা পথ তো আর পায়ে হেঁটে যাওয়া যাবে না। কিছু করার নেই। এটা ছোট স্টেশন। হাতে গোনা দু-চারটে ট্রেনই শুধু দাঁড়ায়।

কাল ভোররাতের আগে কোনও ট্রেন এই স্টেশনে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না। কাজেই এখন কোনও অটোরিকশা কিংবা ট্যাক্সি এই স্টেশনে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে ভয়ের কিছু নেই। এ আমার চেনা জায়গা। চলো, গাড়িতে উঠি। যা হবে, দেখা যাবে।

দুজন গাড়ির পেছনের সিটে উঠলাম। ড্রাইভার আমাদের ট্রলিব্যাগ গাড়ির ডিকিতে রেখে এল। নিজের সিটে বসে লুকিং গ্লাসে দেখে নিল আমাদের। আমার কেন যেন মনে হল লোকটার মুখে ফুটে উঠল একটা দুয়ে হাসি। ইগনিশনে চাবি ঢোকাল। স্টার্ট দিল গাড়ি। একটা হিক্কা তুলে ট্যাক্সি চলতে শুরু করল। আমি বললাম, একটা ব্যাপার দেখে অবাক হলাম। একসময় এখানে চাকরিসূত্রে থাকতাম। আশ্বিন মাসের সন্ধেবেলায় কখনও কুয়াশা পড়তে দেখিনি।

ড্রাইভার মুখ ফিরিয়ে হিন্দিতে একটা ফিল্মি ডায়লগ দিল। তার মর্মার্থ হল, কুয়াশাতেই তো যাত্রা সকলের। আমি পারভিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললাম, শুধু মদ নয়, আমার মনে হয় গাঁজার ছিলিমেও আসক্তি আছে আমাদের গাড়ির সারথির। নইলে এত গভীর দর্শনের কথা বেরোত না মুখ দিয়ে।

যখন চাকরি করতাম তখন পুরো এলাকাটা চেনা ছিল হাতের তালুর মতো। দু-বছর বাদে দেখতে পাচ্ছি অনেক কিছুই বদলে গেছে। রাস্তা চওড়া হয়েছে। স্ট্রিটলাইট বসেছে রাস্তায় রাস্তায়। হাই মাস্টও চোখে পড়ল একটা। জলাজমি বুজিয়ে তার ওপর বিল্ডিং গজিয়েছে অনেক। পারভিন বলল, শান্তিনিকেতনের মতো কলকাতার বহু বাঙালি এদিকেও হয়তো একটা করে বাড়ি বানিয়ে রেখেছে ছুটিছাটায় এসে ক’টা দিন কাটিয়ে যাবে বলে।

স্টেশন থেকে একটা রাস্তা চলে গেছে মহিষবাথান জনপদের দিকে। অন্য সড়ক দিয়ে গেলে প্রথমে আসে তাতাসি সেতু। একশো মিটারের মতো লম্বা তাতাসি ব্রিজ ডিঙিয়ে রাস্তাটা সটান চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। ঘন জঙ্গলের ওপারে আসাম। আর একদিকে ভুটানের অরণ্য। চিতাবাঘ, হাতি, বাইসন, সম্বর নাকি ঘুরে বেড়ায় নির্ভয়ে।

একসময় জঙ্গিদের ঘাঁটিও ছিল শুনেছি। এখন তাদের দাপাদাপির কথা কাগজে আর পড়ি না বটে, কিন্তু নতুন কোনও জঙ্গি সংগঠন তৈরি হয়েছে কি না সেটাও তো ভালো করে জানি না। আমাদের ফার্ম যেদিকে সেই চেনা রুট নয়, ট্যাক্সি ড্রাইভার ধরল অন্য রাস্তা। আমি বললাম, এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? এদিকে তো জঙ্গল!

গাড়ির চালক গাড়িটার গতি ঢিমে করল। মুখ ফিরিয়ে হিন্দিতে বলল, যে লজটায় আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি সেটা জঙ্গলের কোর এরিয়া যেখান থেকে শুরু হচ্ছে, সেখানে। তাতাসি নদীর ধারে। রান্নাবান্না ভালো, এসি আছে, খরচও বেশি নয়। খুব সুন্দর ভিউ। আপনাদের পছন্দ হবে।

লোকটার নিঃশ্বাস থেকে ভকভক করে বেরিয়ে আসছিল সস্তার মদের গন্ধ। পারভিন আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, হোমস্টে থেকে এই লোকটার কমিশনের ব্যাপার আছে নির্ঘাত। সেজন্যই এত উৎসাহ। তুমি অন্য কোথাও চলো। তাছাড়া এই লোকটার হাবভাব যেন কেমন। চোর ছ্যাঁচোড় কি না কে জানে! আমার ভালো লাগছে না একটুও।

আমি পারভিনকে অভয় দিয়ে বললাম, অত টেনশন নিচ্ছ কেন? আগে গিয়ে দেখিই না লজটা। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। ভালো লাগলে থেকে যাব। পছন্দ না হলে অন্য লজে চলে যাব। অসুবিধের কিছু নেই।

ইতিউতি বাড়িঘর চেনা পড়ছিল একটু আগেও। এবার আরও নির্জন এলাকায় চলে এলাম আমরা। একটু আগেও বৃষ্টি হচ্ছিল। পথঘাট ভেজা। গাড়িটা দিব্যি চলছিল এতক্ষণ, এবার মৃত্যুপথযাত্রী রুগির মতো হিক্কা তুলতে শুরু করল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে শেষ অবধি দাঁড়িয়ে পড়ল একসময়। ড্রাইভার ইগনিশনের চাবি ঘুরিয়ে যতই স্টার্ট দেবার চেষ্টা করে কিছুতেই কিছু হয় না। পারভিন আতঙ্কিত গলায় বলল, কী হল ড্রাইভার সাহেব?

ড্রাইভারের কপালে ভাঁজ। নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। গাড়ির বনেট খুলে কী সব দেখে-টেখে ভুরু কুঁচকে বলল, ফ্যানবেল্টের সমস্যা। একটু রেস্ট পেলেই গাড়ি স্টার্ট নেবে। আমি গলায় বিরক্তি মিশিয়ে বললাম, একবার স্টার্ট নিলে আবার বন্ধ হবে না তো?

ড্রাইভার নির্লিপ্ত গলায় বলল, মানুষেরই জীবনের গ্যারান্টি নেই, গাড়ির কী করে থাকবে? খানিক চলার পর হয়তো আবার বন্ধ হয়ে যাবে। তেমন হলে না হয় আবার একটু থামতে হবে। রেস্ট পেলেই আবার স্টার্ট নেবে গাড়ি। এভাবেই জঙ্গলের রাস্তাটা পার করতে হবে।

পারভিন বলল, গ্যারাজ নেই আশেপাশে?

ড্রাইভার হিন্দিতে বলল, জঙ্গলের মধ্যে গ্যারাজ কী করে পাবেন। লোকালয় অবধি না যেতে পারলে গ্যারাজ পাওয়া যাবে না। গাড়িটার মেরামতির কাজও করা যাবে না। তবে এখন সন্ধে নেমেছে। মহিষবাথান গ্রাম্য জায়গা। এই অবেলায় গ্যারাজ খোলা পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে।

পারভিন কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে বসে রইল। আমি দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভেঙে একটা সিগারেট ধরালাম। মোবাইল বার করে দেখি নেটওয়ার্ক কভারেজ নেই। আশ্বিন মাস। কিন্তু এখনও বর্ষা বিদায় নেয়নি মহিষবাথান থেকে। আকাশে মেঘ আছে। ভেজা ভেজা হাওয়া। আশেপাশে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে হয়তো।

ফোনটা পকেটে পুরে এগোতে লাগলাম উদ্দেশ্যহীনভাবে। সন্ধে নেমে এসেছে নরম পায়ে। মেঘের ফাঁক দিয়ে রোগা চাঁদ উঠেছে আকাশে। বিশাল বিশাল গাছগাছালি দাঁড়িয়ে আছে থম মেরে। তার আড়ালে আভাস পাওয়া যাচ্ছে তাতাসি নদীটার।

রাস্তার অন্যদিকে ঘন অরণ্য। যখন মহিষবাথানে থাকতাম তখন শুনতাম প্রায়ই হাতি বেরোত জঙ্গল থেকে। লেপার্ড আছে। বাইসনও অমিল নয়। শ্বদন্ত বের করে আরও কত যে জীবজন্তু জঙ্গলের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে। নিজেরা বিরক্ত না হলে বা ভয় না পেলে তারা খামোখা আমাদের আক্রমণ করবে না।

কিন্তু সেসব স্তোকবাক্য নিজেকে শুনিয়েও ভেতরের ভয় ভয় ভাবটা গেল না। বড় করে শ্বাস নিলাম। কী নিস্তব্ধ নির্জন এই জায়গাটা! চিকরাশি, ওদাল, শাল, সেগুনের জঙ্গল থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে। ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো তাতাসি নদীটা বাঁক নিয়েছে একটা জায়গায়।

হঠাৎ ঘন গাছপালার আড়ালে দেখি চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা কাঠের বাড়ি। মেঘছেঁড়া ক্ষয়াটে চাঁদের আলো এসে পড়েছে বাড়িটার ওপর। এ তো মনে হচ্ছে শিরীষ কাঠ। কালো নয়, মহার্ঘ সাদা শিরীষ।

আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম সবিস্ময়ে। ছোট্ট এমন সুন্দর একটা বাড়ি কে বানাল এই জঙ্গলের মধ্যে। ওপরে লাল টালির চাল। একটেরে বারান্দা। এগিয়ে গেলাম আরও কয়েক পা। তাকিয়ে দেখি ধবধবে সাদা পাজামা আর সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন বসা বেতের চেয়ারে। চোখে চশমা। আমার পায়ের শব্দ শুনে মানুষটা মুখ তুলে তাকাল। আমার চক্ষুস্থির। এ যে আনিস!

আনিসও আমার মতোই অবাক হয়েছে। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে বলল, আরে জাফর, তুমি! এখানে?

আমি হতচকিত। চোখ কচলানোটাই শুধু বাকি। আনিস ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ভেতরের দিকে মুখ করে হাঁক দিয়ে বলল, জরি! অ্যাই জরি, শুনতে পাচ্ছ?

ভেতর থেকে কোনও মহিলার গলা ভেসে এল। কেউ বলল, কী হল? ডাকছ কেন?

আমার বিস্ময় মাত্রা ছাড়াচ্ছিল। বুকের ভেতরের ধকধক শব্দ বেড়ে গেল যেন। কী আশ্চর্য, এ তো জরির গলা। আনিস উত্তেজিত হয়ে বলল, শিগগির বাইরে এসো। দেখে যাও কে এসেছে!