৯
ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিল অমিয়। তার মনে হচ্ছিল হাঁটু দুটো খুলে পড়ে যাবে। শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তি অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। গতকাল রাত থেকে তার সবটা এলোমেলো হয়ে গেছে। যেন একটা ঘূর্ণিঝড় এসে তছনছ করে দিয়েছে সাজানো বাগান। গতকাল যা হয়েছে অমিয় মনেপ্রাণে সেটাকে অস্বীকার করতে চাইছে কিন্তু অস্বীকার করতে চাইলেই কি আর তা হয়? অমিয়র সারা শরীরে জোঁকের মতো লেপটে থাকা দাঁতের দাগ প্রতি মুহূর্তে তাকে জানান দিচ্ছে, সে অন্যায় করেছে। ভয়ানক এক অন্যায়। একই সঙ্গে সে মিতুল এবং পল্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যে বিশ্বাসঘাতকতার কোনও ক্ষমা হয় না। পল্লবের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না বলেই আজ সে ভোর থাকতে থাকতে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। পল্লবকে ফোনে জানিয়েছিল, ব্যারাকপুর রোডে ঝামেলা হচ্ছে। পুলিশ ক্যাম্প বসেছে। সেখানেই দু’তিনদিন থাকতে হবে। মিতুলকে যদিও সে অন্য কথা বলেছে। বলেছে, এক মাসি অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেখানেই যাচ্ছে। মিতুলকে অন্য কথা বলতে হয়েছে কারণ মিতুলের বাবা দীপক পাল অমিয়র অধস্তন। মিতুল চাইলে সহজেই তার বাবার থেকে পুলিশি ঝামেলার সত্যতা যাচাই করতে পারবে। সে রিস্ক অমিয় নেয়নি। মিতুল বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। ফোন ধরেনি অমিয়। বারবার সে মিতুলকে মিথ্যে বলতে পারবে না। মেসেজ করে দিয়েছিল, ফ্রি হলে ফোন করব। চিন্তা কোরো না। ফিরে দেখা করব।
অমিয় আজ অফিসেও যায়নি। দীপক পালকে জানিয়ে দিয়েছে, মাসি অসুস্থ। আসলে এই দু’-তিনদিন সময়টা নেওয়া খুব দরকার ছিল। যত দিন না তার সারা গা থেকে তিতাসের দাঁতের দাগ মুছে যাচ্ছে ততদিন সে কোন মুখে লোকজনের, বিশেষ করে মিতুলের সামনে যাবে? মিতুল যদি জিগ্যেস করে, এগুলো কিসের দাগ? কী উত্তর দেবে সে?
কমবয়সে কলেজে পড়তে এই লাভবাইট বা হিকি নিয়ে একটা রসিকতা প্রচলিত ছিল। একটি মেয়ে একদিন ঘাড়-গলা ভর্তি হিকি নিয়ে বাড়ি ফিরল। মা চমকে উঠলেন মেয়ের গলার কালশিটে দেখে। চিন্তিত হয়ে বললেন, এগুলো কিসের দাগ? মেয়ে কী বলবে আগেই বন্ধুদের থেকে জেনে নিয়েছিল। স্মার্টলি বলল, পোকায় চেটে দিয়েছে। শুনে মা একটু গম্ভীর থেকে বললেন, তাই হবে। আমাকেও বিয়ের পর খুব পোকায় চাটত। পোকাটাকে অবিকল তোর বাবার মতো দেখতে ছিল। তা তোর এই পোকাটিকে কেমন দেখতে?
মিতুল এই গল্পের মায়ের মতো স্মার্ট নয়। আর হলেও অমিয় যদি বলে পোকায় চেটে দিয়েছে, সে হয়তো অবিশ্বাস করবে না। কিন্তু এত বড় মিথ্যেটা সে মিতুলকে কীভাবে বলবে? সে তো কিছুতেই বলতে পারবে না, এই পোকার বাস তার মনের গোপনে। বহু বছর ধরে সে এই পোকাটাকে লালন করছিল। গতকাল ছিদ্র পাওয়া মাত্র এই কীট বাইরে বেরিয়ে এসেছে এবং তাকে দংশন করেছে। দাগ হয়তো মিলিয়ে যাবে সময়ের নিয়মে কিন্তু এই কদর্য ঘুণপোকাটি অমিয়র অন্তরে যে গরল ঢেলে দিল তার জ্বালা কি কোনওদিন জুড়োবে? মনে হয় না।
এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অমিয়। চাবি ঘুরিয়ে খুলে ফেলল দরজা। এ বাড়ির দুটো চাবি। একটা অমিয় সবসময় নিজের কাছে রাখে। আর একটা থাকে ঘরে। পল্লবদের সেই চাবিটা লাগিয়েই সিকিউরিটির কাছে দিয়ে যাওয়ার কথা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সিকিউরিটি কিছু বলবে বলে ছুটে এসেছিল। সম্ভবত চাবিটাই ফেরত দিতে এসেছিল। কিন্তু অমিয়র আজ কথা বলার মুড নেই। তাই সে হাত নেড়ে সিকিউরিটিকে নিবৃত্ত করেছে। চাবিটা পরে ফেরত নিলেও চলবে। শরীর যেন আর চলছে না। একেবারে স্নান করে শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকবে। আসার পথে দুটো ঘুমের ওষুধ কিনে এনেছে। সে দুটো খেয়ে শুয়ে পড়বে। এখন তার পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। একমাত্র নিবিড় ঘুমই পারে দুঃস্বপ্নকে ভুলিয়ে দিতে। লিভিং রুমে দাঁড়িয়েই জামাকাপড় খুলে ফেলল অমিয়। তার পর ঢুকে গেল বাথরুমে। স্নায়ুগুলি দুর্বল থাকায় সে খেয়াল করল না, ঘরের বাতাসে একটা মৃদু সুগন্ধ ভাসছে।
স্নান সেরে তোয়ালেটা কোমরে জড়িয়ে শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল অমিয়। ঘর অন্ধকার। অভ্যস্ত আঙুল লাইটের সুইচে চাপ দিল। আলো জ্বলে উঠল আর সেই আলোতে অমিয় যা দেখল তাতে তার অন্তরাত্মা অবধি শিউরে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য অমিয়র মনে হল সে যা দেখছে চোখের ভুল। হ্যালুসিনেশন। কিন্তু সে ভুল ভাঙতেই অমিয় ভয় পেল। অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে তার মাথা ঘুরতে লাগল। গা গুলিয়ে উঠল। এমন শরীর অসাড় করে দেওয়া ভয় জীবনে সে কোনওদিন পায়নি। সে দেখল, খাটে বসে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে মিতুল।
