৪
খুব রোদ উঠেছে আজ। কুলকুল করে ঘাম হচ্ছে। বগলের কাছটায় একটা ফোঁড়া হয়েছে। ঘামে ঘামে আরও চেটকে যাচ্ছে সেটা। ভেপসে উঠছে। খুব টাটাচ্ছে জায়গাটা। একটা হাত তাই মাথার ওপর তুলে রেখে এক হাতে ছাতু মাখছিল লোকনাথ। সানকিটার তলায় টেপ্পোল খেয়ে গেছে। ঠিকমতো বসছে না মাটির ওপর। নড়বড় নড়বড় করছে। ছাতু মাখতে গেলেই পিছলে সরে যাচ্ছে। রাগ ধরে গেল লোকনাথের। ধুত্তেরি, এভাবে খাওয়া যায়? ছেলেটা এখনও আসছে না কেন কে জানে! এতক্ষণে তো কাজ হয়ে যাওয়ার কথা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকনাথ। তার পর আধমাখা ছাতুর সানকিটাকে একপাশে সরিয়ে হাত ধুয়ে ফেলল। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল চৌকিতে। ফাটিয়ে দিতে চাইলে ফোঁড়াটা ফাটিয়েই দেওয়া যায় কিন্তু ইচ্ছে করেই সেটা করেনি লোকনাথ। এসব ধরনের বিপজ্জনক কাজের আগে ঘা, ফোঁড়া এগুলো হওয়া ভালো লক্ষণ। ব্যথা যত টাটিয়ে উঠবে তত বেশি করে মনে পড়ে যাবে, বাকি আছে। এখনও কাজ বাকি আছে।
ঘরের এক কোণে যেন ছোটদের ঝুলন সাজানো হয়েছে। ইটের টুকরোয় লাল সুতো বেঁধে ঘের দেওয়া হয়েছে কিছুটা জায়গা। তার ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বালি। যেন একটা ছোট্ট বালিয়াড়ি। মাঝখানটায় বালি দিয়েই একটা ঢিপি মতো করা হয়েছে। তার ওপর পুঁতে দেওয়া হয়েছে একটা তিরকাঠি। কাঠিটার সারা গায়ে লাল সুতো জড়ানো। বালির ঢিপিটার ঠিক সামনে খেজুর পাতায় বোনা একটা ছোট্ট চাটাই। তার ওপর রাখা একটা আটার মণ্ড আর সেই মণ্ডটার গায়ে চিপকানো খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া একটা ছবি। ছবিটা তিতাসের। চোখের পলক না ফেলে সেদিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার এত বছরের সাধনা এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিয়েছে এই মেয়েটা। সিদ্ধির দোরগোড়া থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে তাকে। কিন্তু ও জানে না, লোকনাথ চক্কোত্তির জন্মই হয়েছে সাধনা করার জন্য। লোকনাথ জন্ম সাধক। এত বছর ধরে যার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা তো সে শেষ করবেই কিন্তু তার আগে পুড়িয়ে মারবে এই মেয়েটাকে। মেয়েটা কল্পনাও করতে পারবে না লোকনাথের প্রতিহিংসা কী সাংঘাতিক!
এখনও চোখ বুজলেই লোকনাথকে তাড়া করে বেড়ায় সেই দৃশ্যটা। মিতুলকে স্পর্শ করতে গিয়ে অসহায় গেনু ছিটকে পড়েছে দূরে। বুক মুচড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে লোকনাথের। গেনুকে ওরা শেষ করে ফেলেছে। গেনু নেই। গেনু আর আসবে না। কতগুলো বছর গেনু তার সঙ্গে ছিল। কত স্মৃতি গেনুর সঙ্গে। গেনুকে পোষ মানানো সহজ কাজ ছিল না। পোষ মানার আগে গেনু তার দুটো আঙুল খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু পোষ মানার পর গেনু হয়ে উঠেছিল তার অনুগত সহচর। এক মুহূর্তের জন্য গেনু তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেনি কোনও দিন। সেই গেনুকে ওরা…
প্রথম প্রথম ক্রোধে অসহায় হয়ে যেত লোকনাথ। সে শক্তিহীন, সে পঙ্গু। পরাজিত সৈনিকের মতো নিষ্ফল আক্রোশে নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত করত প্রতিনিয়ত। বিছানায় শুয়ে কাঁদত দিনরাত। সে সময় খুব সেবাযত্ন করেছিল সুদেব আর তার বউ। ওরাই তো ভাঙা কোমর জোড়াতালি দিয়ে খাড়া করে দাঁড় করাল লোকনাথকে। লোকনাথের শুধু মনে পড়ে আচমকা একটা গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা মেরেছিল খুব জোরে। বাকিটা অন্ধকার। জ্ঞান ফিরেছিল একটা ঝুপড়ির মধ্যে। পরে সুদেবের কাছে শুনেছিল সবটা।
সুদেব ভেড়িতে যেত মাছ চুরি করতে। সেই প্রথম লোকনাথকে পড়ে থাকতে দেখেছিল। নাড়ি ধরে চমকে উঠেছিল, প্রাণটা এখনও ধুকধুক করছে। লোকনাথ অবশ্য জানত, সে এত সহজে মরবে না। লোকনাথের অসামান্য মেধা দেখে ভাদুড়ি মশায় একবার তার কুষ্ঠি বিচার করতে চেয়েছিলেন। লোকনাথেরও জানার ইচ্ছে ছিল তার কুষ্ঠিতে কী আছে, কেন সে এমন সৃষ্টিছাড়া? তদ্দিনে অবশ্য ভাদুড়ি বুড়োর থেকে তার যা নেওয়ার ছিল নেওয়া হয়ে গেছে। তাই কুষ্ঠি বিচারে যদি এদিক-ওদিক কিছু বেরোত, লোকনাথ ভেবেই রেখেছিল, সে পালাবে। কিন্তু কুষ্ঠি বিচার করে অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। বলেছিলেন, লোকনাথ তুই ক্ষণজন্মা। তুই প্রায় অমর।
চমকে উঠেছিল লোকনাথ, অমর? সে কীরকম গুরুদেব? অমর তো দেবতারা হয় শুনেছি। আমি তো দেবতা নই। সামান্য মনিষ্যি।
একটু চুপ করে থেকে ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তুই বোধ হয় ‘প্রায়’ শব্দটা খেয়াল করিসনি। আমি বলেছি, প্রায় অমর।
দয়া করে বুঝিয়ে বলুন গুরুদেব।
কপালে ভাঁজ পড়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের। বলেছিলেন, দেবতারা ছাড়াও আরও কেউ কেউ অমরত্ব প্রাপ্ত হত। সে তাদের সাধনালব্ধ ফল। তারা অসুর। পুরাণ ঘাঁটলে এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ পাবি যেখানে তপস্যা করে অসুরেরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করে অমরত্বের বর লাভ করেছে। কিন্তু দেবতারা চাইতেন না তাঁরা ছাড়া আর কেউ অমর হোক। তা হলে সৃষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাই তাঁরা সেই বরে ছোট্ট একটা ফাঁক রেখে দিতেন।
যেমন মহিষাসুর অমরত্ব চাওয়াতে বর পেয়েছিল যে কোনও ব্যাটাছেলে তাকে মারতে পারবে না তাই তো?
ঠিক। মহিষাসুর ভাবতেই পারেনি যে কোনও নারী তার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে পারে। ওইটুকু ফাঁক ছিল বরের মধ্যে। তোর পূর্বজন্ম রহস্যাবৃত। আমি তা ভেদ করতে পারিনি। তবে এটুকু বুঝেছি, পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফলে তুই এ জন্মে বরপ্রাপ্ত হয়েই জন্মেছিস। তোর মৃত্যু বিস্ময়কর এবং অভূতপূর্ব। মানে এমন মৃত্যু যা আগে কখনও ঘটেনি। কেউ দেখেনি। কালে কালে তুই অমিত শক্তিধর হবি লোকনাথ কিন্তু…
কিন্তু?
দুটো সম্ভাবনাই আছে। তুই দেবতাও হতে পারিস। অসুরও হতে পারিস। অসুর হওয়া সোজা। দেবতা হতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তুই আমার উজ্জ্বলতম ছাত্র, আমি আশা করব তুই পরিশ্রমের পথটাই বেছে নিবি।
মনে মনে খিক খিক করে হেসেছিল লোকনাথ। হায় রে ভাদুড়ি বুড়ো! বুড়ো জানত না, লোকনাথ তদ্দিনে অসুর হয়ে উঠেছে। দেবতা হওয়া খুব পানসে। পানসে জিনিস লোকনাথের ভালো লাগে না। তাই গাড়িটা যখন লোকনাথের ওপর আছড়ে পড়েছিল তখন জ্ঞান হারাতে হারাতে লোকনাথ একটাই কথা ভেবেছিল, এত সহজে সে মরবে না। গাড়ির ধাক্কায় তো আকছার লোক মরে। আর যাই হোক একে অভূতপূর্ব মৃত্যু বলা যায় না।
অন্য কাউকে পড়ে থাকতে দেখলে সুদেব তুলে আনত কি না বলা মুশকিল কিন্তু সেদিন লোকনাথের রক্তাম্বর তার সহায় হয়েছিল। সাধু সন্নিসিতে খুব ভক্তি সুদেব আর সুদেবের বউ পম্পির। ভ্যানে করে তারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার বলেছিলেন, ওরে হাসপাতালে নিয়ে যা। পেশেন্টের অবস্থা ভালো না।
হাত জোড় করে সুদেব বলেছিল, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো পয়সা বা সময় কোনওটাই নেই ডাক্তারবাবু। এখানেই যা পারুন করুন। যা হওয়ার হবে।
ডাক্তার বলেছিলেন, পেশেন্ট কে হয় তোর?
সুদেব কিছু বলার আগেই পম্পি বলে উঠেছিল, আমার বাবা।
একটা অচেনা অজানা লোকের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তাকে নিজের বাবার জায়গা দিয়ে দেবে অতটাও পরোপকারী পম্পি নয়। লোকনাথকে বাঁচিয়ে তোলার পেছনে তার স্বার্থ ছিল। খুবই বড় স্বার্থ। আসলে সুদেব আর পম্পির দুই ছেলেমেয়ে। ছেলেটার বয়স দশ। মেয়েটা পাঁচ বছরের ছোট। প্রথম যখন পেটে বাচ্চা এল পম্পি আর সুদেব ঠাকুরের কাছে খুব করে প্রার্থনা করেছিল যাতে সুস্থ সবল ছেলে হয়। হেন মন্দির নেই যাতে হত্যে দেয়নি। ঠাকুর ওদের কথা শুনেছিলেন ঠিকই কিন্তু অতিরিক্ত হত্যে দেওয়ার পরিশ্রমে কিছু একটা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল। তাই ছেলেটা হল হাবাগোবা। গন্নাকাটা। ঠাকুর দেবতা ছেড়ে পম্পি এবার পাকড়াও করল সাধু আর জ্যোতিষীদের। তাগা তাবিজ মাদুলি আর আংটিতে প্রায় ঢেকে ফেলল ছেলেটাকে। তা এই করে দশ বছর কেটে গেল, ছেলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হল না। পম্পি আর সুদেব প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল এমন সময় টিভিতে এক জ্যোতিষীর দেখা পেল তারা যিনি না কি চুটকিতে ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। যাকে টিভিতে দেখায় সে তো আর এলিতেলি কেউ না অতএব ছেলেকে নিয়ে সেই জ্যোতি¡ীর কাছে ছুটল পম্পি আর সুদেব। ছেলের হাত দেখে জ্যোতিষীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, খুব শিগগিরই এক দিব্যপুরুষের সংস্পর্শে আসবে এই ছেলে এবং সেই দিব্যপুরুষের আশীর্বাদেই সে সেরে উঠবে। ভক্তিবিহ্বল হয়ে জ্যোতিষীকে হাজার টাকা দক্ষিণা দিল সুদেব আর তাঁর পরামর্শেই জমানো টাকা প্রায় চেঁছেপুঁছে ছেলেকে একটা গোমেদ আর একটা পান্না কিনে দিল। তা এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই যদি সুদেব একটা রক্তাম্বর পরা সাধুটাইপ লোককে উদ্ধার করে তা হলে পম্পি কেন ভাববে না, ইনিই তিনি? সেই দিব্যপুরুষ!
সুদেব আর পম্পির সেবায় লোকনাথ বেঁচে ফিরল ঠিকই কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার ভাঙা কোমরটা পুরোপুরি জোড়া লাগাতে পারল না। লাঠি ধরতে হল লোকনাথকে। তবে বছর খানেক পর শরীরটা সারলেও মাথাটা পরিষ্কার হতে আরও সাত-আট মাস সময় লেগে গিয়েছিল লোকনাথের। শুরুর দিকে সবই কেমন ঝাপসা ঝাপসা ছিল। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, এই ঝুপড়িতে কী করছে, কিছুই স্পষ্ট ভাবে মনে করতে পারত না লোকনাথ। রোজ তাকে ব্রাহ্মী শাকের রস খাওয়াত পম্পি। সাধুবাবা সেরে না উঠলে ছেলেকে আশীর্বাদ করবে কী করে? তা ধীরে ধীরে আবার সব মনে পড়তে লাগল লোকনাথের আর পড়ামাত্রই ক্রোধ, হতাশা মিলেমিশে উন্মাদপ্রায় করে তুলল তাকে। সবটা রাগ গিয়ে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের ওপর। পারলে তখনই সে বুড়োর বুক চিরে মেরে ফেলে কিন্তু সে যে শক্তিহীন। সিদ্ধিলাভের আশায় সব শক্তি সমর্পিত করে দিয়েছিল গেনুর মধ্যে। সিদ্ধি হয়নি। তা ছাড়াও এত বছর ধরে সাধনার যা যা উপকরণ সে সংগ্রহ করেছিল সে সবও হারিয়ে গেছে সেই দিনের পর।
লোকনাথের মনের মধ্যে তখন দিনরাত প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। শয়নে স্বপনে তার একটাই চিন্তা, কীভাবে মারবে ভাদুড়ি বুড়োকে? কিন্তু মারতে গেলে তো সবার আগে তাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। কোন পথে সে অর্জন করবে সেই শক্তি? সাধারণ পদ্ধতিতে সাধনা করাই যায় কিন্তু তাতে লেগে যাবে দীর্ঘ সময়। অত ধৈর্য নেই লোকনাথের। তার চাই এমন কোনও এক পন্থা যা একাধারে সহজ, দ্রুত এবং অমোঘ। এ সবই ভাবতে ভাবতে একদিন সুদেবের ঝুপড়ির দাওয়ায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল লোকনাথ। ঘুম ভেঙেছিল সুদেবের মেয়েটার ডাকে, দাদু, দাদু। ও দাদু।
আরক্ত চোখ চোখ মেলে তাকিয়েছিল লোকনাথ, কী রে?
হাতের মুঠো খুলে লোকনাথের সামনে ধরেছিল বাচ্চা মেয়েটা, এই দেখো দাদু, আমার দাঁত পড়েছে। মা বলেছে দাঁত পড়তে শুরু করলেই আমি বড় হয়ে যাব…
মেয়েটা কলকল করে আধো আধো গলায় আরও কী সব বলে যাচ্ছিল কিন্তু সে সব কিচ্ছু কানে ঢুকছিল না লোকনাথের। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল দুধে দাঁতটার দিকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। এক এক করে সব কটা পাতা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। যে পাতাগুলো সে এক কালে কেটে নিয়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের গোপন খাতা থেকে। পাতাগুলো হারিয়ে গেছে কিন্তু তারা রয়ে গেছে লোকনাথের স্মৃতিতে। ভাদুড়ি মশায় মজা করে বলতেন, লোকনাথের হাতির মতো স্মৃতিশক্তি। যা একবার দেখে আর ভোলে না। দুর্ঘটনার ধাক্কায় সে ক্ষমতায় পলি পড়েছিল কিন্তু আজ হড়পা বান এসে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে সমস্ত আস্তরণ। ঝিকিয়ে উঠছে পুরনো বিদ্যা। মেয়েটির ছেলেমানুষি লোকনাথের সামনে নতুন করে খুলে দিয়েছে অনন্ত সম্ভাবনার গুপ্তদ্বার। এক গাল হেসে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়েছিল লোকনাথ তার পর বলেছিল, দাঁতটা আমারে দেবা দিদিভাই?
খুব অবাক হয়েছিল মেয়েটা, দাঁত নিয়ে তুমি কী করবে দাদু?
কেন? সবাইরে দেখাব, এই দেখো, আমার দিদিভাইয়ের দাঁত।
সরল বিশ্বাসে লোকনাথের হাতে নিজের দাঁতটা তুলে দিয়েছিল মেয়েটা আর পরদিন সকাল হতেই সুদেবরা অবাক হয়ে দেখেছিল, দিব্যপুরুষ তাদের অনাথ করে দিয়ে চলে গেছেন।
জ্যোতিষীর কথা ফলেনি। ছেলে তো সুস্থ হয়ইনি উল্টে দিব্যপুরুষ চলে যাওয়ার এক মাসের মাথায় অসহ্য পেটে ব্যথায় ছটফট করতে করতে মারা গিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা।
সেই শুরু হল লোকনাথের শক্তি অর্জনের সাধনা। সর্বোচ্চ শক্তি আহরণ করতে মারতে হবে নয় বছরের কম বয়সি তেরোটি শিশুকে। একটি করে শিশুর গা ছমছমে মৃত্যু হবে আর একটু একটু করে শক্তিমান হয়ে উঠবে লোকনাথ। ইতিমধ্যে সাতটি শিশুকে জীবন দিতে হয়েছে লোকনাথের শক্তি ফিরিয়ে দিতে। সাত নম্বর শিশুটিকে মারার পরেই লোকনাথ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। আর তখনই জানতে পেরেছিল, তার বিফলতার প্রধান কারিগর তিতাস নামের মেয়েটা। জানতে পেরেওছিল ভারী অদ্ভুত ভাবে। একসাথে হাজারটা বিছে যেন হুল ফুটিয়েছিল লোকনাথের শরীরে। মাত্র একটি নারী ছাড়া সমগ্র নারীজাতিকে লোকনাথ ঘেন্না করে এসেছে জন্মাবধি। সেখানে একটা মেয়ে ছল করে তার এত বছরের সাধনা এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিল! নিজেকে বড় বেশি হীন মনে হয়েছিল লোকনাথের। সেই ঘৃণামিশ্রিত হীনবোধ লোকনাথের অন্তরের সমস্ত অন্ধকার সেঁচে তুলে এনেছিল ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত। দাঁতে দাঁত চেপে লোকনাথ বলেছিল, তিন টাকার বেশ্যা, ত্রাতা হওয়ার শখ জেগেছে? মহান সেজেছ সবার চোখে? তোরে যদি আমি ভরা বাজারে ন্যাংটো না করেছি তো আমার নাম লোকনাথ চক্কোতি না। এমন বাণ মারব, নিজে হাতে নিজের চিতা সাজাবি তুই। নিজেই আগুন ধরাবি তাতে। নিজে তো মরবিই আর সেই আগুনে পুড়ে মরবে তোর আশপাশে যারা আছে তারাও। আমি তারিয়ে তারিয়ে সেই ন্যাড়াপোড়া দেখব।
মহাসিন্ধুর ওপারের সুদূর প্রদেশে হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা এক ঘাতক অভিশাপকে জাগাবার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল লোকনাথ। তার জন্যেই ঘরের কোণে তৈরি করতে হয়েছে নকল বালিয়াড়ি। লোকনাথ জানে, ইতিমধ্যেই অল্প অল্প করে তার ছায়া বিস্তার করতে শুরু করেছে এই তন্ত্র। এবার শুধু অপেক্ষা তিতাসের কোনও দেহাংশ হাতে পাওয়ার। সে চুল, নখ, দাঁত, চামড়া যা কিছু হলেই হবে। তা হলেই পূর্ণ হবে ষোলোকলা। গত তিনদিন ধরে তিতাসের সমস্ত গতিবিধির ওপর নজর রাখছে তড়িৎ। আজ তার জিনিসটা নিয়ে আসার কথা। যদিও সরিত গেলেই সে বেশি নিশ্চিন্ত হত কিন্তু সরিত আটকে পড়েছে বর্ধমানে। একটা খোঁচর বাচ্চাগুলোর মৃত্যু নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে শুরু করেছে। তাকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। লোকনাথ চায় না, এই নিয়ে বেশি হুজ্জুতি হোক। তাই সে এক জায়গায় সব ক’টা বাচ্চাকে না মেরে বিভিন্ন জায়গা বেছে নিয়েছে এবং ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেও কিছুদিন পরপর। এটুকু ধৈর্য সে ধরতে বাধ্য হয়েছে। প্রথমদিকে সবটা লোকনাথ নিজেই করত কিন্তু সরিত আর আর তড়িৎকে পেয়ে তার খাটনি কমেছে। বড় বিশ্বাসী এই দুই ভাই। তড়িৎটা একটু নড়বড়ে কিন্তু সরিতের তুলনা নেই। সরিতের মধ্যে লোকনাথ নিজের ছায়া দেখতে পায়। মাঝে মাঝে সে আদর করে সরিতকে গেনু বলে ডাকে। সরিতও বোঝে, লোকনাথের কাছে এ ডাকের গুরুত্ব কতখানি। মাথা নিচু করে লোকনাথের পা ছোঁয় সে। বলে, তোমার জন্য জান দিতে পারি কত্তা। শুধু হাতটা রেখো মাথার ওপর।
গলা ঝাড়ার শব্দে ঘোর কাটল লোকনাথের। তাকিয়ে দেখল, দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে তড়িৎ। ধড়মড় করে উঠে বসল লোকনাথ। উঠতে গিয়ে আবার টাটিয়ে উঠল ব্যথার জায়গাটা। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে উদগ্রীব গলায় লোকনাথ বলল, এনেছিস?
উত্তর দিল না তড়িৎ। পকেট থেকে একটা মোড়ানো কাগজের টুকরো বার করে এগিয়ে দিল লোকনাথের দিকে। কাগজের ভাঁজ খুলতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল লোকনাথের চোখ। এক গুছি চুল। যা একটু পরেই হয়ে উঠবে তিতাসের অলঙ্ঘ্যনীয় নিয়তি। খুশিয়াল গলায় লোকনাথ বলল, কেমন করে আনলি?
তড়িৎ বলল, রাস্তার ধারে ওত পেতে ছিলাম। গাড়িটা আসতে দেখেই সাইকেলটা ভিড়িয়ে দিলাম গাড়ির সামনে। ওতেই তো কপালটা ফাটল। আমাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল সেই সময় কেটে নিয়েছি।
হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের মুখে, বাহ বাহ বাহ! তুইও তো দেখি দিনে দিনে সরিতের মতো লায়েক হয়ে উঠছিস। ভালো ভালো খুব ভালো। ধর তো একটু, চৌকি থেকে নামি। চান করতে হবে।
স্নান সেরে রক্তাম্বর পরল লোকনাথ। তারপর বজ্রাসনে বসল খেলনার বালিয়াড়ির সামনে। কোমরের দোষে আজকাল এভাবে বসতে কষ্ট হয় কিন্তু উপায় কী? তন্ত্র সহজ জিনিস নয়। সে সাধকের কৃচ্ছ্রসাধন দাবি করে। প্রথমে বালির ঢিবিটার ওপর তিনবার জল ছিটিয়ে দিল লোকনাথ। তারপর খেজুর পাতার চাটাইয়ের ওপর রাখা আটার মণ্ডটার মধ্যে খুব সাবধানে বসিয়ে দিল তিতাসের চুলের গুছিটা। কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। চোখ বুজে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল। কান খাড়া করে তড়িৎ যেটুকু বুঝতে পারল একঘেয়ে সুরে লোকনাথ বলে চলেছে, ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ
