লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ২

গাছের তলাটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে সেখানেই বসে পড়ল রোশনি। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল। ঘুরে ঘুরে পা ব্যথা হয়ে গেল তবু এখনও কাজের কাজ হল না। এই মুহূর্তে রোশনি বসে আছে বর্ধমানের হাসপাতালে। বদ্রিনাথ সাহা নামে হাসপাতালের একজন ফোর্থক্লাস স্টাফের সঙ্গে দেখা করতে সে কলকাতা থেকে বর্ধমান এসেছে সকালের বাসে। বদ্রিনাথ নিজেই আসতে বলেছিল কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়ে গেল রোশনি অপেক্ষা করছে, বদ্রিনাথ আসেনি। এমনকী তার ফোনও বন্ধ। হতাশ হয়ে রোশনি ভাবছিল, নির্ঘাত লোকটা তার সাথে প্র্যাকটিক্যাল জোক করেছে। শুধুমাত্র ফোনে কথা হওয়ার ওপর ভরসা করে সকাল সকাল এতটা উজিয়ে আসা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। কিন্তু রোশনিরও দোষ নেই। বদ্রিনাথ যা ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা শুনলে যে কোনও সাংবাদিকই উত্তেজিত হত। সেখানে তো রোশনির মাথার ওপর খাঁড়া ঝুলছে। বস আকারে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছেন, খুব তাড়াতাড়ি এক্সক্লুসিভ কোনও স্টোরি না করতে পারলে চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। তাই বদ্রিনাথের কথা শুনে নড়চড়ে বসেছিল রোশনি।

গতকাল রোশনির মর্নিং ডিউটি ছিল। হঠাৎ বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে মর্নিং ডিউটিতে সাধারণত খুব একটা চাপ থাকে না। কাজ বলতে, ঘণ্টাখানেক অন্তর অন্তর পুলিশের কন্ট্রোলরুমে ফোন করে খোঁজ নেওয়া। অফিস জমজমাট হতে শুরু করে বারোটার পর থেকে। ফলে আটটা থেকে বারোটা এই চার ঘণ্টা বেশ একটা নিরিবিলি সময় পাওয়া যায়। ওই সময়টায় রোশনি বইপত্র পড়ে বা ইন্টারনেট ঘাঁটে। গতকালও তাই করছিল। এমন সময় বেজে উঠেছিল অফিসের ল্যান্ড ফোন।

খুব বেশিদিন হয়নি রোশনি রিপোর্টিংয়ে ট্রান্সফার হয়েছে। প্রথমদিকে মর্নিং ডিউটিতে ফোন বাজলেই তার বুক ধড়ফড় করত। মনে হত, এই বুঝি কোথাও আগুন লেগেছে বা বাড়ি ভেঙে পড়েছে বা অন্য কোনও দুর্ঘটনা। কিন্তু দিনকয়েক যেতে রোশনি খেয়াল করেছিল, দুর্ঘটনা ঘটারও মোটামুটি কয়েকটা নির্দিষ্ট সময় আছে। যেমন, আগুন লাগে সাধারণত ভোরের দিকে বা দুপুরের পর। বাইকওয়ালারা ফ্লাইওভারের ডিভাইডারে ধাক্কা মারে রাত গহীন হলে আর লোকে বাসে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায় অফিস থেকে ফেরার সময়। একমাত্র মেট্রোয় সুইসাইড করার নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। ওটা মেট্রো খোলার পর যে কোনও সময় হতে পারে। তবে এটা সম্পূর্ণই রোশনির ব্যক্তিগত অভিমত। এতে কোম্পানির কোনও দায় নেই।

সাধারণত সকালের দিকে যে ফোনগুলো আসে সেগুলো খুবই আটপৌরে। কেউ ফোন করে পাড়ার ক্লাবের বার্ষিক বিচিত্রানুষ্ঠান কভার করাতে চান। কেউ আবার ম্যাগাজিনে কেন লেখা ছাপা হচ্ছে না তাই নিয়ে খুব অভিমান করেন। রোশনির বেশ মজা লাগে অচেনা মানুষগুলোর চেনা অভিযোগ, চেনা আবদার শুনতে। অফিসের অনেকেই আছে যারা এই সব ফোন ধরে হ্যাঁ-হুঁ করে কেটে দেয়। রোশনি সে দলে পড়ে না। সে মন দিয়ে সবটা শোনে তার পর তার সাধ্যমতো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। কালও যথারীতি রোশনি ফোন ধরেছিল, হ্যালো।

উল্টোদিক থেকে একটা ভাঙা ভাঙা গলা বলে উঠেছিল, এটা দৈনিক নবজাগরণের অফিস তো?

হ্যাঁ। কে বলছেন?

আপনি কি সাংবাদিক?

প্রশ্নটা শুনে রোশনি এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেছিল। ঠোঁটের গোড়ায় এসে গেছিল, না আমি চিয়ারলিডার। খবরের কাগজের অফিসে সকাল সকাল সাংবাদিক ছাড়া আর কে থাকবে? কিন্তু বলতে গিয়েও সামলে নিয়েছিল নিজেকে। রোশনি খেয়াল করে দেখেছে, সারকাসটিক্যালি কথা বলা ইদানীং একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। ট্যারা ট্যারা উত্তর দিয়ে মানুষ অদ্ভুত আত্মরতি অনুভব করে। ধরা যাক, ফেসবুকে কারও সাথে নতুন আলাপ। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কোথায় থাকেন? সে উত্তর দিল, বাড়িতে। আরে কী জিতে নিলি তুই এটা বলে? তুই কি কুকুরের বাচ্চা যে পথেঘাটে থাকবি! বা কাউকে জিজ্ঞেস করা হল, কেমন আছেন? সে উত্তর দিল, জেনে আপনার লাভ? কথাটা ঠিকই, তুই কেমন আছিস তা দিয়ে বিপুলা এ পৃথিবীর কিচ্ছুটি ছেঁড়া যায় না কিন্তু তবু তো মানুষ কুশল বিনিময় করে। সেটাই সভ্যতা। মানুষের মধ্যে এই সভ্যতার পরিমাণটা কমে যাচ্ছে। মানুষ সোজা কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে। রোশনি কোনও একটা লেখায় পড়েছিল, লোকসংখ্যা বাড়ছে এটা ভয়ের কথা নয়। ভয়ের কথা হল ছোটলোকের সংখ্যা বাড়ছে। একদম ঠিক। যে মানুষ অন্যকে নীচু করে আনন্দ পায় তার থেকে গরিব এ দুনিয়াতে আর কে আছে? প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় রোশনিও রক্তের গরমে মানুষকে বাঁকা কথা বলেছে। সার্কাজমে বিদ্ধ করেছে। কিন্তু বয়েস বাড়তে সামলে নিয়েছে নিজেকে। বুঝেছে, সার্কাজম চন্দ্রবিন্দুর গানেই ভালো লাগে। পারস্পরিক আলাপচারিতায় নয়। তাই নরম গলায় রোশনি বলেছিল, হ্যাঁ আমি একজন সাংবাদিক। বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

লোকটা সময় নিয়ে বলেছিল, ম্যাডাম, আমার কাছে এমন একটা খবর আছে সেটা কাগজে বেরোলে হুলস্থুল পড়ে যাবে।

যাঁরা খবর দিতে ফোন করেন তাঁরা সকলেই মনে করেন, তাঁদের কাছে যে খবর আছে সেটা দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে গদিচ্যুত করে দেওয়া যায়। ফলে বিশেষ মাথা ঘামায়নি রোশনি। নিরাসক্ত গলায় বলেছিল, আচ্ছা।

উল্টোদিকের লোকটা বোধ হয় রোশনির বলার ভঙ্গিটা পড়তে পেরেছিল। একটু চুপ থেকে বলেছিল, আমার কথাটা সিরিয়াসলি নিলেন না তাই না ম্যাডাম? আমি কিন্তু কোনও ফালতু খবর দিতে ফোন করিনি। অন্য কাগজেও ফোন করতে পারতাম কিন্তু আপনারা বাংলার সবচেয়ে বড় মিডিয়া। তা যাক গে, আপনার ইন্টারেস্ট না থাকলে অন্য কথা। রাখি।

লোকটার বলার মধ্যে একটা প্রত্যয় ছিল। রোশনি সচকিত হয়ে উঠেছিল। সে দ্রুত বলে উঠেছিল, দাঁড়ান। কী খবর আছে আপনার কাছে? তার আগে বলুন, আপনি কে? কোথা থেকে বলছেন?

নামটা গোপন থাকবে তো?

থাকবে। সাংবাদিকরা সোর্সের নাম ডিসক্লোজ করে না। প্রফেশনাল এথিক্স। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

আমার নাম বদ্রিনাথ সাহা। বর্ধমান থেকে কথা বলছি। বর্ধমান হাসপাতালের শিশুরোগ ডিপার্টমেন্টের ফোর্থক্লাস স্টাফ। ম্যাডাম, একটা নতুন ভাইরাস এসেছে আর তাতে অদ্ভুত ভাবে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর খবরগুলো চেপে দিয়েছে কিন্তু এটা মানুষের জানা উচিত।

কী বলতে চাইছেন একটু খুলে বলুন।

ম্যাডাম, আমি তিন মাস হল হল বদলি হয়ে এই হাসপাতালে এসেছি। এর আগে ছিলাম হুগলিতে। আমার বদলি হবার মাসখানেক আগে হুগলিতে দু’টো বাচ্চা পরপর মারা যায়। একদম আনন্যাচারাল ডেথ। কিন্তু ডাক্তারেরা পুরো চেপে গেছিল। হাসপাতালের সুপার নিজে বাচ্চা দু’টোর ফ্যামিলির সাথে অনেক কথাবার্তা বলেছিল ঘর বন্ধ করে। শুধু কানাঘুষোয় যেটুকু জানতে পেরেছিলাম, তা হল বাচ্চা দু’টোর না কি দাঁত পড়ে যাচ্ছিল। তা যাই হোক, ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল। কিন্তু মাসখানেক আগে বর্ধমান হাসপাতালেও এমন একটা কেস হয়। এখানেও বাচ্চাটা মারা যায়। এবার আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সেম কেস। এই বাচ্চাটারও দাঁত নিয়ে কিছু একটা প্রবলেম ছিল। আমার এক মামাতো বোন নার্স। সে অবশ্য প্রাইভেট নার্সিংহোমে আছে। সেখানেও একটা বাচ্চার এমন হয়। বাচ্চাটাকে রাতারাতি কলকাতার পিজি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমার মন কু ডাকছিল। আমি কলকাতায় চলে যাই। পিজি হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করতে থাকি। জানতে পারি ওই বাচ্চাটাও মারা গেছে। আমি খাতা দেখে চারটে বাচ্চার ঠিকানা জোগাড় করেছি। ওদের ফ্যামিলির লোকজনের সাথে কথাও বলেছি। কেউই মুখ খুলতে চাইছিল না বুঝলেন? আসলে ডিরেক্ট সরকারি চাপ আছে। কিন্তু অনেক কায়দা করে কিছু কিছু জিনিস জানতে পেরেছি যেগুলো খুব অদ্ভুত। আমার মন বলছে, এই চারটে বাচ্চাই শুধু নয়। এর পর আরও অনেক বাচ্চার সাথে এই একই জিনিস হতে চলেছে। বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে হবে ম্যাডাম।

কথাগুলো শুনে থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রোশনি। তার মাথার মধ্যে তখন ঘুর্ণি তুলেছে নানা সম্ভাবনা, নানা আশঙ্কা। নিজেকে একটু সামলে সে বলেছিল, কী কী জানতে পেরেছেন বলুন।

বদ্রিনাথ বলেছিল, এত কথা ফোনে বলা যাবে না। রিস্ক আছে। আপনি একবার দেখা করতে পারবেন? আমি এই কেসটাতেই খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে একটু আটকে পড়েছি। নয়তো নিজেই কলকাতা চলে যেতাম। বর্ধমানে আসতে অসুবিধে হবে?

একটু ভেবে রোশনি বলেছিল, না। কবে আসব বলুন?

কালকেই আসুন না। সকাল সকাল চলে আসবেন। এসে আমায় একটা ফোন করবেন। আমার মোবাইল নম্বরটা লিখে নিন।

রোশনি লিখে নিয়েছিল মোবাইল নম্বর। ফোন রাখার আগে বদ্রিনাথ বলে উঠেছিল, ও হো! আপনার নামটাই তো জানা হল না। আপনি?

আমি রোশনি।

রোশনি কী?

শুধু রোশনি।

তা সকাল সকালই এসেছিল রোশনি। কলকাতা থেকে সাতটার বাস ধরেছিল। দশটার মধ্যে পৌঁছেও গেছিল দিব্যি। কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে নেমেই তার মাথায় হাত পড়ে গেল। বদ্রিনাথের ফোন সুইচড অফ। এ কী ইরেসপনসিবল লোক রে বাবা! নিজেই আসতে বলে ফোন বন্ধ করে রেখেছে! বাস স্ট্যান্ডেই ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেছিল রোশনি আর বারবার ফোন করছিল বদ্রিনাথকে। কিন্তু সেই একই কথা শুনিয়েছিল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। জেদ চেপে গেছিল রোশনির। এত দূর যখন এসেছে তখন দেখা না করে সে ফিরবে না। একটা টোটো ধরে চলে এসেছিল হাসপাতালে। শিশুরোগ বিভাগে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিল, বদ্রিনাথ এখনও আসেনি। সেই থেকে বদ্রিনাথের জন্য হা পিত্যেশ করে বসে আছে সে। বেলা ভালোই হয়েছে। প্রায় একটা বাজে। সকাল থেকে দু’ কাপ চা আর দু’টো বিস্কুট ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি। বেশ খিদে পেয়েছে। হাসপাতালের বাইরে একটা ভাতের হোটেল দেখেছিল রোশনি। ঠিক করল, ওখানেই দুপুরের খাওয়াটা সেরে কলকাতার বাস ধরবে। বদ্রিনাথের জন্য জীবনের আর একটা মিনিটও নষ্ট করবে না সে।

দোকানে ঢুকে সবে চেয়ার টেনে বসেছে, একটা ছেলে এসে বলল, দিদি ভাত শেষ। একটু বসতে হবে।

রোশনি বলল, কতক্ষণ?

ছেলেটা বলল, চল্লিশ মিনিট।

বিরক্ত হতে গিয়েও হেসে ফেলল রোশনি। ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ঝুলিয়ে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে। ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এতকাল সে দেখেছে, ভাত শেষ হয়ে গেছে বললেই কাস্টমার খেঁকিয়ে ওঠে। এই প্রথম কাউকে হাসতে দেখল। মানুষ তো মানুষের মন পড়তে পারে না। যদি পারত তা হলে ছেলেটা বুঝতে পারত, এই মুহূর্তে রোশনি নিজের ভাগ্যকেই পরিহাস করছে। সে ভাবছিল, কোথায় এখন তার সম্পাদকীয় পাতায় নতুন বেরনো কোনও বইয়ের রিভিউ লেখার কথা, তা না খবরের সন্ধানে সে খিদে পেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে বর্ধমানের রাস্তায়! রোশনি জানে, সে সাপের ল্যাজে পা দিয়ে ফেলেছে। খুব বেশি দিন আর এই চাকরিটা তার কপালে নেই। যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে চাকরিটা রোশনি নিজেই ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু ছাড়েনি দু’টো কারণে। এক, সে যদি নিজে ছেড়ে দিত তা হলে এটা প্রমাণ হত যে সে ভুল করেছে। আর দুই, এই মুহূর্তে চাকরি ছাড়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই তার।

ঝামেলাটা চলছে প্রায় দু’ মাসের ওপর। পূর্বতন সম্পাদক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর ম্যাগাজিনের এক উচ্চপদস্থ কর্তাকে সম্পাদক হিসেবে বসানো হয়, আর ঝামেলাটা শুরু হয় তার পরেই। ভূতপূর্ব সম্পাদক ঠিক যতটা বিনয়ী, ভদ্র ও শিক্ষিত ছিলেন এই লোকটা ঠিক ততটাই দুর্বিনীত, অভদ্র ও অশিক্ষিত। ইনি একটাই জিনিস দারুণ পারেন আর তা হল আদিরসাত্মক রসিকতা। মহিলা সহকর্মী দেখলে ওনার এই পানু জোক বলার ইচ্ছে বৃদ্ধি পায়। এ অবধি তাও মেনে নেওয়া যাচ্ছিল কারণ বহু পুরুষেরই অবদমিত কাম এই পথে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ক্রমে প্রকাশ পেল, শুধু রসিকতাই নয়, ওনার ভর্ৎসনাও আদিরসময়। খুব রেগে গিয়ে তিনি একদিন এক অধস্তন মহিলা সহকর্মীকে বলে উঠলেন, শুধু বুকের খাঁজ দেখানোর জন্য তোকে মাইনে দেওয়া হচ্ছে না।

তার পর আর একদিন অন্য একজনকে ধমকে উঠলেন, পোয়াতি গোরুর মতো পাছা না দুলিয়ে তাড়াতাড়ি যাও।

ওই দু’জনের একজন খুব কাঁদল আর একজন এইচ আরে কমপ্লেন করল। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হল না। রোশনি খেয়াল করেছিল, প্রথম থেকেই লোকটা তার দিকে কেমন অশ্লীল ভাবে তাকায়। একদিন পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, তোর চোখ নাক মুখ হেবি সুন্দর কিন্তু তোর মধ্যে একটা মদ্দা মদ্দা ভাব আছে। অবশ্য সেটা খারাপ না।

আর একদিন ভরা মিটিংয়ে বললেন, রোশনির আবার চাপ কী? ওর তো বাসে অটোয় কনুই খাওয়ার ভয় নেই।

বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন। যেন কী দারুণ একটা মজার কথা বলে ফেলেছেন। চাটুকারেরা হাসিতে যোগ দিল আর বাকিরা রোশনির অপমানে মিশে গেল মাটিতে। ছোট বুক নিয়ে রোশনিকে যে কোনওদিন কটাক্ষ হজম করতে হয়নি এমন নয় কিন্তু অফিসেও যে এটা শুনতে হবে রোশনি কল্পনা করেনি। সে স্তব্ধ হয়ে গেছিল। উঠে চলে গেছিল মিটিং ছেড়ে। সন্ধেবেলায় সম্পাদক নিজে এসে হাজির হলেন রোশনির ডেস্কে। দুপুরের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং যাওয়ার সময় আদর করে রোশনির পাছায় হাত বুলিয়ে দিলেন!

সহকর্মীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ দু’জনকে ঘটনাটা জানিয়েছিল রোশনি। তারা বলেছিল, এইচ আরে কমপ্লেন করতে। রোশনি করেনি। সে জানত কমপ্লেন করে লাভ হবে না। অসহায় রাগ এবং ঘৃণা ক্রমশ পরিণত হয়েছিল প্রত্যয়ে। নিজের কর্মপদ্ধতি ঠিক করে ফেলেছিল রোশনি।

সে দিনটা ছিল শুক্রবার। সন্ধেবেলায় রোশনি কয়েকটা প্রিন্ট আউট বার করছিল। সম্পাদক মহাশয় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তোর মধ্যে একটু মদ্দা মদ্দা ভাব থাকলে কী হবে আসল জিনিসগুলো নরম। এই বলে আবার রোশনির পেছনে হাত রেখেছিলেন সম্পাদক আর এবার কালবিলম্ব না করে তাঁর গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিয়েছিল রোশনি। বলে উঠেছিল, রোজ দাড়ি কামালে কী হবে, আপনার গালটাও ভারী নরম।

সবাইকে স্তম্ভিত করে ব্যাগটা কাঁধে তুলে অফিস থেকে বেরিয়ে গেছিল সে। পরে খবর পেয়েছিল, সম্পাদক আহত ব্যাঘ্রের মতো কিছুক্ষণ দাপাদাপি করেছিলেন নিজের কেবিনে। তার পর প্রেস ক্লাবে গিয়ে চার পেগ মদ খেয়ে রোশনির মতো মদ্দা টাইপ মাগিকে কুকুরেও নেবে না বলে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন এবং রোশনির মতো মেয়েদের ঠান্ডা করার জন্য গ্যাং রেপের দাওয়াই দিয়েছিলেন।

রোশনি জানত ঝড় আসবে কিন্তু সেটা যে এভাবে আসবে বুঝতে পারেনি। এক সপ্তাহের মাথায় তাকে জানানো হল, রিপোর্টিংয়ে দক্ষ লোক দরকার তাই তাকে সেখানে ট্রান্সফার করা হচ্ছে। আর ট্রান্সফারের দু’ সপ্তাহের মাথায় জানানো হল, রোশনি পারফর্ম করতে পারছে না। অনতিবিলম্বে এক্সক্লুসিভ স্টোরি আনতে না পারলে চাকরি যাবে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোশনি। এখুনি চাকরিটা গেলে তার চলবে না। সিদ্ধান্ত বদল করল। বদ্রিনাথের জন্য আরও কিছুটা সময় ব্যয় করতেই হবে। ডিপার্টমেন্ট থেকে বদ্রিনাথের বাড়ির ঠিকানা নিতে হবে এবং তার বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু শিশুরোগ বিভাগে ঢুকতেই থমকে গেল রোশনি। রিসেপশনে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। বিভাগেরই কয়েকজনের সঙ্গে তারা কথা বলছে। কথোপকথন শুনে চমকে উঠল সে। গতকাল রাত থেকে বদ্রিনাথ মিসিং। সন্ধেবেলায় বেরিয়েছিল, আর ফেরেনি। বাড়ির লোক থানায় ডায়েরি করাতে পুলিশ খোঁজ করতে শুরু করেছে।

অদ্ভুত একটা অস্বস্তি দানা বাঁধছিল রোশনির মাথার মধ্যে। অজানা একটা আশঙ্কায় শিহরিত হচ্ছিল সে। গতকাল সকালে যে লোকটা একটা গোপন খবর দেবে বলল, সন্ধে হতে না হতে সে নিখোঁজ! রোশনি কিছুতেই এ দুটোকে সমাপতন বলে মানতে চাইছিল না তবু তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সাবধান করছিল বারবার, চলে যাও। এ খবরের পেছনে না ছুটে ফিরে যাও। বিপদ হবে। খুব বিপদ।