লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ২০

২০

কবিতা করিবে আমারে বিজন/
প্রেমও করিবে স্বপ্ন সৃজন/
স্বর্গের পরী হবে সহচরী, দেবতা করিবে হৃদয় দান/
মলয় বাতাসে ভেসে যাব শুধু, কুসুমের মধু করিব পান…

স্নান করতে করতেই মোবাইলের রিংটোন শুনতে পেয়েছিল রোশনি। ভেবেছিল, স্নান সেরে বেরিয়ে কল ব্যাক করবে। কিন্তু ফোনটা যখন বারবার বাজতে লাগল, স্নান অসমাপ্ত রেখে তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল সে। ফোনটা হাতে নিতে নিতে আবারও বেজে উঠল রিংটোন। থানা থেকে ফোন! এতবার কেন ফোন করছে থানা থেকে? অবাক হয়েই ফোনটা ধরল রোশনি।

থানার সেকেন্ড অফিসার বিশ্বদীপ দত্ত বলে উঠল, আপনি এখুনি একবার থানায় আসুন তো ম্যাডাম। আপনার কথামতো যে স্কেচ করা হয়েছিল, মনে হচ্ছে সেই ছেলেটা ধরা পড়েছে। আপনি এসে আইডেন্টিফাই করে যান।

ফোনটা রেখে চুপ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল রোশনি। আবার ছেলেটার মুখোমুখি হতে হবে ভেবেই একটা অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তি না কি ভয়? ঠিক বুঝে উঠতে পারল না রোশনি। ভয় তো সে পেয়েছিল সেদিন। খুবই পেয়েছিল। এর আগে কখনও মৃত্যু এভাবে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলেনি। শুধু মৃত্যু তো নয়, ভয়ানক অপমানজনক মৃত্যু। নাহ, একা ওই ছেলেটার মুখোমুখি হবে না সে। ঠিক করল, পল্লবকে ফোন করবে।

পল্লব একা নয়, গেনু ধরা পড়েছে শুনে থানায় ছুটে এলেন ভাদুড়ি মশায় স্বয়ং। অপালা আর অমিয় তাঁকে নিয়ে এসেছে। ছেলেটিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে একটা সেলের ভেতর। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। বিশ্বদীপ দত্ত অমিয়র চেনা মানুষ। বলল, রোশনি ম্যাডাম যা বলেছিলেন তারপর আর ওকে বাইরে রাখতে সাহস পাইনি।

রোশনিরা সকলে এসে দাঁড়াল সেলের সামনেটায়। ভেতরে মাথা নিচু করে বসে আছে ছেলেটা। পল্লবের খুব চেনা চেনা লাগল ছেলেটাকে। কোথায় যেন দেখেছিল! মনে পড়ছে না। এদিকে মন দিয়ে ছেলেটাকে দেখতে দেখতে রীতিমতো বিভ্রান্ত বোধ করল রোশনি। হ্যাঁ এ সেদিনের ছেলেটাই কিন্তু কোথাও যেন একটা বড় পার্থক্য আছে। কোথায় সে পার্থক্য? কোথায়? একটু ভাবতেই রোশনি উত্তরটা পেয়ে গেল। পার্থক্য চোখে। চাহনিতে। সে রাতে খুব কাছ থেকে ছেলেটার চোখ দেখেছিল রোশনি। অমন মৃত্যুহিম, ফর্মালিনে চোবানো, লাশকাটা ঘরের গন্ধমাখা চাহনি যে একবার দেখেছে, কোনওদিন ভুলতে পারবে না। এই ছেলেটির চাহনি তো তেমন নয়। বরং এর চাহনির মধ্যে একটা পালাই পালাই ভাব রয়েছে। বিশ্বদীপ দত্ত জিগ্যেস করল, ম্যাডাম এই ছেলেটাই তো?

রোশনি বলল, আমায় দুটো মিনিট দিন। তার পর পল্লবের দিকে তাকিয়ে বলল, পল্লবদা, একবার শুনুন এদিকে।

থানার বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ওরা। রোশনি কিছু বলার আগেই ভাদুড়ি মশায় বললেন, এ সে নয় তাই তো মা?

চমকে উঠল রোশনি, আপনি কীভাবে বুঝলেন স্যার? আসলে আমি ঠিক শিওর হতে পারছি না। অবিকল একই রকম দেখতে কিন্তু…

ঠিকই বলেছ তুমি। এ সে নয়। কথা কেটে বললেন ভাদুড়ি মশায়, পাপের একটা গন্ধ আছে। আমি পাই সে গন্ধ। এই ছেলেটির মধ্যে পাপ নেই। যে তোমায় সে রাতে মারতে এসেছিল সে কিছুতেই এ হতে পারে না।

সকলেই থমকে গেল। অমিয় বলল, তা হলে?

ভাদুড়ি মশায় বললেন, তোমার সঙ্গে তো চেনাশোনা আছে অমিয়। তুমি ওই অফিসারটিকে অনুরোধ করো, আমি এই ছেলেটির সাথে একবার কথা বলতে চাই। আমার মনে হয় রহস্যের জট খুলতে পারব। কেন জানি না, মন বলছে, রোশনির ওপর হামলা থেকে তিতাসের অন্তর্ধান সবটাই এক সুতোয় বাঁধা।

এখুনি ব্যবস্থা করছি স্যার। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। ভাদুড়ি মশায়কে নিয়ে অমিয় ঢুকে গেল ভেতরে আর পল্লব পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল থানার পেছন দিকটায়। সিঁড়ির ওপর ছায়া পড়েছে। ওখানেই বসে পড়ল সে। একটা দিন চলে গেল তিতাসের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইচ্ছে করেই পুলিশকে কিছু জানায়নি সে। এই আধুনিক পৃথিবীর মধ্যে যে আধিদৈবিক, আধিভৌতিক জগত আছে তার রহস্য পুলিশ জানে না। সবটাই এখন ভাদুড়ি স্যারের হাতে। তিতাসের কথা ভাবতে ভাবতেই চোখে জল এসে গেল পল্লবের। কোনওদিনই সে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তিতাস বলত, তোর সবটাই উঁচু তারে বাঁধা। মেঘলা দুপুরে প্রেসিডেন্সির ট্যাঙ্কে বসে গান ধরত তিতাস। সেই গান তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত ম্যাথামেটিকস ডিপার্টমেন্টের ছাদে। তখন প্রেসিডেন্সিতে চুমু খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ভালোবাসায় ফতোয়া ছিল না কোনও। বয়স যত বাড়ছে তত বেশি করে মনে পড়ে যায় পুরনো দিনের কথা। তিতাসের না থাকা বুঝিয়ে দেয় এই প্রেম ঢুকে গেছে অস্থিতে অস্থিতে, অভ্যাসে যাপনে, রুধিরে রুধিরে। তবু কি নতুন প্রেম আসে না? এসে দাঁড়ায় না চৌকাঠে? জয় লিখেছিলেন, ‘এক আঘাতে ছিন্ন করব মন থেকে মুখ… আমি কি আর তেমন কসাই?’ একটা ছায়া এসে পড়ে পল্লবের পাশটিতে। পল্লব বুঝতে পারে রোশনি তাকে দেখছে। চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করে না পল্লব। সে বুঝতে পারে রোশনির চোখেও জল। রোশনির জীবনেও হয়তো বিচ্ছেদ আছে। বিচ্ছেদ থাকেই মানুষের জীবনে। পরিস্থিতি বিশেষে সফল প্রেম আর ব্যর্থ প্রেম মিলেমিশে যায় চোখের জলে।

বিশ্বদীপের সঙ্গে কথা বলে ভাদুড়ি মশায় এসে বসেন ছেলেটার সামনের চেয়ারে। সেই আশ্চর্য অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তার চোখের দিকে। চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সে কিন্তু পারে না। বুকটা কেঁপে ওঠে তড়িতের। সে বুঝতে পারে একটা বিরাট বড় ভুল করে ফেলেছে তার দাদা সরিত আর লোকনাথ ঠাকুর। এই বয়স্ক মানুষটা যে এই ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারে সেটা তাদের ধারণায় ছিল না। এবার ধরা পড়ে যাবে দু’জনেই। কারণ প্রাণের ভয় থাকলেও তড়িত কিছুতেই এই বয়স্ক মানুষটাকে মিথ্যে কথা বলতে পারবে না। এই মানুষের সামনে মিথ্যে বলা যায় না।