বউকালীবাড়ির বেত্তান্ত – ৩

মন্ত্রদান পর্ব সমাপ্ত হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। গোবিন্দ মুহুরির উঠোনে একটা বড় তেঁতুল গাছ। বেশ ছায়া হয়। তারই নীচে চেয়ার পেতে বসেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। অপালা ভেতরে বাড়ির মেয়েদের সাথে গল্প করছে। বিকেলবেলা তাঁরা রওনা হবেন এখান থেকে। মন্ত্রদানের পরেই ভাদুড়ি মশায় বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু গোবিন্দ আটকে দিয়েছে। অনেক অনুরোধ করেছে দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে যেতে। সাধারণত যজমানের কথা ফেলেন না ভাদুড়ি মশায়। থাকতে রাজি হয়েছেন। বসে বসে শান্তনু বলে ছেলেটির কথাই ভাবছিলেন তিনি। ছেলেটির কাছ থেকে যা শুনেছেন তাতে তিনি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কিন্তু আবার পুরোটা ভাবতে বসে তাঁর মনে হতে লাগল কোথাও যেন একটা খটকা আছে। কিন্তু খটকাটা কী কিছুতেই ধরতে পারছিলেন না তিনি। এমন সময় একজনের গলার আওয়াজে তাঁর চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল, নমস্কার ঠাকুরমশাই।

চোখ তুলে দেখলেন নামাবলী গায়ে এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। বছর ষাটেক বয়স হবে। মাথার চুলে সাদা ছোপ ধরেছে। হাত জোড় করেই তিনি বললেন, ঠাকুরমশাই, আমি গ্রামের চণ্ডীতলার পূজারি শিবনাথ চক্রবর্তী। বউকালীবাড়িতেও আমিই পুজো করি।

প্রতিনমস্কার করলেন ভাদুড়ি মশায়। পাশে একটি মোড়া খালি ছিল, সেটা দেখিয়ে বললেন, বসুন।

বসতে বসতে শিবনাথ বললেন, সকালেই আপনার আসার খবর পেয়েছি। এই এতক্ষণ দৈনন্দিন পুজোপাঠ শেষ হল। ভাবলাম একবার দেখা করে যাই আপনার সাথে।

ভাদুড়ি মশায় বললেন, ভালো করেছেন। আপনি কি এ গ্রামেই থাকেন?

শিবনাথ বলতে লাগলেন, এ গ্রামে তাঁদের সাত পুরুষের বাস। সবাই পূজারি। তাঁর পূর্বপুরুষ ভবতোষ হালদারের বাড়ির প্রধান পুরোহিত ছিলেন।

কে ভবতোষ হালদার? বিখ্যাত কেউ? কৌতূহলে প্রশ্ন করলেন ভাদুড়ি মশায়।

শিবনাথ উৎসাহ পেয়ে ভবতোষ এবং বউকালীবাড়ির মিথ শোনাতে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়কে। গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল তাঁর। তিনি বললেন, আমি বহুকাল থেকেই মন্ত্রদানের জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরছি। সব গ্রামেই কোনও একটি দেবস্থান নিয়ে এ ধরনের গল্প প্রচলিত থাকে। তবে এ গল্পটি আর পাঁচটার মতো নয়। বেশ অন্যরকম।

এ কথায় যেন খানিক ক্ষুব্ধ হলেন শিবনাথ। বললেন, আপনি তো আস্তিক। তার পরেও একে গল্পকথা বলছেন?

একটু হাসলেন ভাদুড়ি মশায়, আস্তিক্যের সাথে সংস্কার, বিশেষ করে কুসংস্কারের কিন্তু খুব একটা যোগ নেই শিবনাথবাবু। তা হলে তো হাঁচি, বেড়াল রাস্তা ডিঙানো সব মানতে হয়। আমি আপনার বিশ্বাসকে ছোট করছি না। কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন তো? দেব-দেবী তো অনেক দূরের বাসিন্দা অথচ মানুষ তাঁদের আপন করতে চায়। এ ধরনের গল্প আসলে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা। কোনও মন্দিরে বা কোনও বিশেষ বিগ্রহে দেবতা জাগ্রত হন না সে কথা আমি বলছি না কিন্তু সে খুবই আশ্চর্য ঘটনা। কোটিকে গুটিক।

তাঁদের গ্রামের তথাকথিত জাগ্রত বউকালীবাড়ি মন্দিরকে খুব একটা পাত্তা না দেওয়ায় এবার যেন খানিকটা রেগেই গেলেন শিবনাথ। ফস করে বলে বসলেন, এই যুক্তিতেই আপনি মৃত্যুঞ্জয়ের ভাগ্নেকে ভর সন্ধেবেলায় মন্দিরে যাওয়ার নিদান দিয়ে দিলেন তাই তো? আপনি জানেন এর ফল কতদূর খারাপ হতে পারে?

শিবনাথের বলার ধরনে একটু অসন্তুষ্ট হলেন ভাদুড়ি মশায়। সোজা হয়ে বসলেন, কতদূর খারাপ হতে পারে শুনি?

তীব্র কণ্ঠে শিবনাথ বললেন, ছেলেটা বেঘোরে মারা পড়তে পারে ঠাকুরমশাই। বউকালীবাড়ি মন্দির বড় সহজ জায়গা নয়। আমরা এ গ্রামের আদি বাসিন্দা। আমি বলছি আপনাকে বউকালীবাড়ির খারাপ ইতিহাস আছে। এককালে ওই মন্দির ডাকাতরা দখল করেছিল। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাকাতদের আরাধ্যা ছিলেন বউকালী। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ডাকাতরা ওখানে বলি দিত। গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বলির জন্য বাচ্চা ছেলেমেয়ে ধরে আনত ডাকাতরা। সেই বলি তো বন্ধ হয়েছে হালে। বড়জোড় ষাট-সত্তর বছর আগে। পুলিশের তাড়া খেয়ে ডাকাতরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। চারদিকে জনপদ বাড়তে লাগল। প্রশাসন আগের থেকে শক্ত হল। ডাকাতির পরিমাণ কমতে লাগল। তাও লুকিয়ে চুরিয়ে বলি হত। আর এই বলি হতে হতে কী হল জানেন?

শিবনাথের বলার ভঙ্গিটি মনোগ্রাহী। শ্রোতাকে গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়ার একটা ক্ষমতা আছে এই লোকটির মধ্যে। সম্ভবত ইনি কথকতা করেন। ভাদুড়ি মশায়ও মন দিয়ে শুনছিলেন শিবনাথের কথা। কৌতূহলী শ্রোতার মতো তিনি বলে উঠলেন, কী হল?

শিবনাথ বললেন, দেখুন ঠাকুরমশাই, আমি বিশ্বাস করি মা বলি চান না। তিনি সন্তানের রক্ত দেখতে পছন্দ করেন না। কিন্তু মা না চাইলেও মায়ের সাঙ্গপাঙ্গরা তো রক্তখেকো। কত ডাকিনী, হাঁকিনী, পিশাচ, প্রেত ঘুরে বেড়ায় কালীস্থানের আশপাশে। বলির রক্তে তাদের লোভ। আর বছরের পর বছর এই বলির রক্ত পেতে পেতে তাদের অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। তারা হ্যাংলা হয়ে গেছে। তারা আজও চায় বলি হোক। একবিন্দু বলির রক্তের জন্য ছটফট করে। সে জন্যই তো রাতের বেলা নানা কাণ্ডকারখানা হয় ওখানে। ডাকিনীরা নানা ছল করে মানুষকে ডাকে। ছেলেটিকে সন্ধেবেলায় ওখানে পাঠাবেন না ঠাকুরমশাই। আমি ওর বাড়ির লোককে বারণ করেছিলাম। কিন্তু যা হয়, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। আমার কথায় ওরা গুরুত্ব দিল না। কিন্তু আমি আপনাকে বলে যাচ্ছি, ছেলেটির যদি কোনও ক্ষতি হয় দায়ী থাকবেন আপনি।

সদর্পে পা ফেলে চলে গেলেন শিবনাথ। যেন এক অবাঞ্ছিত দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়ের ওপর।

* * *

ম্লান লাল রঙের সূর্য ডুবে গেল দিগন্ত সীমায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল বিলমাঠের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। কালো সুতোয় বোনা মোটা এক তুষের চাদর কেউ যেন বিছিয়ে দিতে লাগল আমাদের মাথার ওপরে। একটু একটু করে অদৃশ্য হয়ে গেল গায়ের রোমরাজি। একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠতে লাগল আকাশে। দূর থেকে ধেয়ে এল ঠান্ডা হাওয়া। আমার একটু শীত করতে লাগল। বড়মামা বলল, তা হলে আর দেরি করে লাভ কী বাবুসোনা? তুই ভেতরে যা।

আমি ঘাড় নাড়লাম।

জিতু বলল, আমরা এখানেই আছি। কিছু এদিক ওদিক হলেই চিৎকার করবি। আমরা ছুটে চলে যাব।

আমি মনে মনে অপালার দাদুর কথাগুলো আওড়াচ্ছিলাম, ‘বনের বাঘে খায় না। মনের বাঘে খায়।’ ঠিকই। মনের ওপর চাপ পড়াতেই আমি ভয় পেয়েছি। শহরে বড় হওয়া ছেলে আমি, এসবে কোনও দিন বিশ্বাস করিনি। আজ ভয়ের মুখোমুখি হয়েই আমাকে ভয়কে জয় করতে হবে। মামাদের পেছনে ফেলে আমি এগিয়ে যেতে লাগলাম গাছে গাছে ঝুপসি হয়ে থাকা ঢিপিটার দিকে। কিন্তু যত এগোতে থাকলাম আমি বুঝতে পারলাম ইনফ্লুয়েঞ্জার জ্বরে যেমন সারা গায়ে ব্যথা হয় তেমন ভাবেই ভয়টা ছড়িয়ে পড়ছে আমার সমগ্র চেতনা জুড়ে। আমার হাতে একটা টর্চ আছে। সেই আলোয় শুকনো পাতা পেরিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি মন্দিরের দিকে কিন্তু টর্চের আলোয় ওই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এক সময় টর্চ নিভিয়ে দিলাম আমি। চেষ্টা করলাম অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে। আবছা আবছা দেখতে লাগলাম চারপাশ আর তখনই খেয়াল করলাম মন্দির চত্বরটা যেন শ্মশানের চেয়েও নিস্তব্ধ। একটু আগেই বিলমাঠে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনছিলাম। মাঝে মাঝে ব্যাঙ ডেকে উঠছিল। কিন্তু এখানে কোনও শব্দ নেই। চারদিকে শুধু লেপটে আছে দমবন্ধকর মৃত্যুহিম নিস্তব্ধতা। পায়ে পায়ে মন্দিরের দরজার সামনে এসে পৌঁছলাম আমি। খুবই সাদামাটা স্ট্রাকচার। দু’ধাপ সিঁড়ি। তার পর একটুখানি দালান মতো। তার পরেই গর্ভগৃহ। সেখানে টিমটিম করে একটা প্রদীপ জ্বলছে। সেই আলোয় সামান্য আলোকিত হয়েছে কালীমূর্তিটুকু। প্রদীপের শিখার ক্ষমতা ওটুকুই। তার সাধ্য নেই কালিগোলা অন্ধকারের সাথে পাল্লা দেয়। তাই বাকি মন্দিরটা ডুবে আছে আঁধারে। গুটি গুটি পায়ে আমি গর্ভগৃহের ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম। কতক্ষণ থাকতে হবে সে কথা অপালার দাদু আমায় বলেননি। আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম মিনিট দশেক থাকব। ভয়কে জয় করার চেষ্টা করতে করতে আমি গর্ভগৃহের দরজার কাছে বসে পড়লাম।

যে মন্দিরে নিয়মিত পুজো হয় সেখানে পুরনো ফুল, ধূপ, ধুনো, ফল-প্রসাদের একটা মিশ্র গন্ধ থাকে। এ মন্দিরও তার ব্যতিক্রম নয়। এই গন্ধটার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। বসে থাকতে থাকতে, প্রদীপের শিখায় আলোকিত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার যেন একটু একটু করে ভয়টা কেটে যেতে লাগল। মনে হতে লাগল এই দেবস্থানে অমঙ্গলজনক কিছু হওয়া সম্ভব নয়। যা ঘটেছে সবই আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। তার পেছনে বউকালীবাড়ির কোনও ভূমিকা নেই।

মিনিট দশেক প্রায় হয়ে এসেছে। আমি ওঠার তোড়জোড় করছি এমন সময় মন্দিরের বাইরে খুব অস্পষ্ট একটা শব্দ পেলাম। কেউ যেন জোরে নিঃশ্বাস নিল। খুব আবছা শব্দ কিন্তু ওই নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতার সুর কেটে গেল। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। যে ভয়টাকে আমি মন থেকে সরিয়ে ফেলেছিলাম সেই ভয় যেন ফের শ্বাপদের মতো গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। নিজের অজান্তেই হাত জোড় করে আমি বিড়বিড় করে উঠলাম, রক্ষা করো মা। রক্ষা করো। আর তখনই যেন আমার এই প্রার্থনাকে ব্যঙ্গ করে কেউ খলখল করে মেয়েগলায় হেসে উঠল। প্রদীপের অল্প আলোয় চকচক করে উঠল মূর্তির লাল জিভ আর দাঁতগুলো। আমার মনে হল এক্ষুনি ওই দাঁতগুলো আমার গলায় বসে যাবে। আমার পা টলে গেল। দরজার কপাট ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতেই করতেই শুনতে পেলাম আমার ঠিক পেছনে মন্দিরের চাতালটায় নূপুর বাজছে। রুমঝুম, রুমঝুম শব্দ করতে করতে কে যেন হেঁটে আসছে আমার দিকে। স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আমি পেছন ঘুরলাম আর ঘুরতেই দেখলাম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেই ছায়ামূর্তি। হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছে তার আঁচলের প্রান্ত। খুব উচ্ছল কণ্ঠে সে বলল, আমি জানতাম তুই আসবি। আমার ডাক কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না।

সমস্ত শরীর অসাড় করে দেওয়া ভয়ে আমি পালাতে চাইলাম কিন্তু পালানোর উপায় নেই। অলঙ্ঘ্য নিয়তির মতো আমার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে সে। অগত্যা পিছু হটলাম। কিসে যেন ধাক্কা খেলাম আমি। চমকে দেখলাম আমি দাঁড়িয়ে আছি কালীমূর্তির ঠিক খাঁড়াটার নীচে। আর তখনই নিভে গেল প্রদীপটা। হাড় জমিয়ে দেওয়া অন্ধকারে অভিশপ্ত এই মন্দির যেন আমার বলি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিল। অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি শুনলাম, কে যেন বড় মায়া ভরা গলায় আমার নাম ধরে ডাকছে।