লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১২

১২

ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে রইল রোশনি। তারপর ধপ করে শুয়ে পড়ল খাটের ওপর।

ছোট্ট দু’ কামরার ফ্ল্যাট রোশনির। কিন্তু খুব সুন্দর করে গোছানো। সব একেবারে পরিপাটি। যখনই এ বাড়িতে কেউ এসেছে অন্দরসজ্জা দেখে রোশনির প্রশংসা করেছে। ঘরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোশনি। ঘর গুছোতে বড় ভালোবাসে সে। শুধু ঘর কেন, এ জীবনে আনন্দ থেকে বেদনা, প্রেম থেকে বিচ্ছেদ সবই গুছিয়ে রাখতে হয়। সেসবও যত্ন করে তুলে রেখেছে রোশনি। খাট থেকে সোজা তাকালে দেওয়ালে একটা বড় ছবি টাঙানো। মায়ের। সেদিকে তাকিয়ে অজান্তেই চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল রোশনির। মা বেঁচে থাকলে আজ তার জীবনটা হয়তো অন্যরকম হত। তার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে মা ছিল একমাত্র মানুষ যে তাকে বুঝত। একমাত্র মাকেই সবটা খুলে বলতে পেরেছিল সে। শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়েছিল তার দিকে। তার পর মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল, এমন তো হয় বাবান। তোর যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই করবি। তোর ওপর আমার ভরসা আছে।

বাবা কিন্তু ভরসা করত না এতটুকু। মায়ের কাছে সব শুনে প্রবল অশান্তি করেছিল বাবা। প্রথমদিকে ভয় পেলেও ধীরে ধীরে নিজের মনকে শক্ত করেছিল রোশনি। মায়ের কথাটা সাহস দিত তাকে। কিন্তু রোশনির ষোলো বছর বয়সে এই সাহস দেওয়ার মানুষটা তার জীবন থেকে বরাবরের মতো হারিয়ে গেল। ডেঙ্গু হয়ে চারদিনের জ্বরে চলে গেল মা। মা মারা যাওয়ার পর কোনওমতে আরও দুটো বছর রোশনি বাড়িতে ছিল। কিন্তু দিন দিন বেড়ে চলছিল বাবার অত্যাচার। বাবা যেন সহ্যই করতে পারত না তাকে। প্রেসিডেন্সিতে চান্স পাওয়াটা রোশনির কাছে তাই মুক্তির ইশতেহার হয়ে এসেছিল। কিছু জমানো টাকা সম্বল করে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। তার পরের লড়াইটুকু শুধু রোশনিই জানে। এখনও মাঝে মাঝে সে নিজের হাত পায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবে, কী এক আশ্চর্য জাদুবলে সে সারভাইব করে গেল!

চোখের জল মুছে উঠে বসল রোশনি। এমনিতে সে খুবই শক্ত ধাতের মানুষ। কান্নাটান্না চট করে তার আসে না। কিন্তু ক’দিন যা চলছে তাতে মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ারই কথা। সেই বদ্রিনাথের ফোন আসা দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর তিতাসের এই অপমান। জল খেয়ে নিজেকে খানিকটা সামলে নিল রোশনি। তারপর মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসল। খবরটা দেওয়ার পরেই বদ্রিনাথের খুন হয়ে যাওয়া এবং শিশুমৃত্যুর ব্যাপারে তিতাসের কিছু বলতে না চাওয়া এই দুটো ঘটনার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত সমাপতন রয়েছে। রোশনির মনে হল, বদ্রিনাথের কথাই ঠিক। কোনও এক মারণ ভাইরাসের আগমন ঘটেছে এবং সরকার থেকে সবটা গোপন করে যাওয়া হচ্ছে। চোয়াল শক্ত হল রোশনির। তার মনে পড়ল, বদ্রিনাথ বলেছিল, শুধু কলকাতা নয়, হুগলি এবং বর্ধমানেও একই ঘটনা ঘটেছে। রোশনি সিদ্ধান্ত নিল, কালকেই এ নিয়ে একটা স্টোরি করবে। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে স্টোরিটা হয়তো ভাসা ভাসা হবে কিন্তু এটা নিয়ে একটা হইচই হওয়া দরকার।

রোশনির চিফ রিপোর্টার দেবকুমার ঘোষ মানুষটা ভালো। এইচ আর থেকে যখন রোশনির কাছে মেইল এসেছিল যে ঠিকমতো পারফর্ম না করতে পারলে চাকরি যাবে সে ছুটে গেছিল এই ভদ্রলোকের কাছে। বলেছিল, এর মানে কী দেবকুমারদা? আমি সদ্য জয়েন করেছি রিপোর্টিংয়ে। এতদিন সম্পাদকীয় আর রবিবারের পাতা বানিয়েছি। আমি তো রিপোর্টিংয়ের কিছুই জানি না। কোনও কন্ট্যাক্টই তৈরি হয়নি এখনও। সেখানে আমি নতুন স্টোরি কোথা থেকে আনব?

চেয়ার দেখিয়ে দিয়েছিলেন দেবকুমার ঘোষ, বোস ওখানে। অত ঘাবড়ানোর কী আছে? দেখ রোশনি, এই অফিসের বাইরে যে কুকুরটা শুয়ে থাকে সেও জানে তোর এই ট্রান্সফার নরমাল নয়। নেহাত কাউকে বিনা কারণে চাকরি থেকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া যায় না তাই এই নাটকটা করা হল। তুই সাপের ল্যাজে পা দিয়েছিস ভাই। আর সাপটা খুব ভালো করে জানে যে তুই রিপোর্টিংয়ে এসে থই পাবি না। কিন্তু এখানে আমার একটা কথা আছে। তোকে যখন আমার ডিপার্টমেন্টে দিয়েছে তখন তোর দায়িত্ব আমার। হ্যাঁ, ওই সাপটার যা ক্ষমতা সে তুলনায় আমি চুনোপুঁটি। আমি সরাসরি তোর চাকরি হয়তো বাঁচাতে পারব না তবে তোকে হেল্প করব।

সত্যিই সাহায্য করেছিলেন দেবকুমার ঘোষ। নিজের বেশ কিছু ভালো কনট্যাক্টের সঙ্গে রোশনির যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খবর তো আর গাছে ফলে না। তেমন খবর তৈরি হতে সময় লাগে। ফলে সময় চলে যাচ্ছিল কিন্তু রোশনির কপালে আর ব্রেকিং নিউজ জুটছিল না। যাই হোক, রোশনি সিদ্ধান্ত নিল এখনই একবার ব্যাপারটা দেবকুমারদাকে জানিয়ে রাখবে। আশা করা যায় ভদ্রলোককে কনভিন্স করানো খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। ফোনটা হাতে তুলে সবে বসের নম্বর ডায়াল করতে যাবে তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর ফুটে উঠেছে। একটু ভুরু কুঁচকেই ফোনটা ধরল রোশনি, হ্যালো।

ওপার থেকে একটা মেয়েলি গলা বলে উঠল, হ্যালো, রোশনি বলছেন?

হ্যাঁ বলছি। আপনি?

আমার নাম পল্লব।

একটা অদৃশ্য বিষম খেল রোশনি। তার জানা মতে পল্লব ছেলেদের নাম। কী হল ব্যাপারটা? রোশনিকে চুপ থাকতে দেখে ফোনের ও প্রান্ত থেকে সেই গলাটা বলে উঠল, আমার নাম আর গলা শুনে একটু ধন্দে পড়ে গেছেন তাই না? আসলে আমার গলাটা ফোনে মেয়েদের মতো শুনতে লাগে। আগে সামনে থেকেও লাগত কিন্তু এইচ এস দেওয়ার পর থেকে সেই ব্যাপারটা অনেক কমে এসেছে। এখন শুধু ব্যাঙ্ক থেকে যারা লোন দিতে ফোন করেন, তাঁরা, উবারওয়ালা আর অচেনা কেউ আমায় মেয়ে ভেবে ভুল করেন। আগে রাগ হত। ইদানীং অসুবিধে হয় না।

কিছু কিছু মানুষের কথা বলার ধরন হয় ভারী আন্তরিক। কথার মধ্যে যেন এক কাপ গরম কফির উষ্ণতা মিশে থাকে। রোশনির মনে হল এই লোকটিও তেমন। একটু হেসে বলল, আপনি ঠিক ধরেছেন। নাম আর গলা এ দুটো আমাকে একটু কনফিউজ করেছিল। বাই দ্য ওয়ে আমি কিন্তু আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।

চেনার কথাও নয়। আমি কেউকেটা নই। তবে কিছুক্ষণ আগেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আপনি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।

থমকে গেল রোশনি। একটু সময় নিয়ে বলল, আপনি কি তিতাস সেনের…

কথা শেষ করতে না দিয়ে ফোনের ওপারের মানুষটা বলল, হ্যাঁ। আসলে দুটো কথা বলব বলে ফোন করলাম।

একটু গম্ভীর হল রোশনি। তিতাসের ঘটনাটা ফের মনে পড়ে গেছে। তিতাসের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন যে কোনও কিছুকেই রোশনির এই মুহূর্তে অসহ্য লাগছে তবু নিজের সহজাত ভদ্রতাবোধকে সে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না। বলল, বলুন কী কথা। তার আগে বলুন আপনি আমার নম্বর পেলেন কী করে?

আমি এককালে আপনার কাগজেই চাকরি করতাম। কিছু বন্ধুবান্ধব আছেন ওখানে। তাঁদের থেকেই পেয়েছি।

জোর চমকে গেল রোশনি। দ্রুত বলে উঠল, এক মিনিট। এক মিনিট। আপনি নবজাগরণে চাকরি করতেন? আপনার নাম কী বললেন? পল্লব?

হ্যাঁ। ওটাই মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডে লেখা আছে।

আচ্ছা আপনার পদবী কি চক্রবর্তী?

হ্যাঁ। কিন্তু কেন বলুন তো? অন্য কোনও পদবি কি আপনি অ্যালাও করবেন না?

কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল রোশনি। তারপর একসাথে বেশ কয়েকরকম অনুভূতি ঘিরে ধরল তাকে। প্রথমেই তার খুব আনন্দ হল। তার পরে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে হল। তার পরে তিতাসের ওপর সব রাগ জল হয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল রোশনি কিন্তু গলার উচ্ছ্বাসটা আর চেপে রাখতে পারল না। লাফিয়ে উঠে বলল, আপনি… আপনি সেই পল্লব চক্রবর্তী? আপনিই তো নবজাগরণে ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ বলে একটা কলাম লিখতেন? বলুন না, আপনিই লিখতেন তো?

একটু লজ্জা পেল পল্লব। সে যখন নবজাগরণে চাকরি করত তখন এই কলামটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথমে সপ্তাহে একদিন করে বেরনোর কথা হয়েছিল পরে জনগণের দাবিতে সপ্তাহে ওটা তিনদিন হয়ে যায়। ওই কলামে পল্লব এই বাংলার সাধারণ মানুষদের নানা অসাধারণ কাহিনিকে গল্পের মতো করে সাজিয়ে দিত। তার জন্য তাকে ঘুরতেও হত প্রচুর। সে নিচু গলায় বলল, হ্যাঁ। আমিই ওটা লিখতাম।

আবেগ ভরভর গলায় রোশনি বলল, আমি আপনার ফ্যান পল্লবদা। জানেন আপনার ওই কলামটা পড়েই আমার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। তারপর আমি আপনার উপন্যাসও পড়েছি। আপনার ‘আলাপ করে ভালো লাগল’ তো আমার অল টাইম ফেভারিট।

একটু ইতস্তত করে পল্লব বলল, অনেক ধন্যবাদ। কেউ প্রশংসা করলে তার ভারী অস্বস্তি হয়।

রোশনি পল্লবের সে অস্বস্তি ধরতে পারল না। ধরতে পারার কথাও নয়। সে উত্তেজিত হয়ে বলল, ইশ! আজ আপনার এত কাছে গেলাম অথচ চিনতে পারলাম না! আমার যে এখন কী আফশোস হচ্ছে আপনাকে কী বলব? তবে বইয়ের ব্লার্বে আপনার যে ছবিটা আছে তার সাথে আপনার কোনও মিল নেই।

পল্লব হাসল, থাকবে কী করে? ওটা তো আজ থেকে বারো বছর আগে তোলা ছবি।

মানে? আপনার বইটা তো বেরিয়েছে বছর দুয়েক। সেখানে বারো বছরের পুরনো ছবি দিয়েছেন কেন?

সে এক অদ্ভুত করুণ কাহিনি। আপনাকে আর একদিন বলব। যাই হোক, যে দুটো কথা বলব বলে ফোন করা সে দুটো আগে বলি?

হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন।

দেখুন, প্রথমত আমি তিতাসের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইছি। আপনি কি ওর পদত্যাগের ব্যাপারে কিছু জানতে চেয়েছিলেন?

হ্যাঁ।

আমি আন্দাজ করেছিলাম। আসলে বিষয়টা একটু সেনসিটিভ। ওই নিয়ে তিতাস অনেকদিন অসুস্থও ছিল। সব মিলিয়ে হয়তো নার্ভ ফেল করেছে। তাই আপনার সাথে অমন ব্যবহার করে ফেলেছে। দয়া করে ওকে ক্ষমা করে দিন।

পল্লবের বলার মধ্যে যে আকুতি ছিল তা স্পর্শ করল রোশনিকে। সে লজ্জিত স্বরে বলল, ছি ছি। আপনি এভাবে ক্ষমা চাইছেন কেন? বাদ দিন ওসব। যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। একটা অনুরোধ করব?

বলুন।

আমাকে প্লিজ আপনি করে বলবেন না। আমি আপনার থেকে বয়সে ছোট। তার ওপর আপনার ফ্যান। আপনি আমায় তুমি করে বললে খুশি হব।

বেশ তাই হবে। তুমি কেমন আছ রোশনি?

হঠাৎ এই প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে গেল রোশনি। অনিচ্ছাতেও তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল যে শব্দটা তাকে হ্যাঁ আর অ্যাঁ-এর মাঝামাঝি রাখা যায়।

পল্লব বলল, ও কিছু না। তুমিটা ঠিক লাগসই হচ্ছে কি না দেখে নিলাম। এবার দ্বিতীয় কথাটা বলি? সেটা হল, তুমি তোমার অফিসের পাঞ্চিং কার্ডটা আমাদের বাড়িতেই ফেলে গেছ।

সে কী! চমকে উঠল রোশনি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তার। যেখানে সেখানে কার্ড ফেলে আসা তার বরাবরের বাজে স্বভাব। আর একবার এই কার্ড হারালে যন্ত্রণার শেষ থাকে না। অফিস থেকে একটা সাদা কাগজ মতো গলায় ঝুলিয়ে দেয় আর যতবার ঢুকতে বা বেরতে হয় ততবার জাবদা খাতায় নাম এন্ট্রি করতে হয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে হয়। অফিসের সিকিউরিটিগুলো এমন কর্তব্যপরায়ণ যে বিরাট খাতির থাকলেও এই কার্ডের ব্যাপারে কোনও রেয়াত করে না। আর একবার কার্ড হারালে পার্সোনেল ডিপার্টমেন্ট থেকে নতুন কার্ড দিতে প্রায় মাসখানেক লাগিয়ে দেয়। এবার অবশ্য কার্ডটা পাওয়া গেছে কিন্তু কাল সকালে অফিস যাওয়ার আগে আবার সেই বাঁশদ্রোণী অবধি উজিয়ে যেতে হবে ভেবেই রোশনির শরীরটা কেমন খারাপ করতে লাগল। রোশনিকে চুপ থাকতে দেখে পল্লব বলল, বিপদে পড়ে গেলে তাই না? এই কার্ড হারালে যে কী জ্বালা আমি জানি। তোমার কাছে এখন দুটো অপশন আছে। কাল সকালে অফিস যাওয়ার আগে তুমি কার্ডটা আমাদের বাড়ি থেকে কালেক্ট করতে পারো। আর সেকেন্ড অপশন হল, আমি তোমাকে কার্ডটা দিয়ে আসতে পারি।

ভদ্রতাও এক ধরনের প্রতিবর্ত ক্রিয়া। রোশনি দ্রুত বলে উঠল, না না। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি কাল অফিস যাওয়ার পথেই নিয়ে নেব।

সে তোমার ইচ্ছে তবে কষ্টের কিছু নেই। অফিসের এক বন্ধু জানালেন তোমার বাড়ি তো গলফ ক্লাব রোডে। আমার এখন গলফ গ্রিনে একটা মিটিং আছে। মিটিংটা শেষ হতে রাত হবে। যদি তুমি জেগে থাকো আমি ফেরার পথে তোমায় কার্ডটা দিয়ে আসব।

আমি অনেক রাত অবধি জেগেই থাকি। কিন্তু আপনার এত রাতে মিটিং?

প্রোডিউসার কর্তা। তাঁর ইচ্ছেতেই কর্ম। হাসল পল্লব।

মনে মনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেও একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে রোশনি বলল, আপনার অসুবিধে হবে না তো?

না না। অসুবিধের কী? আমি তো ড্রাইভ করে যাব। তুমি একজ্যাক্ট লোকেশনটা পাঠিয়ে রাখো এই নম্বরে। আমি মিটিং শেষে তোমায় ফোন করে নেব। তা হলে এখন রাখি কেমন? দেখা হচ্ছে।

ফোন কেটে দিল পল্লব। ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল রোশনি। তারপর এক পাক নেচে নিল। প্রিয় লেখক বাড়ি বয়ে কার্ড ফেরত দিতে আসছে! ব্যাপারটা যেন এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না রোশনির। ভাগ্যিস আজ তিতাসের সাথে তার ঝামেলা হল। আর তাই তো সে রাগের মাথায় কার্ড ফেলে চলে এল। রোশনির মনে হল, তিতাসের মতো ভালো মেয়ে আর দুটো হয় না। সামনে পেলে সে এখনই তিতাসকে চুমু খেত। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটা খুলে ফেলল রোশনি। পল্লবের অ্যাকাউন্ট খুঁজে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল আর পল্লবের একটা ছবি ডাউনলোড করে পোস্ট দিল, ‘আজ প্রিয় লেখকের সাথে দেখা হওয়ার দিন।’

* * *

এখন পৌনে একটা বাজে। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল রোশনি। রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পগুলো একচোখো পাহারাওলার মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকায় অনেক গাছ। অনেকগুলো আলো গাছের পাতায় ঢেকে আছে। ফলে একটা বিষণ্ণ আবছায়া তৈরি হয়েছে। কালো রাস্তার ওপর গাছের কালো ছায়া পড়ে রহস্য যেন আরও ঘন করে তুলেছে। একটা বাচ্চা কুকুর মৃদু ভুকভুক করতে করতে ছুটে চলে গেল। রেলিংয়ে ভর দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি। মিনিট পাঁচেক আগে পল্লব ফোন করেছিল। জানিয়েছিল, মিটিং হয়ে গেছে। বেরোচ্ছে।

রোশনি জিগ্যেস করেছিল, নীচে গিয়ে দাঁড়াবে কি না?

পল্লব বলেছিল, এত রাতে নীচে নামার দরকার নেই। তুমি সিকিউরিটিকে বলে রাখো। আমি তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে দিয়ে আসব।

কথাটা ভালো লেগেছিল রোশনির। পল্লবদা যে তার সুরক্ষার কথা ভাবছে সে জন্য নয়। মানুষটা কেমন নির্দ্বিধায় বলল, আমি তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে দিয়ে আসব। মানুষের থেকে এই অসঙ্কোচ ব্যবহারই তো আশা করে মানুষ। কিন্তু মানুষের মনে পাপ। মনের পাপ মানুষের ব্যবহারকে আড়ষ্ট করে তোলে। রোশনি ঠিক করে রেখেছে, পল্লবদা এলে তাকে সমাদর করে ঘরে ডাকবে। এক কাপ চা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়বে না।

পল্লবের ফোন পেয়েই নীচের সিকিউরিটিকে বলে দিয়েছিল রোশনি। পল্লবদা এলেই সে গেট খুলে দেবে। হিসেবমতো এবার পল্লবদার চলে আসার কথা। ভাবতে ভাবতেই বেজে উঠল কলিং বেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন কিশোরী মেয়েটি হয়ে গেলে রোশনি। ছুটে গিয়ে খুলে ফেলল দরজার লক। কিন্তু ছিটকিনিটা খুলতে খুলতে রোশনির মাথার মধ্যে টুং করে একটা বিপদঘণ্টি বেজে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য রোশনির মনে পড়ল সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে দু’দিকের রাস্তাই পরিষ্কার দেখা যায়। পল্লবদা বলেছিল, ড্রাইভ করে আসবে। ফলে যেদিক দিয়েই আসুক না কেন গাড়ি এলে সে তো দেখতে পেত। কিন্তু কোনও গাড়ি তো আসেনি। কাউকে সে ফ্ল্যাটে ঢুকতেও দেখেনি। তা হলে কলিং বেল দিল কে? যেই হোক সে পল্লবদা কিছুতেই নয়। ছিটকিনিটা ততক্ষণে খুলে ফেলেছে রোশনি। তাও রিফ্লেক্সে সেই জায়গাটা হাত দিয়ে চেপে ধরে সে চোখ রাখল আই হোলে আর চমকে উঠল। তার ঘরের সামনেটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। অন্যদিন বিকেলের পর থেকে সকাল অবধি এখানে একটা আলো জ্বলে। রোশনি যখন ফিরেছিল তখনও জ্বলছিল কিন্তু এখন আর জ্বলছে না। গা শিরশিরে একটা ভয়ে রোশনির পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠল। সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাতে সে ছিটকিনিটা ফের লাগাতে গেল কিন্তু তার আগেই প্রচণ্ড একটা ধাক্কায় খুলে গেল দরজাটা। সেই ধাক্কায় রোশনি ছিটকে পড়ল মেঝেতে। মাথাটা ঠুকে গেল একটা চেয়ারের কোণে। এক মুহূর্তের জন্য যেন চোখে অন্ধকার দেখল রোশনি। কানের মধ্যে যেন হাজার ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠল একসঙ্গে। কিন্তু একটু আগে পাওয়া অস্বস্তিকর ভয়টাই রোশনির চেতনা ফিরিয়ে দিল। অজানা বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই যেন মস্তিষ্ক ফের সচল হল নতুন করে। দৃষ্টি ফিরে আসতে লাগল ক্রমশ আর ঝাপসা চোখে রোশনি দেখল, ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লম্বামতো কেউ একটা বন্ধ করছে দরজাটা। আরও একটু স্পষ্ট হল রোশনির দৃষ্টি আর তখনই রোশনির দিকে ফিরে তাকাল সে। মুখটা ঢাকা একটা কালো মাঙ্কিক্যাপে। চোখ ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। তবু চিনতে ভুল হল না রোশনির। এ চাহনিতে লাশকাটা ঘরের ফরমালিনের গন্ধ। ধীরে ধীরে মাঙ্কিক্যাপটা খুলে ফেলল সে। আতঙ্কে স্থবির হয়ে রোশনি দেখল, তার দাঁতের ফাঁকে ঝকঝক করছে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো একটা ব্লেড।