২২
বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। ওরা সকলে বসে আছে শ্রীরঞ্জনী বাড়ির লাইব্রেরি ঘরে। ভাদুড়ি মশায়ের মধ্যে অস্বাভাবিক এক অস্থিরতা কাজ করছে। তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে। অকারণেই দু’বার চশমার কাচ মুছে নিলেন। তারপর গলা ঝেড়ে বললেন, আসলে কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না।
এই কথাটাতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হল। এতক্ষণ ঝিমিয়েছিল পল্লব। সোজা হয়ে বসল। বলল, আপনি জানতে পেরেছেন স্যার তিতাস কোথায় আছে? কেমন আছে?
থানা থেকে বেরিয়ে পল্লবকে ওই একটাই কথা বলেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর একেবারে চুপ হয়ে গেছিলেন। অপালাকে শুধু বলেছিলেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।
অপালার সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও চলে এসেছিল বারাসাতে। বাড়ি ফিরেই লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। একটু আগে দরজা খুলে ওদের সকলকে ভেতরে ডেকে নিয়েছেন। পল্লবের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, তিতাস ভালো আছে পল্লব। কিন্তু কোথায় আছে সেটা বলতে একটু সময় লাগবে। আমার কথাগুলো ধৈর্য ধরে শোনো।
সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে ভাদুড়ি মশায়ের মুখের দিকে। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, তিতাসের অন্তর্ধানের বীজ প্রোথিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে। লোকনাথ এসেছিল আমার শিষ্য হতে। সে কথা তোমাদের আগেও বলেছি। কিন্তু যেটা বলিনি সেটা হল, লোকনাথ তন্ত্রবিদ্যার অধিকারী হতে চেয়েছিল কারণ সে একজন মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে চাইত।
চুপ করে থাকতে পারল না অপালা, কী বলছ দাদু! মরা মানুষ বাঁচিয়ে তুলতে চাইত? ইজ ইট পসিবল?
থিয়োরি অনুসারে পসিবল। পৃথিবীর সব দেশের তন্ত্রতেই মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার উপায় বলা আছে। কিন্তু সেসব সাধনা অত্যন্ত গূঢ়, গোপন এবং কঠিন। শুধু কঠিন বললে ভুল হবে, প্রায় অসম্ভব। কারণ যে মারা গিয়েছে সে তার নিয়তি। নিয়তি কেন বধ্যতে। তাই মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুললে নিয়তির সাথে লড়াই করতে হয়। প্রকৃতির নিয়মের লঙ্ঘন হয়। প্রকৃতি চায় না তার নিয়মের অন্যথা হোক। কিন্তু লোকনাথের সাধনা এটাই যে সে মৃত মানুষকে বাঁচাতে চায়। তাই বারবার করেই সে বেছে নেয় কঠিনতম, গোপনতম সব সাধনার পথ। সে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল গেনুর থেকেও শক্তিধর এক দানব, যার সাহায্যে সে খুলে ফেলতে পারত নরকের দরজা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার সাধনা ভেস্তে দিয়েছিল তিতাস। তাই তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল তিতাসের ওপর। এতদিনে সে প্রতিশোধ নিয়েছে।
প্রতিশোধ? চমকে উঠল পল্লব, লোকটা তিতাসের কোনও ক্ষতি করে দিয়েছে তাই না স্যার? পল্লবের গলায় আর্তি, কিন্তু আপনি যে বললেন তিতাস ভালো আছে। কী হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
শান্ত হও পল্লব। তিতাসের কোনও শারীরিক ক্ষতি লোকনাথ করেনি। সেদিক থেকে যদি দেখো তিতাস শারীরিক ভাবে সুস্থই আছে। ভালো আছে। কিন্তু তিতাস আর তিতাস নেই। সে এখন স্বয়ং ইনান্না!
ইনান্না!, সেটা আবার কী? অবাক গলায় বলে উঠল অমিয়।
কী নয়, কে? ইনান্না হলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার একজন দেবী। সম্ভবত সবচেয়ে চর্চিত দেবী। আমি ঠিক বলছি তো দাদু? বলে উঠল অপালা।
মাথা নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, ঠিক।
এক মিনিট, এক মিনিট। উঠে দাঁড়িয়েছে পল্লব, স্যার আপনি এইমাত্র বললেন, তিতাস এখন স্বয়ং দেবী ইনান্না। কিন্তু তিতাস দেবী হবে কী করে?
এটাই তো লোকনাথের অদ্ভুত প্রতিশোধ পল্লব। আমার পুরো কথাটা আগে শোনো। জেলে যে ছেলেটি বন্দি আছে তার নাম তড়িৎ। সে রোশনিকে মারতে আসেনি। এসেছিল তার যমজ দাদা সরিত। লোকনাথ তাকেই ভালোবেসে গেনু বলে ডাকে। তাই রোশনির কাছে ওই নামটাই বলেছিল ছেলেটি। সে যাই হোক, তড়িৎ স্বীকার করেছে সে একদিন ইচ্ছাকৃত পল্লবদের গাড়ির সামনে এসে পড়ে এবং হাসপাতালে যাওয়ার সময় তিতাসের একগুছি চুল কেটে নেয়।
চমকে উঠল পল্লব। ঠিক তো, এই ছেলেটার সাইকেলের সাথেই তো তার গাড়ির ধাক্কা লেগেছিল। তাই এত চেনা চেনা লাগছিল ছেলেটাকে। বলল, ছেলেটা তিতাসের চুল কেটে নিয়েছিল?
হ্যাঁ। লোকনাথই ওকে পাঠিয়েছিল। ছেলেটা ওই চুল দিয়েছিল লোকনাথকে আর তাই দিয়েই লোকনাথ জাগিয়ে তুলেছে এমন এক অভিশাপ যা সহস্রাধিক বছর ধরে গুমরে মরছে মহাসিন্ধুর ওপারে দুই নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক প্রাচীন সভ্যতার উপকথায়। জাগিয়ে তুলেছে দেবী ইনান্নাকে। আমি তোমাদের ইতিহাস পড়াতে বসিনি। এখন সে পরিস্থিতিও নয়। তবু কিছুটা হলেও তোমাদের সবাইকে জানতে হবে কারণ এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে তিতাসের ঘটানো অদ্ভুত ঘটনাগুলোর কারণ, তিতাসের অন্তর্ধান এবং এই সমস্যার প্রতিকার।
এক চুমুক জল খেলেন ভাদুড়ি মশায়, একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তোমরা জানো টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়া বা সুমেরীয় সভ্যতা। এখন যেখানে ইরাক, ইরানের কিছুটা অংশ, কুয়েত আর সিরিয়া। এই সুমেরদের প্রেম, যুদ্ধ আর উর্বরতার দেবী হলেন ইনান্না। অনেকটা গ্রিসের আফ্রোদিতির মতো। দেবী সিংহবাহিনী। ইনান্নাকে নিয়ে অনেক মিথ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মিথ হল, ইনান্না স্বর্গ থেকে ‘মরালিটি’ অর্থাৎ নীতিজ্ঞান চুরি করেছিলেন। তার পর চলে গিয়েছিলেন নরকে। এই মিথকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন তন্ত্রাচার। যার ওপর এই তন্ত্র প্রয়োগ করা হয় সে দেবীকে দেখতে পায়। অনুভব করতে শুরু করে। নিজেকে ক্রমশ দেবী ইনান্না ভাবতে শুরু করে। দেবী তাকে সমস্ত মূল্যবোধ, নীতিজ্ঞান জলাঞ্জলি দিতে উসকানি দেন। বুঝতেই পারছ তিতাস কেন ওই ভয়ানক ঘটনাগুলো ঘটিয়েছিল। এই করতে করতে যখন সেই তন্ত্রবিদ্ধ মানুষটা চূড়ান্ত অন্যায় করে ফেলে তখন তার নরকগমন হয়। এক মুহূর্তের জন্য খুলে যায় নরকের দরজা আর মানুষটাকে টেনে নেয় ভেতরে। তিতাসের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অন্যায় হল, মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া। তিতাস এই মুহূর্তে রয়েছে নরকে।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। ওরা যদি এর আগে মিতুলের ঘটনাটা নিজের চোখে না দেখত তা হলে এসব কথা হয়তো উড়িয়েই দিত। কিন্তু ওরা জানে, এ দুনিয়ায় যতটা দেখা যায় তার বাইরেও অনেক বড় একটা দুনিয়া আছে। সেখানে ওদের দুনিয়াদারি চলে না। চলে ভাদুড়ি মশায়ের। চলে লোকনাথের।
আস্তে আস্তে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছিল পল্লবের। বারবার করে কানে বাজছিল ভাদুড়ি মশায়ের কথাটা, ‘তিতাস এখন নরকে’। বেপথু হয়ে যাচ্ছিল ভাবনা। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তিতাসের সঙ্গে কাটানো আশ্চর্য দিনগুলো। প্রাণশক্তিতে ভরপুর তিতাস, আনখশির সৎ মানুষ তিতাস, তাকে দিয়ে এমন সব অন্যায় করাল লোকনাথ যে তিতাসের নরকবাস হল! পল্লব শুনেছে, দান্তের ইনফার্নোতে পড়েছে নরকের বর্ণনা। নরক ভালো জায়গা নয়। তিতাস খুব টিপটপ মানুষ। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে ভালোবাসে। ওই নোংরা জায়গায় তিতাসের দম আটকে আসবে। এটা তিতাস ডিজার্ভ করে না। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল পল্লব। তারপর আচমকাই পা চেপে ধরল ভাদুড়ি মশায়ের। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তিতাসকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন স্যার। ওকে নরক থেকে বার করে আনুন প্লিজ। ওর তো নরকে থাকার কথা নয়। প্লিজ স্যার ওকে ফিরিয়ে দিন আমার কাছে। তিতাসকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।
পল্লবের মাথায় হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। পল্লব বুঝতে পারছিল, এতক্ষণ যে ভয়াবহ যন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করেছিল তার উপশম হচ্ছে। আরাম হচ্ছে ব্যথার। চোখ মুছে সে তাকাল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। বৃদ্ধ বললেন, শক্ত হও পল্লব। আমরা খুব কঠিন একটা লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তোমাকে বলেছিলাম, লোকনাথ যদি তিতাসকে নরকেও লুকিয়ে রাখে আমি সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব। বিশ্বাস করো আমিও ভাবিনি আমার কথা এতটা লেগে যাবে। আমি নিজেও ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। এখন যদি তুমি ভেঙে পড়ো আমি দুর্বল হয়ে পড়ব। আমার গুরুদেব বলতেন, লেগেপড়ে থাক নীরেন, অলৌকিক হবেই। আমাদের প্রত্যেককে এখন লেগেপড়ে থাকতে হবে। কারণ, এই মুহূর্তে তিতাসকে উদ্ধার করতে গেলে অলৌকিক ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই। তিতাসকে ফিরিয়ে আনতে গেলে লোকনাথ যে তন্ত্রের সাহায্যে তিতাসকে নরকে পাঠিয়েছে সেই তন্ত্রের সাহায্যেই আমাদের নরকের দরজা খুলতে হবে। আর সেটা অসম্ভব না হলেও ভয়ানক রকমের দুঃসাধ্য।
পল্লব উত্তেজিত, দুঃসাধ্য বলছেন কেন স্যার? লোকনাথের থেকে আপনি তো বেশি জানেন। তাই না? তা হলে খুলে ফেলুন না স্যার নরকের দরজা। আমরা তিতাসকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি।
বেচারা পল্লব! তিতাসের কথা ভাবতে ভাবতে ছেলেটার স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ছেলেটার জন্য বড় কষ্ট হল ভাদুড়ি মশায়ের। ম্লান হেসে বললেন, পল্লব, এ কি যেমন তেমন দরজা যে চাইলেই খুলে ফেলা যাবে? এ নরকের দরজা পল্লব। আমি কোনওদিন এই তন্ত্র অভ্যাস করিনি। প্রয়োগ করিনি।
আপনি জানেন না, অথচ লোকনাথ জানে!, বিস্ময় এবার সঞ্জয়ের গলাতেও।
সঞ্জয়, তোমরাও মাঝে মাঝে ভুলে যাও, আমি তান্ত্রিক নই। তন্ত্রচর্চা করেছি আমি অ্যাকাডেমিক কৌতূহলে। হ্যাঁ, গুরুকৃপায় কিছু শক্তি আয়ত্ত করেছি বটে কিন্তু সব তন্ত্র তো আমি প্রয়োগ করিনি। মেসোপটেমিয়ার এই অদ্ভুত তন্ত্রও তার মধ্যে একটি। আমি তো বললামই, এই তন্ত্র অনুসারে তন্ত্রবিদ্ধ মানুষটির পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে নিজে থেকে নরকের দরজা খুলে যাবে এবং তার নরকপ্রবেশ হবে কিন্তু তাকে উদ্ধার করে আনার জন্য যদি নরকের দরজা খুলতে হয় তা হলে দরকার পড়বে দেবী ইনান্নার হাতের দণ্ড। যাতে খচিত আছে এক আশ্চর্য উজ্জ্বল লাপিস লাজুলি। সোজা করে বললে নীলকান্তমণি।
কোথায় আছে স্যার সেই দণ্ড? দ্রুত বলে উঠল পল্লব, বলুন আমায়, আমি নিয়ে আসব। বলুন কোথায় আছে?
সেই দণ্ড রয়েছে প্রাচীন সুমেরীয় উপকথায়। থেমে থেমে বলে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়।
মানে? ফের অস্থির পল্লব।
মানে দেবী ইনান্নার নীলকান্তমণি খচিত দণ্ডটির উল্লেখ ছড়িয়ে রয়েছে সুমেরীয়দের উপকথায়, লোকগানে কিন্তু খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে থেকে আজ অবধি বহু মানুষ বহু খুঁজেও সেই দণ্ডের কোনও অস্তিত্ব পায়নি।
সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়ি মশায়। বুঝি তাঁর ইষ্টকে বোঝাতে চাইলেন তাঁর অসহায়তার কথা। ঘরের মধ্যে পিন পতনের নীরবতা। সকলেই বুঝতে পারছে তিতাসকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা আসলেই একটা অলীক কল্পনা। অনেকটা মিথের মতো। উপস্থিতি আছে কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। চোখ মুছে পল্লব বলল, আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন স্যার, তিতাসের কোনও ক্ষতি হতে দেবেন না।
সে কথা আমি এখনও বলছি পল্লব।
কিন্তু কী করে?
দেবীর ওই দণ্ড আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।
একসাথে চমকে উঠল সবাই। পল্লবের কণ্ঠে উত্তেজনা, এইমাত্র আপনি বললেন হাজার হাজার বছর ধরে ওই দণ্ড কেউ খুঁজে পায়নি। বললেন, ওই দণ্ডের কথা আছে শুধু প্রাচীন সুমেরীয় উপকথায়। তা হলে? যেটা আদপে নেই তা আমরা খুঁজব কেমন করে?
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর বললেন, এতদিন পর্যন্ত আমারও ধারণা ছিল দেবীর ওই দণ্ড মিথ। কিন্তু এখন আর তা মনে হচ্ছে না। আমার গুরু রামদাস ঠাকুর বলতেন, সমস্যার মধ্যেই তার সমাধানের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। লোকনাথ যখন ওই বিশেষ তন্ত্র তিতাসের ওপর প্রয়োগ করতে পেরেছে তখন আমরাও তিতাসকে উদ্ধার করতে পারব। আর সবথেকে বড় কথা, হাজার হাজার বছর ধরে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি মানে সেটা নেই এমন তো নয়। মানব সভ্যতার শুরুর দিকে যে মানুষেরা ছিল তারা ডাইনোসরের কথা জানত না কারণ তারা আসার বহু বছর আগেই ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। তাই না? তার মানে ডাইনোসর ছিল না এমন তো নয়। আধুনিক মানুষ ডাইনোসরের ফসিল আবিষ্কার করার পর সে ব্যাপারে জানতে পেরেছে। তাই যদি সঠিক পথে খোঁজা যায়, আমার বিশ্বাস আমরাও খুঁজে পাব সেই মিথিক্যাল দণ্ড! আর তার থেকেও বড় কথা, আমাদের খুঁজে পেতেই হবে। তিতাসকে ফিরিয়ে আনার জন্য।
ভাদুড়ি মশায়ের ক্লান্ত চোখ এখন আত্মবিশ্বাসী। পল্লব বলতে গেল, স্যার…
হাত তুলে থামিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়, আজ আর কথা নয় পল্লব। তোমরা যাও। আমাকে একটু ভাবতে দাও। কোথা থেকে আমরা এর খোঁজ শুরু করব তার জন্য আমাকে ভাবতে হবে। আমি আগামী কাল সকালে তোমাদের সঙ্গে আবার বসব। আর হ্যাঁ, অমিয়, যে ছেলেটি পুলিশের কাস্টডিতে রয়েছে ও যেমন আছে তেমনই থাক। শুধু পুলিশকে বলো, তদন্ত প্রক্রিয়া যেন আপাতত বন্ধ রাখে। ওই ছেলেটিকে আমাদের দরকার হবে।
মাথা নাড়ল অমিয়, আচ্ছা স্যার।
এক-এক করে সকলে বেরিয়ে গেল লাইব্রেরি ঘর ছেড়ে। বেরনোর সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিল অপালা। লাইব্রেরি ঘরে এখন ভাদুড়ি মশায় একা। সিলিং পর্যন্ত উঁচু তাকে থরে থরে সাজানো বই। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা সারা ঘর জুড়ে। এই ঘরটাতে এসেই বারবার নিজের মুখোমুখি হন তিনি। তিনি জানেন, যতটা সহজ করে পল্লবদের ওই দণ্ড খোঁজার কথা বলেছেন, সত্যি সত্যি খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া হবে তার হাজার গুণ কঠিন। আর যদি বা সেই দণ্ড খুঁজে পাওয়া যায়, তার পর? দেবী ইনান্নার মিথের শেষটুকু যে তিনি বলেননি সবার সামনে। যদি নরক থেকে কাউকে এই দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনতে হয় তা হলে এই দুনিয়া থেকেও কাউকে চলে যেতে হয় নরকে। এটাই নিয়ম। দেবী ইনান্নার বদলে নরকগমন করেছিলেন তাঁর স্বামী দুমুজি। এক্ষেত্রে তিতাসের বদলে পল্লব। এমন ভয়ানক এক তন্ত্র লোকনাথ প্রয়োগ করেছে যেখানে তিতাসকে বাঁচাতে গেলে বলি দিতে হবে পল্লবকে। কী করবেন তিনি? কাকে বাঁচাবেন? তিতাস, পল্লব দু’জনেই তাঁর আপন জন। কাউকেই তো হারাতে পারবেন না তিনি। বড় অসহায় লাগে তাঁর। লোকনাথ বেঁচে আছে জানার পরেও তিনি কোনও সাবধানতা নেননি। আজ তারই ফল ভুগতে হচ্ছে তিতাস আর পল্লবকে। বাকিদেরও। ভূতগ্রস্ত তিতাস যা করে গিয়েছে তাতে কি আর কোনওদিন স্বাভাবিক হবে অমিয় আর মিতুলের সম্পর্ক? পল্লব কি কোনওদিন আগের মতো ভালোবাসতে পারবে তিতাসকে? অবশ্য পল্লব আদৌ থাকবে কি না সেটাই তো প্রশ্ন। কী করবেন তিনি? সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে বৃদ্ধের। এখন একটাই পথ। চোখ বন্ধ করে গুরুর নাম স্মরণ করতে থাকেন ভাদুড়ি মশায়। ধীরে ধীরে মন সংহত হল একটি বিন্দুতে। মানস চক্ষে ভেসে উঠল সেই সদাহাস্যময় মুখ।
আবার সেই পুরনো দিনের মতো গুরুর সামনে নতজানু হল নীরেন। বুকে টেনে নিলেন রামদাস ঠাকুর, কাঁদিস কেন পাগলা? চোখ মোছ।
বড় অস্থির লাগে গুরুদেব। লোকনাথকে বাঁচিয়ে রেখে আমি কি ভুল করেছি? অপূর্ব কোনও মৃত্যু তো আমিও ওকে দিতে পারতাম। কিন্তু…
ওই তো, ওই কিন্তুতেই তো যত জ্বালা রে নীরেন। মানুষ অনেক কিছুই করে ফেলত যদি কিন্তু ঠাকুর না থাকতেন। তুই কোনও ভুল করিসনি। শিষ্যকে কি মারা যায়? গুরু তো মা। কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কদাপি নয়। যা হয়েচে বেশ হয়েচে। অতীত নে পড়ে থাকিস নে। তুই জানিস কী করতে হবে। কঠিন কাজ কি আগে করিসনি? করেচিস তো। তবে? শক্ত হ। তুই লাতন হয়ে পড়লি যে ছেলেমেয়েগুলো খেই হারিয়ে ফেলবে হতভাগা। নীরেন থেকে তুমি ভাদুড়ি মশায় হয়েচ, তালেবর হয়েচ, ঝামেলা পোহাবে নে? আমি বলচি ভয় নেই নীরেন, তন্ত্রই পালক, তন্ত্রই সংহারক। যে তন্ত্র সংহার করতে চাইচে, তার শুভঙ্করী শক্তিই তোরে বাঁচাবে। লেগেপড়ে থাক। অলৌকিক হবেই। অলৌকিক হবেই। অলৌকিক হবেই…
গুরুর কণ্ঠ মিশে যায় লাইব্রেরি ঘরের বাতাসে। আহ বড় শান্তি। সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। তিনি বিশ্বাস করেন, এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স। দৈবের সঙ্গে অসম লড়াইতে নামতে চলেছেন তাঁরা। বুদ্ধিমত্তা দিয়েই জয় করতে হবে দৈবকে। টেলিফোন নম্বর লেখা ডায়েরিটার দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। একজনকে ফোন করতে হবে। দেবী ইনান্নার দণ্ডের খোঁজ কোথা থেকে শুরু করতে হবে সে কথা কিছুটা হলেও জানে এই লোকটা। ফোন করলেন ভাদুড়ি মশায়। ওদিকে রিং হচ্ছে, ক্রিরিরিরিরিরং, ক্রিরিরিরিরিরং…
