৩
মনটা ভারী খুশি ছিল বদ্রিনাথের। যে খবরটার জন্য গত কিছুদিন ধরে লড়ে যাচ্ছে তার একটা বড় সূত্র আজ হাতে এসেছে। বাচ্চা মৃত্যুর ব্যাপারটা হুগলিতে না, শুরু হয়েছিল কলকাতায়। সাত-আট মাস আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পরপর এরকম দুটো কেস এসেছিল। তার একটা নিয়ে তো বিরাট হুলস্থুল হয়েছিল। সরকার তখনও রোগটার গুরুত্ব ধরতে পারেনি তাই কাগজে লেখালিখিও হয়েছিল অল্প করে। আসলে সেই সময় জুনিয়র ডাক্তারেরা ধর্মঘট করে দেওয়ায় খবরটা অন্যদিকে ঘুরে যায়। পুরনো কাগজ ঘেঁটে বদ্রিনাথ এও জানতে পেরেছে, সে সময় এই ডামাডোলে তিতাস সেন নামে একজন ডাক্তার রিজাইনও করেছিল। কাল রোশনি ম্যাডাম আসছে। তাঁকে সবটা খুলে বলতে হবে। হ্যাঁ, নতুন একটা রোগের আমদানি হলে সেটা নিয়ে ঢাকঢোল না পেটানোরই কথা। তাতে লোকে বেশি ঘাবড়ে যায় কিন্তু তা বলে খবরগুলো চেপে দেওয়াও তো কাজের কথা না। এভাবে একের পর এক ফুটফুটে বাচ্চাগুলো মরে যাবে, এ মেনে নেওয়া যায় না কি! এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরছিল বদ্রিনাথ। ভালোই রাত হয়েছে। রাস্তাঘাটে লোকজন নেই। দু’একটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে এদিক ওদিক। হঠাৎই উল্টোদিক থেকে একটা সাইকেল এগিয়ে এসেছিল। এসে থেমেছিল একেবারে গা ঘেঁষে। চমকে উঠেছিল বদ্রিনাথ। সাইকেল আরোহী তার মুখ চেনা। কয়েকদিন আগেও মোড়ের চায়ের দোকানে দেখেছে। দোকানটা চালায় মন্টু। বদ্রিনাথ মন্টুকে জিজ্ঞেস করেছিল, কে রে ছেলেটা? নতুন না কি?
মন্টু বলেছিল, হ্যাঁ। মনে হচ্ছে ভাড়া এসেছে।
ভারী অদ্ভুত দেখতে ছেলেটাকে। ছিপছিপে, লম্বা, ফর্সা, কাটাকাটা চোখমুখ। সুন্দরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লোকে এগুলোই বোঝায় কিন্তু সব ক’টা দিক মিলে যাওয়ার পরেও ছেলেটাকে সুন্দর দেখতে বলা যাবে না। তার কারণ ছেলেটার মুখের মধ্যে অদ্ভুত একটা নিরাসক্তি আছে। চোখ দু’টো যেন পাথরের। কোনও অভিব্যক্তিই ফোটে না তাতে। যাদের চোখ কথা বলে না তাদের মোটে ভালো লাগে না বদ্রিনাথের। সে বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, এ কী! একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়লে যে!
ছেলেটা হড়বড় করে বলে উঠল, সরি দাদা। আসলে মায়ের খুব শরীর খারাপ। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পাশের বাড়ি থেকে বলল, হাসপাতালে আপনার অনেক চেনাশোনা। তাই আপনার বাড়ি গেছিলাম। গিয়ে শুনলাম আপনি নেই। ভাবলাম, হয়তো চায়ের দোকানে আছেন। তাই ছুটে যাচ্ছিলাম। সরি দাদা, একটিবার আমাদের বাড়ি যাবেন প্লিজ? মায়ের এখন তখন অবস্থা!
এসব ব্যাপারে বদ্রিনাথ না করতে পারে না। বিপদে-আপদে এলাকার লোকজন তার কাছে আসে। মনে মনে বিরক্তি চেপে সে বলল, চলো। কোথায় বাড়ি তোমাদের?
দাদা, পশ্চিমপাড়ায়।
ও। ক্যারিয়ারে বসব?
হ্যাঁ দাদা। বসুন।
বদ্রিনাথকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে হু হু করে সাইকেল ছুটিয়ে দিল ছেলেটা। চালাতে চালাতে বলল, কবরখানার মধ্যে দিয়ে গেলে শর্টকাট হয়। যাব দাদা? আপনার ভূতের ভয় নেই তো?
হাসল বদ্রিনাথ, না হে। ওসব ছেলেবেলায় থাকে। যেখান দিয়ে তাড়াতাড়ি হয় চলো। একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিয়ে আমায় আবার ফিরতে হবে। অনেক রাত হল।
বলতে বলতেই রাস্তা থেকে সাইকেল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল ছেলেটা। এ রাস্তা বদ্রিনাথ চেনে। সামনে বড় দরগার কবর পেরোলেই ওপারে বড় রাস্তা। বড় রাস্তায় উঠে কিছুটা গিয়ে ডানদিকে নিলেই পশ্চিমপাড়া। বদ্রিনাথ বলল, তোমায় সেদিন দেখলাম চায়ের দোকানে। ক’দিন এসেছ এদিকে?
ছেলেটা বলল, বেশি না। এই মাস দুয়েক হবে।
ততক্ষণে কবরখানার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সাইকেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছেলেটা এক হাতে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ধরে রেখেছে আর এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। এবড়োখেবড়ো মাটিতে বেশ লাফাচ্ছে সাইকেলটা। তার ওপর ছেলেটা জোরে চালাচ্ছে বলে বসতে আরও অসুবিধে হচ্ছে। বদ্রিনাথ মনে মনে ভাবল, রোগাপাতলা হলে কী হবে? ছেলেটার গায়ে তো বেশ কষ আছে। এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে এই পথে ডবল ক্যারি করা মুখের কথা না। সে বলে উঠল, একটু আস্তে চালাও ভাই।
বলতে না বলতেই আচমকা ব্রেক মেরে দিল ছেলেটা। মাটিতে চাকা ঘষটে বিশ্রী আওয়াজ করে দাঁড়িয়ে গেল সাইকেলটা আর টাল সামলাতে না পেরে বদ্রিনাথ উল্টে পড়ল একটা কবরের ওপর। কবরের ধারগুলো ইট দিয়ে বাঁধানো। তাতে ঘষা খেয়ে কনুইয়ের নুনছাল উঠে গেল। প্রচণ্ড মাথা গরম হয়ে গেল বদ্রিনাথের। ততক্ষণে ছেলেটাও নেমে পড়েছে। সাইকেল স্ট্যান্ড করে এগিয়ে এসেছে বদ্রিনাথের দিকে। বদ্রিনাথ রেগে বলল, ইয়ার্কি না কি! এই ভাবে কেউ সাইকেল চালায়! মানছি মা অসুস্থ তাই বলে বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে?
করুণ গলায় ছেলেটা বলল, সরি দাদা। আপনি যে পড়ে যাবেন আমি বুঝতে পারিনি। মনে হল সামনে দিয়ে একটা সাপ যাচ্ছিল তাই ব্রেক মেরে দিয়েছিলাম। উঠে আসুন।
ডান হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটা। তার হাত ধরে বদ্রিনাথ উঠে দাঁড়াল আর উঠে দাঁড়ানো মাত্রই ছেলেটার বাঁ হাতটা বদ্রিনাথের গলা বরাবর বিদ্যুতের মতো একবার এদিক থেকে আড়াআড়ি ওদিকে চলে গেল। বিস্মিত হয়ে বদ্রিনাথ দেখল, কেউ যেন ছেলেটার মুখে, জামায় পিচকিরি দিয়ে কোনও তরল ছিটিয়ে দিল নিমেষে। কয়েক মুহূর্ত পর বদ্রিনাথ অনুভব করল সে আর শ্বাস নিতে পারছে না। সে প্রাণপণে নাক মুখ দিয়ে বাতাস টানছে কিন্তু সে বাতাস পৌঁছচ্ছে না বুক অবধি। বুকের ভেতরটা এক বিন্দু বাতাসের জন্য আকুলিবিকুলি করছে। বড় কষ্ট হচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। সেই ঝাপসা চোখেই সে দেখতে পেল, ছেলেটার বাঁ হাতে কী যেন চকচক করছে। অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব প্রভা আছে। সেই সামান্য স্পষ্টতাতেও বদ্রিনাথ বুঝতে পারল, ওটা একটা ব্লেড আর নাক মুখ দিয়ে প্রাণপণে টানা সমস্ত বাতাস তার গলার ক্ষত দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার মুখে জামায় যা ছিটকে লাগছে তা তারই রক্ত। ছেলেটা ডান হাতে এখনও শক্ত করে তার হাত ধরে রেখেছে। মরে যেতে যেতে বদ্রিনাথ অবাক হয়ে দেখল, ছেলেটার চোখ দুটো হাসছে!
