৫
মোটরসাইকেল দু’জাতের। এক, বুলেট। দুই, বাকি যা কিছু। সবাই বুলেট চালাতে পারে না। সবার বুলেট চালানোর যোগ্যতা থাকে না। অনধিকারীর হাতে বুলেটও আর পাঁচটা মোটরসাইকেল। যার পয়সা আছে, সে একটা কেন, দশটা বুলেট কিনতে পারে কিন্তু তার মানেই সে বুলেট চালানোর অধিকারী হয়ে উঠবে এমন কোনও কথা নেই। সত্ত্বঃ, তমঃ আর রজোঃ গুণের সুষম বণ্টনে তৈরি হয়েছে বুলেট নামে বস্তুটি। বুলেট আসলে মানুষের তৈরি কোনও যন্ত্র নয়, ঈশ্বরদত্ত মন্ত্রগুপ্তি। সমুদ্রমন্থনে উঠে এসেছিল ইন্দ্রের ঘোড়া উচ্চৈশ্রবাঃ, বুলেট হল তার আধুনিক রূপ। তাই বুলেট চালাতে গেলে যেমন প্রয়োজন ঋষিসুলভ ঔদার্য, তেমনই প্রয়োজন রাজকীয় উন্নাসিকতা। বুলেট কখনওই খুব জোরে বা খুব আস্তে চালানো উচিত না। বুলেটের আচরণ হওয়া উচিত যূথশ্রেষ্ঠ গজপতির ন্যায়, অভিজাত। আপাত মন্থর অথচ প্রতিটি পদক্ষেপেই অমিত গতিশক্তির ইঙ্গিতবহ।
অন্য মোটরসাইকেলগুলোকে তাচ্ছিল্য করে মসৃণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল অমিয়র জলপাই রঙের বুলেট, আর চালাতে চালাতে এই সবই ভাবছিল অমিয়। অমিয় খেয়াল করে দেখেছে, দুটো সময়ে তার স্বাভাবিক সত্তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। বুলেট হাতে নিলে সে হয়ে ওঠে দার্শনিক আর মিতুলের সামনে অর্গলহীন হয়ে ওঠে তার লাজুক কবিমন। এই মুহূর্তে অমিয় বুলেট চালিয়ে মিতুলের সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি যে বেশ ঘোরালো সহজেই অনুমেয়।
আজ মিতুলের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে অমিয় ছুটি নিয়েছে। পল্লব আর তিতাসও আসছে। এতক্ষণে ওদের পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু পল্লব ফোন করে জানিয়েছে, আসতে গিয়ে একটা ছেলের সাথে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে, তাই দেরি হবে। তবে বাড়াবাড়ি কিছু না।
পল্লব আর তিতাসের আসতে খানিক দেরি হবে শুনেই চট করে প্ল্যানটা করে ফেলেছিল অমিয়। ঠিক করে ফেলেছিল, মিতুলকে নিয়ে লাঞ্চে যাবে। তবে অমিয় যে আসবে মিতুল জানে না। এটা সারপ্রাইজ। মিতুলদের কলেজে এখন গরমের ছুটি। ফলে মিতুল বাড়িতেই আছে। মিতুলদের বাড়ির সামনে গিয়ে বুলেটটা থামাল অমিয়। তারপর হর্ন দিল পরপর তিনবার। আজকাল আর বাঁশির যুগ নেই। হর্ন শুনেই রাধিকা আকুলা হন। বোঝেন, অভিসারের সঙ্কেত এসেছে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। হুড়মুড় করে বারান্দায় বেরিয়ে এল মিতুল আর অমিয়কে দেখেই তার চোখ দুটো গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল। প্রথমত, সারপ্রাইজটা একদম ঠিকঠাক হয়েছে। অমিয় যে এই সময় আসতে পারে সেটা মিতুলের কাছে অপ্রত্যাশিত আর দ্বিতীয়ত, অমিয়কে আজ দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে। সাদা ধবধবে একটা জামা পরেছে। জামার হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। নিম্নাঙ্গে ঘন কৃষ্ণনীল ডেনিম। পায়ে বাদামি স্নিকার্স। চোখে এভিয়েটর। দাড়িটা ট্রিম করেছে। জামার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে অমিয়র সুঠাম বুক। মিতুলের শরীরটা যেন কেমন কেমন করতে লাগল আচমকা। গলা শুকিয়ে গেল। খুব গরম লাগতে শুরু করল। মিতুল জানে, এরপর এই লোকটা চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেলবে আর মিষ্টি করে হেসে উঠবে। ব্যস মিতুল শেষ। কিছুতেই ওই হাসিটা দেখবে না মিতুল। ভর দুপুরে সে মোটেই বেহায়া হতে পারবে না। অমিয় চশমাটায় হাত দিতেই মিতুল ঝপ করে চোখ বুজে ফেলল। শক্ত করে চেপে ধরল রেলিংটা।
মিতুলের মাও ভেতর থেকে হর্নের শব্দ শুনেছিলেন। তিনি বাইরে এসে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। দেখলেন, তাঁর মেয়ে রেলিংয়ে হাত দিয়ে প্রাণপণে চোখ বন্ধ করে আছে আর তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অমিয়। তিনি জানেন, অমিয় আর তাঁর মেয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে কিন্তু প্রেমাস্পদকে দেখে চোখ বুজে ফেলার মতো ঘটনা তাঁর অভিজ্ঞতায় নেই। খুবই আশ্চর্য হলেন তিনি এবং একই সাথে ভয় পেলেন। মিতুল হারিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মধ্যে সামান্য পাগলামির লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। মিতুল ফিরে আসায় তিনি অনেকটা সুস্থ হয়েছেন বটে কিন্তু মিতুলকে অসংলগ্ন কিছু করতে দেখলেই আজও তিনি ঘাবড়ে যান। ভাবেন, মিতুলকে আবার কোনও তান্ত্রিক বশ করেছে। তখন তাঁর প্যানিক অ্যাটাক মতো হয়। এখনও তাই হল। তিনি মিতুল বলে একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান মতো হয়ে গেলেন। দৌড়ে আসতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল অমিয় আর তার নতুন সানগ্লাসটা মট করে ভেঙে গেল।
মাথা নিচু করে খাবারগুলো নাড়াচাড়া করছিল মিতুল। মিতুলকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করতে এসেছে অমিয়। যদিও অমিয় আজ সবই তার পছন্দের খাবার অর্ডার করেছে তবু কোনওটারই তেমন স্বাদ পাচ্ছে না মিতুল। সে যদি তখন চোখ বুজে না ফেলত তা হলে তো এত কিছুই হত না। মিতুল জানে, এভিয়েটরটা অমিয়র খুব প্রিয়। প্রচণ্ড অপরাধবোধ হচ্ছে তার। ইশ! সব কিছুর জন্য সে দায়ী। তার জন্মদিন বলে এই লোকটা এত সুন্দর করে সারপ্রাইজ দিতে এল আর সবটা ঘেঁটে দিল সে! কান্না পেয়ে গেল মিতুলের। কিন্তু এখন তো কাঁদতেও পারবে না। লোকটা যদি জিজ্ঞেস করে কাঁদছ কেন, কী উত্তর দেবে সে? বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করা খুবই প্রেস্টিজের ব্যাপার। কান্নাটাকে গিলতে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল সে আর গ্লাসটা নামিয়েই দেখল অমিয় তার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মিতুল। গম্ভীর গলায় অমিয় বলল, খাবার ভালো হয়নি?
মিতুল ঘাড় নাড়ল। অমিয় বলল, তা হলে খাচ্ছ না কেন?
কই? খাচ্ছি তো।
আমার সানগ্লাসটা ভেঙেছে। চোখ খারাপ হয়ে যায়নি।
মিতুল আর থাকতে পারল না। বলে ফেলল, সরি। মা যে অমন করবে আমি বুঝতে পারিনি।
এতক্ষণ ধরে খুব গম্ভীর দিচ্ছিল অমিয়। এবার ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, সেটা তোমার জানার কথাও নয় কিন্তু তুমি কেন অমন চোখ বন্ধ করে ফেললে বলো তো?
অমিয়কে হাসতে দেখে মিতুলের মনের মেঘটা সবে কাটতে শুরু করেছিল কিন্তু এই প্রশ্নে ফের ঘেঁটে গেল ব্যাপারটা। এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে মিতুল? বলবে, তোমাকে দেখলেই আমার বুকের ভেতরটা গুরগুর করে! তুমি কাছে এসে দাঁড়ালেই কোথা থেকে যেন একটা ভাপ উঠে আসে! আমার খুব গরম লাগতে শুরু করে! মনে হয় শরীরটা গলে গলে পড়ছে মোমের মতো! গলা শুকিয়ে আসে আর তুমি চশমা খুলে মিষ্টি করে হাসলেই আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে! ইচ্ছে করে মরে গিয়ে পেত্নি হয়ে তোমার ঘাড়ে চাপি আর তোমায় খেয়ে ফেলি! বাচ্চা ভেবে আজ অবধি তো ঠিকমতো ছুঁয়েও দেখলে না! তোমাকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে গো। ইচ্ছে করে, আদর খেয়ে একটা অজগরের মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকি! কিন্তু এসব তো আর বলা যায় না। এগুলো বলার মতো কথা নয়। ওই যে, কথা কিছু কিছু বুঝে নিতে হয়… যে বোঝে সে বোঝে। যে বোঝে না সে পাথর। যেমন এই লোকটা। অগত্যা চুপ করে থাকে মিতুল।
মিতুলকে চুপ থাকতে দেখে অমিয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই বেজে উঠল তার ফোন।
ডাকবাংলো মোড় পার করেই অমিয়কে ফোন করে দিয়েছিল পল্লব। স্পিকার অন করে দিয়েছিল। বার কয়েক রিং হতেই অমিয় ফোন ধরল, হ্যালো। কোথায় তোরা?
পল্লব বলল, এই তো ডাকবাংলো ক্রস করলাম। তোরা কোথায়?
আমি মিতুলকে নিয়ে খেতে বেরিয়েছিলাম। খাওয়া হয়েই গেছে প্রায়। ছায়াবাণীর সামনে আছি।
ওহ লাভলি। পাঁচ মিনিটে পৌঁছচ্ছি।
আচ্ছা, ওই যে ছেলেটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল তার কী অবস্থা?
আরে আর বলিস না। কিছুতেই তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে পারলাম না। ফার্স্ট এইড-এর পর জোর করে বাড়ি ফিরে গেল। তিতাস কিছু টাকাও দিতে চেয়েছিল। নিল না। বলল, আপনাদের দোষ নেই। আমিই না দেখে গাড়ির সামনে চলে এসেছিলাম।
হুম। তার মানে দুনিয়াতে কিছু ভালো লোক আছে এখনও। আমি তো ভেবেছিলাম ভালোই টাকাপয়সা খিঁচে নেবে। যাক গে, চলে আয় চটপট।
আসছি, ফোন কেটে দিল পল্লব। তিতাস হেসে বলল, প্রেমিকার জন্মদিনে লাঞ্চ ডেট? অমিয় তো দুর্দান্ত রোম্যান্টিক হয়ে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি।
পল্লব বলল, অমিয় চিরকালই রোম্যান্টিক ছিল। তোর দুর্ভাগ্য তুই বুঝতে পারিসনি।
মুহূর্তে পল্লবকে কটাক্ষে বিদ্ধ করল তিতাস। বঙ্কিম স্বরে বলল, বুঝতে পারলে বুঝি ভালো হত?
অফকোর্স নট। তুই যে বুঝিসনি সেটা আমার সৌভাগ্য।
চুপ করে গেল তিতাস। তারপর একটু সময় নিয়ে গিয়ারের ওপরে থাকা পল্লবের হাতের ওপর হাতটা রাখল। নরম গলায় বলল, কার সৌভাগ্য, কার দুর্ভাগ্য সে জানি না পল্লব, শুধু এটুকু জানি ভাগ্যিস তুই ছিলি। না হলে আমি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম না।
তিতাসের হাতটা মুঠো করে ধরে চুপ করে রইল পল্লব। সব কথার উত্তর হয় না।
দক্ষিণপাড়া থেকে বাঁদিকে ঘুরল পল্লবের গাড়িটা। তিতাস জানে, এই রাস্তাটা পল্লবের বড় প্রিয়। এই রাস্তাতেই পল্লবের স্কুল। যতবার পল্লবের সাথে বারাসাতে এসেছে তিতাস ততবার অবধারিত ভাবে পল্লব দুটো জিনিস দেখিয়েছে। তার প্রথম প্রেমিকার বাড়ি আর তার স্কুল। প্রেমিকার বাড়িটা আজ আউট অব রুট কিন্তু স্কুলের কাছে এসেই পল্লব শিশুর উচ্ছলতায় বলে উঠল, তিতাস, এই দেখ আমার স্কুল। বারাসাত প্যারীচরণ সরকার রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়।
কবে স্থাপিত সেটা বললি না? এই বলে হাসতে হাসতে তিতাস ডানদিকে তাকাল আর তখনই কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল মাথাটা। এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল আর সেই অন্ধকার কাটতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল তিতাস। কোথায় পল্লবের স্কুলবাড়ি? এ যে আদিগন্ত বিস্তৃত একটা বালিয়াড়ি। মাঝে মাঝে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা খেজুর গাছ। বালিয়াড়ির মাঝখানে একটা উঁচু ঢিপি আর তার ওপর সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত স্ট্রাকচারের মন্দিরটা। চারদিক শুনশান। কেউ কোথাও নেই। শুধু শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। এমন সময় আবার মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বিশাল চেহারার সিংহটা। বাদামি কেশর কাঁধ ছাপিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। প্রকাণ্ড বলিষ্ঠ থাবা। এদিক ওদিক তাকিয়ে অলস ভাবে একটা গর্জন করল সে আর তখনই কে যেন মৃদু শিস দিল মন্দিরের ভেতর থেকে। সেই শিস শুনে পোষা কুকুরের মতো সিংহটা পেছন ফিরে এগিয়ে গেল মন্দিরের দরজার কাছে। ভেতরটা অন্ধকার। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবু বোঝা গেল, একটা মানুষের অবয়ব এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। সিংহটা সেই ছায়ামূর্তিকে দেখে যেন ভারী আনন্দিত হল। মাথা ঘষতে শুরু করল তার পায়ে। অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক রমণীর সুডৌল হাত। বহুমূল্য রত্নরাজিতে খচিত অলঙ্কারে ভূষিত সেই হাত পরম স্নেহে স্পর্শ করল সিংহের কেশরদাম। যেন বিলি কেটে দিল তাতে। তার পর সিংহের গলায় পরিয়ে দিল রত্নখচিত এক কণ্ঠবন্ধনী।
এই তিতাস, এসে গেছি তো। হাঁ করে কী ভাবছিস? নাম।, পল্লবের কথায় ঘোর কাটল তিতাসের। দেখল, তাদের গাড়িটা ছায়াবাণী সিনেমাহলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক মূহূর্তের জন্য এই আধুনিক সভ্যতাকেই স্বপ্ন বলে মনে হল তিতাসের। মনে হল, এতক্ষণ ধরে সে যা দেখছিল তাই আসলে বাস্তব। মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল তার। একবার মনে হল, পল্লবকে এই দিবাস্বপ্নের ব্যাপারে বলে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, কী লাভ বলে? সে যা করবে, যা দেখবে সব পল্লবকে বলতে হবে না কি? ব্যক্তিগত বলেও তো একটা বিষয় আছে। এ সব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ তিতাসের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সে দেখল, রেস্তোরাঁর কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে অমিয় আর মিতুল। ওহ মাই গুডনেস! অমিয়কে কী দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম লাগছে আজ! পৌরুষ যেন ঠিকরে বেরচ্ছে তার সর্বাঙ্গ থেকে। তিতাস অনুভব করল ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে তার রক্তস্রোত। অমিয়কে ভোগ করার এক প্রবল বাসনা জন্ম নিচ্ছে তার মধ্যে। গাড়ি থেকে নেমে সে ঘোর লাগা চোখে এগিয়ে যেতে থাকল অমিয়র দিকে। এই মুহূর্তে স্থান, কাল, পাত্র কিছুই বিবেচনা করছে না সে। তার সমগ্র চেতনা জুড়ে ঘনিয়ে উঠছে এক উদগ্র অন্ধ যৌনেচ্ছা, বিশাল মহাকায় শকুনের মতো পঙ্খ বিস্তার করছে সহস্রাধিক বছর ধরে অন্ধকারের গর্ভে নিহিত থাকা এক জান্তব খিদে, মাটি ফুঁড়ে নরকের প্রেতদলের মতো উঠে আসছে ঘাতক অতৃপ্তি যার উপশম না হলে প্রলয় অনিবার্য। কী হত বলা যায় না কিন্তু অমিয়র কাছে পৌঁছনোর আগেই রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোয় হোঁচট খেল তিতাস আর তার বুড়ো আঙুলের নখটা ভেঙে গেল নিমেষে। তীক্ষ্ণ বেদনাবোধ তিতাসকে আছড়ে ফেলল বাস্তবের মাটিতে। আহ করে উঠে উবু হয়ে বসে পড়ল সে কিন্তু এই কল্প-বাস্তবের মানসিক টানাপোড়েন সইতে পারল না। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাস্তার ধুলোর ওপরেই। ছুটে এসে তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অমিয় আর পল্লব। মিতুলও ছুটে এল কিন্তু তার মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল। তিতাস দিদি তার আইডল। তিতাস দিদি যা-ই করে মিতুলের তাই ভালো লাগে। কিন্তু আজ ভালো লাগল না। মেয়েরা খুব ভালো চোখের ভাষা পড়তে পারে। মিতুল স্পষ্ট দেখেছে, তিতাস দিদি যেভাবে তার মানুষটার দিকে তাকিয়েছিল সে দৃষ্টিতে লোভ ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না। সে যেই হোক না কেন, কেউ তার মানুষটার দিকে লোভ দিলে মিতুলের খুব খুব খুব রাগ হয়।
* * *
সন্ধেটা আজ ভালোই কেটেছে ওদের। দুপুরে ওষুধ খাইয়ে তিতাসকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল পল্লব। শেষ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে তিতাস চাঙ্গা হয়ে গেল। নিজেই অমিয় আর পল্লবকে তাড়া দিতে লাগল মিতুলদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। পল্লব বলেছিল, তুই আর একটু রেস্ট নে না।
তিতাস উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা, চিন্তা করিস না। আমি একদম ঠিক আছি। কোনও কারণে প্রেশারটা ফল করেছিল।
আরে তোর নখেও তো ব্যথা।
তো? থোড়াই কোনও পদযাত্রায় যাচ্ছি! গাড়িতে যাব। গাড়িতে আসব। চল চল। মিতুলের জন্য এত্ত গিফট এনেছি। কখন দেব সেগুলো?
বেশ চল তবে।
তিতাসের পায়ে নতুন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিল পল্লব তার পর বেরিয়ে পড়েছিল মিতুলদের বাড়ির উদ্দেশে। আগের দিন রাতে নিজে হাতে মিতুলের জন্য কেক বানিয়েছে তিতাস। ম্যাঙ্গো ফ্রেশ ক্রিম। এই কেকটা তিতাস দুর্দান্ত বানায়। কলকাতা থেকে আসার সময় সেটা ভরে নিয়েছিল আইস বাস্কেটে। সেই বাস্কেটটাও রওনা দিল ওদের সঙ্গে। তবে আজকের সেলিব্রেশন মিতুলদের বাড়িতে নয়, ভাদুড়ি মশায়ের বাড়িতে। মিতুলের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি সবাইকে আজ নেমতন্ন করেছিলেন। মিতুলকে গিফট দেওয়ার পালা শেষ হতে দীপক পাল আর তাঁর স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল পল্লব। ওদিকে মিতুল চেপে বসেছিল অমিয়র বুলেটে। তার পর সবাই মিলে ভাদুড়ি মশায়ের বাড়ি। হইহই করে কেক কাটা হল। ভিডিও কলে ধরা হল অপালা আর সঞ্জয়কে। ভাদুড়ি মশায়ের জন্য একটা নতুন চশমার ফ্রেম নিয়ে গিয়েছিল তিতাস। সেটা পেয়ে শিশুর মতো খুশি হলেন বৃদ্ধ। গান, গল্প, আড্ডায় কখন যে রাত বেড়েছে বোঝাই যায়নি। শেষকালে দীপক পাল তাড়া দিলেন। কাল তাঁর মর্নিং ডিউটি। আসর ভাঙল। উৎসবের রেশ লেগে রইল ফিরতি পথে। কিন্তু পল্লব, তিতাস, অমিয় বা মিতুল কেউই আন্দাজ করতে পারল না, আর কিছুক্ষণ পরেই এই রাতটাই এমন বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে যা পাল্টে দেবে ওদের সব্বার জীবন।
অমিয়র বসার ঘরের সোফায় কাত হয়ে শুয়েছিল পল্লব। পল্লবের অনেক সমস্যার মধ্যে একটা সমস্যা হল, সে বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকতে পারে না। ঢিস ঢিস করে বাঁ হাতের ওপর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। একটা ঠ্যাং তুলে দেয় আর একটা ঠ্যাঙের ওপর। তিতাস অনেকবার বলেছে, একটু সোজা হয়ে বোস না পল্লব। সারাক্ষণ শুয়ে পড়িস কেন? কিসের এত ল্যাদ তোর?
পল্লবের উত্তর তৈরিই থাকে, একে শোয়া বলে না তিতাস। এ হল অনন্ত শয্যা। ভগবান শ্রীবিষ্ণু এভাবে শুতেন আর আমি শুই।
তিতাস বলে, মরণ।
আজও অনন্ত শয্যায় শুয়ে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে পল্লব বলল, খাওয়াটা কিন্তু আজ জমজমাট হয়েছে।
তিতাস হাসল, তা কোন দিন তোর খাওয়া জমজমাট হয় না? জানিস অমিয়, রান্নার মাসির হাড় ভাজাভাজা করে দেয়। মাসি এখন তাই আর নিজে থেকে কিছু করার রিস্ক নেয় না। ওর লেখার টেবিলের পাশে এসে কাঁচুমাচু মুখে বলে, আজ কী কী রান্না হবে বউদি?
ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠল অমিয়, বউদি?
তিতাস বলল, তা নয় তো কী? ও তো ওই রকমই। অবিকল বাড়ির গিন্নিদের মতো করে বলবে, ‘আজ একটু লাউ দিয়ে ডাল করো, ঝিরিঝিরি করে আলু ভাজো, পটল পোস্ত করো আর মাছের টক। আর হ্যাঁ শোনো, মুগডালটা কিন্তু আগে খোলায় ভেজে নিও। আর পোস্তটা যে বাটবে পুরো মিহি করে ফেলবে না। সামান্য দাঁতে লাগে যেন। বুঝেছ?’ তরিবতের শেষ নেই। এ তো গেল রান্না তারপর লেখা শেষ হতেই আমার আর মাসির পেছনে টিকটিক শুরু। ‘তিতাস, চাদর ভাঁজ কর। মাসি, টেবিলের পেছনে ঝুল লেগে আছে। ঝেড়ে দাও। তিতাস, জানলা খোল। সকালবেলা জানলা বন্ধ কেন? আলো আসতে দে।’ জ্বালিয়েপুড়িয়ে শেষ করে দিল রে আমাদের।
পল্লব কিছু বলছে না। শুধু মিটিমিটি হাসছে। অমিয় বলল, পল্লব ছোটবেলা থেকেই একটু গোছানো টাইপ। হস্টেলে একমাত্র ওর ঘরটাই রোজ ঝাঁট দেওয়া হত। একমাত্র ওর বিছানাটাই বিছানার মতো দেখতে লাগত। আমাদেরগুলো তো আর বিছানা ছিল না। ছিল, গুদামঘর।
চুপ কর। পুরুষ মানুষ অত গোছানো হলে ভালো লাগে না।
অমিয় হাসল, এই ভালো না লাগতে লাগতেই তো এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলি একসাথে।
তা বটে, কম দিন তো হল না। মাঝের তিনটে বছর শুধু একসাথে থাকাটা হয়নি কিন্তু মনে মনে কি জুড়ে ছিল না পল্লব আর তিতাস? তিতাস ভাবে, সেই কবেকার প্রেম ওদের। দশ বছর নেহাত কম সময় নয়। যখন ওদের ভালোবাসার শুরু তখনও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। তখনও প্রেসিডেন্সিকে পাঁচতারা হোটেল বানিয়ে দেয়নি বেনিয়ার বিকৃত রুচি। তখনও প্রেসিডেন্সির আনাচে কানাচে কান পাতলেই শোনা যেত ইতিহাসের ফিসফিসানি। তখনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর ঋতুপর্ণ ঘোষ বেঁচে ছিলেন। তখন সবে ষাট বছরের যুবক কবীর সুমন। পল্লব তখন সারা দিন ধরে দেওয়াল আর পোস্টার লিখত। প্যান্টের পকেটেই থাকত একগোছা তুলি। নিশানের রং লেগে থাকত হাতে আর জামাকাপড়ে। সেই উলোঝুলো হয়েই পল্লব দেখা করতে আসত তিতাসের সঙ্গে। তিতাসের এক সিনিয়র খুব দুঃখ করে বলেছিল, কত সম্ভাবনা ছিল তিতাস কিন্তু শেষকালে তুই এই লরির খালাসিটার প্রেমে পড়লি? কী দেখলি ওর মধ্যে?
কথাটা মিথ্যে নয়। সুন্দর সুপুরুষ ঝকঝকে যুবকেরা চিরকালই তিতাসের চারপাশে ভিড় করে থেকেছে। তবু তাদের মধ্যে থেকে ওই অত্যন্ত সাধারণ দেখতে, মোটা, মধ্যম উচ্চতার ছেলেটিকেই কেন সবটা উজাড় করে দিয়েছিল তিতাস? কারণ সে বুঝেছিল, বাইরে থেকে যতই সব কিছু গুছিয়ে রাখতে চাক এই ছেলেটা আসলে ভেতরে ভেতরে পৃথিবীর সবচেয়ে অগোছালো মানুষ। যতই কথায় কথায় হাসুক বা হাসাক, বিশাল এক মৌচাকের মতো বেদনা জমাট বেঁধে আছে এই ছেলেটার মনগোপনে। অচেনা এক অস্থিরতায় এই ছেলেটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পল্লবের অন্তরতম প্রদেশের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সেই অন্তরীপের সন্ধান পেয়েছিল একমাত্র তিতাস। ঝড় যে বড় ভালো লাগে তার। তাই সে হয়ে উঠেছিল পল্লবের ব্যথার মলম, শীতের উত্তাপ, রোদ্দুরে জলগামছা।
অমিয় আবার বলে উঠল, তোরা দু’জন আমার ইন্সপিরেশন। তোদের দেখি আর ভাবি, সংসার করতে গেলে এভাবেই করতে হয়। তা বিয়েটা এবার করে নে না।
পল্লব বলল, করব করব। তিতাস প্র্যাকটিস শুরু করলেই করে নেব। বিয়ের পর আমি বাবা আর কাজকর্ম করব না। আমার বরাবরের স্বপ্ন একটা বড়লোক বউ হবে। সে বেশ আমায় হাতখরচা দেবে আর আমি গুছিয়ে সংসার করব। আমার ভাতকাপড়ের দায়িত্ব কবে নিবি তিতাস?
তিতাস বলল, বাজে কথা বলা বন্ধ কর তো। এই অমিয়, বাই এনি চান্স মিতুলের কি মন খারাপ? ওকে আজ একটু ডাউন লাগছিল না?
পল্লব বলল, ঠিক বলেছিস। আমিও খেয়াল করেছি। অন্যদিনের মতো হাসিখুশি না, আজ একটু আড়ষ্ট লাগছিল ওকে। কী হয়েছে রে? ঝগড়া করেছিস?
অমিয় বলল, না রে! ও একটা পাগলি।
পল্লব বলল, আরে হয়েছেটা কী বলবি তো?
দুপুরে মিতুলের চোখ বুজে ফেলা থেকে মিতুলের মায়ের সেন্সলেস হয়ে যাওয়া এবং সানগ্লাস ভাঙার ঘটনাটা ওদের খুলে বলল অমিয়। তারপর বলল, সেই থেকে ব্যাটা গিল্ট ফিলিংয়ে ভুগছে। দুপুরেও ঠিকমতো খায়নি।
পল্লব হেসে উঠতে ধমক দিল তিতাস, বোকার মতো হাসিস না। আহা রে! মিতুলটা বড্ড ইনোসেন্ট। ওকে যত্ন করে রাখিস অমিয়।
একটু যেন লাল হয়ে উঠল অমিয়র গাল দু’টো। চোখ নীচু করে বলল, চেষ্টা করি। কিন্তু বড্ড ছোট তো। ইমম্যাচিওর।
প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারিটা তো যেচেপড়ে নিয়েছিলি ভাই। এখন কাঁদলে চলবে কেন? হাসতে হাসতে বলে উঠল পল্লব, তবে একদিকে ভালো হচ্ছে। বাচ্চা মানুষ করার অভিজ্ঞতাটাও হয়ে যাচ্ছে। পরে আর অসুবিধে হবে না।
পল্লবের বলার ধরনে তিতাস আর অমিয় দু’জনেই হেসে ফেলল। এই সময় বেজে উঠল অমিয়র ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অমিয় বলল, মিতুল। দাঁড়া একটু কথা বলে আসি।
ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল অমিয়, বলো।
কী করছ?
এই তো তিতাস আর পল্লবের সাথে আড্ডা দিচ্ছি। তুমি কী করছ?
শুয়ে আছি।
কী ব্যাপার বলো তো? সারাটা দিন এমন মনমরা হয়ে রইলে কেন? কতবার বলব যে আমি রাগ করিনি? তিতাস আর পল্লবও বুঝেছে তোমার মন ভালো নেই। আরে বাবা, তুমি তো ইচ্ছে করে জেনেবুঝে আমার চশমাটা ভেঙে ফেলোনি।
সে জন্য মন খারাপ না।
যাহ বাবা! আবার কী মন খারাপের কারণ ঘটল?
আমার মন খারাপই না।
তা হলে অমন চুপ ছিলে কেন?
আমার ভালো লাগছিল না।
আরে কী হয়েছে স্পষ্ট করে বলবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অমিয়র স্বরে অধৈর্যের আভাস।
বুঝতে হবে না তোমায়। পল্লবদা’রা কি আজ থাকবে?
হ্যাঁ, তোমায় তো আগেই বলেছিলাম।
থাকার কী আছে? গাড়ি আছে তো। ফিরে গেলেই পারে।
ভারী অবাক হল অমিয়। মিতুলের এই ব্যবহার তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এতদিন সে দেখেছে, পল্লব, তিতাস, সঞ্জয়, অপালাদের দেখলে মিতুল অত্যন্ত আনন্দিত হয়। বিশেষ করে তিতাস এলে তো কথাই নেই। সারাক্ষণ তিতাসের সাথে লেপটে থাকে। আসলে তিতাসের প্রতি তীব্র এক কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করে মিতুলের মধ্যে। মিতুল জানে, তিতাস না থাকলে তার পরিণতি অন্যরকম হত। কিন্তু আজ সেই তিতাসরা থাকাতেই আপত্তি জানাচ্ছে সে! বিস্ময় ধরা পড়ল অমিয়র কণ্ঠে, এই মিতুল, তোমার কী হয়েছে ঠিক করে বলো তো?
মিতুলের গলা নিরাসক্ত, কী আবার হবে? কিছুই হয়নি।
তা হলে বললে কেন ফিরে গেলেই পারে?
ভুল কী বললাম? এমন কিছু রাত হয়নি। রাতের বেলা লোকে দিঘা, মন্দারমণি থেকে গাড়ি চালিয়ে ফিরে আসছে আর ওরা বারাসাত থেকে সাউথ কলকাতা যেতে পারল না?
অমিয়র প্রাথমিক বিস্ময় এবার বিরক্তিতে রূপান্তরিত হল। রুক্ষ গলায় সে বলল, শোনো মিতুল, ওরা আমার বন্ধু। ওরা চাইলেও আমি ওদের ফিরে যেতে দিতাম না। তা ছাড়া, আমার বাড়িতে কে থাকবে না থাকবে তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর তো দরকার দেখছি না। আর তুমি কি না তিতাস, পল্লবকে নিয়ে এসব বলছ! ছিঃ! তুমি এতটা স্বার্থপর আমি তো আগে বুঝতে পারিনি।
ফোনের ওপারে অখণ্ড নীরবতা। অমিয়ও চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমি রাখছি।
অমিয়র থমথমে মুখ দেখে গন্ডগোলের আভাস পেল তিতাস। পল্লব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে চিমটি কেটে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল, অমিয়, খুব টায়ার্ড লাগছে। শুয়ে পড়লাম বুঝলি? সকালে কথা হচ্ছে।
অমিয় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ। শুয়ে পড় তোরা। আমিও শোবো।
কথা না বাড়িয়ে অমিয় নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। চোখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তিতাসের দিকে তাকাল পল্লব, কেসটা কী বল তো?
তুই কি কিছুই বুঝিস না? মিতুলের সাথে অমিয়র ঝগড়া হয়েছে।
সে কী! কেন?
হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিতাস, ওহ পল্লব! হাউ অ্যাম আই সাপোজড টু নো? চল তো শুতে চল। পাগল করে দিবি তুই আমায়।
অনেকক্ষণ হল পল্লব ঘুমিয়ে পড়েছে। ফুরফুর করে নাক ডাকছে তার। কিন্তু তিতাসের কিছুতেই ঘুম আসছে না। সে খালি এপাশ, ওপাশ করছে। একসময় উঠে পড়ল তিতাস, নাহ এভাবে জোর করে ঘুম আসবে না। অমিয়র ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটা ভারী সুন্দর। একটা বাইলেনের শেষপ্রান্তে অমিয়র ফ্ল্যাটটা। ফলে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে দেখা যায় ছোট রাস্তাটা সোজা গিয়ে মিশেছে বড় রাস্তায়। ছোট রাস্তাটার দু’পাশে অনেক গাছ আর কিছু দূর অন্তর অন্তর হলুদ আলো। কয়েকটা গাড়ি পার্ক করা রাস্তার ওপরে। যদিও গরমকাল তবু আজ অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনির রেলিংয়ে কনুইয়ের ভর দিয়ে দাঁড়াল তিতাস। আজ চাঁদ উঠেছে ভারী সুন্দর। চারপাশটা শুনশান। মাঝেমাঝে বড় রাস্তা দিয়ে হুশ হুশ করে এক-আধটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। আশপাশের কোনও ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে মৃদু একটা সুর। একটু কান পেতে তিতাস বুঝল, মধ্যরাতে গান ধরেছেন এলভিস প্রেসলি, ‘ওয়াইজ মেন সে, ওনলি ফুলস রাশ ইন/ বাট আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ’ আলতো একটা হাসি ফুটে উঠল তিতাসের ঠোঁটের কোণে। সে গলা মেলাল প্রেসলি সাহেবের সাথে, আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ। হঠাৎই পল্লবের ঘুমন্ত মুখখানা দেখতে ইচ্ছে করল তার। ইচ্ছে করল, পল্লবের চোখের পাতায় একটা চুমু এঁকে দিতে। সবে ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে একটা বিজাতীয় শব্দে থমকে গেল তিতাস। কোত্থেকে যেন একটা চাপা গরগর আওয়াজ আসছে। ঘুরে তাকাতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে। রাস্তায় পার্ক করানো একটা গাড়ির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে গাড়িটাকে শুঁকছে বিশাল এক সিংহ আর যেন চাপা আক্রোশে গরগর করে চলেছে অনবরত! কয়েক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন সাড়হীন হয়ে গেল তিতাস, তার পরেই সে চমকে উঠল। চাঁদের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে সিংহের গলায় পরানো রত্নখচিত কণ্ঠবন্ধনী! এ তো সেই স্বপ্নে দেখা সিংহটা, যাকে আজ দুপুরেও সে দেখেছে। কিন্তু সেই সিংহটা এখানে কী করছে? আচমকাই গা-টা ছমছম করে উঠল তিতাসের। কেন সে ওই এক স্বপ্ন বারবার দেখছে? আর এখন যেটা দেখছে সেটা কী? স্বপ্ন না বাস্তব? নিজের কপালেই একটা টোকা দিল তিতাস। না, সে তো নিজের অঙ্গসঞ্চালন অনুভব করতে পারছে। তা হলে সত্যি সত্যিই সিংহটা! ভাবনাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারল না তার আগেই সে ঘাড়ের কাছে অনুভব করল একটা তীব্র তীক্ষ্ণ শীতল স্পর্শ। ছিটকে ঘুরে দাঁড়িয়েই বিস্ফারিত হয়ে গেল তিতাসের দুই চোখ। তার থেকে মাত্র এক ফুটের দূরত্বে যে দাঁড়িয়ে আছে সে যে মানুষ না তা নিয়ে তিতাসের কোনও সন্দেহ নেই। এমন রূপ, এমন প্রভা, এমন দীপ্তি মানুষের কল্পনাতীত। এমন উচ্চকিত অথচ নীরব, স্থির অথচ চঞ্চল, শান্ত অথচ উদ্দাম, স্থানিক অথচ চরাচরব্যাপী, প্রেমপূর্ণ অথচ ভীতিপ্রদ উপস্থিতি মানুষের সাধ্যাতীত। তা হলে কে সে? কে এই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়? ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসতে লাগল তিতাসের চোখের পাতা।
* * *
অনেকক্ষণ ধরেই একটা অস্বস্তি হচ্ছিল অমিয়র। সে ঘুমোচ্ছে কিন্তু কিছুতেই যেন দানা বাঁধছে না ঘুমটা। দুধের ওপর লেবুর রস ফেললে যেমন ছানা কেটে যায় ঠিক সেভাবেই বারবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে ঘুমের রেশ। নাহ, মিতুলকে ওভাবে বকাবকি করাটা ঠিক হয়নি। সেই অস্থিরতা থেকেই এই অবস্থা। একটা সময় সে উঠে বসল খাটের ওপর আর নাইট ল্যাম্পের আবছা নীলাভ আলোয় অবাক হয়ে দেখল, তার পায়ের কাছে বসে তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিতাস। বিস্ময়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে অমিয় বলে উঠল, তিতাস তুই? এখানে?
অমিয়র চোখে চোখ রেখে তিতাস বলল, ঘুম আসছিল না। মনটা ভালো নেই। পল্লব তো ঘুমিয়ে কাদা। তাই ভাবলাম, দেখি তুই জেগে আছিস কি না? তা হলে একটু গল্প করতাম। এসে দেখলাম তুই ঘুমোচ্ছিস। তাই আর ডাকিনি।
ভারী অবাক হল অমিয়। মনখারাপ হচ্ছে বলে গভীর রাতে তার সাথে গল্প করতে আসবে এমন মেয়ে তো তিতাস নয়। তবে মানসিক ট্রমাটা থেকে ওঠার পর তিতাস আগের চেয়ে একটু দুর্বল হয়ে গেছে। তিতাসের জন্য খারাপ লাগল অমিয়র আবার একই সাথে মনের গোপনে অদ্ভুত এক পুলকে শিহরিত হল সে। তিতাস তার স্বপ্নের নারী। চিরকাল তিতাস অধরা ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তিতাস বন্ধুর প্রেমিকা। কিন্তু সেই তিতাস যখন নিজে থেকে কথা বলতে এসেছে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না অমিয়। এত বড় কসাই সে নয়। তবে তিতাসের সামনে আদুর গায়ে বড়ই লজ্জা পেল সে। হাত বাড়িয়ে খাটের বাজুতে রাখা টি-শার্টটা নিয়ে পরতে যেতেই তিতাস বলে উঠল, থাক না অমিয়। তোকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।
এবার আর বিস্মিত নয়, রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়ে গেল অমিয়। এসব কী বলছে তিতাস? হতে পারে এ শুধুই মুগ্ধতা প্রকাশ কিন্তু সময়টা যে গভীর রাত। এ মোটেই মুগ্ধতা প্রকাশের জন্য ভালো সময় নয়। অমিয় আচমকা অনুভব করল সে একটা সরু সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে সুতোর একদিকে রয়েছে মনের গহীনে প্রায় এক যুগ ধরে পুষে রাখা এক বিস্ফোরক ইচ্ছে আর অন্যদিকে বন্ধুত্ব, দায়িত্ব, প্রেম, কর্তব্য এবং আরও যা যা কিছু মানুষকে মানুষ করে তোলে। পায়ের কাছ থেকে উঠে এবার অমিয়র পাশে এসে বসল তিতাস। অমিয় অনুভব করল তার খুব গরম লাগছে। এসির টেম্পারেচার খানিকটা কমিয়ে দিল। গলাটা যেন শুকনো শুকনো লাগছে। বেশ খানিকটা জল খেয়ে ফেলল। অমিয়র মন বলছে, তার এখন উঠে যাওয়া উচিত কিংবা তিতাসকে ঘরে ফিরে যেতে বলা উচিত, কিন্তু সে পেরে উঠছে না। কেমন যেন একটা ঘোর লাগছে। যুক্তিবোধ গুলিয়ে যাচ্ছে। আচমকা অমিয়র সুঠাম বুকে একটা হাত রাখল তিতাস। অমিয়র সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল নিমেষে। থরথর করে কেঁপে উঠল সে। অস্ফুটে বলে উঠল, তিতাস!
অমিয়র বুকের ওপর সাবলীল ভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল তিতাসের লম্বা লম্বা সুছাঁদ আঙুলগুলো। ফিসফিস করে তিতাস বলল, আমার আর ভালো লাগে না জানিস অমিয়? পল্লবটা দিন দিন মোটা হচ্ছে। ভুঁড়ি হচ্ছে। আমার ঘেন্না করে। ও যখন আমার গায়ে হাত দেয় আমার বমি পায়। শেষ কবে আমার অর্গ্যাজম হয়েছে আমার মনে নেই। আয় না অমিয়। একবার। একটিবার আমাকে আদর কর।
ভয়ঙ্কর এই কথাগুলো বলতে বলতে তিতাস ততক্ষণে অমিয়কে জড়িয়ে নিয়েছে সরীসৃপের মতো। অস্বাভাবিক এক অস্থিরতায় ছটফট করছে অমিয়। তার চৈতন্য পরিষ্কার ভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। একটা অমিয় চাইছে এই গা শিরশির করা নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে। আর একটা অমিয় চাইছে সেই আদিম বিস্ফোরণ। এই দুই অমিয়র টানাপড়েন চলছে ক্রমাগত। কিন্তু এই লড়াইটা থামিয়ে দিল তিতাসই। তীব্র আশ্লেষে শুষে নিতে শুরু করল অমিয়র অধরোষ্ঠ। অমিয়র একটি পুরুষ পাঞ্জা নিজেই তুলে নিল তার নাতিবৃহৎ সুডৌল বাম স্তনে,মন যেন একটা ঘোর লাগছে। যুক্তিবোধ গুলিয়ে যাচ্ছে। আচমকা অমিয়র সুঠাম বুকে একটা হাত রাখল তিতাস। অমিয়র সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল নিমেষে। থরথর করে কেঁপে উঠল সে। অস্ফুটে বলে উঠল, তিতাস!

অমিয়র বুকের ওপর সাবলীল ভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল তিতাসের লম্বা লম্বা সুছাঁদ আঙুলগুলো। ফিসফিস করে তিতাস বলল, আমার আর ভালো লাগে না জানিস অমিয়? পল্লবটা দিন দিন মোটা হচ্ছে। ভুঁড়ি হচ্ছে। আমার ঘেন্না করে। ও যখন আমার গায়ে হাত দেয় আমার বমি পায়। শেষ কবে আমার অর্গ্যাজম হয়েছে আমার মনে নেই। আয় না অমিয়। একবার। একটিবার আমাকে আদর কর।
ভয়ঙ্কর এই কথাগুলো বলতে বলতে তিতাস ততক্ষণে অমিয়কে জড়িয়ে নিয়েছে সরীসৃপের মতো। অস্বাভাবিক এক অস্থিরতায় ছটফট করছে অমিয়। তার চৈতন্য পরিষ্কার ভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। একটা অমিয় চাইছে এই গা শিরশির করা নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে। আর একটা অমিয় চাইছে সেই আদিম বিস্ফোরণ। এই দুই অমিয়র টানাপড়েন চলছে ক্রমাগত। কিন্তু এই লড়াইটা থামিয়ে দিল তিতাসই। তীব্র আশ্লেষে শুষে নিতে শুরু করল অমিয়র অধরোষ্ঠ। অমিয়র একটি পুরুষ পাঞ্জা নিজেই তুলে নিল তার নাতিবৃহৎ সুডৌল বাম স্তনে, অন্য হাতে আঁকড়ে ধরল অমিয়র স্থূল ও দীর্ঘ পৌরুষ। কয়েক মুহূর্ত পর চুলের মুঠি ধরে সে অমিয়কে নামিয়ে আনল তার নির্লোম, মসৃণ, পিচ্ছিল উরুসন্ধিতে। তার পর শুরু হল এক অবিশ্বাস্য রমণ। কিন্তু কিছুটা সময় যেতেই অমিয়র শীৎকার রূপান্তরিত হল চাপা আকুতিতে। তার স্খলন হয়ে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু তিতাসের পাশবিক রমণের কোনও বিরাম নেই। স্খলনমাত্র ফিরে এসেছে অমিয়র স্বাভাবিক চৈতন্য। নিজের কৃতকর্মের জন্য প্রতিটি পল অনুপলে সে ধিক্কার দিচ্ছে নিজেকে। তার জলে ভরা দুই চোখে বারবার ভেসে উঠছে মিতুলের নিষ্পাপ মুখখানি। কাঁদতে কাঁদতে সে বলছে, ছাড় তিতাস। এবার ছাড় আমায়। প্লিজ। দয়া কর।
কিন্তু তিতাস যেন ঘাতকের মতো নির্দয়, সন্ন্যাসীর মতো নির্বিকার। যন্ত্রের মতো সে রমণ করে চলেছে। আর থাকতে পারল না অমিয়। এক ধাক্কায় তিতাসকে ফেলে দিল খাট থেকে। তারপর চাদর জড়িয়ে ছুটে ঢুকে গেল বাথরুমে। ছিটকিনি এঁটে দিল দরজায়। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দরজায় পিঠ দিয়েই বসে পড়ল মাটিতে।
কতক্ষণ ধরে যে কেঁদেছে সে হিসেব অমিয়র নেই। যখন ফিরে এল ঘরে তিতাস চলে গেছে। বিস্রস্ত হয়ে পড়ে আছে বিছানা। হতাশায়, ক্লান্তিতে বিছানার ওপরেই ধপ করে বসে পড়ল অমিয়। খাটের সোজাসুজি আয়না। এক পলকের জন্য আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। আবছা নীল আলোয় কী যেন দেখা যাচ্ছে তার গায়ে। অমিয় পায়ে পায়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জ্বালিয়ে দিল ঘরের উজ্জ্বল আলো আর সেই আলোয় দেখল, তার সারা ঘাড় গলা জুড়ে দগদগ করছে তিতাসের কামড়ের দাগ। এ দাগে কোনও ভালোবাসা নেই। রয়েছে পাশব প্রবৃত্তির পরিচয়। এ দাগ কিছুতেই লাভ বাইট হতে পারে না। কিছুতেই না। ভয়ে শিউরে উঠল অমিয়। এই ঘৃণার সাক্ষ্য বহন করে সে কেমন করে দাঁড়াবে মিতুল আর পল্লবের সামনে?
চলেছে। আর থাকতে পারল না অমিয়। এক ধাক্কায় তিতাসকে ফেলে দিল খাট থেকে। তারপর চাদর জড়িয়ে ছুটে ঢুকে গেল বাথরুমে। ছিটকিনি এঁটে দিল দরজায়। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দরজায় পিঠ দিয়েই বসে পড়ল মাটিতে।
কতক্ষণ ধরে যে কেঁদেছে সে হিসেব অমিয়র নেই। যখন ফিরে এল ঘরে তিতাস চলে গেছে। বিস্রস্ত হয়ে পড়ে আছে বিছানা। হতাশায়, ক্লান্তিতে বিছানার ওপরেই ধপ করে বসে পড়ল অমিয়। খাটের সোজাসুজি আয়না। এক পলকের জন্য আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। আবছা নীল আলোয় কী যেন দেখা যাচ্ছে তার গায়ে। অমিয় পায়ে পায়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জ্বালিয়ে দিল ঘরের উজ্জ্বল আলো আর সেই আলোয় দেখল, তার সারা ঘাড় গলা জুড়ে দগদগ করছে তিতাসের কামড়ের দাগ। এ দাগে কোনও ভালোবাসা নেই। রয়েছে পাশব প্রবৃত্তির পরিচয়। এ দাগ কিছুতেই লাভ বাইট হতে পারে না। কিছুতেই না। ভয়ে শিউরে উঠল অমিয়। এই ঘৃণার সাক্ষ্য বহন করে সে কেমন করে দাঁড়াবে মিতুল আর পল্লবের সামনে?
