লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১১

১১

বড় অসহায় গলায় অমিয় বলল, মিতুল তুমি?

অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে মিতুল। চোখের সে ভাষা পড়তে পারল না অমিয়। হয়তো বা পড়ার চেষ্টাই করল না। বেদনার এই ভার বহন করা সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত। অমিয় বুঝতে পারছে সে ধরা পড়ে গিয়েছে। এবার বিচার হবে। অমিয়র মনে হল এই মুহূর্তে যদি আত্মহত্যা করতে পারত সবচেয়ে ভালো হত। যুদ্ধে যাওয়ার সময় সৈনিকরা গলায় ঝুলিয়ে নেয় পটাসিয়াম সায়ানাইডের অ্যাম্পুল। যখন দেখে বেঁচে ফেরার আর উপায় নেই তখন তারা মুখে পুরে দেয় ওই বিষ। মুহূর্তে বেছে নেয় মৃত্যুর নিশ্চিন্ত আশ্রয়। জীবনের যুদ্ধে পটাসিয়াম সায়ানাইড বহন করার নিয়ম নেই। সেখানে বেঁচে থেকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য যন্ত্রণাকে স্বীকার করাই ভবিতব্য। অস্ফুটে অমিয় আবার বলল, তুমি এখানে কী করে এলে মিতুল?

মিতুলের খুব কান্না পাচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে। তার তো এভাবে চুপি চুপি অমিয়র বাড়ি আসার কথা ছিল না। তবু সে এসেছে। আজ বিকেলে সে এমন একটা ফোন পেয়েছে যে না এসে থাকতে পারেনি।

রোজকার মতো আজও সকালে ঘুম থেকে উঠে সে অমিয়কে ফোন করেছিল। গত রাতে অমিয়র সঙ্গে যে তার একটু মনকষাকষি হয়েছিল সেটা একেবারেই মনে রাখেনি। মাঝে মাঝে এই লোকটার ওপর মিতুলের রাগ হয়। কিন্তু মিতুল একটা জিনিস খেয়াল করেছে, সে বেশিক্ষণ রাগ পুষে রাখতে পারে না। তার রাগের মেয়াদ বড়জোড় ঘণ্টা দুয়েক। সেখানে একটা গোটা রাতের পরে রাগ যে কমে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফোন করেই অমিয়র গলাটা শুনে ভারী অবাক হয়েছিল সে। অমিয় কেমন যেন কাঠ কাঠ হয়ে কথা বলছে। অমিয় তো এমন করে না। বরং সকালের প্রথম ফোনটায় মিতুলের সঙ্গে বেশ কিছুটা দেয়ালা করে। বেলা যত বাড়ে অমিয় তত গম্ভীর হয়। সন্ধের পর থেকে তার এই গম্ভীর ভাবটা কমতে থাকে এবং রাতের দিকে একেবারেই চলে যায়। তখন অমিয় ফোনে মিতুলকে কিছু কিছু ভালোবাসার কথা বলে। মাঝে মাঝে মিতুলের খুব দুষ্টুমি পায়। তখন সে একটা দুটো অসভ্য কথা বলে ফেলে। ফোনের ও প্রান্ত থেকেই মিতুল বুঝতে পারে সে সব শুনে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে যায় অমিয়। মিতুলেরও যে একটু একটু লজ্জা করে না তা নয় কিন্তু কী করবে সে! মাঝে মাঝে তার যে খুব আদর খেতে ইচ্ছে করে। সে তার বান্ধবীদের কাছে শুনেছে, তাদের বয়ফ্রেন্ডরা না কি সারাক্ষণ ওসব করার জন্য ছুঁকছুঁক করে। কিন্তু এই লোকটাই কেমন অন্য ধারার। আজ অবধি ভালো করে একটা চুমু খায়নি। চুমু খেলে সেই চোখে, গালে কিংবা কপালে। কতবার লজ্জার মাথা খেয়ে মিতুল ঠোঁট বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকটা যেন দেখেও দেখেনি। মিতুল তো একটা মেয়ে। এর থেকে বেশি বেহায়া সে হতে পারবে না।

একবার মিতুল খুব অভিমান করেছিল। অমিয় বলেছিল, তুমি তো এখনও ছোট মিতুল। আর একটু বড় হও। আমরা তো কেউ পালিয়ে যাচ্ছি না। আগে মনে মনে মিলমিশটা হয়ে যাক। তারপর ওসব তো আছেই।

এরপরে আর কথা বলা চলে না। চুপ করে গেছিল মিতুল। তবে লোকটার এই ব্যাপারটা তার ভালোও লাগে। লোকটার চওড়া বুকে মাথা রেখে একটা আশ্রয় পাওয়া যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই লোকটাকে সে বেশ খানিকটা বোঝে। সে বুঝতে পারে লোকটা তাকে বড্ড ভালোবাসে। তাই সকালের কাঠ কাঠ গলাটা পেয়ে মিতুল বলেছিল, কী হয়েছে গো?

একটু চুপ থেকে আমতা আমতা করে অমিয় বলেছিল, তার কে এক মাসি অসুস্থ। সেখানে যেতে হবে। তখনই সামান্য খটকা লেগেছিল মিতুলের। প্রায় দু’ বছর হয়ে গেল অমিয়র সঙ্গে তার সম্পর্ক। কই কোনও মাসির কথা তো শোনেনি! কিন্তু এ নিয়ে তখন কথা বাড়ায়নি মিতুল। সে শোনেনি মানেই অমিয়র মাসি নেই এটা কোনও যুক্তি হতে পারে না। খটকাটা বাড়ল অমিয় পরপর তিনবার ফোন না ধরায়। লোকটা তো কখনও এমন করে না। যখনই মিতুল ফোন করে অমিয় ফোন ধরে। খুব ব্যস্ত থাকলেও ফোন ধরে চাপা গলায় বলে দেয়, পরে করছি। সেখানে পরপর তিনবার! এর কিছুক্ষণ পরে অমিয়র একটা মেসেজ এসেছিল। মেসেজটা দেখেও অস্বস্তি হয়েছিল মিতুলের। এমন কাঠ কাঠ করে তো লোকটা মেসেজ লেখে না। কী হয়েছে লোকটার? কোনও সমস্যায় পড়েছে? এসব ভাবতে ভাবতেই বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল মিতুল।

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। চারদিকে কেমন একটা ঝিম ধরা ভাব। দুপুরের শেষ আর বিকেলের শুরু, এই সন্ধিক্ষণটা ভারী অদ্ভুত। মিতুল চিরকাল দেখেছে এই সময়টায় কোনও এক অজানা কারণে তার মন খারাপ হয়ে যায়। আজও খুব মন খারাপ করছিল তার। কেন কে জানে অদ্ভুত একটা সন্দেহ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার মন বলছিল, অমিয় তাকে কিছু একটা গোপন করে যাচ্ছে। কিন্তু কী গোপন করছে? কেনই বা করছে! গত রাতে তিতাস দিদি আর পল্লব দাদাকে সে চলে যেতে বলেছিল বলে কি লোকটা এখনও তার ওপর রাগ করে আছে? তখনই তিতাসের ফোনটা এসেছিল। চমকে উঠেছিল মিতুল। একটা কুণ্ঠাবোধ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। গত রাতের ব্যবহারের জন্য সে খুবই লজ্জিত হয়ে আছে। সারা রাত তার ঘুম হয়নি। বারে বারেই মনে হয়েছে তিতাস দিদিকে সে ভুল বুঝেছে। যে তিতাস দিদি তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছে তাকে ভুল বোঝার কোনও অধিকার নেই তার। আর তিতাস দিদি তো পল্লব দাদাকে কত্ত ভালোবাসে। পল্লব দাদাকে ছেড়ে সে কেন তাকাতে যাবে এই মানুষটার দিকে? ছি ছি! সবটাই তার পাপ মনের কল্পনা। নিজেকে খুব ধিক্কার দিয়েছিল মিতুল।

প্রথমবার বেজে বেজে কেটে গেছিল ফোনটা। মিনিট পাঁচেক পরেই আবার ফোন করেছিল তিতাস। এবার আর দেরি করেনি মিতুল। নিজেকে সামলে ফোনটা ধরেছিল, হ্যাঁ তিতাস দিদি বলো।

কোনও ভনিতা না করে তিতাস বলেছিল, হ্যাঁ রে, অমিয়র সাথে তোর কথা হয়েছে?

একটু অবাক হয়েই মিতুল বলেছিল, না গো। সকালের পর আর হয়নি। কেন?

না, আসলে অমিয় আমার বা পল্লব কারও ফোনই ধরছে না। সকালে আমরা বেরনোর আগেই ও বেরিয়ে গেছিল। পরে পল্লবকে ফোন করে জানিয়েছিল, ব্যারাকপুরে রোডে না কি খুব ঝামেলা হচ্ছে। সেখানেই পুলিশ ক্যাম্পে আছে। তাই চিন্তা হচ্ছে আর কী!

থমকে গেছিল মিতুল। ব্যারাকপুর রোডে ঝামেলা? কই দুপুরে খেতে এসে বাবা তো তেমন কিছু বলল না! বরং বাবাও বলল যে মাসি অসুস্থ বলে লোকটা আজ অফিসে আসেনি। সবটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল মিতুলের। লোকটা তাকে একরকম বলেছে, তিতাস দিদিদের আর একরকম বলেছে! কেন? আবার সেই সন্দেহের পোকাটা কুট করে কামড়ে দিয়েছিল মিতুলকে। ফোনের ওপার থেকে তিতাস বলেছিল, যাই হোক। তোর সাথে যদি কথা হয় আমাদের একবার ফোন করতে বলিস। আমরা খুব চিন্তায় আছি।

ঠিক আছে গো। বলে ফোন রেখেছিল মিতুল আর তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল লোকটার বাড়ি যাবে। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলেছিল, কিছু একটা গোলমাল আছে। সে নিশ্চিত হয়ে গেছিল, লোকটা তাকে মিথ্যে কথা বলেছে। বেচারা মিতুল! সে জানতেও পারেনি কলকাতায় নিজের ঘরে তখন ঝুম হয়ে বসে আছে তিতাস। তার মাথার ভেতর অনুরণন তুলেছে এক অপার্থিব কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ বলছে, অমিয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ধরিয়ে দাও ওকে। ধরিয়ে দাও।

সন্ধের মুখেই অমিয়র ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছেছিল মিতুল। সিকিউরিটির থেকে জানতে পেরেছিল অনেক ভোরে অমিয় বেরিয়ে গেছে। এখনও ফেরেনি। অমিয়র বাড়িতে যে দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই আসে তারা ঘরের চাবি তার হাতে দিয়ে ন’টা নাগাদ চলে গেছে। মিতুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আজ লোকটার সাথে কথা না বলে সে ফিরবে না। তাকে জানতে হবে, কেন লোকটা তাকে মিথ্যে বলেছে? সিকিউরিটির থেকে চাবি চেয়ে নিয়েছিল সে। সিকিউরিটিকে বলেছিল, তোমার স্যারকে বোলো না আমি এসেছি। সারপ্রাইজ দেব।

সিকিউরিটি মিতুলকে খুব ভালো করেই চেনে। তাই দ্বিরুক্তি করেনি। তবে মিতুলের কথা সে পুরোপুরি শুনেছে এমনটাও নয়। প্রভুভক্তির নমুনা দিতে সে অমিয়কে বলতেই গেছিল যে ঘরের ভেতরে একজন আছে। কিন্তু অমিয় তার কথা শোনেনি। কী আর করা যাবে! নিয়তি কেন বধ্যতে।

অমিয় ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মিতুল টের পেয়েছিল কিন্তু তখন সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় সে ছিল না। কারণ ততক্ষণে তার বিশ্বাসের পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। স্থবিরের মতো সে বসেছিল খাটের ওপর। ঘরে ঢুকতেই সে দেখেছিল অমিয়র বিছানাটা একেবারে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। যেন খাটের ওপর যুদ্ধ হয়েছে। বিছানা কখন এমন এলোমেলো হয় সে সম্পর্কে মিতুলের একটা অস্পষ্ট ধারণা আছে। সে ধারণায় সিলমোহর পড়েছিল আরও দুটো জিনিস দেখার পর। মেঝেতে পড়ে আছে একটা কালো রঙের বাহারি ব্রা। আর খাটের এক কোণে পড়ে থেকে মিতুলকে বিদ্রূপ করছে একটা কালো প্যান্টি।

তারপর অমিয় ঘরে ঢুকে এল এবং আলো জ্বালাল আর আলো জ্বলতেই মিতুল দেখল, অমিয়র সারা গায়ে অজস্র দাঁতের দাগ। এক মুহূর্তের জন্য অভিমানে ভারী হয়ে এল মিতুলের চোখের পাতা। দুনিয়ার যত অভিমান যেন এক নিমেষে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে বোধকে আচ্ছন্ন করল ক্রোধ। একটা বোবা রাগে মিতুলের ইচ্ছে করল অমিয়কে খুন করে ফেলতে। কিন্তু সে রাগও বেশিক্ষণ থাকল না। অদ্ভুত এক অসহায়তা গ্রাস করল তাকে। এখন মিতুলের খুব কান্না পাচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন দম বন্ধ হয়ে যাবে। ওদিকে কেমন বিবশের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে অমিয়। বেশ খানিকটা সময় নিল মিতুল। তবু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল সে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তারপর বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে অমিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, আজ বুঝলাম কেন তুমি আমাকে আদর করতে চাও না। আমায় আদর করলে সে খুব কষ্ট পাবে বলো?

এতক্ষণে মিতুলের চোখের ভাষা পড়তে পারল অমিয়। গলায় কান্না থাকলেও সেখানে ঘেন্না ছাড়া আর কিচ্ছু লেখা নেই।