লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ৬

থানার বাইরে মেলা ভিড় হয়েছে। লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন তো গাছের ছায়া দেখে বসেও পড়েছে। সবাই বুঝে গেছে, এত সহজে এ ঘটনার ফয়সালা হবে না। সবাই তাই হাতে সময় নিয়েই জড়ো হয়েছে থানার সামনে। বদ্রিনাথ নিখোঁজ হওয়ার প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পর গতকাল রাতে পুলিশ বড় দরগার কবরখানার মধ্যে থেকে বদ্রিনাথের গলার নলি কাটা দেহ উদ্ধার করেছে। খুনের মামলা রুজু করেছে পুলিশ। তবে খুনি শুধু বদ্রিনাথের গলার নলি কেটেই ক্ষান্ত দেয়নি, যাওয়ার আগে নিপুণ হাতে বদ্রিনাথের নাকটা কেটে নিয়ে গেছে। আজ সারা সকাল গোটা কবরখানা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই কাটা নাকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বদ্রিনাথ পরোপকারী মানুষ ছিল। লোকের বিপদে আপদে বুক দিয়ে দাঁড়াত। এলাকার লোকজন তাকে ভালোবাসে। তাই তার খুনের খবর চাউর হতেই সবাই খেপে উঠেছে। তারা ঠিক করেছে, যতক্ষণ না বদ্রিনাথের খুনিকে গ্রেফতার করা হবে ততক্ষণ থানার বাইরে অবস্থান করবে। পার্টির লোকেরা সব জায়গায় মুখ মারতে চলে আসে। এখানেও এসে পড়েছে। চারদিকে পার্টির ঝান্ডা লাগিয়ে দিয়েছে। একটা ভোবদা মতো আধবুড়ো নেতা গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে, বদ্রিনাথ সাহার খুনিকে গ্রেফতার করতে হবে, করতে হবে। বদ্রিনাথ সাহার মৃত্যু মানছি না, মানব না।

পিচ করে খানিকটা থুতু ফেলল সরিত। মনে মনে বলল, তুই মানবি কি মানবি না তাতে আমার বাল ছেঁড়া যায়।

আসলে কারও মানামানিতেই আর কিছু এসে যায় না। বদ্রিনাথ মরেছে এটা দিনের আলোর মতো সত্যি। প্যান্টের ডান পকেটটা আলতো করে একবার ছুঁয়ে নিল সরিত। পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো কাটা নাকটা ওখানেই আছে। নাকটা বেশি লম্বা হয়ে গেছিল বদ্রিনাথের। সেটা তো কাটতেই হত।

বদ্রিনাথকে খুন করার পরেই ঠাটিয়ে নেশা করেছিল সরিত। একদিনেরও বেশি সময় ঘুমিয়েছিল। খোঁয়াড়ি কাটতে বেরিয়েছিল চা খেতে। সেখানেই জানতে পারে থানার বাইরে লোক জমায়েত হচ্ছে। জামাকাপড় বদলানোর আর সময় পায়নি। চা খেয়েই সোজা থানায় চলে এসেছে। তাই নাকটা রয়ে গেছে পকেটেই। লোকজনের ভিড়ে মিশে সেও এখন বসে আছে থানার বাইরে একটা গাছের তলায়। পার্টির একটা ছেলে এসে তার হাতেও কালো ফিতে বেঁধে দিয়ে গেছে। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দিয়ে গেছে। তাতে লেখা, ‘বদ্রিনাথ সাহার খুনির চরম শাস্তি চাই।’ সেইটা বুকের কাছে যত্ন করে ধরে রেখেছে সরিত।

খুন করার পর খুনি সাধারণত ঘটনাস্থল থেকে অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। নিজের অ্যালিবাই খাড়া করার চেষ্টা করে। কিন্তু সরিত উল্টো। খুন করার পর সে কিছুদিন স্পটের আশপাশেই পড়ে থাকে। একেবারে পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ায়। এতেই সবচেয়ে বড় অ্যালিবাই তৈরি হয়ে যায়। তবে সরিত যে সাবধানতার সাথে এবং সন্তর্পণে কাজ সারে তাতে কাকপক্ষীও টের পায় না। তবু সাবধানের মার নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সরিত তার এই সাতাশ বছরের জীবনে পাঁচটা মানুষ খুন করেছে কিন্তু কোনওবারই পুলিশ খুনির টিকির নাগাল পায়নি।

এ বুদ্ধিটা সরিতের মাথায় এসেছিল বই পড়ে। সে পড়েছিল, সম্রাট আকবর না কি কোহিনুর হীরেকে পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করতেন। এটার কারণ হল, কোনও জিনিসকে একেবারে চোখের সামনে অবহেলায় ফেলে রাখলে মানুষ ভেবেই উঠতে পারে না যে জিনিসটা দুর্মূল্যও হতে পারে।

বই পড়তে ভারী ভালোবাসে সরিত। তাকে বইপোকা বললেও অত্যুক্তি হয় না। তার ব্যাগের মধ্যে আর কিছু থাক না থাক গোটা দুয়েক বই সব সময় থাকবেই। বাজারে নতুন কোনও বই এলেই সরিত সে বই কিনে ফেলে আর একটু ফাঁক পেলেই বসে পড়ে বই খুলে। তবে এই বই পড়া বিফলে যায়নি। নিকষছায়া নামে একটা বই পড়তে গিয়েই তো সে কত্তাকে আসল খবরটা দিতে পেরেছিল। সে না বলা অবধি তো মানুষটা পালের গোদাকে ছেড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল অন্যের পেছনে। কথাটা শুনে কত্তা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। তারপর ঘড়ঘড়ে গলায় বলেছিল, তুই ঠিক বলছিস?

সরিত বলেছিল, আমি ঠিক ভুল বলার কে? এ গল্প তো আগেই আপনার মুখে শুনেছি। এই দেখুন না, বইয়ের পাতা উল্টে আসল জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছিল।

অনেকক্ষণ ধরে পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখেছিল কত্তা। দেখতে দেখতে থরথর করে কেঁপে উঠছিল কত্তার রোগা শরীরটা। চোখ দুটো দিয়ে আগুন বেরোচ্ছিল যেন আর একসময় সেই জ্বলন্ত দুই চোখ ভরে উঠেছিল জলে। হাতের চেটোয় চোখের জল মুছে বইটা ফেরত দিয়ে সরিতের মাথায় হাত বুলিয়ে কত্তা বলেছিল, যার জন্য আমার সর্বস্ব গেছে তাকে চিনিয়ে দিলি তুই। তুই জানিস না আমার কত বড় উপকার করলি।

মনটা ভরে গেছিল সরিতের। বলেছিল, উপকার তো আপনিও আমার কম করেননি কত্তা। আপনার চরণে আমায় জায়গা দিয়েছেন। আমাকে শিষ্য বলে মেনেছেন। এবার বলুন কত্তা, কী করতে হবে? কীভাবে মারব মাগিটাকে? শুয়োরকে যেভাবে মারে? পোঁদে গরম রড ঢুকিয়ে দেব?

চমকে উঠেছিল কত্তা। বলে উঠেছিল, না না। তুই কিছু করবি না। ও মাগির ব্যবস্থা তো আমি করব। আমাকে ওর একটা ছবি জোগাড় করে দিতে পারবি?

তা ছবিও জোগাড় করে দিয়েছিল সরিত। একটু ভাবতেই মনে পড়েছিল, বেশ কয়েক মাস আগে কাগজে এই মাগিটার ব্যাপারে বেরিয়েছিল। মাগিটা ডাক্তার। কত্তা কলকাতায় যে বাচ্চা দুটোকে মেরেছিল তাদের নিয়ে হুজ্জুতি হওয়ার ফলে মাগিটা রিজাইন দেয়। পুরনো খবরের কাগজ থেকে মাগিটার একটা ছবি কেটে এনে দিয়েছিল। ইন্টারনেট থেকেও দেখিয়েছিল, তিতাস সেনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল। তার পরেই কত্তা বলেছিল, মাগিটার দেহের কোনও অংশ লাগবে।

কলকাতায় থাকলে সরিত নিজেই যেত কিন্তু এদিকে কাজ পড়ে গেল। তবে তড়িত তৈরি হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে হয়তো জিনিসটা এনেও দিয়েছে কত্তাকে। ফোন থাকলে ফোন করে জেনে নেওয়া যেত। এই সব সময়ে একটা ফোনের দরকার অনুভব করে সরিত কিন্তু তারপরেই সাবধান হয়ে যায়। মোবাইল ফোন খারাপ জিনিস। মোবাইল থাকা মানেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ার জন্য একটা পা বাড়িয়ে থাকা। তাই সরিত ওসব ঝামেলায় যায়নি। আর দিনতিনেক এখানে থাকলেই হবে। তার পর সে কলকাতা যাবে। কত্তার সঙ্গে দেখা করবে। কত্তাকে সে রেখেছে খিদিরপুরের একটা বস্তিতে। সবে সাতটা বাচ্চা মারা হয়েছে। কত্তার পুরো শক্তি ফিরে আসার জন্য এখনও ছ’টা বাচ্চাকে মারতে হবে। কত্তার সাথে দেখা করে সেসব নিয়ে বসতে হবে। কলকাতা, হুগলি, বর্ধমান এই তিন জায়গায় কাজ হয়েছে। এবার নতুন জায়গার সন্ধান করতে হবে। নয় বছরের কম বয়সি বাচ্চা খুঁজতে হবে। তাদের সাথে ভাব জমাতে হবে। কাজ অনেক। আগে কত্তা একাই করত। কিন্তু এখন এগুলো সে-ই করে। তড়িৎ কত্তার দেখাশোনা করে আর দরকারে টুকটাক সাহায্য করে। বাচ্চা মারার ব্যাপারটা ও জানে না। কত্তাই জানাতে বারণ করেছে। মাঝখান থেকে এই বদ্রিনাথ নাক না গলালে অ্যাদ্দিনে পরের প্ল্যান ছকা হয়ে যেত। সরিত চায়, খুব তাড়াতাড়ি কত্তার সবটা শক্তি ফিরে আসুক। তবেই না কত্তা তাকে মন্ত্রদীক্ষা দিতে পারবে।

দুনিয়াতে এই একটা মানুষ, সরিত যাকে তোয়াক্কা করে। অবশ্য কত্তা বলে, রতনে রতন চেনে। তাই আমাদের এত ভাব।

তবে সরিত যদি একটা রত্ন হয় কত্তা যে খাঁটি হীরে তা নিয়ে সন্দেহ নেই সরিতের। একটা সময় অবধি সরিত ভাবত, সে এই দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক মানুষ। কিন্তু কত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সরিতের ধারণা পাল্টে গেছে। সে বুঝেছে, সে যদি সবচেয়ে খারাপ মানুষ হয়, কত্তা তবে রাক্ষস বা অসুর। কত্তা যে অবলীলায় ভয়ঙ্কর কথাগুলো ভাবতে পারে তা কোনও মানুষের কম্ম না। এমন একটা মানুষের খোঁজেই তো সরিত এতদিন ছিল। এমন একটা মানুষ যার সামনে নির্দ্বিধায় মাথা নোয়ানো যায়, যাকে ভয় পাওয়া যায়। কতকাল ধরে একটুখানি ভয় পাওয়ার জন্য সরিতের প্রাণটা আকুলিবিকুলি করেছে কিন্তু তেমন দাপের মানুষ কোথায় যে সরিতকে ভয় পাওয়াতে পারে? সরিত তো নিজেই একটা মূর্তিমান ভয়। কত কত মানুষ শুধু তার চাহনি দেখেই ভয়ে গুটিয়ে গেছে আর সে নিজের রূপ দেখালে তো কথাই নেই। মানুষ যখন তাকে দেখে ভয়ে পেচ্ছাপ করে ফেলে তখন ভারী ভালো লাগে সরিতের। মনের মধ্যে কেমন একটা তৃপ্তি ভুসভুসিয়ে ওঠে। মনে হয়, সার্থক এই জন্ম।

আসলে ছেলেবেলা থেকেই সরিত সৃষ্টিছাড়া। জন্মের পর থেকে আজ অবধি সে একবারের জন্যেও কাঁদেনি। জ্ঞান হওয়ার আগের কথা তো তার মনে নেই, মায়ের মুখে শুনেছিল, সে কাঁদে না দেখে মা তার কুষ্ঠি বিচার করতে দিয়েছিল। কুষ্ঠি বানাতে গিয়ে ভয় পেয়ে গেছিল জ্যোতি¡ী। মাঝপথে কাজ বন্ধ করে ছুটে এসেছিল মায়ের কাছে। বলেছিল, ভালো চাস তো এই ছেলেকে মেরে ফেল সবিতা। এ বেঁচে থাকলে সব্বোনাশ হবে।

মা বলেছিল, কার সব্বোনাশ?

জ্যোতিষী বলেছিল, তোর, আমার, সব্বার। এ ছেলে মানুষ নয়। অন্য কিছু।

জ্যোতিষীকে সে দিন ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছিল মা। সরিতের না কি তখন চার বছর বয়েস। কিন্তু ১২ বছর পর সরিত যেদিন মায়ের বুকের ওপর দম দম করে কয়লা ভাঙা হাতুড়ি পিটছিল সেদিন মরে মরে যেতে মা আফশোস করেছিল জ্যোতিষীর কথা না শোনার জন্য। মাকে মারতে চায়নি সরিত কিন্তু সে একটা খুন করছিল আর মা সেটা দেখে ফেলেছিল। বলেছিল, সবাইকে বলে দেবে। বাধ্য হয়েই মাকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল সেদিন। অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল। মাকে মেরে সরিত তড়িৎকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধে গেলে তড়িতেরও এই একই অবস্থা হবে।

তড়িৎ তার যমজ ভাই। সে দু’মিনিটের বড়। দু’জনকে হুবহু একই রকম দেখতে না হলেও চেহারায় এতটাই মিল যে যারা চেনে না তাদের গুলিয়ে যেতে বাধ্য। সরিত জানে, তড়িৎ তাকে পছন্দ করে না। সে না করুক, ভয় পেলেই হবে। হ্যাঁ, তড়িৎ ভয় পায় সরিতকে। একটু আধটু না, যমের মতো ভয় পায়। তড়িৎ অবাধ্য হলেই সরিত তাকে একটা বিশেষ শাস্তি দেয়। সেই শাস্তির ভয়েই কি না কে জানে তড়িৎ তার সব কথা শুনে চলে। নিজের সুবিধের জন্যই সরিত তড়িৎকে কিছু কিছু কাজ শিখিয়েছে। তবে কত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে তড়িতেরও কাজেকম্মে মন বসেছে। আর হবে নাই বা কেন? কত্তা কি আর যে সে লোক? সরিত স্বপ্ন দেখে সেও একদিন কত্তার মতো রাক্ষস হয়ে উঠবে। আর আজ বলে না, এ স্বপ্ন সরিত জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে।

সরিতের জন্ম কালীঘাটের বেশ্যাপট্টিতে। তার মাকে সুন্দর দেখতে ছিল। আর মায়ের চেয়েও সুন্দর দেখতে কোনও এক হারামি মায়ের পেট বাঁধিয়ে কেটে পড়েছিল। তাই তো সরিত আর তড়িৎকে এত সুন্দর দেখতে। অবশ্য সে হারামখোরের নাম মা মরার সময়েও বলে যায়নি। তবে বেজন্মা হলে কী হবে ছোট থেকেই সরিতের মাথাটা ভীষণ পরিষ্কার। মা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। সেখান থেকেই তো বই পড়ার নেশা ধরল। কিন্তু রক্তের দোষ কোথায় যাবে? তখন সরিতের ক্লাস সিক্স। তদ্দিনে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াল, কুকুর খুন করে সরিত হাত পাকিয়ে ফেলেছে। আলাদা করে রাগ বা কোনও কারণ ছিল না। খুন করতে ভালো লাগত তাই সে খুন করত। খাবারের লোভ দেখিয়ে কুকুর বা বেড়ালকে একটেরে নির্জন জায়গায় নিয়ে যেত। আগে থেকেই বিষ মিশিয়ে রাখত খাবারে। সেই বিষ মেশানো খাবার খেয়ে কুকুর বা বেড়ালটা যখন ছটফট করত তখন লাঠি দিয়ে সেটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মারত সরিত। এবার সে কুকুর, বেড়াল ছেড়ে নজর দিল মানুষের দিকে। সরিতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল মৃণ্ময়। রোজ সে সরিতকে নিজের টিফিনের ভাগ দিত। কী খেয়াল হল, একদিন বাড়ি ফেরার পথে সরিত তাকে একটা ইঁদুর মারা বিষ মেশানো লাড্ডু খাইয়ে দিল। বিষ মেশানো লাড্ডু খেয়ে মৃণ্ময় যখন ছটফট করছে, ড্রেনের ধারে উবু হয়ে বসে বমি করছে, পেছন থেকে তার মাথায় দমাস করে একটা থান ইট বসিয়ে দিল সরিত। ঝুপ করে মৃণ্ময়ের দেহটা উল্টে পড়ল ড্রেনের কালো থকথকে জলে। থিকথিক করছিল মশার ডিম। সেগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেল।

সেই শুরু হল মানুষ মারা। জহুরিরাও খাঁটি রত্নের খোঁজে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যেই খুন করার বিনিময়ে সরিত টাকা পেতে শুরু করল। প্রথাগত লেখাপড়ার পাট পুরোপুরি চুকিয়ে দিয়ে এই লাইনে নেমে পড়ল সে। খুন করতে সরিতের ভালো লাগে। তা ভালো লাগার কাজ করে যদি উপার্জন করা যায় মন্দ কী? এ দুনিয়ায় সেই তো ভাগ্যবান যার প্যাশন আর প্রফেশন এক হয়ে যায়। সরিত লক্ষ্য করে দেখেছে, মানুষ মারা একটা নেশা। খুব বেশিদিন মানুষ মারতে না পারলে তার ভারী অস্বস্তি হয়। কিন্তু মানুষ মারায় অনেক ঝক্কি আছে। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পুলিশকে নিয়ে। পুলিশকে সরিত ভয় পায় না কিন্তু দিনের পর দিন জেলে বন্দি হয়ে থাকাটায় তার আপত্তি। তাই অনেকদিন থেকেই সরিত এমন একটা উপায় খুঁজছিল যাতে চাইলে দূর থেকেই মানুষকে মেরে ফেলা যায়। পড়াশোনা করতে গিয়েই সরিত জেনেছিল, তন্ত্রসিদ্ধ হতে পারলে মারণ, উচাটনের মতো এমন অনেক ক্ষমতা করায়ত্ত হয় যা যে কোনও অস্ত্রের চাইতে অনেক বেশি ঘাতক। কিন্তু মন্ত্রদীক্ষা না হলে যে সিদ্ধি হয় না। আর এ বিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে গুরুবাদী। বই পড়ে আর যাই হোক তান্ত্রিক হওয়া যায় না। সে জন্যই গুরুর সন্ধানে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছিল সরিত। কিন্তু লাভ হচ্ছিল না। বেশিরভাগই ভণ্ড। শুধু মদ, গাঁজা খাওয়া আর টুপি দিয়ে লোকের থেকে পয়সা লোটার ফিকির। ঘেন্না ধরে যাচ্ছিল সরিতের। এর মধ্যেই এক ভৈরবীর সন্ধান পেল সে। হুগলি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক পরিত্যক্ত শ্মশানে তার বাস। দেখে মনে হয়েছিল, বিদ্যাটা জানে। কিন্তু শবসাধনা শেখাবে বলে নির্জনে টেনে নিয়ে গিয়ে খপ করে সরিতের প্যান্টের মধ্যে হাত ভরে দিয়েছিল মাগিটা। ছেলেবেলা থেকে মাকে এসব ছেনালি করতে দেখেছে সরিত। চড়াত করে গরম হয়ে গেছিল মাথাটা, সাধনার নামে ঢলানি? সেই মুহূর্তে ঠিক করে নিয়েছিল মাগিটাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু মাগিটা বেশ গায়ে-গতরে। সঙ্গে কোনও অস্ত্র নেই। খালি হাতে মারতে গেলে ধস্তাধস্তি হবেই। চেঁচালে লোক জড়ো হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই সে বলেছিল, আজ ছেড়ে দাও আমায়। কাল আসব।

ঘন গলায় ভৈরবী বলেছিল, সত্যি আসবি তো? আমি কালী, তুই আমার শিব। দু’জনের মিলন না হলে সৃষ্টি থেমে যাবে যে পাগল।

ভৈরবীর থুতনিটা ধরে সরিত হেসে বলেছিল, আসব গো। আসব।

মাথার মধ্যে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে সরিত বেরিয়ে আসছিল শ্মশান থেকে। আচমকা একটা গলা ভেসে এসেছিল, আগুন হবে?

থমকে ঘুরে তাকিয়ে সরিত দেখেছিল, অন্ধকারে গাছের নীচে উবু হয়ে একটা লোক বসে আছে। পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে সরিত এগিয়ে গেছিল সেদিকে। দেশলাইটা বাড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু দেশলাইটা না নিয়ে লোকটা বলেছিল, মাগিটারে কীভাবে মারবা কিছু ভাবলে?

চমকে উঠেছিল সরিত, কী করে জানল লোকটা? তার ওপর নজর রাখছিল না কি? পুলিশের খোঁচর? কিন্তু তাও যদি হয় সরিতের মনের কথা জানা তো সম্ভব নয়। সাবধানী গলায় সরিত বলে উঠেছিল, কে তুমি?

লোকটা বলেছিল, আমি নগণ্য মনিষ্যি।

বলতে বলতে লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল কোনওমতে। সরিত দেখেছিল, লোকটার কোমরের কাছ থেকে বেঁকে আছে সামনের দিকে। চলাফেরা করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল লোকটাকে। তবু লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে যেতে যেতে লোকটা বলেছিল, মারবাই যখন নতুনত্ব করে মারো। একঘেয়ে খুনে মজা নাই।

বিপদের ইঙ্গিত পেয়েছিল সরিত। চকিতে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা বোতল তুলে নিয়েছিল। লোকটা তখন তার দিকে পেছন ফিরে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাঙা কাচের বোতল অস্ত্র হিসেবে মারাত্মক। শরীরের সবটা শক্তি একত্র করে বোতলটা সে গেঁথে দিতে চেয়েছিল লোকটার ঘাড়ে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখেছিল, সে এক বিন্দু নড়াচড়া করতে পারছে না। অদৃশ্য এক শেকল যেন পাকে পাকে বেঁধে ফেলেছে তাকে। নিজের শরীরটাই আর তার বশে নেই। জীবনে এই প্রথমবার ভয় পেয়েছিল সরিত। সে অনুভব করছিল, তার গলার কাছটা শুকিয়ে আসছে। কেমন যেন ভার ভার ঠেকছে তলপেট। বিচ্ছিরি একটা শীত ভাব কিলবিল করে বেড়াচ্ছে রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায়। চিৎকার করে উঠতে চেয়েছিল সরিত। কিন্তু তাও পারেনি। কে যেন লোহার সাঁড়াশি দিয়ে টিপে ধরে রেখেছিল তার কণ্ঠা। তখনই যেতে যেতে ফিরে তাকিয়েছিল লোকটা। খিক খিক করে হেসে বলেছিল, এরে বলে হস্তপদ বন্ধন। এলেবেলে কাজ। মন দিয়ে শিখতে পারলে আরও কত কী যে করা যায়! আমার গুরু বলতেন, ওরে লোকনাথ, তন্ত্রই পালক। তন্ত্রই সংহারক। তোমার মধ্যে বস্তু আছে বাপ। কিন্তু বড্ড ছাড়াকাটা হয়ে আছে। পাকড়ে ধরে বিন্দুতে স্থিতি করাতে লাগবে। চাও তো দিশা দেখাতে পারি। এবার তোমার ব্যাপার। বড় হয়েছ, যা ভালো বোঝো।

ফের খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে গেছিল লোকটা আর সরিতের গায়ে জড়িয়ে থাকা অদৃশ্য শেকলের বাঁধনেও ঢিল পড়েছিল। গুড়ুল খাওয়া পাখির মতো ঝপ করে মাটির ওপর খসে পড়েছিল সরিত। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়েছিল ধাতস্থ হতে তার পর ছুটে গিয়ে সোজা আছড়ে পড়েছিল লোকটার পায়ে।

চুঁচড়ো স্টেশনের একটা অন্ধকার কোণে উবু হয়ে বসে ফুঁ দিয়ে চা খেতে খেতে লোকটা ফিসফিস করে বলেছিল, শোনো বাপ, পাপ করার নেশা হল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেশা। একটা সময় পাপ করতে করতে মানুষ আর পাপী থাকে না। সে নিজেই আস্ত একটা পাপ হয়ে ওঠে। ভালোর যেমন একটা শক্তি আছে, খারাপেরও আছে। বরং খারাপের শক্তিতে কাজ হয় অনেক চটজলদি। ভালো ব্যাপারটাই হল ভদ্রঘরের সতী মাগির মতো। কোমরের কাছে কাপড় গুটোতে এত সাধ্যসাধনা করতে হয় যে ঝক্কি পোষায় না। আর খারাপ হল বাজারি মেয়েছেলে। পা ফাঁক করেই আছে। তোমার তো বাপ সুখ পাওয়া নিয়ে কথা। তা হলে খামোখা অত খাটতে যাবা কেন? তবে হ্যাঁ, খারাপেরও তরতম আছে। খারাপকে খারাপতর, তার পর খারাপতম করে তুলতে হয় ধীরে ধীরে। তবেই বিপরীত শক্তি আত্মস্থ হয়। বুঝলা? তা এই মাগিরে যখন মারবা ভেবেছ, খুব খারাপ করে মারো। দেখি তুমি কতটা খারাপ করে ভাবতে পারো। তোমার ভাবনার দৌড় দেখি।

মানুষ খুন করার কয়েকটা অভিনব পন্থা পরপর বলে গেছিল সরিত কিন্তু প্রত্যেকবারই মাথা নেড়ে নাকচ করে দিয়েছিল লোকটা। বলেছিল, তুমি যেগুলো বলছ বাপ সেগুলো এমন কিছু নতুনত্ব না। আর সবচে বড় কথা এগুলোর মধ্যে নিষ্ঠুরতার বড় অভাব।

থমকে গেছিল সরিত। তার বুদ্ধিতে বলে, খুন ব্যাপারটাই ভয়ানক নিষ্ঠুর একটা কাজ। সেখানে আবার নিষ্ঠুরতার অভাব খুঁজে পাচ্ছে লোকটা! বলেছিল, আমার মাথায় তো এগুলোই আসছে। আপনিই বলুন প্রভু।

কাঁধে হাত রেখে লোকটা বলেছিল, প্রভু না। তুমি আমারে কত্তা বলে ডাকবা। আমার বড় কাছের একজন আমায় কত্তা বলে ডাকত। তোমার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। ভালো করে কাজ করো, তোমায় একটা নাম দেব। তোমায় গেনু বলে ডাকব।

তখনও নিকষছায়া বইটা ঘুমিয়ে আছে পল্লবের অন্তরেই। ফলে অবাক হয়ে সরিত বলেছিল, গেনু কে?

লোকটা বলেছিল, সে পরে একদিন বলব তোমায়। যাক গে, খুনের কায়দাটা বলি। দেখো তো পছন্দ হয় কি না?

বলেছিল লোকটা আর সবটা শুনে ফের ভয়ে হিম হয়ে গেছিল সরিত। তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। হাত কাঁপছিল তিরতির করে। মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন, এত ভয়ঙ্কর ভাবে কেউ ভাবতে পারে? তখনই সরিত বুঝেছিল, তার উল্টো দিকে যে বসে আছে, মানুষের মতো দেখতে হলেও আসলে সে রাক্ষস কিংবা অসুর। মানুষের মন এখনও এতটা হিংসা ধারণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। প্রথমে ভয় পেলেও সারা রাত ধরে নিজেকে বুঝিয়েছিল সরিত। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাকেও কত্তার মতো হয়ে উঠতে হবে। মানুষ থাকার মধ্যে মজা নেই। রাক্ষস হতে হবে, রাক্ষস। খারাপকে করে তুলতে হবে কুৎসিত। নৃশংসকে করে তুলতে হবে নারকীয়।

পরের দিন রাত বাড়তেই সে হাজির হয়েছিল পরিত্যক্ত শ্মশানটায়। তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল ভৈরবী। একটা বড় ঝোপের আড়ালে তাকে উদোম করে ফেলে ধামসাতে ধামসাতে প্রথমেই সায়া দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলেছিল সরিত। তার পর নিজে উদোম হয়ে জাঙিয়াটা ঠেসে গুঁজে দিয়েছিল তার মুখের মধ্যে। বহুদিনের বুভুক্ষু মাগিটা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল সরিতের এই দস্যুতায়। তখনই নিপুণ হাতে প্যান্টের পকেট থেকে জিনিসটা বার করে এনেছিল সরিত। আদর করার অছিলায় সরসরিয়ে নীচের দিকে নেমে গেছিল মাগির পেট বেয়ে আর চোখের পলকে তার দু’পায়ের মাঝখানে উজাড় করে দিয়েছিল অ্যাসিডের বোতলটা। অবরুদ্ধ যন্ত্রণায় কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিল মাগিটা। হাত বাঁধা থাকায় মুখ থেকে বার করতে পারছিল না জাঙিয়াটা আর পারছিল না ভারসাম্য রাখতে। উঠে ছুটতে গিয়েই উল্টে পড়েছিল। আর দেরি করেনি সরিত। দ্রুত হাতে কেটে দিয়েছিল মাগিটার গোড়ালির শিরা দুটো। ভালো ভাষায় যাকে বলে অ্যাকিলিস টেন্ডন।

সেই প্রথমবার খুন করার পরে সরিতের জ্বর এসেছিল। সারারাত মাথার কাছে বসে জলপট্টি দিয়েছিল কত্তা। ভোরের দিকে করমচার মতো লাল চোখে তাকিয়েছিল সরিত। তার বুকে হাত বোলাতে বোলাতে কত্তা বলেছিল, ভয় পায় না বাপ। ভয় পায় না। তোমার হবে। তুমি পারবা গেনু হয়ে উঠতে। প্রথম প্রথম তো, তাই এমন আনচান করছে। আসলে অনেকখানি বিপরীত শক্তি শরীরে প্রবেশ করেছে। এ তারই প্রভাব। ধীরে ধীরে অভ্যেস হয়ে যাবে।

তা ভুল বলেনি কত্তা। সত্যি অভ্যেস হয়ে গেছিল সরিতের। এখন আর স্বাভাবিক ভাবে খুন করতে তার ভালো লাগে না। বদ্রিনাথের কাটা নাকটায় হাত বোলাতে বোলাতে এসবই ভাবছিল সরিত। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। থানার গেট থেকে কিছু দূরে একটা টোটো এসে থেমেছে। টোটো থেকে নেমে এল একটা হলুদ জামা পরা দোহারা চেহারার মেয়ে। চুলগুলো পেছনে টান করে বাঁধা। চোখে সানগ্লাস। ব্যাগটা বুকের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি হয়ে ঝুলছে কোমরের কাছে। একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে মেয়েটা ঢুকে গেল থানার ভেতর। সরিত লক্ষ্য করল, বুক না থাক মাগিটার পাছাটা মাখন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল সরিত। তার ইন্দ্রিয়গুলো বড়ই সংবেদনশীল। নতুন কিছু ঘটতে চললে সে তার আঁচ পায়। এবারও তার মন বলে উঠল, এই মাগিটার মধ্যে কোনও একটা ঘাপলা আছে। এ এই এলাকার মাল নয়।

একটা কথা বাদে পুলিশকে সবটাই খুলে বলেছে রোশনি। বদ্রিনাথের কল রেকর্ড ট্রেস করে বর্ধমান থানার পুলিশ রোশনির সাথে যোগাযোগ করেছিল। সে খবরের কাগজে চাকরি করে জেনে অত্যন্ত বিনীত ভাবেই অনুরোধ করেছিল, যদি একবার সে থানায় হাজিরা দেয় বড় ভালো হয়। না করেনি রোশনি। পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকের অসদ্ভাব নেই। একটা বড় জবানবন্দি দিয়েছে সে। সেখানে বদ্রিনাথের ফোন আসা থেকে শুরু করে করে তার বর্ধমানে আসা এবং দেখা না পেয়ে ফিরে যাওয়া সবটাই সে বলেছে। বলেনি যেটা সেটা হল বদ্রিনাথের দেওয়া খবরের সূত্রটা। কাল যখন বদ্রিনাথকে পাওয়া যাচ্ছিল না তখন থেকেই রোশনির মনে কু ডেকেছিল কিন্তু সেটা যে এমন মর্মান্তিক ভাবে সত্যি হয়ে যাবে তা রোশনি ভাবতেও পারেনি। বদ্রিনাথের খুন তাকে বিহ্বল করে দিয়েছিল। একটাই কথা ভাবছিল সে, বদ্রিনাথের খুনের পেছনে কি এই গোপন খবরটার ভূমিকা আছে? বদ্রিনাথ এই খবরের সন্ধানে অনেকটা দূর চলে গিয়েছিল বলেই কি তাকে অকালে সরে যেতে হল? সে যদি এই খবরের গভীরে প্রবেশ করতে যায় তাকেও কি তবে সরে যেতে হবে? এই সব ভাবতে ভাবতেই থানা থেকে বেরিয়ে এসেছিল রোশনি। অন্যমনস্কের মতো হেঁটে যাচ্ছিল। এমন সময় কে যেন ডাকল, ম্যাডাম।

ঘাড় ঘুরিয়ে রোশনি দেখল, একটা সুন্দর মতো ছেলে। লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে চেহারা। রোশনি বলল, আমাকে ডাকছেন?

ছেলেটা এগিয়ে এল, হ্যাঁ। কলকাতা থেকে আসছেন?

একটু থমকাল রোশনি। অপরিচিত মানুষ বেশি কৌতূহল দেখালে তার ভালো লাগে না। গম্ভীর গলায় সে বলল, তাতে আপনার কী দরকার?

দু’পা এগিয়ে এল ছেলেটা, বদ্রিদার সঙ্গে আপনারই তো কথা হয়েছিল। তারপর আরও দু’পা এগিয়ে এসে চাপা গলায় বলল, ওই শিশুমৃত্যুর ব্যাপারে, তাই তো?

প্রবল চমকে উঠল রোশনি। সেটা দেখে মনে মনে হেসে ফেলল সরিত, ঢিলটা একদম ঠিক জায়গায় লেগেছে। থানার এক কনস্টেবলকে খৈনি বেটে দিতে দিতেই জেনে নিয়েছিল, মেয়েটা খবরের কাগজে চাকরি করে। বদ্রিনাথের কল রেকর্ডে মেয়েটার নম্বর আছে। তখনই দু’য়ে দু’য়ে চার করে নিয়েছিল সরিত। সে আবার বলল, বদ্রিদা আমাকে সব বলেছিল। বদ্রিদা ভয় পাচ্ছিল, ওর কিছু হয়ে যেতে পারে। ঠিক তাই হল। বদ্রিদা ভালো লোক ছিল। ওর খুনিকে না ধরা অবধি আমরা থানার সামনে অবস্থান করব। তা ছাড়া আমিও চাই এই শিশুমৃত্যুর কেসটা সবার সামনে আসুক। আমি যতটা জানি আপনাকে বলতে পারি ম্যাডাম। কিন্তু এখানে সবার সামনে কথা বলা ঠিক হবে না। এখান থেকে আমি মিনিট দশেকের ডিসট্যান্সে থাকি। যদি চান আপনি আমার সঙ্গে আসতে পারেন।

রোশনির দিকে তাকিয়ে রইল ছেলেটা। দ্বিধায় পড়ে গেল রোশনি। সে বুঝতে পারছে না, এই ছেলেটাকে বিশ্বাস করা কতটা উচিত হবে? তার একটু ভয় ভয় করতে লাগল কিন্তু একই সাথে এই খবরের ওজন তার সাংবাদিক সত্তাকে উত্তেজিত করে তুলল। একটা সময় সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে বলে উঠল, চলুন।বড় খুশি হল সরিত। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বদ্রিনাথের কাটা নাকটাকে একটু আদর করে দিল সে।