বউকালীবাড়ির বেত্তান্ত – ১

কলেজের ছুটি পড়তেই বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিলাম। ছুটিতে কলকাতায় পড়ে থাকার কোনও মানেই হয় না। ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা হল আমার মামার বাড়ি। মামাবাড়ির গ্রামটা এখনও গ্রামই আছে। শহরের নকল করতে গিয়ে দোআঁশলা হয়ে যায়নি। দিগন্তজোড়া ধানখেত। সন্ধে হলেই আকাশ কালো করে উড়ে যায় টিয়ার ঝাঁক। শীতকালে চারপাশ হলুদ হয়ে থাকে সর্ষেখেতে। এমন উজ্জ্বল সে হলুদ রং যে চোখে ধাঁধা লাগে। ফুলকপি খেতের ওপর ঝরে পড়ে হিম। ভিজে মাটি থেকে কেমন মায়া মায়া গন্ধ ওঠে। বড় বড় বাঁশবাগান। তলায় বিছিয়ে থাকে রাজ্যের শুকনো পাতা। আম-কাঁঠালের বাগানের তো লেখাজোকা নেই। এক একটা বাগান এমন ঝুপসি যে দিনের বেলাতেও ভালো করে আলো ঢোকে না। ইলেকট্রিকের একটা ট্রান্সফরমার বসেছে বটে কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কুড়ি ঘণ্টাই আলো থাকে না। তাতে অবশ্যি গ্রামের লোকের কোনও হেলদোল নেই। তারা যেন শহরের ছোঁয়াচ বাঁচাতে পারলেই ভারী তৃপ্তি পায়। কলকাতা থেকে মাত্র একশো কুড়ি কিলোমিটার দূরেও যে এমন একখানা ছবির মতো গ্রাম আছে ভাবলেই বড় অবাক লাগে। ছুটিছাটা পেলেই তাই আমি মামাবাড়িতে বডি ফেলে দিই। গাছের ফল, পুকুরের মাছ আর হাঁসের ডিম খেয়ে গায়ে গত্তি লাগিয়ে নিই খানিক। এবারও ভোর ভোর পৌঁছে গেলাম মামাবাড়িতে। যেতেই রাজকীয় আপ্যায়ন শুরু হয়ে গেল। ভারী পেতলের গ্লাসে বেলের পানা বানিয়ে দিদা বলল, খা বাবুসোনা।

মামাবাড়ির সামনে একটা বিশাল পুকুর। পেছনে আম-কাঁঠালের বাগান। সে বাগান পেরিয়ে আর একখান পুকুর। মাঝখানে উঠোন ঘিরে গোল করে ঘর উঠেছে। সে উঠোনের একপাশে হাঁস-মুরগির ঘর। মাঝে মাঝে বাগানের দিকে দরজা টপকে ভামবেড়াল ঢুকে পড়ে হাঁস-মুরগি ধরতে। তাই উঠোনে ভামধরা কল পেতে রাখা হয়েছে। কিন্তু ভামবেড়াল খুব চালাক প্রাণী। ওরা সহজে ফাঁদে পা দেয় না। বেলের পানা শেষ হতে না হতেই মামি এত বড় একটা জামবাটি হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে খই, ঘরে পাতা টকদই, দু’টো পাকা মর্তমান কলা আর গোটা তিনেক আম। এতটা একসঙ্গে খাব কী করে ভাবছি তার মধ্যেই মামার ছেলে জিতু বলল, ওর মধ্যে একটু আখের গুড় নিবি না কি দাদা?

উত্তর দেওয়ার আগেই মামা বলল, দুপুরে কী খাবি? মাছ না মাংস? মাছ খেলে এই বেলা বল। পদা মুনিশকে দিয়ে জাল দেওয়াব। আর নয়তো দেশি মুরগিও খেতে পারিস। পদাকে বললেই কেটে দেবে।

মামি বলল, মাছ, মাংস দুটোই খাবে। এ কি বে বাড়ি না কি? মাছ খেলে মাংস নাই? তুমি পদাকে জাল দিতে বলো।

দিদা সরু চোখে আমার হাত-পা টিপতে টিপতে বলল, রোগা হয়ে যাচ্ছিস কেন বাবুসোনা? ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস না তাই না? ও বউমা, ওরে আর দু’টো আম কেটে দাও দিনি।

আমি আঁতকে উঠে কিছু বলতে যাব তার আগেই ছোটমামা হাতে একটা ভাঁড় ঝুলিয়ে হাজির। আমার হাঁ মুখে একটা পেল্লায় রসগোল্লা গুঁজে দিল।

* * *

জিতুর বিছানায় শুয়ে খালি এপাশ ওপাশ করছিলাম। এমন খাওয়া খাইয়েছে যে পেটটা অজগরের মতো ফুলে গেছে। ঠিক করে দমও নিতে পারছি না। জিতু দেখি ফুরর ফুরর করে নাক ডাকছে। খুব রাগ ধরে গেল আমার। পেটে এক খোঁচা মারলাম। জিতু ধড়মড় করে উঠে বসল, কী হল?

আমি রাগী চোখে বললাম, আমার ভালো লাগছে না জিতু। বাইরে দেখ কী সুন্দর বিকেল। এখন পড়ে পড়ে ঘুমোবি?

জিতু আলস্য ভরে একটা হাই তুলে বলল, কালকেও এমন বিকেল থাকবে। আজ তোর কল্যাণে হেবি খেয়েছি। একটু ঘুমোতে দে না।

আমি ঠেলে ওকে সোজা করে বসিয়ে দিলাম, খবরদার না। জিতু আমি যদি এখন ঘুমোই এটাই কিন্তু আমার শেষ ঘুম হবে। এমন অ্যাসিড হয়ে যাবে তখন আর আমায় বাঁচাতে পারবি না।

জিতু হতাশ গলায় বলল, তা হলে কী করতে চাস বল?

আমি বললাম, চল না বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি।

চল, ব্যাজার মুখে বলল জিতু।

ছোটমামার সাইকেলটা নিয়ে আমি আর জিতু বেরিয়ে এলাম। রোদ পড়ে এসেছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে। ভারী মনোরম পরিবেশ। দু’জনে মাঠের ধার দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। মাঠে ছেলেরা গাদির কোর্ট কেটেছে। খুব হুল্লোড় করছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। আকাশে কয়েকখানা ঘুড়ি। একটা আবার কেটে গেল। মনটা বড় ভালো হয়ে গেল আমার। জিতুর গানের গলা দরাজ। বললাম, একটা গান ধর না জিতু।

জিতু বলল, কোন গান বল।

ওই যে, পৃথিবী আমারে চায়।

আচ্ছা।

জিতু গান ধরল, পৃথিবী আমারে চায়/ রেখো না বেঁধে আমায়/ খুলে দাও প্রিয়া/ খুলে দাও বাহুডোর…

গান শেষ হতে জিতুকে আমি সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিলাম। বললাম, এই হল জল-হাওয়ার গুণ। মনটা একেবারে লাগামছাড়া হয়ে গেছে। আর একটা ধর জিতু।

আমি বিলমাঠের আল ধরে সাইকেল চালাতে লাগলাম। জিতু একটার পর একটা গান গেয়ে যেতে লাগল। কখন যে সন্ধে নেমে এসেছে বুঝতে পারিনি।

বিলমাঠের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছি আমরা। বিলমাঠ হল একটা নিচু জমি। বর্ষাকালে জল জমে গিয়ে বিশাল বাওড়ের মতো দেখায়। সেই জন্য মাঠটার নাম হয়ে গেছে বিলমাঠ। সন্ধের একেবারে আবছা আলোয় বাঁদিকের উঁচু ঢিপি আর মন্দিরের চুড়াটা দেখে বুঝলাম আমরা বিলমাঠের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে চলে এসেছি। ওটা বউকালীবাড়ি মন্দির। এই কালীমন্দিরের নাম বউকালীবাড়ি কেন তা নিয়ে একটা গল্প আছে। অনেক কাল আগে এ গ্রামে এক জমিদার ছিল। তার নাম ভবতোষ হালদার। সে জমিদার বাড়ি ভাঙাচোরা অবস্থায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের এক প্রান্তে। তা সেই জমিদার বাড়িতেই আগে কালীমন্দির ছিল। সেখানে বলি হত। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের পুজো করার অধিকার ছিল না। ভবতোষের দ্বিতীয় পক্ষের বউটা না কি ছিল খুব জেদি। সে লুকিয়ে লুকিয়ে এই বিলমাঠে এসে মায়ের পুজো করত। ভবতোষ একদিন সেটা জানতে পেরে যায়। দলবল নিয়ে এসে দেখে এই বিলমাঠে এক গাছতলায় ঘট পেতে বউ পুজো করছে। রাগে আগুন হয়ে বউয়ের চুলের মুঠি ধরে ভবতোষ। বলে, লুকিয়ে লুকিয়ে পুজো করিস তো? দেখি তোর ঠাকুর আজ তোকে কেমন করে বাঁচায়? এই ঘট পেতেছিস তার সামনেই বলি দেব তোকে।

বউটা কিন্তু কাঁদল না, কোনও কাকুতিমিনতি করল না। শুধু বলল, তোমার অকল্যাণ হবে।

বউটাকে এই বিলমাঠেই গাছের নীচে খুন করল ভবতোষ। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে অবাক কাণ্ড! তার বাড়ির মন্দিরে বিগ্রহ নেই। মায়ের মূর্তি উঠে এসেছে বিলমাঠের সেই গাছতলায়। সেই থেকে এখানেই তৈরি হল মন্দির। নাম হল বউকালীবাড়ি। শোনা যায়, ভবতোষের বীভৎস মৃত্যু হয়েছিল। কেউ যেন এই বউকালীবাড়ি মন্দিরের সামনেই ভবতোষকে দু’ আধখানা করে কেটে রেখেছিল। চিল, শকুনে তার চোখ খুবলে নিয়ে চলে গেছিল।

এই মন্দিরটা নিয়ে গ্রামের লোকের মধ্যে নানা গুজব আছে। লোকে বলে, রাত হলে এই মন্দিরে না কি নানা অশরীরী কাণ্ডকারখানা হয়। কারা যেন চলফেরা করে। অনেকে ধান কেটে রাত করে বাড়ি ফেরার পথে এই মন্দির থেকে নূপুরের শব্দ পেয়েছে। আবার কেউ দেখেছে, কে একটা বউ শাড়ি পরে মন্দিরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বেলা। সুর করে ডাকে, আয়। আয়।

গুজব এমনই একটা জিনিস যত ছড়ায় তত বাড়ে। তাই মন্দিরটা একেবারেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এক পূজারি আছেন। তিনি সন্ধে হবার আগেই মাকে আরতি করে বাড়ি ফিরে যান। আসেন আবার পরদিন সকালের আলো ফোটার পরে। দিনের বেলা কিছু মানুষ আসে পুজো দিতে কিন্তু বিকেলের আগেই সব কাজ সেরে ফিরে যায়। বিলমাঠের এদিকটা এমন ঝুপসি মতো আর একটেরে, কেউ আসে না। তা ঘুরতে ঘুরতে যে সেখানেই গিয়ে পড়ব আমরা বুঝতে পারিনি। আমি বললাম, জিতু, এ তো বউকালীবাড়ির কাছে চলে এলাম রে। চল ফিরে যাই।

জিতু ততক্ষণে আলের ওপর বসে পড়েছে। বলল, অনেকটা পথ সাইকেলে এলাম। কোমর ধরে গেছে। বোস না একটু জিরিয়ে নিই।

আমি বরাবরই দেখেছি, জিতুর ভয়ডর কম। আর আমিও এসব গুজবে বিশ্বাস করি না। নেহাত জায়গাটা বড় নির্জন বলে গা শিরশির করছে। সাইকেলটা শুইয়ে রেখে জিতুর পাশে বসে পড়লাম। একটু বসে থাকতেই বড় ভালো লাগল। মানুষ অন্ধকারকে যে কেন এত ভয় পায় কে জানে! অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব মায়া আছে। আকাশে আজ চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। কী তিথি অত জানি না কিন্তু চাঁদহীন আকাশে তারাগুলো যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে সারা আকাশ জুড়ে হলদে, সবুজ হীরের কুচি ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। মাঝে মাঝে এক-একটা তারা যেন দপ করে জ্বলে উঠছে। দূরে মাঠের মাঝখানে একটা গোল ফুটকির মতো আগুন জ্বলে উঠল। কী একটা সুর ভেসে আসছে। হাওয়া উল্টো দিকে বইলে সুরটা আবার হারিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, ও কিসের সুর জিতু?

জিতু বলল, সাঁওতালরা শুয়োর মেরেছে। ওরা রোজ পিকনিক করে।

তুই শুয়োর খেয়েছিস জিতু?

শুয়োর খাইনি কিন্তু নিতাই মুর্মু একদিন আমায় ধেড়ে ইঁদুর পুড়িয়ে খাইয়েছিল।

ধেড়ে ইঁদুর? ভালো খেতে?

নাহ। মাটি মাটি গন্ধ। সিগারেট খাবি দাদা?

সিগারেট? কোথায় পেলি?

ছোটকার প্যাকেট থেকে ঝেড়েছি।

আগুন আছে তোর কাছে?

জিতু শুয়েছিল। উঠে বসল, না। কিন্তু আগুনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

আমি বললাম, কী করে? ওই সাঁওতালদের থেকে আগুন চাইবি?

না না, অদ্দূর কে যাবে?

তা হলে?

পুরুত তো কালীবাড়িতে প্রদীপ দেয়। ওই আগুন থেকে ধরিয়ে নেব।

আমি চমকে উঠলাম, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই ভর সন্ধেবেলা তুই বউকালীবাড়িতে ঢুকবি? না না ও সব পাকামো মেরে লাভ নেই। বাড়ি যাই চল। এবার সবাই চিন্তা করবে।

জিতু বলল, দাঁড়া না। সিগারেটটা ধরিয়েই চলে আসব। সাইকেলে করে সিগারেট খেতে খেতে যাব। মজাই আলাদা।

আমার কোনও কথা না শুনে জিতু গাছে গাছে ঝুপসি হয়ে থাকা ঢিপিটার দিকে এগিয়ে গেল। একটু পরেই জিতুকে আর দেখা গেল না। অন্ধকারে হারিয়ে গেল জিতু। শোঁ শোঁ করে হাওয়া দিল হঠাৎ। আমার গাটা কেমন ছমছম করে উঠল।

বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেল কিন্তু জিতু ফিরল না। এবার আমার বেশ অস্বস্তি হতে লাগল। সিগারেট ধরাতে এতক্ষণ লাগে? কে বলেছিল ওকে এই কায়দা করতে! ভীষণ রাগ হল জিতুর ওপর। আসলে আমার ভয় করছিল। আমি ভাবছিলাম, জিতু যদি না ফেরে তা হলে আমাকে ওই মন্দিরে ঢুকতে হবে। যদিও আমি গুজবে বিশ্বাস করি না তবু এই সন্ধেবেলায়, চাঁদহীন নক্ষত্ররাজিময় আকাশের নীচে, বিশাল বিস্তীর্ণ নির্জন বিলমাঠের বুকে দাঁড়িয়ে আমার মনে হতে লাগল যা রটে তার কিছু তো ঘটে। আমি প্রাণপণে চাইতে লাগলাম, এখন যেন কোনও নূপুরের শব্দ না শুনি।

সময় গড়াচ্ছে। কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। এমন সময় অন্ধকার ঢিপির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা ছায়ামূর্তি। হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে আমার গলার কাছে আটকে গেল। হাতে পায়ে কোনও সাড় পাচ্ছি না। তাও সবটা সাহস এক জায়গায় করে চিৎকার দিয়ে উঠলাম, কে? কে ওখানে?

এগিয়ে আসতে আসতে ছায়ামূর্তি বলল, আমি। জিতু।

ধড়ে যেন প্রাণ পেলাম আমি। ছুটে গেলাম জিতুর দিকে, এতক্ষণ লাগে তোর সিগারেট ধরাতে? আমি চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।

জিতু গম্ভীর গলায় বলল, ধরাতে পারিনি। প্রদীপ নিভে গেছিল।

আমি বললাম, বেশ হয়েছে। যত রাজ্যের উদ্ভট খেয়াল তোর। চল। সাইকেলে ওঠ।

জিতুকে পেছনে বসিয়ে আমি সাইকেল ছোটালাম আলের ওপর দিয়ে। অন্ধকারে সাইকেল চালাতে খুবই অসুবিধে হচ্ছে। বললাম, সন্ধেবেলায় এখানে আসাটা ঠিক হল না বুঝলি জিতু? খানাখন্দে পড়লে আর দেখতে হবে না।

জিতু কোনও উত্তর দিল না। আমার একটু খটকা লাগল। মন্দির থেকে ফিরে আসার পর থেকেই জিতু কেমন যেন একটা গম্ভীর হয়ে আছে। আমি বললাম, এই জিতু কী হয়েছে রে তোর?

জিতু কিছু বলার আগেই আমাদের খুব কাছে শেয়াল ডেকে উঠল। চমকে তাকিয়ে দেখি, সাইকেল থেকে কিছুটা দূরেই নীচে জমির মধ্যে জ্বলজ্বল করছে কয়েক জোড়া সবুজ চোখ। আমি ঘাবড়ে গেলাম, এই মরেছে। এখন আবার শেয়াল জুটল কোত্থেকে? কামড়েটামড়ে দেবে না তো। মুখে হ্যাট হ্যাট করলাম। কিন্তু আমার হ্যাট হ্যাটের প্রত্যুত্তরে শেয়ালগুলো আরও জোরে ডেকে উঠল। আমি জোরে চালাতে চেষ্টা করলাম আর তখনই লক্ষ্য করলাম আমি কিছুতেই জোরে চালাতে পারছি না। জিতু যেন অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। ঘুরে বলতে গেলাম, চাকায় কি হাওয়া নেই? কিন্তু যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। সাইকেলের ক্যারিয়ার খালি। জিতু নেই সেখানে। আমি টাল সামলাতে না পেরে নীচু জমির মধ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়লাম। কোনওমতে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখলাম, আমার থেকে হাত দশেক দূরে অন্ধকারে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখতে পাচ্ছি না। শুধু দেখতে পাচ্ছি তার গায়ের শাড়িটা হাওয়ায় উড়ছে। করুণ গলায় সে বলতে লাগল, আয়। আয়।

দেখলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জিতু। জিতু তো ছিল না। তা হলে এল কোথা থেকে? না কি আমি ভুল দেখেছি? ভয়ে আমার বমি পেতে লাগল। তবু ওই ভয় পেতে পেতেই আমি বুঝতে পারলাম, জিতুর ওখানে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমি মাটিতে পড়ে থেকেই হাত বাড়িয়ে জিতুর পায়ের গোড়ালি চেপে ধরলাম। চিৎকার করে বললাম, যাস না জিতু। কিন্তু জিতুর গায়ে যেন মত্ত হাতির জোর। আমাকে নিয়েই এগিয়ে যেতে লাগল জিতু। মেয়েগলাটা তখনও বলে চলেছে, আয়। আয়।

* * *

বিলমাঠ থেকে আমাদের উদ্ধার করল চারটে মাতাল। নেশাড়ুদের ভয়ডর কম থাকে। তারা গেছিল আবডালে বসে নেশা করবে বলে। মৌতাত জমেও উঠেছিল ঠান্ডা হাওয়ায়। সম্ভবত আমার চিৎকারে তাদের চটকা ভাঙে। জিতুকে এই এলাকায় সবাই চেনে। আমাদের অচেতন হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তারাই মামাবাড়িতে খবর দেয়। লোকজন সাথে করে গিয়ে বড়মামা আমাদের নিয়ে আসে। এই সবটাই শুনেছি পরের দিন দুপুরে ঘুম ভাঙার পরে। ছোটমামার মুখে।

ঘুম থেকে উঠে আমার শরীর কিন্তু বেশ ঝরঝরে হয়ে গেল। কাল সন্ধ্যায় যে অত কাণ্ড হয়েছে সবটাই কেমন দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল। তবে জিতু কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হল না। তার গায়ে একশো জ্বর। চোখ লাল হয়ে আছে। তার মধ্যেই জিতু আমাকে ফিসফিস করে বলল, আমি যে মন্দিরে ঢুকেছিলাম কাউকে বলিস না দাদা।

অবাক হলেও চুপ করে রইলাম। সবাই যখন জানতে চাইল কাল কী হয়েছিল, বললাম, বিলমাঠে আমি আর জিতু ভয় পেয়েছি। জিতুর কথামতো মন্দিরের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলাম। দিদা আমাদের দু’জনের গায়েই লোহা আগুনে সেঁকে ছুঁইয়ে দিল। চণ্ডীতলা থেকে চরণামৃত আনা হল। আমরা দুই ভাই সেই চরণামৃত খেলাম। বড়রা পইপই করে বলল, আর যেন সন্ধেবেলা বিলমাঠে না যাই। এটা না বললেও কিছু এসে যেত না। কারণ আমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর ওমুখো হব না। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। লোকমুখে যা ছড়িয়েছে সবটাই গুজব নয়। কারণ এখনও আমার কানে ভাসছে ওই আয়, আয় ডাক। কিন্তু হায় রে নিয়তি। এক দিনের মধ্যে আমাকে যে আবার ওই বিলমাঠে, ওই বউকালীবাড়ি মন্দিরে যেতে হবে সে কে জানত!

* * *

রাত্তিরে আমি জিতুর পাশেই শুলাম। জিতু খুব একটা ভালো করে খেল না। অবশ্য থার্মোমিটারে দেখলাম ওর গায়ে জ্বর নেই। ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। মাথার দিকে জানলাটা খোলা। বাগানের দিক থেকে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। সে হাওয়ায় মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে মোমবাতির শিখা। আমি জিতুকে ডাকলাম, জিতু।

বল।

একটা কথা বলবি?

কী?

তুই সিগারেট না জ্বালিয়ে ফিরে এসেছিলি কেন?

বললাম তো আগুন নিভে গেছিল।

ব্যস?

আবার কী?, জিতু পাশ ফিরে শুল। বুঝলাম, কথা বাড়াতে চাইছে না।

কিন্তু কথা বাড়াতে না চাইলেই তো হবে না। আমারও তো কৌতূহল বলে একটা বস্তু আছে। হ্যাঁ, একটু ভয় ভয় করছে কিন্তু তা বলে কৌতূহল গিলে নেব? আমি ফের খোঁচালাম জিতুকে, এই জিতু। বল না মন্দিরের ভেতর কিছু দেখেছিলি?

জিতু বড় করে একটা শ্বাস ফেলল। বোধ হয় কিছু বলার জন্য আমার দিকে ঘুরল কিন্তু তখনই আর্তনাদের মতো একটা ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারল জানালায়। কটাস করে জানলার পাল্লাটা বন্ধ হল আর মোমবাতিটা নিভে গেল। কেউ যেন এক বালতি পিচগোলা অন্ধকার আমার মাথার ওপর ঢেলে দিল। এত অন্ধকার যে নিজের হাতটাও দেখতে পাচ্ছি না। জানলার পাল্লাটা কেমন একঘেয়ে কট কট শব্দ করছে। আমি অস্ফুটে ডাকলাম, জিতু। ঠিক তখনই মনে হল, খাটের পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম। আমি ঘাড় ঘোরাচ্ছি না। আমি জানি না, কে এসে দাঁড়িয়েছে খাটের পাশে কিন্তু আমি তার নিঃশ্বাস অনুভব করছি আমার কাঁধে। আমি আস্তে করে বাঁ হাত দিয়ে জিতুকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার হাতটা শূন্যেই ঘুরে এল। বাঁ দিকে তাকাতে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। জিতু আমার পাশে নেই। বিছানা খালি। তখনই আমার পায়ে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেলাম। কেউ যেন একটা আঙুল দিয়ে আমার পায়ের পাতায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমি চিৎকার করতে চাইলাম কিন্তু আমার গলা দিয়ে একটুও আওয়াজ বেরোল না। হঠাৎ ঘরের মধ্যে একটা মৃদু আলো চলে এল। সে আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, জিতু আমার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে আছে। জিতুর চোখদুটো ভয়াবহ রকমের সাদা। আমি জিতুর চোখের মণি দেখতে পাচ্ছি না। অবিকল মেয়েদের মতো গলায় জিতু বলল, ভয় লাগছে দাদা? বলেই হেসে উঠল। নিঃশব্দ হাসি। কিন্তু হাসির দাপে জিতুর গা কাঁপছে। আমি দেখলাম, জিতুর মুখের মধ্যে একটা প্রদীপ জ্বলছে। জিতু হঠাৎ চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। তার পর ঘষটে ঘষটে ঢুকে যেতে লাগল খাটের তলায়। জানলার পাল্লাটা কট কট শব্দ করেই চলেছে।

খুব ভয়ের মধ্যেও কখনও কখনও মানুষের স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তি কাজ করতে শুরু করে দেয়। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলল, আমার এখনই এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কোথা থেকে যে গায়ে বল পেলাম কে জানে। এক লাফে আমি খাট থেকে নেমে পড়লাম। দ্রুত ছুটে গেলাম দরজার দিকে। এক টানে খুলে ফেললাম দরজা। কিন্তু বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বুঝলাম, খুব বড় ভুল করে ফেলেছি। বারান্দা থেকে সোজাসুজি তাকালে হাঁস-মুরগির ঘর। আমি স্পষ্ট দেখলাম সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না কিন্তু বাতাসে তার শাড়ির প্রান্ত উড়ছে। করুণ গলায় সে বলল, আয়। আয়।

কীভাবে যে দিদার ঘরের দরজায় আছড়ে পড়েছি জানি না। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমায় ঘিরে আছে বাড়ির সবাই। আমি শুয়ে আছি দিদার কোলে মাথা দিয়ে। আকুল গলায় দিদা বলছে, কী হয়েছে বাবুসোনা? ভয় পেয়েছিস?

আমি দিদাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার চোখে জল এসে গেল।