লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ২১

২১

বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিল লোকনাথ আর তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সরিত। লোকনাথের মনটা আজ ভারী ভালো আছে। সরিত যে বাচ্চাগুলোর চুল নিয়ে এসেছিল সেগুলোর কাজ আজ হয়ে গিয়েছে। দরকার ছিল পাঁচটা বাচ্চার চুল। সরিত এনেছিল ছ’টার। তাই কাজ শুরু করার আগে লোকনাথ লটারি করেছিল। লোকনাথ ভাবছিল, বাকি বাচ্চাগুলো যখন যন্ত্রণায় ছটফট করবে তখন একটা বাচ্চা খেলে বেড়াবে। নিজেকে ভগবান মনে হচ্ছিল লোকনাথের। ভগবান না, শয়তান। দু’জনের একই ক্ষমতা কিন্তু ভগবান আলুনি, পানসে। শয়তান রগরগে। আহা!

আর একটা বাচ্চা দরকার। কিন্তু এই বাচ্চাটাকে জ্যান্ত লাগবে। লুকিয়ে তুলে আনতে হবে বাচ্চাটাকে। তার পর তাকে নিয়ে লোকনাথ এক বিশেষ জায়গায় যাবে। কোনওদিন সেখানে যায়নি লোকনাথ। এই প্রথমবার যাবে। ভাদুড়ি স্যারের খাতার পাতাগুলো ভাগ্যিস সে চুরি করে এনেছিল। ওই পাতাগুলোয় লেখা ছিল দেশ-বিদেশের নানা তন্ত্রের মারণ প্রয়োগ। তার প্রতিকারও লেখা ছিল অন্য পাতাগুলোয় কিন্তু সেগুলো আনেনি লোকনাথ। মানুষের উপকারে লাগে এমন কিছুতে আগ্রহ নেই তার। মানুষকে সে ঘেন্না করে। লোকনাথ মনে মনে ভাবে, ভাদুড়ি স্যার চাইলে কত কিছু করতে পারতেন। এই দুনিয়া তাঁর পায়ের তলায় থাকতে পারত কিন্তু লোকটা কিছুই করল না। শুধু তন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করে গেল। যেন ভাদুড়ি মশায়কে করুণা করেই মুখ দিয়ে চুক করে একটা শব্দ করল লোকনাথ।

সরিত চোখ তুলে তাকাল, কিছু ভাবছ কত্তা?

লোকনাথ হেসে বলল, কত কিছুই তো ভাবি রে বাপ। বয়স হলে নানারকম ভাবনা আসে। এইবার সাধনা শেষ হলে আমার ছুটি। তোকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ে রিটায়ার করব।

সরিত একটু চুপ করে থেকে বলল, একটা কথা বলব কত্তা?

বল।

কীসের জন্য তোমার এই সাধনা কত্তা? কী চাও তুমি? কতবার ভেবেছি জিগ্যেস করব। কিন্তু সাহস হয়নি।

সোজা হয়ে বসল লোকনাথ, আজ সাহস পেলি কী করে?

একটু দমে গেল সরিত। কত্তা কি রাগ করল? কিন্তু তির যখন একবার বেরিয়ে গেছে তখন আর ভেবে কাজ নেই। মনে হচ্ছে কত্তার আজ মন ভালো। গলাটা ঝেড়ে সরিত বলল, তুমি সাধনার এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছ, আর একটা বাচ্চা মারলেই সিদ্ধি। তাই জানতে চাইলাম। যদি মনে করো আমার এখনও সে কথা জানার যোগ্যতা হয়নি তবে বোলো না।

সোজা চোখে খানিকক্ষণ সরিতের দিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার পর নিচু গলায় বলল, কীসের জন্য আমার এই সাধনা জানতে চাস? আমি একজন মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে চাই।

থমকে গেল সরিত। লকগেট খুলে দিলে যেমন হু হু করে জল বেরোয় তেমন করেই একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ভিড় করে এল সরিতের মনে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় এসেছিল সেটাই আগে জিগ্যেস করল সরিত, কত্তা, সত্যি সত্যি মরা মানুষ বাঁচিয়ে তোলা যায়?

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল লোকনাথ, যায়। কঠিনতম সাধনায় উলটে দেওয়া যায় দুনিয়ার নিয়ম। বেঁচে ওঠে মরা মানুষ। সারা জীবন লেগে যায় সে সাধনা করতে। প্রকৃতি চায় না তার নিয়মের অন্যথা হোক। তাই এই সাধনায় বাধা পড়ে। যতবার আমি সাধনার কাছাকাছি গেছি ঠিক শেষকালে কোনও না কোনও বাধা এসেছে। সে জন্যই তো যতক্ষণ না আঁচাচ্ছি আমি বিশ্বাস করতে পারি না।

আচ্ছা কত্তা, তুমি যদি সিদ্ধিলাভ করো যে কোনও মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে?

না রে। একজন। মাত্র একজন মরা মানুষকে বাঁচাতে পারব। পরের জনকে বাঁচাতে আবার একই রকম কঠিন সাধনা করতে হবে। দুনিয়ার নিয়ম উলটে দেওয়া কি ছেলের হাতের মোয়া?

লোকনাথের এই উত্তরটা শুনে ঘেঁটে গেল সরিত। একজন মাত্র মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য কত্তা এমন পাগলের মতো সাধনা করে যাচ্ছে? এত বড় বড় ঝুঁকি নিচ্ছে? শুধু এটুকুই চায় কত্তা? আর কোনও ক্ষমতা চাই না তার?

সরিতের অবস্থা দেখে হেসে উঠল লোকনাথ, কী ভাবছিস? কত্তার মাথা খারাপ তাই তো? সিদ্ধিলাভ করতে চায় শুধু এটুকুর জন্য? আর কিছু চায় না? না রে সরিত, আর কিছু চাই না আমি। আমার লোভ নেই, মোহ নেই, কাম নেই, মদ নেই, মাৎসর্য নেই। শুধু ক্রোধটুকু আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। ওই রাগ আর ঘেন্নাটুকু না থাকলে আমি যে সাধনা করার উৎসাহ পাব না বাপ।

আজ যেন নতুন করে লোকনাথকে চিনছিল সরিত। এতদিন ধরে সে ভেবেছে সিদ্ধিলাভ করে লোকটা দুনিয়াকে পায়ের তলায় রাখতে চায়। কিন্তু এখন তো দেখছে তার ভাবনা ভুল। মিলিয়ে দেখছিল সরিত, সত্যিই তো কত্তার কিছুর ওপর লোভ নেই। ভালো খাবার, ভালো থাকার জায়গা কিচ্ছু চায় না। এই যে এত ক্ষমতা লোকটার কোনওদিন সাধনার কাজটুকু ছাড়া সেটা ফলাতে দেখেনি। কোনওদিন কোনওরকম অহংকার করতে দেখেনি। আর থাকতে পারল না সরিত। বলে ফেলল, কে সেই মানুষটা কত্তা? যাকে বাঁচানোর জন্য তুমি প্রায় তোমার গোটা জীবনটা সাধনায় কাটিয়ে দিলে? কে সে, যে তোমার কাছে এত প্রয়োজনীয়? এত গুরুত্বপূর্ণ?

অস্ফুটে লোকনাথ বলল, সে ছিল একজন। আছে একজন। ভাদুড়ি স্যারকে বলেছিলাম, মানুষটাকে বাঁচিয়ে দিন না স্যার। আপনার তো কত ক্ষমতা। কথা শোনেনি লোকটা। বলেছিল, ওসব ভূত মাথা থেকে তাড়া লোকনাথ। নিয়তির সঙ্গে লড়াই করলে সর্বনাশ হয়। যে চলে গিয়েছে সে তার নিয়তি। খুঁচিয়ে ঘা করতে গেলে প্রলয় হবেই। কিন্তু আমি জানি, চাইলে লোকটা করতে পারত। করল না। আর আমারে করতেও দিল না। আমি তো আমার মতো রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলাম, কিন্তু আমারে পুলিশে ধরিয়ে দিল। আপনি আমার গুরু, আপনি আমায় সাত ঘা জুতো মারতে পারতেন, কিন্তু পুলিশে দেবেন কেন? সে কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। লোকটাকে আমি খুব ভালোবাসতাম সরিত। কিন্তু লোকটা আমার সাথে ঠিক করেনি।

তোমার যখন লোকটার ওপর এত রাগ লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখলে কেন? মেরে দাও। বলো তো আমি…

কথা শেষ করতে পারল না সরিত, তার আগেই লোকনাথ ঠাটিয়ে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে তার গালে।

চড়টা খেয়ে ঘাবড়ে গেল সরিত। তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গর্জে উঠল লোকনাথ, আর যদি কোনওদিন তুই এ কথা মুখে এনেছিল তোর জিভ ছিঁড়ে নেব শুয়োরের বাচ্চা। তুই ভাদুড়ি স্যারকে মারবি? ভাদুড়ি স্যারকে? হাতি দেখেছিস, বুনো দাঁতাল হাতি? তুই যদি একটা পিঁপড়ে হোস ভাদুড়ি স্যার তা হলে সেই হাতিটা। গেনু অবধি লোকটার একটা চুল ছিঁড়তে পারেনি আর তুই কে! শোন সরিত, ভাদুড়ি স্যারকে মারার কথা আমারও একবার মনে হয়েছিল। তখন আমি পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়েছিলাম, তাই আমার মাথা কাজ করছিল না। সুস্থ মাথায় থাকলে এ কথা আমিই কখনওই ভাবতাম না। পরে অনেক ভেবে দেখেছি, লোকটাকে আমি মারতে চাই না। লোকটা আমার গুরু। আমার পরম গুরু। আমি শুধু সিদ্ধিলাভ করে লোকটাকে দেখিয়ে দিতে চাই, লোকনাথ পেরেছে। তুমি চাওনি লোকনাথ শয়তান হয়ে উঠুক কিন্তু লোকনাথ শয়তান হয়েছে। অসুর হয়েছে। তুমি লোকনাথকে আটকাতে পারোনি গুরুদেব।

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সরিত, বুঝেছি কত্তা। আর কখনও এমন কথা বলব না।

হুম। একটা কথা জানবি, চোখে চোখ রেখে লড়াই করার একটা মানুষ না থাকলে যুদ্ধু করে মজা নেই। স্যারের ক্ষেত্রে সেই লোকটা আমি, আমার ক্ষেত্রে স্যার। লোকনাথ না থাকলে যেমন ভাদুড়ি বুড়োর কেরামতির কোনও দরকার নেই, তেমনই ভাদুড়ি বুড়ো না থাকলে লোকনাথও ফক্কা।

এই বলে, ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল লোকনাথ। সেই হাসি দেখতে দেখতে সরিত ভাবল, সে লোকনাথের থেকেও বড় অসুর হয়ে উঠবে একদিন। লোকনাথ তার গুরুকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু কাজ মিটে গেলে লোকনাথকে সরিয়ে দিতে তার হাত এতটুকু কাঁপবে না।

* * *

সেলের ভেতর থেকে যখন ভাদুড়ি মশায় বেরিয়ে এলেন তখন তাঁর মুখ বজ্রগর্ভ মেঘের মতো থমথমে। সকলেই অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। সবার আগে ছুটে গেল পল্লব, কী বুঝলেন স্যার?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাদুড়ি মশায় বললেন, বুঝলাম, লোকনাথকে মেরে ফেললেই বুঝি বা ভালো হত।