৮
মেয়েটা রিক্সায় যাচ্ছে আর সরিত সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে তার সামনে সামনে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে আড় চোখে মেয়েটাকে দেখছে। কী যেন চিন্তা করছে মেয়েটা। সরিত জানে, বদ্রিনাথের মৃত্যুর খবরে মেয়েটা ভয় পেয়েছে। ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যা হবে তখন এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয় পাবে মেয়েটা। কারও মৃত্যুসংবাদ শোনা আর চোখের সামনে খাঁড়ার মতো মৃত্যুকে ঝুলতে দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সাইকেল চালাতে চালাতে সরিত ভাবছিল, ভয় পেলে মেয়েটার মুখটা কেমন দেখতে হবে।
যে মুহূর্তে মেয়েটা ‘চলুন’ বলেছিল, সেই মুহূর্তেই পরবর্তী কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নিয়েছিল সরিত। প্রথমে মেয়েটাকে নিয়ে নিজের ঘরে যাবে। মেয়েটার সাথে কথা বলে জানবে বাচ্চা মৃত্যুর ব্যাপারে বদ্রিনাথ ওকে কতটা বলেছে। তবে বেশি জানুক আর কম জানুক, পরিণতি একই হবে। কথা হয়ে গেলে ঘুমের ওষুধ মেশানো চা খাইয়ে মেয়েটাকে বেহুঁশ করে ফেলবে। হাত, পা, মুখ বেঁধে ফেলে রাখবে রান্নাঘরে। রাত গভীর হলে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে মেয়েটার জ্ঞান ফেরাবে কিন্তু তখনই মারবে না মেয়েটাকে। মেয়েটার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। এরকম টানটান চাবুক চেহারার মেয়েই সরিতের পছন্দ। তার ওপর পাছাখানা মাখনের মতো। কথায় বলে, ‘শ বুর গলাকে বনতা হ্যায় এক গাঁড়।’ খাঁটি কথা। গাঁড় মেরে যে সুখ সে সুখ অন্য কিচ্ছু দিতে পারে না। আর গাঁড় মারার সময় বেশি ব্যথা লাগে বলে সবাই চেঁচায় বেশি, তার ওপর মুখ বাধা থাকলে তো কথাই নেই। সেই চিৎকারটা যেন সারা শরীরের কাঁপুনি দিয়ে বেরিয়ে আসে। ওতেই তো আরও বেশি উত্তেজিত হয় সরিত।
আসলে কিছু স্মৃতি মানুষের অবচেতনে থেকে যায় এবং মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় আজীবন। নয়তো সে কেন এমন তীব্র পায়ুকামী হয়ে উঠবে? কেন আজও প্রতিটি রমণের সময় এক ঝলকের জন্য হলেও তার মনে পড়ে যাবে সেদিনের কথা?
সরিতের মা মাঝে মাঝেই বাবু বদলাত। প্রতিটি মানুষই উন্নত থেকে উন্নততর জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখে। সরিতের মা বেশ্যা বলে সে যে এমন স্বপ্ন দেখতে পারবে না, তার তো কোনও কথা নেই। সেই উন্নততর জীবনযাপনের লক্ষ্যেই এই বাবু বদল। বছর খানেক, বছর দেড়েক পরপর মা একটা করে নতুন বাবু ধরত আর তাদের ঘরে নতুন ফ্রিজ, নতুন টিভি আসত। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা হত। বেড়ে যেত হাতখরচের টাকার পরিমাণ। পুরনো বাবুরা যে ঝামেলা করত না তা নয় কিন্তু মা ওসব সামলে নিত। বেশ্যাপট্টির দালালদের টাকা খাইয়ে আগে থেকেই হাতে রেখে দিত মা, ফলে কেউ বেশি ঝামেলা করলে তার বিচি গেলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করাই থাকত। তবে সবার ক্ষেত্রে যে একই নিয়ম খাটে না, মা এটা বুঝতে পারেনি। তাই সুখেন্দু জানা বলে একটা লোকের কাছে কেস খেয়ে গেল।
বেশ্যাপট্টিতে যে ধরনের চুতখোরেরা আসে সুখেন্দু জানা একেবারেই তাদের মতো ছিল না। হাবেভাবে সে ছিল একেবারে নিপাট ভদ্রলোক। খুব সাধারণ ছিটের কাপড়ের জামা টেরিলিনের প্যান্টের মধ্যে বেল্ট দিয়ে গুঁজে পরত। পায়ে বাটার চটি। সব সময় পায়ে হেঁটে আসত। মায়ের কাছে সরিত শুনেছিল, এই সুখেন্দু জানার না কি আটটা কোল্ড স্টোরেজ, তিনটে পেট্রল পাম্প আর বত্রিশটা ট্রাক, যেগুলো অন্ধ্র থেকে মাছ নিয়ে আসে নিয়মিত। শুনে কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে থেকেছিল সরিত। তার মন বলে উঠেছিল, বাইরের এই ভদ্রলোকের মতো চেহারাটা আসলে সুখেন্দু জানার ক্যামোফ্লাজ। সে কথা অবশ্য সরিত মাকে বলেনি।
প্রথম প্রথম সুখেন্দু জানাকে নিয়ে মা খুব খুশি ছিল। বাড়ি বদলে তারা একটা নতুন বাড়িতে উঠেছিল। এসি বসানো হয়েছিল তিনটে ঘরেই। সুখেন্দু জানা মাসের মধ্যে দু’বার কি তিনবার আসত, রাতটুকু থেকে পরদিন সকালে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিয়ে ফিরে যেত। দিব্যি চলছিল, কিন্তু ওই যে মায়ের ছেনাল স্বভাব। এই শান্তির জীবনে শরীরে ঠিক হিট আসছিল না। বাবু আর বাবুর বন্ধুরা আসবে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, খিস্তাখিস্তি হবে, ল্যাংটো নাচ হবে, নাচের সময় বাবুরা ঠাটিয়ে ঠাটিয়ে পোঁদে চড় মারবে, পোঁদ যত লাল হবে তত টাকা ফেলবে আর পরদিন সকাল হতেই নেশায় চুর হয়ে লং ড্রাইভে চলে যাবে মন্দারমণি। তবে না একটা কালারফুল লাইফ! যে ভাতার না চাইতেই টাকা দেয়, যার সাথে নখরা করে সুখ নেই, তার সাথে বেশি দিন থাকা যায় না। তাই বছর না ঘুরতেই সুখেন্দু জানাকে লুকিয়ে মা আশনাই শুরু করল অন্য একটা বেওরা মালের সাথে। সে মাল আবার বেআইনি অস্ত্র বেচত, ফলে মা ভেবেছিল, সুখেন্দু জানা জানতে পেরে ঝাম দিলে মেশিন দেখিয়ে চমকে দেবে।
কিন্তু সুখেন্দু জানা যেদিন এল সেদিন মাকে বাঁচাতে না এল দালালরা, না এল মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ড। সরিতের স্পষ্ট মনে আছে, সে দিনটা ছিল শনিবার। সরিত তদ্দিনে ইশকুলের পাট চুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তদ্দিনে আবার বই পড়ার নেশাটা ধরে গেছে। তাই ঘুম থেকে উঠে পাড়ার দোকানে কচুরি খেয়ে সরিত শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। তড়িৎ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল আর মা যথারীতি ঘুমোচ্ছিল পাশের ঘরে। সাড়ে আটটা কি ন’টা হবে বেজে উঠেছিল কলিং বেল। তড়িতকে এক লাথি মেরে সরিত বলেছিল, খোল।
একটা দোতলা বাড়ির ওপরের তলায় থাকত তারা। তড়িৎ নীচে নেমে গেছিল দরজা খুলতে কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তির বেগে ওপরে উঠে এসেছিল। দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল মায়ের ঘরে। ব্যাপারটা কী হল বুঝতে না বুঝতেই সরিত দেখল, দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সুখেন্দু জানা। হাসিমুখে সে বলল, কেমন আছ সরিত?
সরিত বুঝতে পারছিল না, সুখেন্দু জানাকে দেখে তড়িৎ এত ভয় পেয়ে গেল কেন? বুঝল একটু পর, যখন চারটে দানবের মতো লোক মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ডটাকে নেংটি ইঁদুরের মতো আছড়ে ফেলল ঘরের মেঝেতে। ততক্ষণে মা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে আর অবস্থা আন্দাজ করতে পেরে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে খাটের ওপর বসেছিল সুখেন্দু জানা। মা যেসব দালালদের পয়সা খাওয়াত তাদেরই দু’জন চা এনে দিয়েছিল তাকে। সবটাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মা কিন্তু তার আর কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। মা ততক্ষণে বুঝতে পেরে গেছিল, সুখেন্দু জানাকে সে হালকা ভাবে নিয়েছিল। তার কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু দুঃখটা যে অমন অভিনব ভাবে আসবে তা মা কেন, সরিতও আঁচ করতে পারেনি।
চা খেয়ে গলা ঝেড়ে সুখেন্দু বলেছিল, সবিতা, তুই আমাকে ঠকিয়েছিস। তোকে আমি সব দিয়েছিলাম কিন্তু তুই জাত খানকি। নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিস। এই ঘর থেকে তোকে তো আবার পথে নামিয়ে দেবই কিন্তু তার আগে অন্য একটা শাস্তি দেব।
এতক্ষণে মা ছুটে এসে সুখেন্দু জানার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিল। মায়ের কান্নায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সুখেন্দু জানা মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ডটাকে বলেছিল, এই ওঠ। উঠে ওকে ধর।
কাঁদতে কাঁদতেই ছিটকে উঠে দাঁড়িয়েছিল মা, ধর মানে? কী করবে তুমি?
মাকে বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মায়ের হাত দুটো পেছন দিকে পেঁচিয়ে ধরেছিল মায়ের সেই বেওরা বয়ফ্রেন্ড। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠেছিল মা। সুখেন্দু জানার ইশারায় মায়ের মুখে রুমাল ভরে মুখটা বেঁধে দিয়েছিল একটা দানবাকৃতি লোক। মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে সুখেন্দু জানা বলেছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি কী জানিস? অপমান। তোকে আজ আমি তোর দুই ছেলের সামনে অপমান করব। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি অপমান করা যায় কীভাবে জানিস? জোর করে পোঁদ মেরে।
এই বলে সরিত আর তড়িতের সামনেই মাকে ধর্ষণ করেছিল সুখেন্দু জানা। তড়িৎ ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ঘরের এক কোণে বসে কিন্তু সরিত পুরোটা দেখেছিল। এক মুহূর্তের জন্যেও সে চোখ সরায়নি। সে দেখছিল, মায়ের চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। চিৎকার করতে পারছে না বলে শরীরটা, বিশেষ করে পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। মিথ্যে কথা বলবে না, সরিতের ভালো লেগেছিল শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতিটা। সুখেন্দু জানার কথাটা তার মাথার মধ্যে গেঁথে গেছিল, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি কি জানিস? অপমান। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি অপমান করা যায় কীভাবে জানিস? জোর করে পোঁদ মেরে।’
পৃথিবীটা গোল। সেই ঘটনার আট বছর পরে সুখেন্দু জানাকে খুনের সুপারি পেয়েছিল সরিত। খুন করার আগে আচ্ছা করে সুখেন্দু জানার পোঁদটা মেরে দিয়েছিল সে। সরিত মাকে ঘেন্না করত ঠিকই কিন্তু ভালোও তো বাসত।
তা আজ এই মেয়েটাকেও অপমান করবে সরিত। তার পর বডিটা টুকরো টুকরো করে কেটে চুনের বস্তায় ভরে পেছনের পানা পুকুরে ফেলে দেবে। কত্তার সাধনার পথে যেই বাধা হতে আসবে তাকে এই দুনিয়ার মায়া কাটাতে হবে। এখনও ছ’টা বাচ্চা মারা বাকি। কত্তা একবার সম্পূর্ণ শক্তি পেয়ে গেলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না সরিতকে।
রিক্সাওয়ালা হাঁক দিল, দাদা কোনদিকে?
সম্বিত ফিরল সরিতের। রিক্সাওয়ালাকে বাড়িটা না চেনানোই ভালো। সে বলল, এখানেই রেখে দাও। ম্যাডাম, অল্প একটু রাস্তা। হাঁটতে অসুবিধে নেই তো?
না। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে এল রোশনি। ভাড়া মিটিয়ে পা বাড়াল ছেলেটার সাথে। দুটো ছোট গলি পেরিয়েই একটা বাঁশবাগানের সামনে এসে পড়ল তারা। জায়গাটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। লোকালয়ের এত কাছে যে এমন ঘন একটা বাঁশঝাড় থাকতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ছেলেটা বলল, এদিকটা বেশ গাছপালা আছে। ওপাশে একটা আমবাগানও আছে। ওই বাগানের মধ্যেই আমাদের ঘর। এবার তো আমের ফলন ভালো হয়েছে। ঘরের চালে আম পড়ছে। চলুন আপনাকে খাওয়াব।
রোশনি বলল, আম খাওয়ার সময় নেই। আমায় ফিরতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটাই তো জানা হয়নি।
ছেলেটা হাসল, আমার নাম গেনু।
একটু অবাক হল রোশনি। নামটা ভারী অদ্ভুত! সে জিগ্যেস করল, এটাই আপনার নাম?
ছেলেটা বলল, হ্যাঁ। এই নামেই সবাই চেনে। আপনার কী নাম ম্যাডাম?
রোশনি।
বাহ! সুন্দর নাম। আসুন, এই দিকে।
ছেলেটার পিছুপিছু একটা ছায়াঘন আমবাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল রোশনি। দিনের বেলাতেও জায়গাটা বেশ অন্ধকার হয়ে আছে। শুকনো পাতায় পায়ের চাপে খড়মড় শব্দ উঠছে। কাছেই কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠল। টরেটক্কার মতো শব্দ কিন্তু রোশনির মনে হল, তক্ষকটা যেন বলছে, ‘যা রে, যা রে, যা রে, যা রে। পালা, পালা, পালা, পালা।’ অবশ্যই মনের ভুল তবু যেন একটু শিউরে উঠল রোশনি। সে বলে উঠল, এখানে তো কোনও লোকজন নেই। যা বলার বলে নিন না।
ছেলেটা যেন রোশনির মনের কথা বুঝতে পারল। বলল, লোকজন নেই দেখে কি ঘাবড়াচ্ছেন ম্যাডাম? কোনও ভয় নেই। এদিকটায় জঙ্গল কিন্তু বাড়ির উল্টোপাশ আবার খোলামেলা। রাস্তা দিয়ে সব সময় ভ্যান, রিক্সা সব যায়। এদিক দিয়ে এলে শর্টকাট হয় তাই এলাম। গিয়ে একটু জিরিয়ে নিন। সব বলছি। বলব বলেই তো নিয়ে এলাম আপনাকে।
একটা মজা পানাপুকুর পেরিয়ে বাড়িটার কাছে গিয়ে তবে রোশনির অস্বস্তিটা কমল। সামনের দিকটায় সত্যি মানুষ চলাচলের রাস্তা আছে। মোটর ভ্যান, রিক্সা চলছে। ঘরে ঢুকে বিছানাটা ঝেড়ে দিয়ে ছেলেটা বলল, মায়ের শরীরটা ভালো না। মামার কাছে আছে। আমি এখন একাই আছি। ম্যাডাম বসুন। চা বানিয়ে আনি।
রোশনির আপত্তিতে কর্ণপাত করল না ছেলেটা। ঢুকে গেল লাগোয়া রান্নাঘরে।
রান্নাঘরে ঢুকে নিঃশব্দে প্রাণ খুলে হাসল সরিত। নামেই সাংবাদিক কিন্তু আসলে ভ্যাবলা। এত সহজে যে শিকার ফাঁদে পা দেবে সেটা সরিত আশা করেনি। চায়ের জল ফুটতেই তাক থেকে ঘুমের ওষুধের শিশিটা নামিয়ে জলে ছ’টা ট্যাবলেট ফেলে দিল সে। বেশি করে চিনি দিয়ে দিল। ওষুধের তিতকুটে ভাবটা চাপা পড়বে। চা খাওয়ার পর আধ ঘণ্টা কথায় কথায় ব্যস্ত রাখতে হবে মেয়েটাকে। তা হলেই যথেষ্ট। প্লেটের ওপর চায়ের কাপ বসিয়ে ঘরে এল সরিত। মেয়েটা মোবাইলে কী যেন দেখছিল। সরিত ডাকল, ম্যাডাম চা।
ধন্যবাদ। হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিল মেয়েটা। তার পর সেটা টেবিলে রেখে বলল, এবার বলুন। কী বলবেন বলছিলেন।
একটা মোড়া টেনে সামনে বসল সরিত, চা-টা খেয়ে নিন না। ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।
আমার খুব গরম কিছু খেতে অসুবিধে হয়। আপনি বলুন।
চা খাওয়ার জন্য বেশি তাড়া দেওয়া কাজের কথা হবে না। মেয়েটা সন্দেহ করতে পারে। সরিত বলল, বলছি। তার আগে বলুন, বদ্রিদা আপনাকে কতটা বলেছে?
রোশনি বলল, উনি আমায় তেমন কিছুই বলেননি। শুধু বলেছিলেন, নতুন একটা ভাইরাসের আক্রমণে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে আর গভর্নমেন্ট সেই খবর বাইরে আসতে দিচ্ছে না। বাকি কথা দেখা হলে বলবেন বলেছিলেন।
মনে মনে হাসল সরিত, বলে না কি ভাইরাস! তার পর বলল, হুম। তার মানে আপনি তেমন কিছুই জানেন না। ম্যাডাম, এ ঘটনার শেকড় অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে আছে। বদ্রিদা যখন হুগলিতে ছিল তখন দুটো বাচ্চা মারা যায়। কিন্তু বদ্রিদা তখনও ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারেনি। তবে ম্যাডাম, শহরের বুকে এ ঘটনা কিন্তু শুরু হয়েছিল কলকাতায়।
চমকে উঠল রোশনি, কলকাতায়?
ফের মনে মনে হাসল সরিত। একে সবটা খুলে বলে দিলেও কিছু এসে যায় না। কারণ একটু পরেই মেয়েটা আর গোটা থাকবে না। ছোট ছোট টুকরো হয়ে ঢুকে পড়বে চুনের বস্তায়। সে বলল, হ্যাঁ। কলকাতায় বাচ্চা মৃত্যু নিয়ে হেবি ঝামেলা হয়েছিল। তিতাস সেন বলে একটা ডাক্তার রিজাইনও করেছিল। বদ্রিদা বলেছিল আমায়।
মাই গড! তার পর? উত্তেজনায় চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিল রোশনি। চুমুক দিতে যাবে তখনই জানলা টপকে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল একটা সাদা রঙের বেড়াল। ডেকে উঠল, ম্যাও। কিন্তু তারপর যেটা হল সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না রোশনি। সে দেখল, বেড়ালটার আওয়াজ শুনেই বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে তাকাল ছেলেটা আর কিছু বোঝার আগেই প্রচণ্ড এক ক্ষিপ্র লাথিতে বেড়ালটাকে ছিটকে ফেলে দিল। বেড়ালটা গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘরের নিরেট দেওয়ালে। উঠেই প্রাণভয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। ঠিক দু’ পা ছুটেই কাতর একটা আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ল মেঝের ওপর। আর নড়ল না। একগাল হেসে খুব পরিতৃপ্ত গলায় ছেলেটা বলল, সেদিন আমাকে আঁচড়ে দিয়েছিল।
রোশনির মাথা কাজ করছিল না। হাত-পা কাঁপছিল থরথর করে। তার নিজের একটা পোষা বেড়াল ছিল। এরকমই সাদা গায়ের রং। কান দুটো পাটকিলে। রোশনি তাকে মজন্তালি বলে ডাকত। মজন্তালি আর রোশনি রোজ এক টেবিলে ডিনার করত, এক বিছানায় শুত। মজন্তালির শরীর খারাপ হলে রোশনি অফিস ছুটি নিত। গত বছর মজন্তালি চলে গিয়েছে না ফেরার দেশে। আজও তাকে বড্ড মিস করে রোশনি। রোশনির মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার মজন্তালিকেই লাথি মেরেছে। চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে রোশনি দ্রুত ছুটে গেল নেতিয়ে পড়ে থাকা বেড়ালটার কাছে। মাটিতে বসে পড়েই হাতে তুলে নিল মাথাটা এবং বুঝতে পারল, বেড়ালটার দেহে আর প্রাণ নেই। জিভটা অর্ধেক বাইরে বেরিয়ে আছে। কান আর মুখের কাছে জমে আছে রক্ত। অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে উঠল রোশনির। তারপর সেই জল ভরা চোখে সে যখন ফিরে তাকাল সরিতও যেন এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল। ত্রু«দ্ধ বাঘিনীর মতো দেখাচ্ছে রোশনিকে। উঠে এসে সরিতের মুখোমুখি দাঁড়াল সে। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল, আপনি কি জানোয়ার? একটা অবলা প্রাণীকে এভাবে মেরে ফেললেন? আপনি জানেন এটা ক্রিমিনাল অফেন্স? আই ডোন্ট নিড ইয়োর হেল্প।
দ্রুত হাতে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল রোশনি। খুশি হল সরিত, বেশ তেজ আছে তো মেয়েটার। তার চোখে চোখ রেখে কথা বলা সহজ নয়। ভালোই হবে, যত ছটফটাবে, গাঁড় মেরে তত সুখ। কিন্তু মেয়েটা তো চলে যাওয়ার উপক্রম করছে।
সবে দরজার চৌকাঠে পা রেখেছে রোশনি, সরিত বলে উঠল, আরে! রাগ করছেন কেন ম্যাডাম? ঠিক আছে আমার হেল্প না নিলেন, চা-টুকু খেয়ে যান।
ঘুরে তাকাল রোশনি। মধ্যমাটা সরিতের নাকের সামনে তুলে বলল, ফাক ইউ।
মাথায় আগুন জ্বলে উঠল সরিতের। খানকি মাগির এত তেজ! খপ করে সে হাত চেপে ধরল রোশনির আর তার পরেই অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা ঘটল। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রোশনি অন্য হাতে সপাটে চড়িয়ে দিল সরিতের গালে। সরিতের ফর্সা গালে রোশনির পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেল।
বিস্ময়ের অভিঘাত কাটিয়ে দু’ আঙুলের ফাঁকে ব্লেড ধরে সরিত যতক্ষণে বাইরে এল ততক্ষণে সামনের দিক দিয়ে বেরিয়ে রোশনি একটা চলতি ভটভটি ভ্যানে উঠে বসেছে। বিচ্ছিরি কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভ্যানটা এগিয়ে চলেছে। সেই ধোঁয়া ঢুকে যাচ্ছে সরিতের নাকে, মুখে। অনেকটা ডিজেলপোড়া ধোঁয়া গিলে নিয়ে সরিত একটা ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞা করে বসল।
