১৩
বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল তিতাস। বড় অস্থির করছে শরীরটা। মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে আছে। সঙ্গে সূক্ষ্ম একটা যন্ত্রণা। আজকাল মাঝে মাঝেই মনে হয় তার সঙ্গে কিছু একটা যেন ঘটছে। কিন্তু কী ঘটছে সেটা ধরা যায় না কিছুতেই। পল্লবের কথা যদি সত্যি হয় এ তা হলে শর্ট টার্ম মেমোরি লসের লক্ষণ। একটা রিপোর্টার মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল মনে আছে তিতাসের। তাকে নিয়ে পল্লব একটু মশকরা করেছিল। তারপর সে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংয়ের দিকে যাচ্ছিল… ব্যস এটুকুই। এরপরে আর কিচ্ছু মনে নেই। কিন্তু পল্লব বলছে, সে না কি মেয়েটার সাথে অসম্ভব দুর্ব্যবহার করেছে! মেয়েটাকে মারতে উঠেছিল পর্যন্ত! অথচ ওই সময়ের স্মৃতিটুকু যেন পুরোপুরি মুছে গেছে। তিতাস কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, সে একজন সাংবাদিককে মারতে গেছিল। কিন্তু পল্লব তো আর মিথ্যে কথা বলবে না। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিতাস। দু’হাতে চেপে ধরল মাথাটা। সে কি তবে পাগল হয়ে যাচ্ছে? আজকাল মাঝে মাঝেই সে ওই স্বপ্নটা দেখে। সেই আদিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। সেই প্রাচীন মন্দির। সেই বিশালাকার বলিষ্ঠ সিংহ আর সেই…। থমকে যায় তিতাস। মাত্র দু’বার তাকে অনুভব করেছে তিতাস কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যেন আজন্মকালের। তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় বাস্তব অথচ তার অবস্থিতি যেন স্থান, কাল, সময়ের বোধ এলোমেলো করে দেয়। মাথার ভেতরে বেজে ওঠে সেই কণ্ঠস্বর। যা একাধারে শান্ত নদীটির বহতার মতো কোমল আবার বন্যার মতো সর্বগ্রাসী। তিতাস বেশ কয়েকবার ভেবেছে পল্লবকে এই স্বপ্নের ব্যাপারে বলবে কিন্তু যখনই বলতে গেছে অদ্ভুত একটা অবসাদ ঘিরে ধরেছে তাকে। একই সঙ্গে মনে হয়েছে এই স্বপ্ন তার একান্ত ব্যক্তিগত। এ পৃথিবীর কারও অধিকার নেই তাকে জানার। এই ভাবনা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার যেন সেই অবসাদ অনুভব করল তিতাস কিন্তু আজ আর সেটাকে প্রশ্রয় দিল না। নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়াল বিছানা থেকে। জরুরি মিটিংয়ে পল্লব বেরিয়েছে। তার ফিরতে ফিরতে রাত হবে। মুখে যখন বলতে পারছে না, তিতাস ঠিক করে ফেলল, এই অদ্ভুত স্বপ্ন এবং তার মানসিক অবস্থার কথা সে লিখে ফেলবে। দৃঢ় পায়ে সে এগিয়ে গেল পল্লবের টেবিলটার দিকে। টেবিলের ওপর পল্লবের ল্যাপটপটা রাখা স্লিপ মোডে। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল তিতাস। ডেস্কটপে একটা ফোল্ডার বানাল। নাম দিল ‘ড্রিম’। স্বপ্ন। ফোল্ডারটা খুলে সবে লিখতে শুরু করবে তখনই বেজে উঠল ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হল সে। মিতুল ফোন করছে। এখন সাড়ে বারোটা বাজে। মিতুল অমিয়র সাথে বকবক না করে তাকে কেন ফোন করেছে? না কি ওরা কনফারেন্সে নিতে চাইছে? যদি কনফারেন্স হয় অমিয়কে খুব ঝাড়বে। সেই যে ভোরে বেরিয়ে গেছে তারপর থেকে ফোন তো ধরেইনি। একবার রিং ব্যাকও করেনি। মাঝে মাঝে খালি পল্লবকে মেসেজ পাঠাচ্ছে, আমি ঠিক আছি। এমন ভাব করছে যেন তিতাসের সাথে ওর শত্রুতা। ফোনটা রিসিভ করল তিতাস। কিন্তু হ্যালো বলেই সে থমকে গেল। মিতুল কাঁদছে। মুহূর্তে নানারকম সম্ভাবনা ভিড় করল তিতাসের মাথার মধ্যে। তবে কি অমিয়র সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে না কি অন্য কোনও বিপদ? সে দ্রুত বলে উঠল, কী হয়েছে মিতুল? কাঁদছিস কেন?
অমিয়র বাড়ি থেকে বেরনোর পর মিতুল যে কীভাবে বাড়ি অবধি পৌঁছেছে সে শুধু মিতুলই জানে। ভাগ্যিস একটা চেনা রিক্সাওয়ালা পেয়ে গেছিল।
কান্না কঠিন ব্যাপার। তার থেকেও কঠিন ব্যাপার কান্না চেপে রাখা। কষ্ট তো চোখের জল হয়ে গলে পড়ে। কিন্তু সে যন্ত্রণা নির্গমনের পথ না পেলে সারা শরীর বইতে থাকে বেদনার ভার। মিতুলের মুখ দেখেই চমকে উঠেছিলেন তার মা। মাথা ধরেছে বলে মাকে কোনওমতে মাকে কাটিয়ে ঘরে এসে দরজা দিয়েছিল মিতুল। ভালোই হয়েছে বাবার আজ নাইটে স্পেশাল ডিউটি পড়েছে। এত সহজে সে বাবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারত না।
ঘরে এসে বিছানার ওপর আছড়ে পড়েছিল মিতুল। অমিয়র সামনে সে এতটুকু কাঁদেনি। বিশ্বাসঘাতকের সামনে চোখের জল ফেলতে তার ডিগনিটিতে বাধছিল। কিন্তু ভালোবাসা বড় বেহায়া। পোষা কুকুরের মতো। জুতোর বাড়ি খাওয়ার পরেও পায়ের কাছে এসে কুঁইকুঁই করে। সে অকাতরে ক্ষমা করে দিতে চায় বিশ্বাসঘাতককে। কিন্তু তাকে প্রাণপণে পিছু টানে ইগো, সেলফ রেসপেক্ট। আর এই দুইয়ের টানাটানিতে ক্ষতবিক্ষত হয় মানুষ। কাঁদে। পাগলের মতো বিলাপ করে। কিন্তু চোখের জলও ফুরিয়ে আসে কিছুক্ষণ পর। তখন বোমার মতো আছড়ে পড়ে চরাচরব্যাপী শূন্যতা। ফোঁড়ার মতো বিষিয়ে ওঠে পুঁজরক্তকষ্টবমি।
কী করবে কিছু বুঝতে না পেরেই তিতাসকে ফোন করে ফেলেছিল মিতুল। তিতাসের গলা পেয়ে তার কান্নার বেগটা আরও বেড়ে গেল। ওদিকে তিতাস বারবার জিগ্যেস করে চলেছে, কী হয়েছে বল আমাকে। এমন করছিস কেন? আমার তো ভয় লাগছে।
একসময় নিজেকে একটু সামলে উঠল মিতুল। এই অপমানের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতেই হবে। কষ্ট না কি ভাগ করলে কমে। কষ্টটা কমা দরকার। এতটা যন্ত্রণা মিতুল সহ্য করতে পারছে না। সে বলল, তোমাদের বন্ধু আমাকে ঠকিয়েছে তিতাস দিদি।
চমকে উঠল তিতাস, মানে? কী করেছে অমিয়?
ও তোমাদেরও মিথ্যে বলেছিল তিতাস দিদি। ব্যারাকপুর রোডে আজ কোনও ঝামেলাই হয়নি। ও যায়নি পুলিশ ক্যাম্পে।
অবাক হল তিতাস, অমিয় কেন মিথ্যে বলল তাদের? সেই জন্যই কি অমিয় তার ফোন ধরছিল না? পল্লবকে মেসেজ করে মুখের ওপর মিথ্যে বলার ঝামেলা এড়াচ্ছিল?
তা হলে কোথায় গেছিল ও? প্রশ্ন করল তিতাস।
সে আমি জানি না। কিন্তু ও আমাকে বলেছিল ওর কোন মাসি না কি অসুস্থ। তোমার ফোন পাওয়ার পরেই আমার সন্দেহ হয় আর আমি ওর বাড়ি যাই। ও তখন বাড়িতে ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসে।
তারপর?
অনেকটা সময় নিয়ে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে আর জুড়তে জুড়তে তিতাসকে সবটা বলে গেল মিতুল। সে যতই আপন হোক, প্রেমিকের দ্বিচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতার কথা অন্য কাউকে বলা খুব সহজ কাজ নয়।
সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল তিতাস। এ কী শুনল সে? এ যে অবিশ্বাস্য। যতবার অমিয়র সঙ্গে মিতুলকে নিয়ে কথা হয়েছে ততবারই অমিয়র চোখে মিতুলের প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম দেখেছে সে। সেই অমিয় কীভাবে অন্য নারীর সঙ্গে? ভাবতেই কেমন যেন মাথা ঘুরে উঠল তিতাসের। মিতুলকে কী বলবে বুঝেই উঠতে পারল না কিছুক্ষণ। এই মুহূর্তে মিতুলের মনের যা অবস্থা তাতে সান্ত্বনাবাক্য কুরুচিকর। আপাতত মনের জোর দিতে হবে মিতুলকে। মিতুল বাচ্চা মেয়ে। নয়তো সে কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। তার পর সবটা খতিয়ে দেখতে হবে। অমিয়র সঙ্গে কথা বলতে হবে। অমিয়কে হীন ভাবতেও তার বন্ধুত্বে বাধছে।
ফোনের ওপাশে তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে মিতুল। মিতুলকে কী বলবে মনে মনে সবটা সাজিয়ে নিল তিতাস কিন্তু কিছু বলার আগেই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতল নিঃশ্বাস। মুহূর্তে এক ভয়াল শৈত্যপ্রবাহ নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বরাবর। তিতাস বুঝতে পারল, সে এসেছে। আর সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার চেয়ারের পেছনে। চেয়ারের সঙ্গেই যেন আটকে গেল তিতাস। একই সঙ্গে অসম্ভব গরম আর শীত লাগছে তার। ধীরে ধীরে বহুমূল্য রত্নরাজিতে খচিত অলঙ্কারে ভূষিত দুটি সুডৌল হাত এসে পড়ল তিতাসের কাঁধে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল তিতাসের। অস্ফুটে সে বলল, ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্না।
কাতর কণ্ঠে মিতুল বলল, চুপ করে আছ কেন তিতাস দিদি? কিছু বলো।
চোখ খুলল তিতাস। তার কাঁধে হাত রেখে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়। তিতাসের কাঁধে মৃদু চাপ দিল সে। যেমন করে মানুষ পোষ্যকে অনুমতি দেয় ঠিক তেমন। তিতাস কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল, ভালোবাসার মানুষ যখন এভাবে ধোঁকা দেয় তখন কী লাভ বল তো বেঁচে থেকে? এই যন্ত্রণা সহ্য করার থেকে মরে যাওয়া ভালো। তুই অনেক শক্ত মিতুল। অনেক শক্ত। পল্লব যদি আমার সঙ্গে এমন করত আমি হয়তো আত্মহত্যা করতাম। হয়তো কেন? আমি ঠিক আত্মহত্যা করতাম মিতুল। শেষ করে দিতাম নিজেকে। আমি সবসময় ব্যাগে ঘুমের ওষুধ রাখি। যদি কখনও পল্লব আমার সঙ্গে এমন করে আমি একসাথে সবক’টা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেব। আমি আর কথা বলতে পারছি না মিতুল। আমি রাখছি।
ফোন রেখে শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল মিতুল। তার মাথায় একটাই শব্দ বেজে চলেছে জাহাজের একঘেয়ে সাইরেনের মতো। আত্মহত্যা।
