লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১৯

১৯

শোক, ভয়, দুশ্চিন্তা এই প্রত্যেকটি অনুভূতিই মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেখানে সবগুলি যখন একসঙ্গে আছড়ে পড়ে চেতনায় তখন যে নৈঃশব্দ্যের জন্ম হয় তা মহামারীর মতো সর্বগ্রাসী, কবরের মতো অন্ধকার। ঠিক এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে ওরা সকলে। ভাদুড়ি মশায়ের লাইব্রেরি ঘরে বসে আছে পল্লব, সঞ্জয়, অপালা, অমিয়, দীপক পাল আর ভাদুড়ি মশায় স্বয়ং। কারও মুখে কোনও কথা নেই। অমিয় শুধু শক্ত করে পল্লবের হাতটা ধরে রেখেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাদুড়ি মশায় মাথা তুললেন আর প্রশ্ন করলেন সঞ্জয়কে, তোমার মামি এখন আর আসেন না? তিনি তোমায় কিছুর ব্যাপারে সাবধান করেননি?

এমনি এমনি এ প্রশ্ন করেননি ভাদুড়ি মশায়। গত চব্বিশ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে এই প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে। অমিয়র কথাটা শোনার পর থেকেই পল্লবের মাথা কাজ করছিল না। যন্ত্রের মতো সে ফিরে এসেছিল বাড়িতে আর বাড়ি ফিরে আবিষ্কার করেছিল, তিতাস নেই। শোবার ঘরে বিছানার ওপর ল্যাপটপ খোলা, কফি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, বিছানার চাদরটা অবধি কুঁচকে আছে যেন এইমাত্র কেউ সেখানে বসেছিল, কিন্তু তিতাস নেই। সারা বাড়িতে কোথাও নেই। অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ বলছিল, তিতাস বাইরে যায়নি অথচ তিতাস নেই। যেন কোনও এক মন্ত্রবলে সে উবে গিয়েছে।

এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেনি পল্লব। অমিয় আর সঞ্জয়কে ফোন করে সোজা ছুটে এসেছিল ভাদুড়ি মশায়ের বাড়িতে এবং তিতাসের অন্তর্ধানের খবর দিয়েছিল। একই সঙ্গে খুলে বলেছিল, অমিয়র সঙ্গে তিতাসের কী হয়েছিল সে কথা। বলেছিল, মিতুলের সঙ্গে তিতাসের শেষ কথোপকথনের কথাও। সংশয় ঘনিয়ে উঠছিল অপালা আর সঞ্জয়ের মনেও। তারাও কিছু গোপন না করে মেইলগুলো দেখিয়েছিল পল্লব, অমিয় এবং ভাদুড়ি মশায়কে। মেইলগুলো দেখতে দেখতে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল পল্লব। তার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। সে বুঝতে পারছিল, তার মেইল আইডি ব্যবহার করে তিতাসই এই মেইলগুলো করেছে অপালাকে। চোখে জল এসে গেছিল পল্লবের। ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তিতাসকে ভুল বুঝো না পল্লব, এ কাজ তিতাস করেনি। তিতাস নিজের মধ্যে নেই, ওকে দিয়ে এই সব কিছু করানো হয়েছে আর আমি নিশ্চিত, ওর অন্তর্ধানও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই অবধি বলে চুপ করে গেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। অজানা এক আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে গেছিল বাকি সকলেই। তিতাস কোথায় আছে, কেমন আছে এই প্রশ্ন সকলকেই কুরে কুরে খাচ্ছিল। পল্লব কাঁপছিল থরথর করে। ওকে ধরে রেখেছিল অমিয়। তখনই নৈঃশব্দ্য ভেঙে ভাদুড়ি মশায় প্রশ্নটা করলেন।

তিতাসের অন্তর্ধানের সঙ্গে মামির আসার সম্পর্কটা ধরতে পারল না সঞ্জয়। তবু বলল, মামির তো আর আসার কথা নয় স্যার। কারণ মামার মৃত্যুর পরে আমি মামি আর দুই মামাতো ভাই বোনের নামে গয়ায় গিয়ে পিণ্ড দিয়ে এসেছি।

কী? ছিটকে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। ত্রু«দ্ধ কণ্ঠে বললেন, তুমি পিণ্ড দিয়ে এসেছ? কেন?

অবাক হল সঞ্জয়। ভাদুড়ি মশায়ের রাগের কারণটা সে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তাকে উত্তর দেওয়ার অবকাশ না দিয়েই ভাদুড়ি মশায় ফের চিৎকার করে উঠলেন, কাকে জিগ্যেস করে তুমি পিণ্ড দিয়েছ? একবারও আমার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করলে না?

রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন তিনি। অপালা গিয়ে হাত দুটো চেপে ধরল, কী হয়েছে দাদু? তুমি এত একসাইটেড হচ্ছ কেন? প্লিজ শান্ত হও।

অপরাধী গলায় সঞ্জয় বলল, স্যার, আসলে মামা মারা যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম…

কেন ভেবেছিলে? কে তোমাকে ভাবতে বলেছিল সঞ্জয়? এত বড় একটা কাজ করলে আর তুমি আমাকে জানালে না? আমি যদি ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারতাম তুমি তোমার মামির পিণ্ড দেওয়ার কথা ভাবছ আমি তখনই তোমাকে আটকাতাম। তুমি জানো না কত বড় ভুল করে ফেলেছ তুমি। তোমার মামিকে যে আমাদের এখন খুব দরকার ছিল।

মামিকে দরকার কেন স্যার?

কারণ একমাত্র সেই আমাদের লোকনাথের গতিবিধির ব্যাপারে সাবধান করতে পারত।

লোকনাথ! একসঙ্গে বলে উঠল সবাই, কিন্তু সে তো মারা গিয়েছে!

দু’হাতে কপালের রগ ধরে মাথা নীচু করলেন ভাদুড়ি মশায়। আর চুপ করে থাকতে পারল না পল্লব। উঠে গিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের সামনে হাঁটু ভেঙে বসল, চুপ করে থাকবেন না স্যার। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষণে সব বুঝতে পেরেছেন। বলুন আমাকে তিতাস কোথায়? ও কেন করল এসব? লোকনাথের কথা কেন বললেন আপনি? বলুন প্লিজ। চুপ করে থাকবেন না। বলুন।

অপরাধী গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, লোকনাথ বেঁচে আছে।

ঘরের মধ্যে বাজ পড়লেও বুঝি বা কেউ এতটা চমকাত না। কথাটা বুঝতেই যেন কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল ওদের। কাঁপা গলায় অমিয় বলল, লোকনাথ বেঁচে আছে? কী করে?

আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল অমিয়। কিন্তু তাকে সেই প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে কঠিন গলায় পল্লব বলে উঠল, লোকনাথ যে বেঁচে আছে আপনি সে কথা জানতেন তাই না স্যার? তারপরেও আপনি সে কথা আমাদের কাছে গোপন করে গেছেন। আজ তিতাস যা যা করেছে তার সঙ্গে যে লোকনাথের কোনও যোগাযোগ আছে এ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। যা ঘটেছে তার জন্য আপনি দায়ী। তিতাসের এই অন্তর্ধানের দায় আপনাকে নিতে হবে।

কোনওদিন ভাদুড়ি মশায়ের সঙ্গে এভাবে কেউ উঁচু গলায় কথা বলেনি। শিউরে উঠল অপালা, দাদুর রাগ ভয়ঙ্কর। সে গিয়ে পল্লবকে টেনে সরিয়ে আনতে চাইল, কী করছ পল্লব? প্লিজ কুল ডাউন।

এক ঝটকায় অপালার হাত সরিয়ে দিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের একেবারে সামনে এগিয়ে গেল পল্লব। তার চোখে জল। চিৎকার করে বলল, চুপ করে থাকবেন না স্যার। উত্তর দিন। আপনি জানতেন তো লোকনাথ বেঁচে আছে?

ধীরে ধীরে মাথা তুললেন ভাদুড়ি মশায়, হ্যাঁ জানতাম।

তা হলে আমাদের বলেননি কেন? আর যদি নাই বলেন, কেন লোকনাথকে শেষ করে দেননি? আপনার তো অসীম ক্ষমতা। আপনি চাইলেই তো লোকনাথকে মারতে পারতেন। বলুন পারতেন না?

উত্তরটা দেওয়ার আগে নিজেকে যেন খানিকটা প্রস্তুত করে নিলেন ভাদুড়ি মশায়। তারপর বললেন, না পল্লব, পারতাম না।

কেন পারতেন না?

কী করে পারতাম আমি? যতই তন্ত্রচর্চা করি, দিনের শেষে আমি তো শিক্ষক। ছাত্র পড়ানো আমার পেশা, আমার ধর্ম। লোকনাথ আমার উজ্জ্বলতম ছাত্র। সে যতই বেয়াড়া হোক, শিক্ষক হয়ে ছাত্রকে আমি মারতে পারব না। সেদিনও পারিনি, আজও পারব না। তোমরা আমাকে ক্ষমা কোরো।

দু’হাতে মুখ ঢাকলেন ভাদুড়ি মশায়। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পল্লব। তার মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা যখন সুপ্রতিমকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে সঞ্জয়কে গ্রেফতার করার জন্য মুখিয়ে ছিল পুলিশ। সেই সময়কার প্রেসিডেন্সির অন্যতম উজ্জ্বল ছাত্র সঞ্জয়কে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন শিক্ষকেরাই। পল্লব নিজেও মাস্টার বাড়ির ছেলে। আজীবন শিক্ষকতাই করতে চেয়েছিল, ভাগ্য তাকে অন্য পথে চালিত করেছে। কিন্তু সে জানে উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রীর প্রতি শিক্ষকের যে মায়া জন্মায় তা পুরোপুরি অপত্য না হলেও অপত্যের খুব কাছাকাছি তো বটেই। সে বুঝতে পারল কেন সেদিন জল দেখেছিল বৃদ্ধের চোখে। ধীরে ধীরে ভাদুড়ি মশায়ের হাঁটুর ওপর হাত রাখল সে। চোখের জল মুছে বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। আপনার সাথে ওভাবে কথা বলে অন্যায় করেছি।

শক্ত করে পল্লবের হাত চেপে ধরলেন ভাদুড়ি মশায়, কোনও অন্যায় করোনি। তোমার জায়গায় আমি থাকলে এর থেকেও বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। তোমার সন্দেহ ঠিক। তিতাসের অন্তর্ধানের পেছনে লোকনাথের হাত আছে। এ লোকনাথ ছাড়া কারও কাজ হতে পারে না। কিন্তু, আমি তোমাকে একটা কথা বলছি পল্লব, লোকনাথকে আমি মারতে পারিনি ঠিকই কিন্তু তিতাসেরও আমি কোনও ক্ষতি হতে দেব না। লোকনাথ যদি তিতাসকে নরকে নিয়ে গিয়েও লুকিয়ে রাখে সেখান থেকে আমি ওকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।

ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর পল্লবের চোখে চোখ রেখে বললেন, দুশ্চিন্তা কোরো না। রামদাস ঠাকুরের প্রিয়তম শিষ্য নীরেন তোমায় কথা দিচ্ছে। এ কথার অন্যথা হয় না।

শিউরে উঠল পল্লব। একই সাথে বড় নিশ্চিন্ত বোধ করল সে।