লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১৭

১৭

ইন্টারভিউটা বেশ ভালো হয়েছে। ভালো ইন্টারভিউ দিলে মনটাও ভালো লাগে। খুশি মনে প্রেসিডেন্সি কলেজের মেন বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল সঞ্জয়।

মাস দুয়েক আগে একদিন হঠাৎ ফোন করেছিল পল্লব। হুড়মুড় করে বলেছিল, প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে ভ্যাকেন্সি বেরিয়েছে। দুটো পোস্ট আছে। একটা প্রফেসরের আর একটা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তোকে লিঙ্ক পাঠিয়েছি। এক্ষুনি অ্যাপ্লাই কর। কোনও বাহানা শুনব না সঞ্জয়। পাকামি করলে বিচি ফাটিয়ে দেব।

এটুকু বলেই ফোন কেটে দিয়েছিল পল্লব। সেই মুহূর্তে কিচ্ছু বলার সুযোগ পায়নি সঞ্জয় কিন্তু স্মৃতিসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে তাকে আছড়ে ফেলেছিল অতীতের বেলাভূমিতে। মনে পড়ে গিয়েছিল সেদিনের সোনাঝরা সন্ধেগুলোর কথা। হিন্দু হস্টেলের ছাদে বসে তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখত তারা চার বন্ধু মিলে। সে, পল্লব, অমিয় আর সুপ্রতিম। ছোটবেলার ভয়ংকর স্মৃতি অনেকটাই সে তখন কাটিয়ে উঠেছে। নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে পদার্থবিদ্যার বিপুল সমুদ্রে। ভালো ছাত্র হিসেবে খানিক নামডাকও হয়েছে।

অনাথ আশ্রমে বড় হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়াটাই সঞ্জয়ের কাছে স্বপ্নের মতো। অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে এসেই এত ঘাবড়ে গিয়েছিল যে ঠিক করে ফেলেছিল, এই কলেজে পড়া যাবে না। কিন্তু হেডমাস্টারমশাই শোনেননি। লিস্টে নাম ওঠার পর জোর করে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কলেজে। রেখে গিয়েছিলেন হিন্দু হস্টেলে। কলেজের প্রথম দিনটার কথা তো সঞ্জয়ের স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বল করছে। প্রথম ক্লাসেই চোস্ত ইংরেজিতে লেকচার দিলেন অধ্যাপক পি.আর.বি। প্রিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। সবটুকু সঞ্জয়ের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। খুব মুষড়ে পড়েছিল সঞ্জয়। বুঝতেই যদি না পারে তা হলে শিখবে কী করে? পরের ক্লাসগুলোও কমবেশি একরকম। কেউ দু’ লাইন বাংলায় বলেন তো পরের কুড়ি লাইন ইংরেজিতে। একজন ছেলে খুব সাহস করে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, স্যার একটু বাংলায় বলবেন?

তাতে চাপা হাসির আওয়াজে মুখরিত হয়েছিল ক্লাসরুম আর অধ্যাপক বলেছিলেন, আমি বলতেই পারি বাংলায় কিন্তু বাংলায় তো ফিজিক্সের ভালো বই নেই। ইংরেজিটা তোমায় শিখে নিতেই হবে।

ক্লাস শেষে কলকাতার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া কিছু ছেলেমেয়ে খুব আওয়াজ দিয়েছিল বাংলায় বলতে বলা ছেলেটিকে। সেই দিনই সঞ্জয় বুঝে গিয়েছিল, কলকাতার ছেলেমেয়েরা কখনও মফস্বলের ভালো বন্ধু হতে পারে না। তারা সব সময়ই মফস্বলকে নিচু চোখে দেখে। জাজ করে। পরে এই কলকাতার ছেলেমেয়েরাই সঞ্জয়ের কাছে পড়া বুঝতে আসত। সঞ্জয় বুঝিয়েও দিত। সে অন্য কথা। তো প্রথম দিনের ক্লাসের শেষে সঞ্জয়ের ঝুলিতে ছিল শূন্য, হাতে পেনসিল। খুব মন খারাপ করে ফিরে এসেছিল হস্টেলে। সুপ্রতিম আলাপ করিয়ে দিয়েছিল বাংলা ডিপার্টমেন্টের ছেলে পল্লবের সাথে। সঞ্জয়কে চুপ করে থাকতে দেখে পল্লব বলেছিল, তোর মন খারাপ ভাই? কী হয়েছে?

সঞ্জয় খুলে বলেছিল সমস্যার কথাটা। শুনে হো হো করে হেসে উঠেছিল পল্লব। খুব রাগ ধরে গিয়েছিল সঞ্জয়ের। গম্ভীর গলায় বলেছিল, এতে হাসির কী আছে?

পল্লব বলেছিল, ইংরেজির মতো একটা সোজা ব্যাপার নিয়ে ঘাবড়াচ্ছিস, হাসব না তো কী করব?

আরও রেগে গেছিল সঞ্জয় পাকা ছেলেটার ওপর, তোর কাছে সোজা হতে পারে, আমার কাছে না।

ইংরেজি সবার কাছেই সোজা। একটু বুদ্ধি খাটালেই ইংরেজি বোঝা যায়। গড়গড় করে বলা যায়। বল তো, আমি গেলাম আর হাতে করে দুধ নিয়ে এলাম—এর ইংরেজি কী?

বেশ ঘাবড়ে গেছিল সঞ্জয়। ক্লাসের ইংরেজি লেকচার না বুঝলেও বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রান্সলেশন সে করতে পারে। কিন্তু তখন কিছুই মাথায় আসছিল না। ওর অবস্থা দেখে পল্লব বলেছিল, তুই বেশি ভাবছিস তাই ঘেঁটে ফেলছিস। ভেরি ইজি। আমি গেলাম আর হাতে করে দুধ নিয়ে এলাম—এর ইংরেজি হল, ‘গোয়িং কামিং হ্যান্ড মিল্ক’।

প্রথমটায় থ হয়ে গেছিল সঞ্জয়। তারপর বলেছিল, এটা কোনও শুদ্ধ ইংরেজি না। এমন ভুলভাল ইংরেজি বলতে সবাই পারে।

একজ্যাক্টলি, লাফিয়ে উঠেছিল পল্লব, আমিও তো তোকে এটাই বলতে চাইছি ভাই। মফস্বলের ছেলে তুই, ইংরেজিকে শুদ্ধ করার দায় আজই তোকে কে নিতে বলেছে? আগে ধীরে ধীরে ঢোক ব্যাপারটার মধ্যে তারপর শুদ্ধ করিস। ভাষার মোদ্দা কথা তো কমিউনিকেশন না কি? এই যে গোয়িং কামিং হ্যান্ড মিল্ক—তুই তো বুঝলি কী বলতে চাইছি। ওটাই ইমপরট্যান্ট। আমার এক দিদি ছিল, মধুদি, সে প্রথম আমায় এটা বুঝিয়েছিল। ভাই, তুই ভার্ব, অ্যাডভার্ব, প্রিপোজিশনের চক্করে মন দিতে গিয়ে আসল জায়গাগুলো মিস করে গেছিস। ক্লাসে স্যার যখন লেকচার দিচ্ছেন ফিজিক্সের টার্মগুলো খেয়াল কর। ওগুলো তো তুই জানিস। ট্রাই করে দেখ দু’দিন, ব্যাপারটা ইজি হয়ে যাবে।

ট্রাই করেছিল সঞ্জয়। সত্যি লেকচারগুলো আগের থেকে অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষার কাঁধে ভর দিয়েই সে বুঝতে শুরু করেছিল পদার্থবিদ্যার নানা রহস্য। সেই থেকে ভাব জমে গেল পল্লবের সাথে। সুপ্রতিম তো আগেই ছিল, তারপর এল হ্যান্ডসাম অমিয়। গড়ে উঠল চারজনের সংসার।

সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন ছিল পল্লবের চোখে। বৈষ্ণব পদাবলী কণ্ঠস্থ ছিল তার। সে বলত, বৈষ্ণব রসতত্ত্ব দুনিয়ার সব্বার পড়া উচিত। পদাবলীর থিয়োরি নিয়ে কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠত। রেগে বলত, এই অ্যাকাডেমিশিয়নগুলো নিজেদের বিরাট তালেবর ভাবে। এমন ভাবে থিয়োরির বই লেখে লেম্যান বুঝতেই পারবে না। কিছু বলতে গেলেই বলবে, সব জিনিস সবার জন্য নয়। আগে অধিকারী হতে হয়। যত সব বালের যুক্তি। একদিন আমি পদাবলীর থিয়োরির ওপর একটা বই লিখব। এমন সোজা করে লিখব যাতে যে কেউ পড়ে বুঝতে পারে।

সত্যি বড় সহজ করে পদাবলী আর প্রাচ্য রসতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারত পল্লব। সে বলে যেত আর বুঁদ হয়ে শুনত বাকি তিন বন্ধু। কলেজে এই আড্ডা বসলে যোগ দিত তিতাসও। গবেষণা করার পরে প্রেসিডেন্সিতেই পড়াতে চাইত পল্লব। বলত, আমার বাপ, ঠাকুরদা মাস্টার। আমি বেনের ঘরের ছেলে, বিদ্যাবণিক। পড়ানো ছাড়া আর কিছুই তো পারি না। চোখ ধাঁধানো রেজাল্টও করেছিল সে। কিন্তু সেই পল্লবই যখন অ্যাকাডেমিয়া ছেড়ে বাণিজ্যিক লেখালিখিতে চলে গেল ভারী কষ্ট পেয়েছিল সঞ্জয়। কষ্ট পেয়েছিলেন পল্লবের মাস্টারমশাইয়েরাও। সঞ্জয় অনেকবার বলেছিল, পড়ানোয় ফিরে আয় পল্লব। অনেক ছাত্রছাত্রীকে তুই বঞ্চিত করছিস।

চুপ করে বসে থাকত পল্লব। তারপর বলত, ওটা একটা বদ্ধ জলা। পচা গন্ধ ছাড়ছে।

সঞ্জয় বুঝত, এ সবই পল্লবের অভিমানের কথা। যেভাবে নতুন ভিসির জমানায় প্রেসিডেন্সির রেজিস্ট্রার আর ডিন অব স্টুডেন্টসকে তাড়ানো হয়েছিলে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি পল্লব। এ অবশ্য চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। তবু কিছু লোক আজও চোরের ওপর রাগ করার সাহস রেখে মাটিতে ভাত খাওয়ার কৃচ্ছ্র করতে পারে। পল্লব তাদেরই একজন।

অবশ্য অভিমান কি সঞ্জয়েরও কম ছিল কিন্তু বছর দুয়েক আগে মিতুলের ঘটনাটা সবাইকে আবার কাছাকাছি এনে ফেলেছে। শুধু প্রতিম তাদের এই রিইউনিয়নের অংশ হতে পারল না।

পল্লবের পাঠানো লিঙ্কটা খুলে দেখেছিল সঞ্জয়। তারপর অনেক দ্বিধা পেরিয়ে অ্যাপ্লাই করে ফেলেছিল। আইআইটি ছেড়ে রাজ্য সরকারের কলেজে পড়াতে আসাটা অর্থকরী দিক থেকে খুবই অলাভজনক সিদ্ধান্ত কিন্তু এ কলেজ যে আর পাঁচটা কলেজ নয়। এ যে তাদের যৌবনের ওয়ান্ডারল্যান্ড। তাই চাকরি পাবে কি পাবে না, পেলেও করবে কি করবে না সে পরের কথা কিন্তু ইন্টারভিউটা দিতে চলে এসেছিল। আর সেটা ভালোও হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সে যে কলকাতায় এসেছে এটা পল্লবকেও জানায়নি। একবারে পল্লবের বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দেবে। সবটা শুনে পল্লবের কী অবস্থা সেটা ভাবতে ভাবতেই পোর্টিকোতে নেমে এল সঞ্জয় কিন্তু নিজেই এতটা সারপ্রাইজড হয়ে গেল যে মিনিটখানেক তার মুখ দিয়ে কথা সরল না। সে দেখল, পোর্টিকোতে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে অপালা। সঞ্জয়ের মনে হল, প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোতে একটা সূর্যমুখী ফুল ফুটেছে।

প্যারামাউন্টে ডাব শরবতে চুমুক দিতে দিতে অপালা বলল, সারপ্রাইজ কি তুমি একাই দিতে পারো?

উত্তর দিল না সঞ্জয়। এই মেয়েটির সঙ্গ তার ভারী ভালো লাগে। অপালার আপাত গাম্ভীর্যের মধ্যেও যে এমন একটা ছেলেমানুষি আছে সেটা দেখতে দেখতেই বিস্মিত হচ্ছিল সে। সারপ্রাইজ দেবে বলে সুদূর আমেরিকা থেকে কলকাতায় উড়ে আসা সহজ কথা নয়। এর জন্য ভেতরে তিন পুরুষের পাগলামি থাকতে হয়।

এই দু’বছরে অপালার সঙ্গে সঞ্জয়ের আলাপটা জমে উঠেছে মূলত হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে। বেশির ভাগই টেক্সট মেসেজ। ভিডিও কল কদাচিৎ। যদিও এই আলাপটা জমে ওঠার কথা ছিল না। কারণ সঞ্জয় স্বভাবগত ভাবেই স্বল্পভাষী। কলেজ বেলায় পল্লব তাকে মৌনীবাবা বলে ডাকত। সঞ্জয় দেখেছে, মেয়েরা সাধারণত ছেলেদের থেকে বেশি কথা বলে। আর শুধু কথা বলেই তারা ক্ষান্ত থাকে না, উল্টোদিকে যে শুনছে তাকেও কথা বলতে বাধ্য করে। মেয়েরা ভালো শ্রোতা পছন্দ করে না। তারা নিজেও বক্তা, তাদের পছন্দও বাগ্মী মানুষকে। পল্লব যে বরাবর নারী পরিবৃত হয়ে থেকেছে তার অন্যতম কারণ সে অবান্তর, অক্লান্ত বকতে পারে। সঞ্জয় তাই চিরকালই মেয়েদের থেকে দূরত্ব রেখে চলেছে কিন্তু একটা কথোপকথনকে কেন্দ্র করেই সে অপালার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল।

একটা প্রাচীন পুঁথিতে পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত কিছু শ্লোক পেয়েছিল অপালা। সে বিষয়েই সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কথায় কথায় সঞ্জয় জানতে চেয়েছিল, পোস্ট ডকের পরে তোমার প্ল্যান কী?

অপালা বলেছিল, দেশে ফিরে আসব।

একটু অবাক হয়েছিল সঞ্জয়, ফিরে আসবে? চাইলেই তো তুমি ওখানের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবে। আর সত্যি বলতে এ-দেশে কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

অপালা বলেছিল, বিদেশে কী আছে জানি না। তবে অন্যের মাটিতে বেশি দিন থাকা যায় না। আসলে নতুন ভাষা শিখে, খাওয়াদাওয়া রপ্ত করে হয়তো খানিকটা বিদেশি সাজা যায় কিন্তু ও দেশের আকাশে কোন মেঘে বৃষ্টি হবে সেটা ও দেশের শিশুও আমার থেকে ভালো জানে। আজীবন জানবে। তা ছাড়া ইমিগ্র্যান্ট, লোভে পড়ে অন্যের দেশে এসে বসে আছি এটা ভাবতেও ভালো লাগে না। তাই কাজটা শেষ হলেই ফিরে যাব ঠিক করেছি। দেশে কিছু না কিছু জুটে যাবে।

মুগ্ধ হয়ে গেছিল সঞ্জয়। তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ হয়েছিল এটা বুঝতে পেরে যে অপালা তার চেয়েও কম কথা বলে। শরবতটা শেষ করে সঞ্জয় বলল, পল্লবের সঙ্গে দেখা করে আসবে না কি?

সঞ্জয় ভেবেছিল, প্রস্তাবটা শুনে অপালা খুশি হবে কিন্তু পল্লবের কথা শুনেই অপালা যেন একটু থমকে গেল।

অপালার অস্বস্তিটা চোখ এড়াল না সঞ্জয়ের। বলল, এনিথিং রং?

একটু চুপ করে থেকে অপালা বলল, ব্যাপারটা তোমাকে কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। কিন্তু এটা তোমার জানা দরকার। গত কয়েকদিন ধরে পল্লব আমাকে খুব অদ্ভুত কিছু মেইল করছে। কিছুক্ষণ আগেও করেছে।

খুব অবাক হল সঞ্জয়, পল্লব মেইল করেছে!

কেন পল্লব মেইল করতে পারে না?

তা নয় কিন্তু আমি ওকে যতদূর চিনি ও এসবে অভ্যস্ত হতে চায় না। পল্লব যখন খবরের কাগজে চাকরি করত তখন রেজিগনেশন দেওয়ার পরেও ও পঁয়তাল্লিশ দিন নোটিস পিরিয়ড সার্ভ করেছিল যদিও নোটিস পিরিয়ড ছিল এক মাসের। আসলে ও অফিসিয়াল মেইলটাই চেক করেনি তাই জানতেও পারেনি কোম্পানি ওকে সময়েই রিলিজ করে দিয়েছে। ওই যে পনেরো দিনের মাইনে পায়নি সেটা নিয়ে ও আজও আফসোস করে। তাই মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ থাকতে ও তোমায় মেইল করল কেন বুঝতে পারছি না।

বোধ হয় মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে লিখতে সাহস পায়নি। দেখো মেইলগুলো। দেখলেই বুঝতে পারবে। নিজের মোবাইল ফোনটা সঞ্জয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল অপালা, পরপর দেখো, আমি সেভ করে রেখেছি।

পড়তে শুরু করল সঞ্জয় এবং কিছুটা পড়েই তার গা গুলিয়ে উঠল। প্রত্যেকটা মেইলই বিরক্তিকর যৌনগন্ধী। সেখানে পল্লব ইনিয়েবিনিয়ে একটা কথাই লিখে গেছে, তিতাসের সঙ্গে সম্পর্কটায় সে আর কোনও চার্ম খুঁজে পাচ্ছে না। তিতাস বিছানায় খুব খারাপ, কোনওভাবেই সে পল্লবের কোনও চাহিদা মেটাতে পারছে না। এই সম্পর্কটা থেকে সে বেরোতে চায়। আশ্রয় চায় অপালার কাছে। অপালা ঢিলেঢালা জামাকাপড় পরলেও সে বুঝতে পেরেছে অপালার ফিগার দুর্দান্ত। অপালাই পারবে তার অতৃপ্তি দূর করতে। সেও কথা দিচ্ছে, অপালাকে বহুবার স্বর্গীয় অর্গাজম উপহার দেবে।

ফোনটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সঞ্জয়। পল্লব এই মেইলগুলো করেছে অপালাকে! তার বন্ধু পল্লব! তিতাসের প্রেমিক পল্লব! পল্লবের অধঃপতন তাকে পীড়িত করতে লাগল ক্রমাগত, তিতাসের জন্য কষ্ট হতে লাগল কিন্তু সমস্ত এই অনুভূতিকে ছাপিয়ে অন্য যে অনুভূতি তার চেতনার দখল নিল তার নাম ক্রোধ। মনে হতে লাগল, পল্লবের সাহস কী করে হল অপালাকে কুদৃষ্টিতে দেখার! চমকে উঠল সে, পল্লব যে অপালাকে কামনা করেছে এটায় তার এত রাগ হচ্ছে কেন? আদি কাল থেকে পুরুষ নারীকে এবং নারী পুরুষকে কামনা করেছে। এটা তো স্বাভাবিক একটা ঘটনা। হ্যাঁ, তিতাস থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীকে কামনা করা এবং তাকে যৌনগন্ধী মেইল করা অনৈতিক, খুবই খারাপ কাজ করেছে পল্লব। তাকে শাসন করা দরকার। কিন্তু সঞ্জয়ের ইচ্ছে করছে পল্লবের গলাটা টিপে ধরে। দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেয়। রাগের গতিপথ খুবই একমুখী। সঞ্জয় ভাবল, অপালার জায়গায় এটা যদি অন্য কোনও মেয়ে হত তা হলেও কি সে পল্লবের ওপর এতটাই রেগে যেত? না বোধ হয়। তা হলে? এত দিনে এই প্রথমবার সঞ্জয় উপলব্ধি করল, সে আসলে অপালার প্রেমে পড়েছে।