লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১৬

১৬

হু হু করে গাড়িটা ছুটছিল বাইপাস দিয়ে। পল্লব চালাচ্ছে। পাশে বসে আছে রোশনি। চুপ করে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে সে। দুটো দিন কেটে গেছে কিন্তু এখনও সেই রাতের দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পায়নি সে। ট্রমাটা কাটতে পল্লবেরও সময় লেগেছে।

পল্লবের চিৎকারে খুব দ্রুত লোকজন জড়ো হয়ে গেছিল সে রাতে। পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি অচেতন রোশনিকে নিয়ে ঘরে চলে গেছিলেন। খবর দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখেছিল ঘরে কেউ নেই। পুলিশ আন্দাজ করেছিল, চেঁচামেচিতে সবাই যখন এই ঘরের দরজায় জড়ো হয়েছে সেই অবকাশে আততায়ী ব্যালকনি দিয়ে নেমে পাঁচিল টপকে পালিয়েছে। তিনতলার ব্যালকনি থেকে নীচে তাকিয়ে আঁতকে উঠেছিল পল্লব, এদিকে তো রেন ওয়াটার পাইপ নেই। তা হলে নামল কী করে?

যে অফিসার এসেছিলেন তিনি একটু ভুরু কুঁচকে থেকে বলেছিলেন, সেক্ষেত্রে তো একটাই অপশন পড়ে থাকে। লাফ দেওয়া।

কথাটা মানতে পারেনি পল্লব, এখান থেকে লাফ দিলে তো নিশ্চিত ভাবে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে বাইরের অত বড় পাঁচিলটা সে টপকাবে কী করে?

অফিসার বলেছিলেন, কিন্তু টপকেছে এটা তো শিওর। আমরা পুরো প্রিমাইস চিরুনি তল্লাশি করেছি। কেউ নেই।

পল্লবের হাঁ মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, আপনার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। ব্যাপারটা সত্যিই অমানুষিক।

আর এই অমানুষিক শব্দটাই পরের দিন সকালে পল্লবের মাথার মধ্যে নতুন করে আছড়ে পড়েছিল, যখন সে রোশনির মুখে শুনেছিল, আততায়ীর নাম গেনু। কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেছিল সে। তারপর কাঁপা গলায় বলেছিল, কী নাম বললে?

পল্লবের ফ্যাকাসে মুখ দেখে রোশনিও যেন নতুন করে ভয় পেয়েছিল, নামটা শুনে এমন চমকে উঠলেন কেন পল্লবদা?

উত্তর না দিয়ে পল্লব ভাবছিল, আততায়ীর চেহারার যে বর্ণনা রোশনি দিয়েছে তার সঙ্গে তো গেনুর চেহারার কোনও মিল নেই। তা ছাড়া গেনু তো তাদের চোখের সামনেই শেষ হয়ে গেছিল। তবে কি আবার নতুন কোনও রূপ ধরে ফিরে এসেছে সেই বিভীষিকা? রোশনিকে সে বলেছিল, আচ্ছা রোশনি, তুমি শিওর যে এসেছিল সে মানুষ?

প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে গেছিল রোশনি। তার পর চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, আর যাই হোক মানুষ নয় পল্লবদা। মানুষ অতটা নৃশংস হতে পারে না।

কিচ্ছু মেলাতে পারছিল না পল্লব কিন্তু অব্যক্ত একটা ভয় তাকে বিবশ করে দিচ্ছিল ক্রমশ। সেই মুহূর্তেই পল্লব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই রহস্যের সমাধান যিনি করতে পারবেন সময় নষ্ট না করে তাঁর কাছেই যেতে হবে। রোশনিকে বলেছিল, আজ তো হবে না। কাল তোমায় নিয়ে এক জায়গায় যাব। ফাঁকা থেকো।

ইচ্ছে করেই আজ তিতাসকে সঙ্গে আনেনি পল্লব। রোশনির সাথে তিতাসের ওই দুর্ব্যবহারের ব্যাখ্যা এখনও খুঁজে পায়নি সে। যদিও তিতাস বলেছে, ওই সময়টার কথা তার কিছুই মনে নেই কিন্তু কথাটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি পল্লব। তিতাসকে অবিশ্বাস করতে তার মোটেই ভালো লাগছে না কিন্তু তিতাস যা বলছে তা যদি সত্যি হয় তা হলে ধরে নিতে হবে তিতাসের শর্ট টার্ম মেমোরি লস হয়েছে। ওই একটি ঘটনা ছাড়া তেমন কোনও লক্ষণ এখনও পল্লবের চোখে পড়েনি।

* * *

শ্রীরঞ্জনীর লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে ঘটনার গৌরচন্দ্রিকাটা সেরে নিয়েছিল পল্লবই। তারপর বলতে শুরু করেছিল রোশনি। ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তুচ্ছতম ঘটনাও বাদ দেবে না মা। যা হয়েছে সব বলবে আমাকে।

পুলিশকে তো সে সবটাই বলেছে, তারপরেও পল্লবদা কেন এই বৃদ্ধের কাছে নিয়ে এল এবং কেন তিনি আবার সবটা শুনতে চাইছেন সেটা রোশনি বুঝতে পারছিল না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিল, এই বৃদ্ধের উপস্থিতির মধ্যে একটা নিবিড় আশ্রয় আছে। যা এই বিক্ষুব্ধ সময়ে তাকে শান্তি দিচ্ছিল। জোগাচ্ছিল সাহস। বদ্রিনাথের ফোন পাওয়া থেকে শুরু করে সে দিনের রাতের ঘটনা অবধি সবটাই বলেছিল রোশনি।

পুরোটা সময় চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়েছিলেন বৃদ্ধ। তারপর মাথা তুলে বললেন, সবই শুনলাম। তুমি যে বিপদের মধ্যে আছ আমি বেশ বুঝতে পারছি কিন্তু আমি কীভাবে তোমায় সাহায্য করব বুঝতে পারছি না। অবশ্য আমার প্রয়োজন না থাকলে পল্লব তো তোমাকে আমার কাছে আনতও না।

পল্লব বলল, স্যার আপনি এখুনি সবটা বুঝে যেতেন রোশনি যদি সবটা আপনাকে বলত।

রোশনি অবাক হল, সবই তো বলেছি পল্লবদা। কিচ্ছু বাদ দিইনি।

আসল জিনিসটাই তুমি বাদ দিয়ে ফেলেছ রোশনি। ছেলেটা ছেলেটা করে কথা বলে গেছ। নামটা বলোনি। স্যার, যে ছেলেটি রোশনির ওপর অ্যাটাক করেছিল সে তার নাম বলেছিল গেনু।

অচেতন মানুষকে স্মেলিং সল্ট শোঁকালে সে যেমন ভাবে শিউরে ওঠে ঠিক সেই ভাবে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। পল্লব দেখল তাঁর সেই গভীর প্রজ্ঞাবাহী দুই চোখ আছন্ন হল তীব্র আতঙ্কে। যদিও মুহূর্তেই সামলে নিলেন নিজেকে তবু তাঁর সেই ভীত দৃষ্টি পল্লবকে দিশাহীন করে তুলল।

কী নাম বললে পল্লব? উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের কণ্ঠে।

স্যার, গেনু। বলতে গিয়ে যেন নতুন করে গলা কেঁপে গেল পল্লবের।

কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তার পর স্বাভাবিক গলায় বললেন, এটা নিতান্তই কাকতালীয়। তুমি যা ভাবছ তা হতে পারে না পল্লব কারণ গেনু নেই। আর যদি সে থাকতও তা হলেও সে এই ছেলেটি হতে পারে না। কারণ গেনুর ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা নেই। আশা করি তোমরা পুলিশকে সব জানিয়েছ। পুলিশই এর তদন্ত করবে। আমি এবার একটু লিখতে বসব।

ভাদুড়ি মশায়ের বলার মধ্যে স্পষ্ট যে তিনি আর এ নিয়ে কথা বাড়াতে চান না। এ সব ক্ষেত্রে নিয়ম চলে যাওয়া কিন্তু পল্লব আজ নিয়ম না ভেঙে পারল না। বলে উঠল, কিন্তু স্যার…

কথা কেটে ভাদুড়ি মশায় অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার যা বলার ছিল আমি বলে দিয়েছি। এবার তোমরা এসো।

হতাশ গলায় পল্লব বলল, এসো রোশনি। আমরা যাই।

বাইরে বেরিয়ে জুতো পরতে পরতে রোশনি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো পল্লবদা? গেনু নামটা নিয়ে আপনাদের এমন ট্রমা কেন?

সে অনেক গল্প রোশনি। পরে কোনও একদিন বলব।

আচ্ছা। তবে আপনার এই ভাদুড়ি স্যার কিন্তু বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল। হঠাৎ কেমন করে আমাদের তাড়িয়ে দিলেন।

থমকে গেল পল্লব, সেটাই তো ভাবছি রোশনি। উনি এমন করার মানুষ নন। দেয়ার ইজ সামথিং রং। তুমি একটু বোসো তো। আমি আর একবার ভেতরে যাচ্ছি। বুড়ো কিছু একটা বুঝেছে কিন্তু চেপে যাচ্ছে।

রোশনিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে গেল পল্লব।

যদিও অনুমতি না নিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের লাইব্রেরিতে ঢোকা একটা দুঃসাহসিক কাজ তবু আজ সেই কাজটাই করে ফেলল পল্লব। তার মন বলছিল, কিছু না কিছু বিপদের আঁচ পেয়েছেন বৃদ্ধ। আসলে তাঁর ওই আতঙ্কিত দৃষ্টিই পল্লবকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। যে মানুষ গেনুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছেন সেই গেনুর নাম শুনে তিনি ভয় পাবেন কেন?

পা টিপে টিপে লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে পড়ল পল্লব। ভাদুড়ি মশায় বসে আছেন তার দিকে পেছন করে। ক্রাচ দু’টি টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। দু’হাতে মাথা ঢেকে বসে আছেন তিনি। চশমাটা খুলে রাখা একটা বইয়ের ওপরে। একটু ইতস্তত করেও পল্লব ডেকে উঠল, স্যার।

চমকে পেছন ফিরে তাকালেন ভাদুড়ি মশায় আর সেই মুহূর্তে পল্লবের ওপর যেন বাজ পড়ল। নিশ্চল হয়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে লাগল সে। বৃদ্ধের দু’চোখে টলটল করছে জল। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি কাঁদছেন!