১৮
সঞ্জয় আর অপালা যতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছল ততক্ষণে মিতুলকে আইসিসিইউ-তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীপক পাল পাথরের মতো বসে আছেন। একটা পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে পল্লব। তার সঙ্গে একটি অচেনা মেয়ে। পল্লবকে দেখেই ভুরুটা কুঁচকে গেল সঞ্জয়ের। অমিয়কে কোথাও দেখতে পেল না সঞ্জয়। পল্লবই প্রথম দেখতে পেল সঞ্জয় আর অপালাকে। সময়টা শোক ও নিদারুণ উদ্বেগের। তবু নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না সে। ছুটে এগিয়ে এল, সঞ্জয় তুই? অপালা তুমি? তোমরা একসাথে? এই সময়?
পল্লব একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল কিন্তু সঞ্জয় দেখছিল তার অভিব্যক্তি, আর যত দেখছিল ততই ঘনীভূত হচ্ছিল সংশয়। অপরাধবোধ চেপে রাখা খুব সহজ কথা নয়। তার জন্য অনেক বড় অভিনেতা হতে হয়। পল্লব এক সময় দাপিয়ে অভিনয় করেছে মঞ্চে কিন্তু জীবনের রঙ্গনাট্যে তার অভিনয় প্রতিভার পরিচয় সঞ্জয় কোনওদিন পায়নি। বরং পল্লব মানুষটা একটা খোলা ডায়েরির মতো। আবেগ নিয়ন্ত্রণে সে একেবারেই পারদর্শী না। আজও পল্লব আগের মতোই উচ্ছ্বল। এই হাসপাতালের গাম্ভীর্যও তার স্বভাবসুলভ চাপল্যকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রিয় বন্ধুকে দেখে সে বরাবরের মতোই উদ্বেল।
অপালাও অবাক হচ্ছিল পল্লবকে দেখে। প্রথম দিন থেকেই তার আলাদা করে চোখে পড়েছিল পল্লবকে। সদাহাস্যময় মানুষটার রসবোধ নজর কেড়েছিল তার। তারপর সময় যত গড়িয়েছে তত বেশি করে ভালো লেগেছে পল্লবকে। পল্লবের মতো বন্ধু চট করে মেলে না। যে কোনও প্রয়োজনে পল্লব পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নির্দ্বিধায়। কোনওদিন পল্লবের চাহনিতে অস্বস্তিকর কিছু লক্ষ্য করেনি সে। তাই পল্লবের মেইলগুলো পেয়ে সে ভারী চমকে উঠেছিল। কিছুতেই ওই কদর্য কথাগুলোকে মেলাতে পারছিল না পল্লবের সঙ্গে। কিন্তু দিনের পর দিন একই ধরনের মেইল পেতে পেতে সে পল্লবকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিল। কিন্তু আজ আবার সামনে থেকে দেখে অপালার মনে হল, ওই মেইলগুলো পল্লব করতে পারে না।
কী ব্যাপার? তোরা ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে? পল্লবের কথাতেই ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল সঞ্জয় আর অপালার। মাথা নেড়ে স্বাভাবিক গলায় সঞ্জয় বলল, কিছু না। কী করে হল এমনটা? কিছু জানতে পারলি?
পল্লব বলল, বলছি। তার আগে বল, তোরা দু’জনে একসাথে কী করে?
সঞ্জয় বলল, আজ প্রেসিডেন্সির ইন্টারভিউ ছিল। তোকে সারপ্রাইজ দেব বলে জানাইনি। অপালাও না জানিয়ে বাড়ি ফিরছিল। বাইচান্স দেখা হয়ে গেছে। আমি অপালার সাথে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। এসে শুনলাম এই কাণ্ড।
এবার একটু হতাশ লাগল পল্লবকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মিতুল এমনটা করবে আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। জরুরি একটা দরকারে আমি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। সেখানেই অমিয়র ফোন আসে। কাল সন্ধে থেকেই না কি মিতুলের মন খারাপ। ওর মা সেটা জানিয়েছেন। আজ সকালে মিতুলকে অনেকক্ষণ বাথরুমে দেখে পালদার সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে দেখা যায় মিতুল কমোডের পাশে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। পাশে দুটো খালি ফিনাইলের বোতল।
ওহ গড! শিউরে উঠল অপালা, তারপর?
তারপর পালদা অমিয়কে ফোন করেন। ওরা দু’জন মিলে মিতুলকে নিয়ে এসেছে।
তিতাসকে জানিয়েছিস? জিগ্যেস করল সঞ্জয়।
একটু থেমে পল্লব বলল, না। অমিয় বারণ করল।
ভারী অবাক হল দু’জনেই। অপালাই বলে উঠল, হোয়াট? তিতাসকে জানাতে বারণ করেছে কেন? আর অমিয় কোথায়?
পল্লব বলল, অমিয় আইসিসিইউ-এর ভেতরে। মিতুলকে চোখের আড়াল করতে দিচ্ছে না। তবে তিতাসকে কেন জানাতে বারণ করল আমি বুঝতে পারিনি। খুব স্ট্রিক্টলি বারণ করল। বোধহয় তিতাস শক পাবে ভেবেই বারণ করেছে। তিতাস তো এখনও মেন্টালি পুরো ফিট নয়।
হুম, চশমাটা ঠিক করে সঞ্জয় বলল, ডাক্তার কী বলছে?
জানি না। আমি যতক্ষণে এসেছি ততক্ষণে মিতুলকে অ্যাডমিট করা হয়ে গেছে। পালদাকে যে জিগ্যেস করব ভরসা পারছি না। কেমন একটা চুপ হয়ে গেছে লোকটা।
সত্যিই দীপক পালের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। হাসিখুশি মানুষটার মুখে কেউ যেন কালি লেপে দিয়েছে। দুশ্চিন্তায় চোখ দুটো কোটরাগত। এমন সময় ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অমিয়। সকলে প্রায় একসঙ্গে ছুটে গেল তার দিকে। সবার চোখে একটাই জিজ্ঞাসা। অমিয় বলল, ওয়াশ করা গেছে। অবস্থা আগের থেকে ভালো। তবে আরও সময় লাগবে।
চোখের জল ভারী অদ্ভুত জিনিস। উদ্বেগেও বেরোয়, উদ্বেগ প্রশমিত হলেও বেরোয়। এতক্ষণে কেঁদে ফেললেন দীপক পাল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। তাঁর কাঁধে হাত রাখল অমিয়। অমিয়র হাত ধরে দীপক পাল বললেন, স্যার, আপনাকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। যেদিন থেকে মিতুল আর আপনার সম্পর্ক হয়েছে আমার থেকে খুশি আর কেউ হয়নি। কিন্তু আমার মেয়েটা যে বড্ড ছোট। কী এমন হল স্যার যার জন্য ওকে ফিনাইল খেতে হল? আপনি সামলে রাখতে পারলেন না ওকে?
পল্লব স্পষ্ট দেখল, অপরাধবোধে ঝুলে পড়ল অমিয়র চোয়াল। তবু নিজেকে শক্ত করে অমিয় বলল, মিতুল নিজে থেকে ফিনাইল খায়নি পালদা। ওকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে।
ঘরের ভেতর বাজ পড়লেও বুঝি কেউ এতটা চমকাত না। পল্লব প্রায় চিৎকার করে উঠল, কী বলছিস তুই? কে দিয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচনা?
একটু চুপ করে থেকে অমিয় বলল, পল্লব, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। বাইরে আয়। তোমাদের সঙ্গে একটু পরে কথা বলছি অপালা।
অমিয়র মধ্যে চূড়ান্ত একটা অস্থিরতা কাজ করছে। অপালা বা সঞ্জয়ের সম্মতির অপেক্ষা না করেই সে এগিয়ে গেল বাইরের দিকে। একটু থমকে থেকে পল্লবও এগোল তার পিছু পিছু।
হাসপাতালের মধ্যে একটা বড় নিমগাছ। তার গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। সেখানেই এখন বসে আছে পল্লব আর অমিয়। প্রায় মিনিট পাঁচেক দু’হাতে মুখ ঢেকে থাকার পর অমিয় মুখ তুলল। রুমালে মুখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে বসল পল্লবের দিকে। তারপর পকেট থেকে একটা ফোন বার করল। পল্লব চিনতে পারল, এটা মিতুলের ফোন। একটা রেকর্ডিং চালিয়ে অমিয় ফোনটা এগিয়ে দিল পল্লবের দিকে, শোন।
‘ভালোবাসার মানুষ যখন এভাবে ধোঁকা দেয় তখন কী লাভ বল তো বেঁচে থেকে? এই যন্ত্রণা সহ্য করার থেকে মরে যাওয়া ভালো। তুই অনেক শক্ত মিতুল। অনেক শক্ত। পল্লব যদি আমার সঙ্গে এমন করত আমি হয়তো আত্মহত্যা করতাম। হয়তো কেন? আমি ঠিক আত্মহত্যা করতাম মিতুল। শেষ করে দিতাম নিজেকে। আমি সবসময় ব্যাগে ঘুমের ওষুধ রাখি। যদি কখনও পল্লব আমার সঙ্গে এমন করে আমি একসাথে সবক’টা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেব। আমি আর কথা বলতে পারছি না মিতুল। আমি রাখছি।’
রেকর্ডিংটা শুনতে শুনতেই তীব্র উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল পল্লব। শেষ হতে, বিস্ময়ে বলল, এ যে তিতাসের গলা!
মাথা নাড়ল অমিয়, এটাই মিতুলের লাস্ট ফোন কল। তারপরেই মিতুল ফিনাইল খাওয়ার ডিসিশন নিয়েছে। মিতুলের ফোনের সেটিংসটাই এমন যে সব কল রেকর্ড হয়ে থাকে। মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে তিতাস।
পল্লবের পায়ের তলার মাটি দুলে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছুই বলতে পারল না। তারপর অস্ফুটে বলে উঠল, কিন্তু তিতাস কেন এমন করবে?
এটা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয় পল্লব। তিতাস অনেকদিন থেকেই প্ল্যান করছিল।
মানেটা কী? পল্লবের কণ্ঠে উষ্মা, কী আজেবাজে কথা বলছিস তিতাসের নামে? তুই জানিস না তিতাস মিতুলকে কতটা ভালোবাসে? আর তুই তিতাসের দোষ দিচ্ছিস? রেকর্ডে তো স্পষ্ট শুনলাম, তিতাস বলছে, ভালোবাসার মানুষ যখন ধোঁকা দেয়… তার মানে তুই কিছু একটা করেছিস। কী করেছিস বল। নিজে অন্যায় করে বাচ্চা মেয়েটাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তিতাসের নামে দোষ দিয়ে বাঁচতে চাইছিস?
না রে পল্লব। বাঁচতে চাইছি না। চাইলেও বাঁচতে পারব না। কারণ এই ঘটনার জন্য তো তিতাসের পাশাপাশি আমিও দায়ী। যা হয়েছে, তারপর মিতুল বা আমি, কাউকে তো একটা আত্মহত্যা করতেই হত।
অমিয়র বলার ধরনে সবটা গুলিয়ে গেল পল্লবের। অমিয়র কাতরতা স্পর্শ করল তাকে। অমিয়র হাত ধরে সে বলল, ভাই, কী বলছিস একটু স্পষ্ট করে বল। আমি যে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
বলতে চাই পল্লব, কিন্তু জানি না কীভাবে তোকে বলব? আমি শুধু মিতুল না, তোর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। বিশ্বাস কর পল্লব, সেই ঘটনার পর থেকে আমি রোজ রাতে সার্ভিস রিভলভারটা হাতে নিয়ে বসে থাকি, কখনও কপালে, কখনও থুতনিতে ঠেকাই। কিন্তু ট্রিগার আর টানতে পারি না। আমি তো ট্রেটার, তাই ভয়টা বেশি। মিতুলের তো কোনও পাপ নেই। তাই কত সহজে এই সাহসী সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিতে পারল। আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করিস না পল্লব। কোনওদিন ক্ষমা করিস না।, কাঁদতে কাঁদতে অমিয় বসে পড়ল নিমগাছের নীচে।
অমিয়, সঞ্জয়, পল্লব, সুপ্রতিম। এই চার বন্ধুর মধ্যে অমিয়ই সবচেয়ে হাট্টাকাট্টা। অমিয়কে কোনওদিন কাঁদতে দেখেনি পল্লব। সেই অমিয় কাঁদছে। শুধু কাঁদছে না, বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। পল্লবেরও কান্না পেয়ে গেল। অমিয়কে জড়িয়ে ধরে বলল, কী হয়েছে অমিয়। প্লিজ বল আমায়।
বড় করে একটা শ্বাস নিল অমিয়। কথায় বলে, সত্যি বলতে দম লাগে। এ সেই দম যা অস্বস্তিকর কোনও সত্যিকে সামনে আনার আগে নেওয়া বাধ্যতামূলক। অমিয় সেটাই করল। তারপর বলল, আই হ্যাড সেক্স উইথ তিতাস।
কথাটা শুনে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে পারল না পল্লব। শুধু হাঁ করে অমিয়র দিকে তাকিয়ে রইল।
* * *
কফির কাপটা হাতে করে নিয়ে বিছানায় এসে বসতেই মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল তিতাসের। কোনওমতে সামলে নিল। আর একটু হলেই কফিটা উলটে পড়ত বিছানায়। কফিটা কোস্টারের ওপর রেখে একটু ধাতস্থ হল তিতাস। কী হল ব্যাপারটা? হঠাৎ এমন মাথা ঘুরল কেন? এসব রোগ তো তার কখনও ছিল না। কী যে হচ্ছে আজকাল! ভাবতে ভাবতেই মেঝের দিকে তাকিয়ে ভারী অবাক হয়ে গেল তিতাস। মেঝেতে একটা ফাটল ধরেছে। সরু চুলের মতো ফাটল কিন্তু সেটা দেওয়ালের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত অবধি চলে গিয়েছে। একটু আগেও যখন কফি আনতে গেল তখনও তো এটা চোখে পড়েনি! সকালে কাজের মাসি ঘর মুছে গেছে। সেও তো কিছু বলল না! এত বড় ফাটল তার চোখে পড়বে না সেটা তো হয় না। তা হলে? ফাটলটা কি এই কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হল? একটু ঘাবড়েই গেল তিতাস। আজকাল প্রোমোটাররা খারাপ জিনিসপত্র দিয়ে বাড়ি তৈরি করে, তারপর এই সব গন্ডগোল শুরু হয়। ঝুঁকে পড়ে ফাটলটার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করছিল তিতাস। তার মনে হল, ফাটলটা থেকে যেন একটা নীল আভা বেরোচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার তো! কোনওভাবে কি নীচের ফ্লোরের আলো আসছে ফাটল দিয়ে? তা হলে তো বাজে রকমের ফাটল ধরেছে। খুব বিরক্ত হয়ে প্রোমোটারকে ফোন করবে বলে উঠে দাঁড়াল তিতাস আর উঠেই দেখল, তার থেকে ঠিক এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়! সেই আশ্চর্য তেজোদ্দীপ্ত, প্রভাময় উপস্থিতিতে স্তম্ভিত হয়ে গেল তিতাস। তীব্র এক ভয় পাকে পাকে জড়িয়ে ধরতে লাগল তাকে। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সাবধান করল, খুব খারাপ কিছু একটা হতে চলেছে। খুব ভয়ানক কিছু হতে চলেছে। নিজের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে চিৎকার করে উঠল সে তারপর ছুটে গেল দরজার দিকে। কিন্তু বেরোতে পারল না, তার আগেই কোনও এক দৈব ইঙ্গিতে সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। তিতাস আছড়ে পড়ল দরজার ওপরেই। ধীরে ধীরে রাজকীয় লঘু চালে রত্নরাজি খচিত অলঙ্কারে ভূষিত অপূর্ব সেই নারীমূর্তি এগিয়ে এল তিতাসের দিকে। তার হাতে অদ্ভুতদর্শন এক দণ্ড। দণ্ডের ওপরে শোভা পাচ্ছে নীল রঙের এক অত্যুজ্জ্বল পাথর। তিতাসের মনে হল, এই নীল রংটা যেন পাথরের হৃদয় নিংড়ে বেরিয়ে আসছে। অস্ফুটে তিতাস বলে উঠল, লাপিস লাজুলি। এর আগে মাত্র একবারই তিতাস এই নারীমূর্তিকে দেখেছে। অমিয়র ব্যালকনিতে। আর বার দুয়েক তার উপস্থিতি অনুভব করেছে। কিন্তু চোখ খোলেনি। আগের বার বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কায় সম্ভবত এই নীল পাথর খেয়াল করেনি তিতাস। কিন্তু আজ এই পাষাণের হৃদয়ক্ষরা নীল রং দেখেই তিতাস চিনে ফেলল নারী মূর্তিকে আর তখনই নীল রঙের পাথরটিতে আলোর উদ্ভাসন হল। চোখ দুটো যেন পুড়ে গেল তিতাসের আর সেই দহনের মধ্যেই তিতাস দেখতে পেল সে তীব্রভাবে রমণ করছে অমিয়কে! দেখতে পেল, পল্লবের মেইল আইডি থেকে সে কুৎসিত সব মেইল পাঠাচ্ছে অপালাকে! শুনতে পেল, মিতুলকে সে বলছে, এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো মিতুল। মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিচ্ছে সে! কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই আচমকা এই সমস্ত রক্ত হিম করে দেওয়া দৃশ্যকল্প তার চোখের সামনে থেকে মুছে গেল। সে দেখতে পেল, সে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের ফাটলটার ঠিক সামনে। শুধু মাঝের এই সময়টুকুতে ফাটলটা বড় হয়েছে। এতটা বড় যে একটা মানুষ সেটার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু পড়ে গেলেই বা মানুষটা যাবে কোথায়? এই ফাটলের গভীরতা মাপার কোনও একক নেই। যেন আদি অনন্তকাল ধরে এই ফাটল গড়িয়ে গেছে শুধুই নীচের দিকে। অন্ধকারের দিকে।
আর কিছু ভাবার অবকাশ পেল না তিতাস, তার আগেই সেই নারীমূর্তি তাকে ঠেলে ফেলে দিল ফাটলের গভীর, গহীন, নীলাভ অন্ধকারে।
