৪
অজ্ঞান শান্তনুকে মন্দিরের ভেতর থেকে উদ্ধার করলেন ভাদুড়ি মশায়। সঙ্গে শান্তনুর মামাবাড়ির লোকেরা। মন্দিরের বাইরে এনে চোখে জলের ছিটে দিতেই প্রাথমিক ভাবে জ্ঞান ফিরে পেল শান্তনু এবং উদভ্রান্তের মতো বলল, ওই যে… ওই সেই ছায়ামূর্তি। আমায় নিতে এসেছে। আমায় নিতে এসেছে।
তার পরেই আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। শান্তনুকে ওর মামার কোলে শুইয়ে রেখে যত দ্রুত সম্ভব মন্দিরের ভেতরে ঢুকলেন ভাদুড়ি মশায়। আসলে দুপুর থেকেই শিবনাথ চক্রবর্তীর কথাগুলো তাঁর কানে বাজছিল। যদিও এই মন্দিরের মিথে তিনি বিশ্বাস করেননি তবু পৌত্রসম ছেলেটির ক্ষতির আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তাই বাড়ি ফিরতে গিয়েও সিদ্ধান্ত বদলে তিনি এসে পড়েছিলেন বউকালীবাড়ি মন্দিরে। শান্তনু যে অস্বাভাবিক ভয় পেয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকেই মনটা ভালো হয়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। বড় পবিত্র একটি সুগন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে আশপাশে। নিজে হাতে প্রদীপখানি ফের জ্বালালেন তিনি। সেই আলোয় মায়ের মুখখানি দেখে বড় শান্তি পেলেন। মা করালবদনা নন বরং মায়ের মুখে স্মিত হাসি। এ যে মায়ের শান্ত, স্নিগ্ধ রূপের প্রকাশ। বহুকাল ধরে আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক বিষয় নিয়ে চর্চা করছেন তিনি। কোনও জায়গায় গিয়ে এক মুহূর্তে বুঝতে পারেন জায়গাটির মধ্যে কোনও নেগেটিভিটি আছে কি না। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন এই মন্দিরে কোনও সমস্যা নেই। এমন পবিত্র জায়গায় কোনও সমস্যা থাকতে পারে না। তা হলে শান্তনু এত নিশ্চিত ভাবে ছায়ামূর্তির কথা বলছে কেন? মুহূর্তে একটা ভাবনা আলোড়িত করল ভাদুড়ি মশায়কে এবং তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে গোবিন্দ মুহুরিকে বললেন, গোবিন্দ তোমাদের গ্রামের পুরোহিত শিবনাথ চক্রবর্তীকে এখন কোথায় পাব?
ভাদুড়ি মশায়ের গলার স্বরে চমকে উঠল উপস্থিত জনতা। গোবিন্দ ভয়ে ভয়ে বলল, কেন ঠাকুরমশাই? ওনাকে দিয়ে কী হবে?
আহ! উল্টো প্রশ্ন না করে জবাব দাও। বিরক্তি ঝরে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের কণ্ঠে।
আজ্ঞে উনি তো এই সময় চণ্ডীমণ্ডপেই থাকেন।
এখুনি আমাকে সেখানে নিয়ে চলো। মৃত্যুঞ্জয়, আপনি শান্তনুকে নিয়ে বাড়ি যান। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আপনার বাড়ি আসছি।
দ্রুত এগিয়ে চললেন ভাদুড়ি মশায়। ক্রাচের সাহায্য নিতে না হলে বোধ হয় এতক্ষণে তিনি ছুটে চলে যেতেন।
গোবিন্দ মুহুরিকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুড়ি মশায় যখন চণ্ডীমণ্ডপে এসে পৌঁছলেন ততক্ষণে সন্ধ্যারতি সেরে ফেলেছেন শিবনাথ। ভাদুড়ি মশায়কে অমন ঝড়ের বেগে আসতে দেখে তিনি বেশ খানিকটা অবাক হলেন, ঠাকুরমশাই আপনি?
কথা না বাড়িয়ে জলদমন্দ্র স্বরে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
প্রশ্নটা শুনেই একটু থতিয়ে গেলেন শিবনাথ। তার পর গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি কি আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছেন?
না। আমি সামান্য একটা প্রশ্ন করেছি। আপনি তাকে জটিল করছেন কেন?
আপনার প্রশ্ন করার ধরন দেখেই জিগ্যেস করছি ঠাকুরমশাই। কী হয়েছে একটু খুলে বলবেন কি?
একটু চুপ করে থেকে ভাদুড়ি মশায় বললেন, শান্তনু কিছুক্ষণ আগে বউকালীবাড়ি মন্দিরে গেছিল এবং ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
কয়েক মুহূর্ত ভাদুড়ি মশায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শিবনাথ। তার পর হো হো করে হেসে উঠে বললেন, আপনার কী ধারণা আমি ভূত সেজে ছেলেটাকে ভয় দেখিয়েছি?
একেবারে সোজাসাপটা এই কথায় খানিকটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। কিন্তু তাঁকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কঠিন গলায় শিবনাথ বললেন, শুনুন ঠাকুরমশাই আমি বিশ্বাস করি বউকালীবাড়িতে কিছু সমস্যা আছে। আপনি আমাদের এলাকার মানুষ না, আপনি সে কথা বিশ্বাস নাই করতে পারেন। কিন্তু আমার কথাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্য আমি লুকিয়ে থেকে ছেলেটাকে ভয় দেখাব এতটাও হীন আমি নই। আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলতে পারি, আমি বিকেল থেকে এই মন্দিরেই ছিলাম। আপনার বিশ্বাস না হয় আপনি গ্রামের লোকেদের জিগ্যেস করে দেখতে পারেন। অবশ্য গ্রামের লোকেদের কথাতেও আপনার প্রত্যয় নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি বরং শান্তনুর মামিকে জিগ্যেস করুন। সে নিজেই শান্তনুর নামে পুজো দিতে এসেছিল। এই যে তার দেওয়া ডালা। দেখুন। দেখুন।
এই বলে ভাদুড়ি মশায়ের সামনে একটা পুজোর ডালা তুলে ধরলেন শিবনাথ। লজ্জিত বোধ করছিলেন ভাদুড়ি মশায়। এখানে ছুটে আসার আগে তাঁর একটু ভাবা উচিত ছিল। শিবনাথের কাছে কীভাবে ক্ষমা চাইবেন বুঝতে পারছিলেন না কিন্তু তখনই তাঁর চোখ আটকে গেল ডালার একটা বিশেষ জায়গায়। চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। বাসরঘরের ছিদ্রগুলির চরিত্র একই রকম। চোখের সামনেই থাকে অথচ অদ্ভুত অন্তরালবর্তী আচরণ। কিছুতেই দেখা যায় না। শান্তনুর গল্প শুনে শুরু থেকে যে খটকাটা লাগছিল সেটা যেন এক মুহূর্তেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে এল। তবে এবার আর হঠকারী হওয়া যাবে না। নিশ্চিত হতে হবে। শিবনাথের কাছে ক্ষমা চেয়ে দ্রুত পায়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন ভাদুড়ি মশায়। এখন তাঁকে একটা ফোন করতে হবে। যাদবপুরের কলেজের বর্তমান উপাচার্য অমিতাভ গুপ্তর সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। অমিতাভ তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করে। অনেকবার যাদবপুরের সেমিনারে নিমন্ত্রণ করেছে। একমাত্র অমিতাভই তাঁর সংশয় নিরসন করতে পারবে।
অমিতাভর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি একটি বিষয় জানতে চেয়েছেন। অমিতাভ জানিয়েছে, আধ ঘণ্টা পরে ফোন করবে। অমিতাভর ফোনের অপেক্ষা করতে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়। মনটা তেতো হয়ে গেছে তাঁর। তাঁর আশঙ্কা যদি সত্যি হয় তা হলে সেটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে। মিনিট কুড়ি কাটতে না কাটতেই ফোন করলেন অমিতাভ। অমিতাভর কথা শুনে ভুরু কুঁচকে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। অমিতাভকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখলেন তিনি। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মুহূর্তে বড় অসহায় বোধ করলেন। বরাবর দেখেছেন, তাঁর অনুমান অভ্রান্ত। কিন্তু এক্ষেত্রে যেন তা না হলেই তিনি খুশি হতেন। গোবিন্দ মুহুরিকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন শান্তনুর মামাবাড়ির উদ্দেশে।
* * *
ভাদুড়ি মশায়কে দেখে যেন খানিক বিরক্ত হল মৃত্যুঞ্জয়। শান্তনুর অবস্থা বিশেষ সুবিধের না। আবার জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে। ডাক্তার ডাকা হয়েছে। অনেকক্ষণ থেকেই মৃত্যুঞ্জয়ের মনে হচ্ছিল, ওই ভাদুড়ি মশায়ের কথা না শুনলেই ভালো হত। জিতু তো রীতিমতো রাগারাগি করছে। এমন একটা অবস্থায় ভাদুড়ি মশায়ের উপস্থিতি অনভিপ্রেত। তবু যথাসম্ভব সম্মান দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল, ঠাকুরমশাই আপনি? কিছু বলবেন?
ভেতরে ঢুকে এলেন ভাদুড়ি মশায়, বলব বলেই তো এলাম মৃত্যুঞ্জয়। আপনি হয়তো আমার ওপর রুষ্ট হয়েছেন। আমি বলেছিলাম মন্দিরে গেলে শান্তনুর ভয় কেটে যাবে। সে কথা ফলেনি। কিন্তু কেন ফলেনি সেটা বলতেই আমি এসেছি। আমি আপনার এবং আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।
অবাক হল মৃত্যুঞ্জয়। সে বুঝতে পারছে না ভাদুড়ি মশায় কেন একান্তে কথা বলতে চাইছেন?
ভাদুড়ি মশায় বললেন, বেশিক্ষণ সময় নেব না আমি।
এবার একটু ধাতস্থ হল মৃত্যুঞ্জয়। বলল, আমার স্ত্রী শান্তনুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। যা বলার আমাকেই বলুন।
স্মিত হাসলেন ভাদুড়ি মশায়, শুধু আপনাকে বললে হবে না। ওনাকেও লাগবে। কথাগুলো আপনাদের দু’জনেরই জানা দরকার।
একটু ভেবে মৃত্যুঞ্জয় বলল, ঠিক আছে। আপনি আমার ঘরে এসে বসুন। আমি মায়াকে ডাকছি।
ভাদুড়ি মশায়কে একটা ঘরে বসিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল স্ত্রী মায়াকে সঙ্গে নিয়ে। ভাদুড়ি মশায় বললেন, দরজাটা বন্ধ করে আমার সামনে বসুন আপনারা।
চাপা গলায় মৃত্যুঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে মায়া কথা বলে উঠল। তার কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে পড়ছে, কী ব্যাপার বলো তো? একে তো ওনার কথা শুনে এই কাণ্ড হল। এখন আবার কী তামাশা হচ্ছে? দরজা বন্ধ করার কী আছে?
নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ভাদুড়ি মশায় বললেন, দরজা বন্ধ করার দরকার আছে মা। কারণ এখন আমি যে কথাগুলো বলব সেগুলো হাটের কথা নয়। মাথা ঠান্ডা করে আমার কথাগুলো শুনুন। এতে শান্তনুর মঙ্গল হবে।
কয়েক মুহূর্ত ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে রইল মায়া। তার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। মৃত্যুঞ্জয় বসল ভাদুড়ি মশায়ের সামনে। মায়া বসল না। দাঁড়িয়ে রইল খাটের বাজু ধরে। গলা ঝেড়ে ভাদুড়ি মশায় বলতে শুরু করলেন, দেখুন, গুরুকৃপায় সামান্য কিছু বিদ্যা আমি আয়ত্ত করেছি। শান্তনুর কাছ থেকে সবটা শুনে প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল ও যে ভয় পাচ্ছে সবটাই ওর মনের ভুল। সে জন্যই আমি সন্ধেবেলায় ওকে একা মন্দিরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু ওকে এ কথা বলার পরে আপনাদের গ্রামের পুরোহিত শিবনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তিনি আমাকে বউকালীবাড়ি সম্পর্কে নানা ভয়ের গল্প শোনান এবং এও বলেন, যদি শান্তনুর কোনও ক্ষতি হয় তার জন্য আমিই দায়ী থাকব। শান্তনু আমার নাতনির সহপাঠী। আমাকে দাদু বলে ডেকেছে। শিবনাথের এই কথায় আমি একটু হলেও চিন্তায় পড়ে যাই এবং বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদল করে বউকালীবাড়ি মন্দিরে ছুটে যাই। যতক্ষণে আমি ওখানে গিয়ে পৌঁছই ততক্ষণে শান্তনু ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মন্দিরে ঢুকে মাকে দর্শন করে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে এ মন্দিরে কোনও অপশক্তি নেই।
চাপা অথচ খর গলায় মায়া বলে উঠল, দেখেই আপনি বুঝে গেলেন? এই যে এতদিন ধরে বউকালীবাড়ি নিয়ে এত কথা শুনি তা হলে সেসব মিথ্যে?
হ্যাঁ মিথ্যে, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রায় গর্জন করে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, সবটাই মানুষের কল্পনা ও বানানো গালগল্প।
ভাদুড়ি মশায়ের এই দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সহজ কথা নয়। মায়াও চোখ নামিয়ে নিল। একটু সময় নিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, তাই মন্দিরে ঢোকার পরেই আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে শান্তনুকে ভয় দেখিয়েছে সে মানুষ।
এ কথাটায় একসঙ্গে চমকে উঠল মৃত্যুঞ্জয় আর মায়া। মৃত্যুঞ্জয় বলল, এ আপনি কী বলছেন ঠাকুরমশাই? মানুষে ভয় দেখিয়েছে বাবুসোনাকে?
হ্যাঁ মৃত্যুঞ্জয়। শুধু আজ নয়, আপনার বাড়িতে যে রাতে শান্তনু ভয় পেয়েছিল সেটাও মানুষের কীর্তি।
রীতিমতো ঘাবড়ে গেল মৃত্যুঞ্জয়। অসহায় গলায় বলল, আপনি কী বলছেন আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ঠাকুরমশাই।
ম্লান হেসে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আপনার স্ত্রী কিন্তু সবটা বুঝতে পারছেন। ওনাকে জিগ্যেস করুন।
এ কথায় মায়া যেন জ্বলে উঠল। তীব্র কণ্ঠে বলল, কী আবোলতাবোল বকছেন আপনি? কী বুঝব আমি হ্যাঁ? কী বুঝব?
মায়ার চোখে চোখ রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, আপনিও বুঝতে পারছেন না? বেশ আমি বুঝিয়ে বলছি তবে। উঁহু মায়াদেবী চলে যাওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই। আমি না চাওয়া পর্যন্ত আপনি এ ঘর থেকে বেরোতে পারবেন না। বললাম না, গুরুকৃপায় সামান্য কিছু বিদ্যা আমি আয়ত্ত করেছি। আপনার ইন্দ্রিয়গুলি এখন আমার ইচ্ছাধীন। অতএব আমি যা বলছি চুপ করে শুনুন।
অবাক হয়ে মৃত্যুঞ্জয় দেখল, মায়া কেমন যেন কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু চোখ দু’টো বিস্ফারিত। ভয় পেয়ে গেল সে। হাত জোড় করে বলল, আপনি ওর সাথে কী করলেন ঠাকুরমশাই? ঠিক করে দিন ওকে। ঠিক করে দিন।
নরম গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমি খারাপ মানুষ নই মৃত্যুঞ্জয়বাবু। আপনার স্ত্রীর কোনও ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার নেই। কিন্তু আমি এখন যে কথাগুলো বলব সেগুলো শুনতে ওনার ভাল লাগবে না। তাই এই ব্যবস্থা। আমি যাওয়ার আগে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যাই হোক, যা বলছিলাম, শান্তনুকে ভয় দেখিয়েছে মানুষ। একজন নয়, দু’জন এই জঘন্য খেলার অংশীদার। আপনার স্ত্রী এবং আপনার ছেলে।
জলে পড়ে যাওয়া মানুষের মতো বড় বড় করে শ্বাস নিল মৃত্যুঞ্জয়। ভাদুড়ি মশায় বুঝতে পারছেন মৃত্যুঞ্জয় মনেপ্রাণে তাঁর কথা অবিশ্বাস করতে চাইছে কিন্তু মায়ার অবস্থা দেখে সে এক কঠিন দ্বন্দে পড়েছে। ইচ্ছে করেই মায়ার হস্তপদ বন্ধন করেছেন ভাদুড়ি মশায়। এটুকু আশ্চর্য না দেখালে তিনি মৃত্যুঞ্জয়কে সবটা বিশ্বাস করাতে পারতেন না। কোনও মানুষই নিজের স্ত্রী ও সন্তানের নামে খারাপ কথা শুনতে চায় না।
তিনি বলতে লাগলেন, আপনার স্ত্রী প্রথম থেকেই আপনার বোনের ছেলেকে হিংসে করেন। কেন করেন তা আমি জানি না। মানুষের মনোবৃত্তি বড় জটিল। কিন্তু দিনে দিনে এই হিংসে বাড়তে লাগল যখন দেখা গেল শান্তনু জিতুর চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো। সব জায়গায় শান্তনুর প্রশংসা হয়। আপনি, আপনার মা এবং আপনার ছোটভাই সকলেই শান্তনুকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। সেটা মায়াদেবীর ভালো লাগত না। ধীরে ধীরে জিতুর মনেও তিনি এই হিংসের বীজ বুনে দিলেন এবং জিতুকে বোঝাতে লাগলেন তাকে যে কোনও উপায়ে শান্তনুর সমকক্ষ হতে হবে। সেটার উপায় কী? না শান্তনু যে কলেজে পড়ে জিতুকেও সেখানে ভর্তি হতে হবে। সেই চেষ্টাও শুরু হল। জিতু শান্তনুর কাছে তালিম নিতে লাগল। কিন্তু সবার মেধা তো সমান নয়, জিতু যাদবপুরের প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হল না। জিতু যে যাদবপুরে পরীক্ষা দিয়েছে একথা কিন্তু আপনিও জানেন না। চান্স পেয়ে আপনাদের সবাইকে চমকে দিতে চেয়েছিল জিতু। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উপাচার্য অমিতাভ গুপ্তর সঙ্গে দেখা করবেন। কারা কারা এ বছর ইকোনমিক্সে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিল তার তালিকা পেয়ে যাবেন আপনি। জিতুর ভালো নাম আমি জানতাম না। সরকার পদবি এবং ঠিকানা দেখে নিশ্চিত হয়েছি। তা যাই হোক, যাদবপুরে ভর্তি হতে না পেরে শান্তনুর ওপর অসূয়া আরও বেড়ে গেল জিতুর। তাতে প্রতিনিয়ত ঘৃতাহুতি দিতে লাগলেন আপনার স্ত্রী। সন্তানের এই ব্যর্থতা উন্মাদপ্রায় করে তুলল তাঁকে। এর মধ্যেই কলেজের ছুটিতে শান্তনু আপনাদের এখানে এল এবং বউকালীবাড়ি মন্দির থেকে ফেরার পথে ভয় পেল। সেবার কিন্তু শান্তনু সত্যি ভয় পেয়েছিল। আর এই ভয় পাওয়াই আপনার স্ত্রী ও ছেলের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দিল। শান্তনু কী দেখে ভয় পেয়েছে সেটা জিতু জেনে নিল এবং আবার তাকে ভয় দেখাল। আপনার স্ত্রী অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আয় আয় বলে ডেকে উঠলেন। ভয় দেখিয়ে একটা মানুষের কতটা আর ক্ষতি করা যায়? কিন্তু হিংসে এমনই এক রোগ যা মানুষকে বিবেচনাহীন করে তোলে। যেকোনও ভাবে শান্তনুকে ব্যতিব্যস্ত করাই আপনার স্ত্রী ও জিতুর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। তাই আমি যখন শান্তনুকে মন্দিরে যাওয়ার নিদান দিলাম ওরা দু’জন হাতে চাঁদ পেল। কিন্তু এমন ভাবে বিষয়টাকে সাজাল যাতে কারও সন্দেহ না হয়। জিতু পুরোটা সময় আপনাদের সাথে বসে রইল এবং মায়াদেবী চণ্ডীতলায় পুজো দিতে গেলেন। ফলে মায়াদেবী যে বিলমাঠে যাননি তার পাকা অ্যালিবাই রইল। কিন্তু পুজো দিতে গিয়েই মায়াদেবী একটা ভুল করে ফেললেন। তিনি তাড়াহুড়ো করলেন। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ পুজো দেওয়া তো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের পুরোহিতকে নিজের মুখ দেখিয়ে অ্যালিবাই পাকা করা। ডালাটা মন্দিরে দিয়েই উনি বিলমাঠে ছুটলেন এবং শান্তনুকে ভয় দেখিয়ে আপনারা ফেরত আসার আগেই বাড়ি ফিরে এলেন। দরকারে আপনি মন্দিরের পূজারি শিবনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। আপনার স্ত্রী কখন মন্দির থেকে বেরিয়ে গেছেন সেই সময়টা পেয়ে যাবেন। আর আপনার মাকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারবেন মায়াদেবী কখন বাড়ি ফিরেছেন। আসলে মায়াদেবী ভাবতেই পারেননি কেউ তাঁকে সন্দেহ করতে পারে। সবটাই বউকালীবাড়ির মিথের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেবেন ভেবেছিলেন কিন্তু একটা ছোট্ট ভুল করে ফেললেন। প্রণামীতে একটা ছেঁড়া পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে দিলেন। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মানুষ যে পুজো দেয় তা যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু উনি তো সন্তানের ক্ষতি চেয়েছিলেন। তাই ডালাটাও সাজিয়েছিলেন দায়সারা ভাবে। ওনার মাথায় ঘুরছিল, কতক্ষণে বউকালীবাড়িতে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকবেন। যাই হোক আমি এবার উঠব। সত্য-মিথ্যা আপনার স্ত্রীর থেকে যাচাই করে নেবেন। আমি শান্তনুকে মিছিমিছি একটা তাবিজ দিয়ে দেব। তাবিজটা দেখে ও মনের জোর পাবে এবং সময়ের নিয়মে ওর এই ভয় কেটে যাবে। আসি।
উঠে দাঁড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে তখন জল। ধরা গলায় সে বলল, একটা কথা বলব ঠাকুরমশাই?
তার কাঁধে হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, ভয় নেই। একথা আমি কাউকে বলব না। শান্তনু মনে করে তার মামাবাড়ি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা। ওর এই বিশ্বাস আমি ভেঙে দেব না। আপনি বরং আপনার স্ত্রী ও ছেলেকে সামলে রাখবেন। মানুষ ভুল করে, কিন্তু তাকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়।
শান্তনু যে ঘরে আছে সে ঘরের দিকে এগিয়ে চললেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি বুঝতে পারছেন মায়া কাঁদছে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, মানুষ বড়ই জটিল প্রাণী। দেবতা কিংবা অপদেবতার সাধ্য নেই এতটা জটিলতা অন্তরে ধারণ করে।
