লোকনাথের প্রত্যাবর্তন – ১০

১০

জীবন বড় সহজ ব্যাপার নয়। তার অনেকরকম বাধ্যবাধকতা থাকে। প্রতিদিন অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙার পরে অফিস যেতে হবে ভাবলেই মানুষের মনে হয়, আহা রে! যদি সিকিমে পাহাড়ের কোলে আমার একটা হোমস্টে থাকত! হিম হিম ভোরবেলা উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখতে দেখতে গরম চায়ে চুমুক দেওয়া যেত! প্রতিদিনের এই অসহ্য অফিস, অফিস পলিটিক্স, বসের চোখরাঙানিকে তুড়ি মেরে পাহাড়ি ঝরনার জলে স্নান করা যেত অবিরাম… কিন্তু মনে হওয়া দিয়ে জীবন চলে না। মাঝখানে ঈশ্বরের অবতারের মতো নানা রূপে এসে হাজির হয় বাধ্যবাধকতা। মনে পড়ে যায়, দু’দিন পরে ইএমআই দিতে হবে। বসার ঘরের সোফাটা ভেঙে গেছে। কাঠের মিস্ত্রি বলেছে, ও সারানো যাবে না। নতুন নিয়ে নিন। মায়ের অ্যাজমাটা আবার বেড়েছে। বউ বলছে, শীতের ছুটিতে কেরালা যাবে। কিংবা গত তিন মাস প্রেমিকের চাকরি নেই। প্রতি মাসে তাকে হাতখরচ দিতে হচ্ছে। আগে যখন চাকরি ছিল তখন ছ’ টাকার ফ্লেক খেত। আজকাল সতেরো টাকার গোল্ডফ্লেক কিং সাইজ খাচ্ছে। অগত্যা স্নান সেরে অফিস যেতে হয়।

রোশনিও ঠিক এরকমই একটা বাধ্যবাধকতার জালে জড়িয়ে পড়েছে। গেনু বলে ছেলেটার কাছ থেকে শিশুমৃত্যু সম্পর্কে যা তথ্য পেয়েছে সেগুলোর কোনওটাই তার কাজে লাগানোর ইচ্ছে নেই। কারণ ওই ছেলেটার প্রতি এক তীব্র ঘৃণা বোধ করছে সে। এমন ইতর প্রকৃতির মানুষ অদ্যাবধি দেখেনি রোশনি। তার অফিসের বসও বুঝি ইতরতায় এর কাছে হেরে যাবে। এ কথাটা মাথায় আসতেই নিজেকে সংশোধন করল রোশনি। তুলনাটা ঠিক হল না। তার অফিসের বস একটা আধবুড়ো, অপদার্থ, অবদমিত কামসর্বস্ব মানুষ। কিন্তু আর যাই হোক লোকটা খুনি নয়। খুন করার জন্য এক অদ্ভুত উন্নাসিকতার অধিকারী হতে হয়। এই ‘মাদার নেচার’ তার স্তন্য দিয়ে তিলে তিলে একটা প্রাণ গড়ে তোলে। যেহেতু সেই অমৃতসুধাবিন্দু এই দুনিয়ার প্রতিটি প্রাণের আকর তাই প্রাণে প্রাণে এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ থাকে। সেই অদৃশ্য সংযোগের টানেই দলের একটি বাইসন চিতার কবলে পড়লে বাকিরা তাকে বাঁচাতে ছুটে যায়। প্রবল বর্ষণে ভিজতে থাকা পথকুকুরকে পরম মমতায় ঘরে তুলে আনে মানুষ। বিপদের দিনে অচেনা মানুষও অন্যের পাশে দাঁড়ায় নির্দ্বিধায়। এই পৃথিবীতে পারস্পরিক সহাবস্থানই স্বাভাবিক। সেখানে ওই অমোঘ সংযোগ ছিন্ন করে প্রাণের বিনাশ করার জন্য অন্য কোনও এক শক্তির প্রয়োজন। সে শক্তি সকলের থাকে না।

শুরু থেকেই ছেলেটার চাহনির মধ্যে একটা অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ্য করেছিল রোশনি। কেমন যেন একটা নিরুত্তাপ চাহনি। সে চাহনির দিকে তাকিয়ে বেশিক্ষণ কথা বলা যায় না। মনে হয় যেন একটা মৃতদেহ কথা বলছে। সে চাহনিতে লাশকাটা ঘরের ফরমালিনের গন্ধ। কিন্তু খবরটা পাওয়ার উত্তেজনায় রোশনি বিষয়টাকে পাত্তা দেয়নি। এখন তার মনে হচ্ছে ছেলেটার সাথে না গেলেই ভালো হত। তা হলে চোখের সামনে বেড়ালটাকে ওভাবে মরতে দেখতে হত না। ছেলেটার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো ব্যবহার করতে বারবার অনীহা হচ্ছিল রোশনির। মৃত বেড়ালটার মুখ মনে পড়লেই রাগে উষ্ণ হয়ে উঠছিল তার রক্তস্রোত। মনে হচ্ছিল, ছেলেটাকে আরও কয়েকটা থাপ্পড় মারলে বুঝি বা মনের একটু শান্তি হত। কিন্তু ওই যে বাধ্যবাধকতা। এই মুহূর্তে রোশনি চাকরিটা ছাড়তে পারবে না। তাছাড়া নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদও তো রয়েছে। তাই কলকাতায় ফিরেই সে ছুটে গেছিল অফিসের লাইব্রেরিতে।

অত্যন্ত গোছানো রোশনিদের অফিসের এই লাইব্রেরিটা। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকের কোনও তুলনা হয় না। যেদিন থেকে এই সংবাদপত্র প্রকাশিত শুরু করেছে সেদিন থেকে আজ অবধি রোজকার কাগজ জমানো আছে কম্পিউটারের মেমোরিতে। কয়েকটা ক্লিকেই অভীষ্ট সংবাদটি পড়ে ফেলা যায়। আট মাস আগে যখন জুনিয়র ডাক্তাররা ধর্মঘট ডেকেছিল সেই সময়টার কথা রোশনির মনে আছে। এ বিষয়ে কয়েকটা সম্পাদকীয় এডিট করতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু সেসময় তিতাস সেন নামটা তার নজরে আসেনি। আজ পুরনো খবরগুলো খুঁটিয়ে পড়তে গিয়ে অবাক হল সে। তাদের কাগজেই তিতাস সেনের ছবি দিয়ে একটা খবর ছাপা হয়েছিল। খবরের হেডিং ‘শিশুমৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ ডাক্তারের।’

এত জরুরি খবরটা সে খেয়ালই করেনি! অবশ্য খুব ছোট করে ছাপা হয়েছিল। খুব বেশি তথ্যও দেওয়া নেই। তবু সম্পাদকীয় যখন এডিট করতে হয়েছিল তখন এ-খবরটা মিস করা উচিত হয়নি।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে এসে কম্পিউটার অন করেছিল রোশনি। দ্রুত হাতে খুলে ফেলেছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন ডাক্তারদের লিস্ট। সেখান থেকে তিতাস সেনের ব্যাপারে ডিটেইলস বার করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।

তিতাস সেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী। এমবিবিএস-এর পরে এসএসকেএম থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। অত্যন্ত মেধাবী। কোনও বিদেশি ডিগ্রি নেই অথচ বিদেশি সব তাবড় তাবড় জার্নালে একের পর এক লেখা ছাপা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে কমবয়সি সফল শল্যচিকিৎসক হিসেবে বিপুল পরিচিতি রয়েছে। বিদেশ এবং দেশের প্রথম সারির প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে ডাক এলেও সে ডাকে সাড়া দেয়নি তিতাস। সরকারি হাসপাতালেই থাকতে চেয়েছে বরাবর। কিছুদিন বারাসাত জেলা হাসপাতালে ছিল। সেখান থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ট্রান্সফার হয়। সেখানেই এই পদত্যাগ।

একটু খটকা লেগেছিল রোশনির। মেয়েটা বিদেশি প্রাইভেট হাসপাতালের লুক্রেটিভ অফার ফিরিয়ে দিয়েছে। সাধারণ জনতার সেবা করতে চায় বলে সরকারি হাসপাতালে থেকে গেছে। সেখানে রোগীর আত্মীয়রা হাসপাতাল ভাঙচুর করেছে, জুনিয়র ডাক্তাররা আহত হয়েছে বলে সে চাকরি ছেড়ে দেবে? হ্যাঁ, ঘটনার সূত্রপাত একটি বাচ্চাছেলের মৃত্যু থেকেই কিন্তু এমন ঘটনা তো আমাদের রাজ্যে হামেশাই হয়। আজকাল শপথ নেওয়ার সময় ডাক্তারদের হাতে তুলো আর ডেটলের বোতল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বলে দেওয়া হয়, যে কোনও মুহূর্তে তারা প্যাঁদানি খেতে পারে। রোগীর আত্মীয়দের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের ওপর হাতের সুখ করার। এটাও চাকরির অঙ্গ।

রোশনি ঠিক করে ফেলেছিল, তিতাস সেনের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলবে। শিশুমৃত্যুর এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে গেলে তাকে তিতাসের সাহায্য নিতেই হবে। তিতাসের মতো ডাক্তারের ফোন নম্বর বা ঠিকানা জোগাড় করা কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু ইচ্ছে করেই ফোন করেনি রোশনি। ফোন করলে অনেকেই ধানাইপানাই করে। তার চেয়ে ফিজিক্যালি চলে যাওয়া অনেক ভালো। অতএব মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশনে নেমে রোশনি রিক্সাওয়ালাকে জিগ্যেস করেছিল, দাদা সুবোধ পার্ক চেনেন?

বিরস মুখে রিক্সাওয়ালা বলেছিল, সুবোধ পার্ক কেন? সবই চিনি। যাবেন কোথায়?

ডাক্তার তিতাস সেন।

কথা শেষ করতে দেয়নি রিক্সাওয়ালা। এক গাল হেসে বলেছিল, তিতাস দিদির বাড়ি যাবেন? আসুন আসুন।

তিতাসদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়াতেই মনটা ভালো হয়ে গেল রোশনির। যে বাড়ির দরজাটাই এমন সুন্দর সে বাড়ির ভেতরটা না জানি আরও কত সুন্দর হবে! অন্য ফ্ল্যাটের মতো এখানে দরজার পাশের দেওয়ালে কোনও প্রথাগত কলিং বেল নেই। তার বদলে ঝোলানো রয়েছে ভারী সুন্দর দেখতে একটা লোহার ঘণ্টা। দরজাটায় গ্রাফিটি করা। তার মাঝখানে কাঠের নেমপ্লেটে লেখা ‘পাগলাঝোরার বাসা’। থমকে গেল রোশনি। কে এই পাগলাঝোরা? তিতাসের ডাকনাম? কিন্তু কেউ কি নিজের ডাকনাম তাও আবার এমন কাব্যি করে নেমপ্লেট বানায়? উঁহু। বানায় না। ওই যে গান আছে না, ‘যার নাম তার মুখে ভালো লাগে না।’ তা হলে কে বানিয়েছে এই নেমপ্লেট? যে তিতাসকে অমন সুন্দর ডাকনাম দিয়েছে, সে? কে সে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টাটা নাড়াল রোশনি। ঢং ঢং করে একটা গম্ভীর শব্দ হল। কয়েক মুহূর্ত পরেই দরজাটা খুলে মুখ বাড়াল বছর তিরিশ-বত্রিশের একটা ছেলে। মাথায় এলোমেলো চুল, গালে দাড়ি, চোখে ভারী পাওয়ারের চশমা। এরকম চুল দাড়ি রোগা, লম্বা ছেলেদের মুখে ভালো মানায়। কিন্তু এ ছেলেটা লম্বা নয়। উচ্চতায় রোশনির মতোই হবে। সাড়ে পাঁচ ফুটের কিছু বেশি। আর রোগা তো কোনওমতেই নয়। রোশনি এবার একটা ‘কাকে চাই’ গোছের প্রশ্নের জন্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তাকে অবাক করে মিষ্টি হেসে ছেলেটা বলল, গুড ইভনিং।

একটু হকচকিয়ে গেল রোশনি। তারপর সামলে নিয়ে বলল, গুড ইভনিং। এটা ডাক্তার তিতাস সেনের বাড়ি তো? আমি দৈনিক নবজাগরণের রিপোর্টার রোশনি। ওনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

দরজা থেকে সরে দাঁড়াল ছেলেটা, আসুন। ভেতরে আসুন। আপনি বসুন। আমি তিতাসকে ডেকে দিচ্ছি।

বসার ঘরে দেওয়াল ঘেঁষে একটা বড় সোফা। সেটায় বসে চারদিকটা দেখছিল রোশনি। তার ধারণা মিথ্যে নয়। সত্যি খুব সুন্দর করে সাজানো বাড়িটা। বিত্তের অহংকার নেই কিন্তু ঘরের প্রতিটা কোণে রুচিবোধের ছাপ স্পষ্ট। সোফার পেছনের দেওয়ালে দুটো বড় ছবি। তিতাস এবং যে ছেলেটি দরজা খুলে দিল তার। তা হলে এই ছেলেটিই তিতাসের বয়ফ্রেন্ড?

তিতাস আধশোয়া হয়ে গান শুনছিল। পল্লব ঘরে ঢুকতেই কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে বলল, কে রে?

একজন রিপোর্টার এসেছে। তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।

অবাক হল তিতাস, রিপোর্টার? আমার সঙ্গে?

হুঁ। দেখিস না আজকাল ডাক্তাররা বেশির ভাগ সময় টিভিতেই বকবক করে।

বাজে বকিস না।

আচ্ছা ঠিক আছে। আগে গিয়ে তো দেখ। মেয়েটাকে বসিয়ে রেখেছি। বাচ্চা মেয়ে।

তুই কোনটায় বেশি আপ্লুত হলি? বাচ্চা দেখে না মেয়ে দেখে?

হেসে ফেলল পল্লব। ল্যাপটপের সামনে বসতে বসতে বলল, মেয়ে মাত্রই সুন্দর। এ ব্যাপারে ঈশ্বর একচোখো। উনি কোনও মেয়েকেই অসুন্দর করে বানাননি। কেউ কেউ একটু বেশি সুন্দর এই যা। এই মেয়েটা অবশ্য বেশি সুন্দরের দলে পড়বে।

ইঙ্গিতবহ গলা খাঁকরানি দিয়ে তিতাস এগিয়ে গেল বসার ঘরের দিকে। কিন্তু শোবার ঘর পেরিয়ে বসার ঘরে আসতেই এক মুহূর্তের জন্য যেন তিতাসের মাথাটা ঘুরে উঠল আর ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর গমগম করে উঠল সেই কণ্ঠস্বর, যা একাধারে অনির্বচনীয় সুরেলা ও সুরহীন কর্কশ। সেই কণ্ঠস্বর মিশে যেতে লাগল তিতাসের সমস্ত চৈতন্য জুড়ে। তিতাস বুঝতে পারল সে বলছে, কঠোর হও। নির্মম হও। নীতিজ্ঞান লোপ পাক। চৈতন্য উদ্ভাসিত হোক অন্ধকারে। আমায় ধারণ করো অন্তরে। বলো, ইযুজ্জু ইনান্না… ইযুজ্জু ইনান্না… ইযুজ্জু ইনান্না…

পায়ের আওয়াজে ঘুরে তাকাল রোশনি কিন্তু তাকিয়েই একটু ধাক্কা খেল। তিতাস এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মুখ দেখে তার মনের অবস্থা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা যায়। রোশনি বুঝতে পারল তিতাস অসম্ভব বিরক্ত। এই বিরক্তির কারণ কী? সে খবর না দিয়ে এসেছে বলে না কি অন্য কিছু?

রোশনি উঠে দাঁড়িয়ে তিতাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, হ্যালো ম্যাম। আমি….

কথা শেষ করতে না দিয়ে তিতাস খর গলায় বলল, শুনেছি। কী দরকার আপনার?

বেশ জোরালো একটা ধাক্কা খেল রোশনি। এই ডাক্তারটির ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। ছোটবেলা থেকে খারাপ ব্যবহার পেয়ে পেয়ে খারাপ ব্যবহারের প্রতি রোশনির একটা তীব্র বীতরাগ তৈরি হয়েছে। কেউ খারাপ ব্যবহার করলেই তার চুলের মুঠি ধরে দুটো থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করে। এখনও ইচ্ছে করছিল কিন্তু ওই যে বাধ্যবাধকতা। গলাটা যথাসম্ভব নরম করে রোশনি বলল, আসলে ম্যাম আপনার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই।

কথা বলতে চান তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেননি কেন? এভাবে উইদাউট অ্যাপয়েন্টমেন্ট কারও বাড়িতে যে আসা উচিত নয় আপনি জানেন না?

অত্যন্ত অপমানিত বোধ করল রোশনি। কিন্তু এখন অপমান গিলে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। অপমান খুবই তেতো খেতে। রোশনির গলার কাছটা তিতকুটে হয়ে গেল। সে বলল, জানি ম্যাম। আসলে ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট তাই।

বলুন কী ব্যাপার? সংক্ষেপে বলবেন।

রোশনি ব্যাগ থেকে ছোট একটা নোটবই আর কলম বার করল। বলল, ম্যাম আজ থেকে আট মাস আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তাররা রোগীর পরিবারের হাতে নিগৃহীত হয়। সে সময় আপনি পদত্যাগ করেন। আমি পুরনো খবর ঘেঁটে জানতে পেরেছি, এই গন্ডগোল শুরু হয়েছিল একটি শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। আপনি কি আমাকে বলবেন সেসময় আসলে কী হয়েছিল?

কথাগুলো বলতে বলতেই রোশনি খেয়াল করছিল, তিতাসের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু তিতাস যে এই ব্যবহারটা করবে সেটা রোশনি একেবারেই আশা করেনি। রোশনির কথা শেষ হওয়া মাত্রই তিতাস প্রায় চিৎকার করে বলল, না। বলব না। আর ফারদার যদি আপনি আমাকে বিরক্ত করেন তা হলে আপনাকে পুলিশে দেব। বেশ তো নায়ক-নায়িকাদের জামা-প্যান্ট অন্তর্বাস নিয়ে খবর করছিলেন। সেগুলোই করুন না। এসব সিরিয়াস ব্যাপারে কে ঢুকতে বলেছে আপনাকে? দু’ পয়সার সাংবাদিক সে এসেছে মেডিক্যাল কলেজের খবর করতে। গেট আউট।

এবার নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না রোশনি। বাঁকা হেসে বলল, যাচ্ছি ম্যাডাম। আমি দু’ পয়সার সাংবাদিক। আপনি দু’ কোটি টাকার ডাক্তার। তবে আপনি চাইলে আমার থেকে ভদ্রতা শিখতে পারেন। আমি ফিজ নেব না।

মুহূর্তে রোশনির গলার কাছটা খামচে ধরল তিতাস, কী বললি তুই? কী বললি?

আচমকা এই আক্রমণের জন্য রোশনি একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল সোফার ওপরে। তার পায়ের ধাক্কায় সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা একটা ফ্লাওয়ার ভাস মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। তিতাস তখনও তার কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে, তোর এত বড় সাহস আমায় ভদ্রতা শেখাতে চাস?

বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিতেই রোশনির মাথাটা আগুন হয়ে উঠল। এই অসভ্যতা বরদাস্ত করার কোনও মানে হয় না। হাঁটু দিয়ে তিতাসের পেটে একটা ধাক্কা মারতে যাবে তার আগেই ছুটে এল ছেলেটা। একটানে তিতাসকে সরিয়ে নিল রোশনির গায়ের ওপর থেকে, কী করছিস তিতাস? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

পল্লবের থেকে বাধা পেয়ে তিতাসের যেন আরও বেশি করে চেতনা লোপ পেল। পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, ছাড় আমাকে। ছাড় বলছি। ওকে আজ আমি শেষ করে দেব।

পল্লব কোনওদিনই তিতাসকে এতটা হিংস্র হতে দেখেনি। কোনওমতে তিতাসকে টানতে টানতে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল বাইরে থেকে। দরজার ওপারে তিতাস তখন অবরুদ্ধ ক্রোধে চিৎকার করছে। দড়াম দড়াম করে লাথি মারছে দরজায়। পল্লব বুঝতেই পারল না, মেয়েটা কী এমন বলল যাতে তিতাস এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। সে এগিয়ে এসে হাতজোড় করে বলল, তিতাসের ব্যবহারের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আপনি এখন যান প্লিজ।

কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এল রোশনি। মুডটা অত্যন্ত বিগড়ে আছে। আজ দিনটাই খারাপ। সকাল থেকে একটার পর একটা অসভ্য ইতর মানুষের সাথে কথা বলতে হচ্ছে। তিতাসের বয়ফ্রেন্ড ছেলেটির ব্যবহার তো বেশ ভালো। তিতাসের মতো মেয়ের সঙ্গে থাকে কী করে?

একটা উবার ডেকে ফেলল রোশনি। এখন আর অটো বা রিক্সা ধরার এনার্জি নেই। এখান থেকে তার ভাড়ার ফ্ল্যাটটা কাছেই।

একশো তিরিশ টাকা ভাড়া নিল উবার। রোশনির ফ্ল্যাটটা একটা গলির মধ্যে। সেখানে গাড়ি ঢোকে না। বড় রাস্তায় নেমে মিনিট তিনেক হাঁটতে হয়। গলফ ক্লাব রোডের এই দিকটা একেবারেই রেসিডেন্সিয়াল এলাকা। সন্ধের পর রাস্তাঘাটে লোকজন বিশেষ থাকে না। নাইট ডিউটির দিনগুলোতে তো বাড়ি ফিরতে বেশ গা ছমছম করে। এখন যদিও ন’টা বাজে তবু রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এক-আধটা বাইক আর গাড়ি হুস করে চলে যাচ্ছে। লম্বা পিচের রাস্তাটা চলে গেছে অনেক দূরে। রাতের আলোয় রাস্তাটাকেও কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির গলির দিকে পা বাড়াল রোশনি।

রোশনি গলিতে ঢুকতেই রাস্তার উল্টোদিকের গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা হুড পরা অবয়ব। কিছুটা দূরত্ব রেখে সে রোশনির পিছু নিল। একটা ল্যাম্প পোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে চিনে নিল রোশনির ফ্ল্যাটটা। রোশনি ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর সে দু’ পা এগিয়ে এল সামনের দিকে। মাথার ওপর থেকে সরিয়ে দিল হুড। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল সরিতের ঠান্ডা চোখ দুটো।