১
গাড়ির জানলায় মাথা হেলিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তিতাস কী একটা গান গুনগুন করছে। পল্লব কান খাড়া করে শুনল, তিতাস গাইছে, ‘ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য মাইটি জাঙ্গল, দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট/ ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য কোয়াইট জাঙ্গল, দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট…’
মনটা বড় ভালো হয়ে গেল পল্লবের। অনেকদিন পর তিতাস আবার গান গাইছে।
শেষ ছ’মাস খুব খারাপ কেটেছে। গান গাওয়া তো দূরের কথা, তিতাস কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল প্রায়। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করত না। দরজা বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকত ঘরে। অনেক সাধ্যসাধনা করে যদি বা ঘরের বাইরে বার করা যেত তাও ছেঁড়া ছেঁড়া দু’-চারটে কথা বলেই সে চুপ করে যেত। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত দেওয়াল বা সিলিং-এর দিকে আর চোখ দু’টো ভরে উঠত জলে। গাল বেয়ে সে জল টপ টপ করে ঝরে পড়ত হাতের পাতায়। সেদিকে খেয়াল থাকত না তার। পাশে এসে বসত পল্লব। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলত, কেন এমন করছিস তিতাস? ওগুলো অ্যাক্সিডেন্ট। অ্যাক্সিডেন্ট কি মানুষের জীবনে হয় না? তা বলে সেটা নিয়ে এভাবে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে হবে? তুই আস্তে আস্তে আবার কাজ শুরু কর।
জলে ভরা চোখ নিয়ে পল্লবের দিকে তাকাত তিতাস। বলত, অ্যাক্সিডেন্ট একবার হতে পারে। পর™র দু’বার নয়। আমি ডাক্তারিটা জানি না পল্লব। প্লিজ আমাকে কনভিন্স করতে আসিস না।
চুপ করে যেত পল্লব। তিতাসের অবস্থা দেখে তারও খুব কান্না পেত। সে তো তিতাসকে এই ভাবে দেখে অভ্যস্ত নয়। তিতাস মানেই প্রাণ, তিতাস মানেই গান। যে বন্যার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব জড়তা। যে মিতুলকে উদ্ধার করার জন্য প্রাণ অবধি বাজি রাখতে পারে! সেই তিতাস কি না এই ভাবে গুটিয়ে যাচ্ছে নিজের ভেতরে! নিয়ত আত্মধিক্কারে যন্ত্রণা দিচ্ছে নিজেকে! এ কি সহ্য করা যায়? অসহায় হয়ে সঞ্জয়কে ফোন করত পল্লব কিন্তু সঞ্জয়ও কোনও আশার কথা শোনাতে পারত না। সেও তো তিতাসকে বোঝানোর কম চেষ্টা করেনি। আর শুধু সঞ্জয়ই বা কেন, অমিয়, দীপক পাল, তিতাসের বাবা-মা, শিক্ষকেরা এমনকী ভাদুড়ি মশায় অবধি তিতাসকে বহুবার বুঝিয়েছেন। তাতেও কাজ হয়নি। তিতাস নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। সে আর ডাক্তারি করবে না। চাকরি থেকে রিজাইন করেছে এমনকী নিজের ডাক্তারি লাইসেন্সটা অবধি ছিঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিল একদিন। অনেক কষ্টে পল্লব তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছে।
ঘটনার সূত্রপাত মাস আটেক আগে। তিতাস ততদিনে বারাসাত জেলা হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জয়েন করেছে। সেখানেই অদ্ভুত এক রোগ নিয়ে ভর্তি হল মোহর নামে একটি বাচ্চা মেয়ে। গার্ডেন হাই-তে ক্লাস টু-তে পড়ে। ডাকনাম বুবু।
বুবুর দাঁত পড়ে যাচ্ছিল। তা এই বয়েসের বাচ্চাদের দুধে দাঁত পড়ে নতুন দাঁত উঠবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপারটা হল, বুবুর পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। খুব অবাক হয়েছিল বুবু। এক-একদিন ঘুম থেকে উঠে সে দেখত, তার একটা দাঁত নেই। কিন্তু সেটা কোথায় যে গেল, কিছুতেই খুঁজে পেত না। বুবুর বাড়ির লোকেরা হাসাহাসি করত, সত্যি বোধ হয় ইঁদুরে দাঁত নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু কিছুদিন পর ব্যাপারটা আর মজার জায়গায় রইল না। মেয়ের দাঁত পড়ছে নিয়মিত, নতুন দাঁতও গজাচ্ছে কিন্তু পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো যাচ্ছে কোথায়? বুবুর একটাই উত্তর, সে কিছু জানে না। ঘুম থেকে উঠে দেখেছে, দাঁত ভ্যানিশ। বুবুর মা-বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এর মধ্যেই শুরু হল বুবুর পেটে ব্যথা। সে এমন ব্যথা ছোট্ট মেয়েটার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তাকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে আসা হল। পরীক্ষা করে দেখা গেল অদ্ভুত কাণ্ড! বুবুর পাকস্থলী এবং অন্ত্র জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট দাঁত! তাদের আঘাতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে ক্রমাগত।
মেডিক্যাল বোর্ড বসল রাতারাতি। ডাক্তাররা সিদ্ধান্তে এলেন, ঘুমের মধ্যেই বুবুর দাঁত পড়ে যায় এবং সেগুলো ঘুমের ঘোরেই গিলে ফেলে সে। তাই দাঁতগুলো জমা হয়েছে পাকস্থলীতে আর অন্ত্রে। তবে অন্য একটা ব্যাপারে আশঙ্কিত হলেন তাঁরা। পাক প্রক্রিয়ায় দাঁতের ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে গিয়ে দাঁতের আকার ছোট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে দাঁতগুলির আকার বেড়েছে। বহু জার্নাল ঘাঁটাঘাঁটি করেও এমন অদ্ভুত রোগের দ্বিতীয় কোনও নজির পেলেন না ডাক্তারেরা। চিকিৎসা পদ্ধতি কী হবে তাই নিয়েও ধন্দে পড়লেন তাঁরা। তখনই মেডিক্যাল বোর্ডের কনিষ্ঠতম সদস্যা তিতাস বলে উঠেছিল, আমি কিছু বলতে চাই স্যার। আমার মনে হয়, কীভাবে মেয়েটির এই দাঁত পড়া ও গিলে ফেলা আটকানো যায় সেসব নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। এই মুহূর্তে মেয়েটির যা কন্ডিশন তাতে অপারেট করে আগে ওর পেট থেকে দাঁতগুলো বার করে ফেলা দরকার।
প্রবীণ চিকিৎসকেরা সায় দিলেন তিতাসের কথায়। কিন্তু বড়ই জটিল এই অস্ত্রোপচার। অন্ত্র এবং পাকস্থলীর দুরূহ কোণে গেঁথে আছে দাঁতগুলি। সেখান থেকে তাদের তুলে আনা বড় সহজ কথা নয়। তিনজন শল্যচিকিৎসকের টিম তৈরি হল। যে টিমে সেকেন্ড ইন কম্যান্ড তিতাস।
অপারেশনের কথা শুনে ভয়ে এতটুকু হয়ে গেছিল ছোট্ট মেয়েটা। তার নরম হাত দু’টো নিজের হাতে নিয়ে তিতাস বলেছিল, কোনও ভয় নেই বুবু। তোমার এত্তটুকু ব্যথা লাগবে না।
ডাগর চোখ দু’টি তুলে বুবু বলেছিল, প্রমিস?
তার চুল ঘেঁটে দিয়েছিল তিতাস, প্রমিস।
না। সে প্রমিস রাখতে পারেনি তিতাস। প্রায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশনের পর বুবুর পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে দাঁতগুলি বার করতে সক্ষম হয়েছিল তিন চিকিৎসকের দলটি কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটে গেছিল সেই রাতেই। ঘুমের ঘোরে আবার একটি দাঁত গিলে ফেলেছিল বুবু এবং সেই দাঁতটি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল তার পাকস্থলীর অন্তর্গাত্রের কাঁচা সেলাইগুলি। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চলে যেতে হয়েছিল বুবুকে।
মনমরা হয়ে পড়েছিল তিতাস। একা থাকলেই বুবুর মুখটা ভেসে উঠত চোখের সামনে। ছোট্ট মেয়েটিকে দেওয়া কথা রাখতে না পারার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হত সে। যদিও বা কিছুদিন পর তিতাস সামলে উঠেছিল খানিকটা কিন্তু তার পরেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। একই রোগ নিয়ে ভর্তি হল ময়ূখ নামে একটি বাচ্চা ছেলে। এবারে তিতাস যেটা করেছিল, প্রথমেই অ্যালুমিনিয়াম পাত দিয়ে সিল করে দিয়েছিল ছেলেটির দুটো মাড়ি। অপারেশন সাকসেসফুলও হয়েছিল। চিকিৎসকেরা ভেবে চলেছিলেন, কীভাবে দাঁত পড়া নিশ্চিত ভাবে আটকানো যায়। ছেলেটি দ্রুত সুস্থও হয়ে উঠছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। লোহার বাসরের ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ল কালনাগিনী। ছেলেটিকে খাওয়ানোর সময় অ্যালুমিনিয়াম পাত খুলে নিতে বলেছিল তিতাস আর সেখানেই ভুলটা হয়ে গেল। খাবারের সাথেই একটা দাঁত গিলে ফেলল ছেলেটি এবং একই ভাবে পুরনো ক্ষতগুলিকে খুঁচিয়ে তুলল সেই ঘাতক দাঁতটি।
কিন্তু এখানেই শেষ হল না ব্যাপারটা। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এনে হাসপাতালের ডাক্তারদের ওপর চড়াও হল ছেলেটির পরিবারের লোকজন। তারা যথেচ্ছ ভাবে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করল এবং তাদের মারে তিনজন জুনিয়র ডাক্তার জখম হলেন। একজনের অবস্থা তো রীতিমতো আশঙ্কাজনক। রাজ্য জুড়ে ধর্মঘট ঘোষণা করলেন জুনিয়র ডাক্তারেরা। বিরাট এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল চিকিৎসা পরিষেবা। শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ধর্মঘট উঠল বটে কিন্তু এই গোটা ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে রিজাইন করল তিতাস। হাজার অনুরোধ-উপরোধেও তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ানো গেল না। আর এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হল তিতাসের একলা যাপন। নিজেকে শিশু দু’টির হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলল সে। ভয়ানক এক ডিপ্রেশন গ্রাস করল তাকে।
একটা সময় পল্লব বেশ বুঝতে পারছিল, আর কিছুদিন এভাবে চললে তিতাসকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে উঠবে কিন্তু এই সমস্যার কোনও সমাধানও পাচ্ছিল না। তখনই তাকে বুদ্ধিটা দিয়েছিল অপালা। ভাদুড়ি মশায়ের নাতনি। মিতুল উদ্ধারের পর থেকেই অপালার সঙ্গে ভারী বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওদের। আমেরিকায় ফিরে গেলেও অপালা নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে ওদের সঙ্গে এবং গত পুজোয় সে দেশে এসেছিল। পুরো পুজোটাই প্রায় ওদের সঙ্গে কাটিয়েছে।
একদিন কনফারেন্স কলে অমিয় আর সঞ্জয়ের সঙ্গে তিতাসকে নিয়ে কথা বলছিল পল্লব। সে কলে অপালাও ছিল। হঠাতই সম্পূর্ণ এক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিল অপালা। বলেছিল, আচ্ছা পল্লব, তোমার কী মনে হয়, তিতাস কী দেখে তোমার প্রেমে পড়েছিল?
ভারী হকচকিয়ে গেছিল পল্লব। বলেছিল, হঠাৎ এ প্রশ্ন? আমাদের তো কথা হচ্ছিল, তিতাস কাউন্সেলিং করাতে চাইছে না, সেই নিয়ে। তার সাথে এর কী সম্পর্ক?
অপালা বলেছিল, দেখো, সরাসরি হয়তো সম্পর্ক নেই কিন্তু আমি অন্য একটা দিক থেকে বিষয়টা ভাবতে চাইছি। আমি তোমাদের দু’জনের কেমিস্ট্রি দেখেছি। ইটস বিউটিফুল। তিতাস যে তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু যেকোনও ভালোবাসার পেছনেই একটা প্রাইম ফ্যাক্টর থাকে। সেটা খুব পাওয়ারফুল হয়। ইট ক্যান বি এনিথিং। যেমন লুকস, পারসোনালিটি, উইট, ক্রিয়েটিভিটি, ইভন হাউ সামওয়ান পারফর্মস ইন বেড… সেটাও একটা ক্রাইটেরিয়া হতে পারে। তোমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কী? তুমি কেন তিতাসের প্রেমে পড়েছিলে সেটা এই মুহূর্তে ইমমেটিরিয়াল। তিতাসের তোমার প্রতি ভালোবাসার কারণটা বলো। আই ওয়ান্ট টু নো।
একটু থমকে গিয়েছিল পল্লব। সে জানে, প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের আর মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গিগত একটা বিরাট পার্থক্য আছে। আর তার জন্য দায়ী হরমোন। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রেমে পড়াটা অনেক বেশি চাক্ষুষ। ছেলেরা মেয়েদের বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে উত্তেজিত হয়। মেয়েটিকে কামনা করে কিন্তু উল্টোদিকে মেয়েদের প্রেমে পড়া অনেক বেশি বৌদ্ধিক। সম্পর্কের শুরুতেই একটি ছেলে একটি মেয়েকে শারীরিক ভাবে চাইলেও মেয়েটির এই চাহিদা তৈরি হতে সময় লাগে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় কিন্তু সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয়ে যায় বলে কেউ তো আর আকাশের রং লাল বলে না। পল্লবও তিতাসের প্রেমে পড়েছিল তিতাসকে দেখেই। গানটা ছিল ‘এক্সট্রা চিজ’। অ্যাডেড ফ্যাক্টর। আজও চোখ বুজলে পল্লব দেখতে পায় মিলিউয়ের স্টেজে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মাইক হাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটা লম্বা ছিপছিপে শ্যামলা মেয়ে। কোঁকড়ানো চুলগুলোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তার হলুদ ব্যান্ডানা। যদিও সানগ্লাসে ঢাকা চোখ তবু সে চোখের দিকে যে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাবে না তখনই বুঝেছিল পল্লব। সেই মুহূর্ত থেকেই সে তিতাসের প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিল কিন্তু পল্লবের প্রেমে পড়তে সময় লেগেছিল তিতাসের। পল্লবের সাথে সে কথাও বলত খুব কম। তখনও স্মার্টফোনের যুগ আসেনি। দিনে একশোটা করে মেসেজ ফ্রি থাকত। সেই একশোটা মেসেজের সবক’টাই পল্লব তিতাসের পেছনে খরচ করত। উত্তর পেত সাকুল্যে দশটা। পল্লবের একটা সমস্যা আছে। সে বেশিক্ষণ সাধারণ কথা বলতে পারে না। কয়েকটা সাধারণ কথার পর থেকেই তার কথায় কেমন একটা ‘শরীর শরীর’ গন্ধ বেরোয়। পল্লব খেয়াল করে দেখেছিল, এই সুগন্ধী কথাগুলো তিতাস এড়িয়ে যায়। কোনও উত্তর দেয় না। একদিন খুব রাগ ধরে গেছিল পল্লবের। সোজা মেসেজ করেছিল, তুই রেসিপ্রোকেট করিস না কেন বল তো?
তিতাস উত্তর দিয়েছিল, কেন করব বল তো? তুই আমার কে হোস?
পল্লবের আহত পৌরুষ তার শিল্পীসত্তার ঘেটি ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো গলগল করে বেরিয়ে এসেছিল চার লাইন একটা কবিতা। সেটাই সে পাঠিয়ে দিয়েছিল তিতাসকে। যথারীতি সে কবিতারও কোনও উত্তর দেয়নি তিতাস কিন্তু পরের দিন বিকেলে হুট করে হাজির হয়েছিল প্রেসিডেন্সিতে।
তখন সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে। উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তারাগুলি। পাখিদের ঘরে ফেরা শেষ। একটা-দু’টো করে জ্বলে উঠছে প্রেসিডেন্সি কলেজের সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পগুলো। সোডিয়ামের হলুদ আলো বড় খারাপ জিনিস। যখন তখন মায়াকাজল পরিয়ে দেয় চোখে। বিভ্রম সৃষ্টি হয়। এ আলো পৃথিবীর আলো নয়। সেই অপার্থিব আলোতে বসে কথা বলতে বলতেই আচমকা পল্লবকে চুমু খেয়েছিল তিতাস। কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছিল পল্লব। তার মনে হচ্ছিল সে অনেক উঁচু একটা নাগরদোলায় বসে আছে আর সেটা হু হু করে নেমে আসছে নীচের দিকে। ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে তলপেটের ভেতরটা। পল্লবের নীচের ঠোঁটটা জ্বালা করছিল। উঠে দাঁড়িয়েছিল তিতাস। চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, এমনিতে আমি মোটা ছেলে বিশেষ পছন্দ করি না কিন্তু বড্ড ভালো লিখিস তুই। অগত্যা।
পল্লব বলল, তিতাস আমার লেখা দেখে প্রেমে পড়েছিল। আর তিতাস ছিল বলেই আমি লেখালিখিটাকে জীবিকা করতে পেরেছি। না হলে হয়তো অ্যাদ্দিনে কোনও কলেজে চর্যাপদ পড়াতে পড়াতে নিজেই শিলালিপি হয়ে যেতাম।
লাফিয়ে উঠেছিল অপালা, ওয়ান্ডারফুল। প্লিজ ইউজ দিস টুল।
পল্লব কিছু বলার আগেই সঞ্জয় অবাক হয়ে বলেছিল, কিন্তু কীভাবে?
অপালা বলেছিল, দেখো, তিতাসের মন ভালো করার জন্য ওর যা যা ভালো লাগে সেসবই তো আমরা এর মধ্যেই ট্রাই করে ফেলেছি। কাজ হয়নি। তিতাস ডাক্তারও দেখাতে চাইছে না। তাই এখন এই একটা রাস্তা খোলা আছে। কনসাশে বা সাবকনসাশে পল্লবের লেখালিখির প্রতি তিতাসের একটা দুর্বলতা থাকবেই। সো পল্লব, ইউ ক্যান রাইট সামথিং যাতে তিতাসকে ইনভলভ করা যায়। আমার মনে হয় ইট উইল ওয়ার্ক।
কথাটা মনে ধরেছিল পল্লবের এবং বছর দুয়েক আগে দীপক পালের মেয়ে মিতুলকে উদ্ধার করা নিয়ে যে নানা কাণ্ডকারখানা হয়েছিল তাই উপন্যাস আকারে লিখতে শুরু করেছিল। একটা করে পর্ব লিখত আর তিতাসকে পড়ে শোনাত। ঘটনার পাত্রপাত্রীদের অনুমতি নিয়ে সবার আসল নামই ব্যবহার করছিল লেখায়। প্রথম প্রথম তিতাস উৎসাহ দেখাত না কিন্তু ধীরে ধীরে সেও উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে গা ভাসাতে শুরু করল। স্থান কাল লজিকের ত্রুটি শুধরে দিতে শুরু করল। লেখা শেষ হওয়ার পরে নিজেই প্রুফ দেখে দিল, প্রচ্ছদ নিয়ে প্রচ্ছদ শিল্পীর সঙ্গে ঝামেলা করল এবং বই প্রকাশের দিন নিজেই সেজেগুজে পল্লবকে ঠেলে তুলল ঘুম থেকে, ওঠ। আর কত ঘুমোবি? দেরি হয়ে যাবে তো এবার।
কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তিতাসের দিকে তাকিয়েছিল পল্লব তার পর তাকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেছিল। কেঁদে ফেলেছিল তিতাসও। পল্লবের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, আই অ্যাম সরি। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি এই ক’দিনে।
সেদিনের পর থেকেই তিতাস স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল, আর আজ এত দিনে এই প্রথমবার গান গেয়ে উঠল। পল্লব যে আনন্দিত হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
পল্লব আর তিতাস আজ বারাসাত যাচ্ছে। মিতুলের আজ জন্মদিন। আজ আর ফিরবে না ওরা, অমিয়র ফ্ল্যাটেই থেকে যাবে। বেশ একটা ছুটি কাটানো হবে। তাই সকাল সকাল দু’জনে বেরিয়ে পড়েছে বারাসাতের উদ্দেশে। গাড়ি এখন বাইপাসের ওপর। পল্লব শুনল, তিতাস গাইছে, ‘নিয়ার দ্য ভিলেজ, দ্য পিসফুল ভিলেজ/ দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট/ নিয়ার দ্য ভিলেজ, দ্য কোয়াইট ভিলেজ/ দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট…’
পল্লব হেসে বলল, হাকুনা মাতাতা।
তিতাসও ঘাড় ঘুরিয়ে হাসল, হাকুনা মাতাতা।
কী ব্যাপার? হঠাৎ লায়ন কিং?
কাল একটা সিংহের স্বপ্ন দেখেছি বুঝলি?
পল্লব গম্ভীর হয়ে বলল, স্বপ্নে আমার বদলে অন্য পুরুষ আসছে। ভালো লক্ষণ নয়।
তিতাস হেসে ফেলল, হ্যাট গাধা।
পল্লব বলল, সিংহ থেকে গাধা?
আরে শোন না, স্বপ্নটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল।
কীরকম?
তিতাস বলতে শুরু করল, আমি প্রথমে একটা মরুভূমি মতো জায়গা দেখলাম জানিস? না, ঠিক মরুভূমি না, বালিয়াড়ি বলা ভালো। সেখানে একটা মন্দির। অদ্ভুত স্ট্রাকচার মন্দিরটার। এমন আমি আগে দেখিনি।
তার পর?
মন্দিরটা একদম ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। শুধু শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। এমন সময় মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বিশাল চেহারার সিংহ। বাদামি কেশর কাঁধ ছাপিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। বিশাল বলিষ্ঠ থাবা। কী মাসল! সাচ আ ম্যানলি বিস্ট।
পল্লব মুখ বাঁকাল, কী নির্লজ্জের মতো ঝাড়ি মারছিস সিংহটাকে!
বেশ করছি, তারপর শোন না কী হল…
কথাটা শেষ করতে পারল না তিতাস তার আগেই প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি খেল সে। সিট বেল্ট বাঁধা না থাকলে মাথাটা এতক্ষণে উইন্ডশিল্ডে ঠুকে যেত। রিফ্লেক্সে একটা চিৎকার করে উঠল সে। তার পরেই পল্লবের দিকে ঘুরে দেখল, বিস্ফারিত চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে পল্লব থরথর করে কাঁপছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। রাস্তার আশপাশ থেকে হইহই করে ছুটে এল লোকজন। একটু ধাতস্থ হয়ে পল্লব আর তিতাসও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।
রাস্তার পাশে একটা কম বয়সি ছেলে কাত হয়ে পড়ে আছে। ছাব্বিশ- সাতাশ বছর বয়েস হবে। লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে চেহারা। কপাল ফেটে রক্ত বেরচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে জ্ঞান নেই। তার সাইকেলটা পড়ে আছে উল্টোদিকে। গাড়ির ধাক্কায় পেছনের চাকাটা একেবারে তুবড়ে গেছে। লোকজন রে রে করে উঠল। এই ধরনের দুর্ঘটনায় সব দোষ গিয়ে পড়ে তুলনায় বড় আকারের গাড়ির চালকের ওপর। লোকে এমন একটা হাবভাব করে যেন, আহা! ও তো ছোট গাড়ি! সাইকেল কিংবা বাইক! ও কি অতশত বোঝে? তুমি বড় গাড়ি, তোমার একটা দায়িত্ব নেই?
এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হল। পল্লব কাউকে বোঝাতেই পারল না, সে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারেনি। সে খুব ধীরে সুস্থেই চালাচ্ছিল। এই ছেলেটি যেন নিজে থেকেই গাড়ির সামনে চলে এল সাইকেল নিয়ে! যেন অপেক্ষা করছিল, কখন গাড়ি আসবে আর সে ঝাঁপ দেবে!
হাওয়া গরম হয়ে উঠল। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে তিতাস এগিয়ে এল। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলল, আপনারা উত্তেজিত হবেন না। আমরা ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ওর চিকিৎসার খরচ আমাদের। ওকে একটু গাড়িতে তুলে দিতে হেল্প করুন।
লোকজন ছেলেটিকে গাড়িতে তুলে দিল। ছেলেটির মাথা কোলে নিয়ে পেছনের সিটে বসল তিতাস। একজন সহৃদয় ভদ্রলোকও এগিয়ে এলেন। বললেন, চলুন, আমিও যাচ্ছি আপনাদের সঙ্গে।
এই ডামাডোলে স্বপ্নের শেষটুকু আর বলা হল না তিতাসের। এদিকে পল্লব সবে গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা লোফার টাইপের ছেলে বলে উঠল, ট্রিটমেন্টের খরচ তো দেবেন ম্যাডাম, কিন্তু সাইকেলের দামটা?
চড়াং করে মাথাটা গরম হয়ে গেল পল্লবের। স্পিড তুলতে তুলতে সে বলল, তুই সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করিস। ফেরার পথে তোকে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারব। তখন দু’টোর দাম একসাথে দিয়ে দেব।
এই কঠিন পরিস্থিতিতেও পল্লবের উত্তরে ফিক করে হেসে ফেলল তিতাস আর হাসতে গিয়ে খেয়াল করল না, কোলে শুয়ে থাকা আহত ছেলেটি স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে আঙুলের ফাঁক থেকে একটা ব্লেড বার করে আনল সে এবং সবার অলক্ষ্যে অভ্যস্ত হাতে চোখের পলকে কেটে নিল তিতাসের কয়েকটি চুল।
