১৫
ভোর হচ্ছে। আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হতে শুরু করেছে। গঙ্গার ওপরের আকাশে ইতস্তত উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা পাখি। তারা ডাকছে। বোধ হয় বাকিদের ঘুম থেকে ডেকে তুলছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে জেটিটা। ডকের একটা কোণের দিকে বসে আছে দু’জন মানুষ। একজন বুড়ো মতো। আর একজন জোয়ান। ওরা গুরু-শিষ্য। লোকনাথ আর সরিত।
মাথা নীচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সরিত আর তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে লোকনাথ। আচমকা বাঁ হাত দিয়ে সরিতের কানের কাছে কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল সে। চড়টা খেয়েও মুখ তুলে তাকাল না সরিত। নীচু গলায় বলল, মাফ করে দাও কত্তা। ভুল হয়ে গেছে।
কোনও উত্তর না দিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। সরিতের সঙ্গে তার কথা বলার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। কোন একটা মেয়েছেলেকে মারতে না পেরে সরিত ফিরে এসেছে বলে লোকনাথের কোনও আক্ষেপ নেই। তার আক্ষেপ এখানেই যে সরিত ওই মেয়েছেলেটাকে অনেকগুলো কথা বলে ফেলেছে। মেয়েটা সরিতকে চিনে ফেলেছে। এবার মেয়েটা পুলিশের কাছে যাবে। সেখানে সরিতকে কেমন দেখতে ছিল সে সব বলবে আর একই সঙ্গে এটাও বলে দেবে যে পেটে দাঁত ঢুকে এখনও অবধি ছ’টা বাচ্চা মারা গেছে। যদিও আসলে সাতটা বাচ্চা। কিন্তু সুদেব আর পম্পির মেয়ের ব্যাপারটা কেউ জানে না বলেই লোকনাথের বিশ্বাস। যেই নাড়াঘাঁটা হবে ওমনি এই বাচ্চাদের মৃত্যু নিয়ে হইহল্লা শুরু হবে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারবে ওই ছ’টা বাচ্চার মধ্যে অন্তত তিনটে বাচ্চার বাড়িতে একটা বুড়ো মতো খোঁড়া জমাদার আসত। যে শেষ কিছুদিন ধরে আসছে না। বাকি তিনটে বাচ্চার বাড়ির লোক আর ইশকুলে খবর নিয়ে পুলিশ এটাও জানতে পারবে যে একটা ফর্সা মতো সুন্দর দেখতে বেলুনওয়ালা ইশকুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। সেও অনেকদিন বেপাত্তা। তারপর যদি পুলিশ সন্দেহভাজনদের ছবি আঁকায় তা হলে তো আর কথাই নেই। ভাসা ভাসা হলেও তার এবং সরিতের একটা চেহারা পুলিশের কাছে চলে আসবে। তাতে অবশ্য পুলিশ তার বালটাও ছিঁড়তে পারবে না কিন্তু মাঝখান থেকে আসল কাজটা পিছিয়ে যাবে। এখনও ছ’টা বাচ্চা মারতে হবে। লোকনাথ চেয়েছিল, সরিত বর্ধমান থেকে ফিরে এলেই কাজ শুরু করে দেবে। এবার আর একটা একটা করে না। একসাথে ছ’টা বাচ্চার চুল জোগাড় করে ফেলবে। কিন্তু সরিত এমন প্যাঁচাল পাকিয়ে রেখেছে যে ক’দিনের জন্য চুপচাপ থাকতেই হবে। যতবার সে সিদ্ধির কাছাকাছি যায় কোনও না কোনওভাবে তাকে পিছিয়ে আসতে হয়। হতাশায় চোখে জল এল লোকনাথের। অথচ জীবনের কাছে এর বেশি কিছু তো চায়নি সে। মানুষ কত কিছু চায়। গাড়ি, বাড়ি, ধন, দৌলত, ক্ষমতা, খ্যাতি কত কিছু। কিচ্ছু চায়নি সে। শুধু সাধনা করতে চেয়েছে। সিদ্ধিলাভ করতে চেয়েছে। আর সিদ্ধি না হওয়া অবধি যে তার মুক্তি নেই। সে যে সত্যবদ্ধ। সে যে কথা দিয়েছিল চিন্ময়ীকে। এ পৃথিবীর একমাত্র নারী যাকে লোকনাথ ভালোবেসেছিল।
চিন্ময়ী চলে গেছে আজ কত বছর হবে? হিসেব গুলিয়ে যায় লোকনাথের। পঁয়ত্রিশ বছর না চল্লিশ? কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য লোকনাথ ভুলতে পারেনি সেই দিনটার কথা। সেদিনের সেই ক্ষত আজও লোকনাথের মনে সদ্য কাটা ঘায়ের মতো দগদগে হয়ে আছে। সেই দিনের পরেই তো লোকনাথ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, মানুষ হয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। মানুষ বড় দুর্বল প্রাণী। প্রিয়জনকে রক্ষা করার ক্ষমতা মানুষের নেই। তাই ঈশ্বর কিংবা রাক্ষস হতে হবে। ঈশ্বর হওয়া কঠিন। মানুষ ঈশ্বর হতে পারে না। কিন্তু চাইলেই রাক্ষস হওয়া যায়। লোকনাথ রাক্ষস হয়েছে।
লোকনাথ বোঝে তার বয়স হচ্ছে। শরীরের জোর তো কমে আসছেই। মনটাও আজকাল মাঝে মাঝে বশে থাকে না। কেমন যেন হতাশ লাগে। মনে হয়, সে বুঝি শেষ অবধি পেরে উঠবে না। এই এখন যেমন লাগছে। ভোরের গঙ্গার শীতল হাওয়াও তার ক্লান্তি দূর করতে পারছে না। একটা সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল লোকনাথ। একটু যেন ঝিমুনি এসেছে। আচমকা সোজা হয়ে বসল সে। চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধক করে। নাহ, হার মানলে হবে না। সে লোকনাথ চক্কোত্তি। তার জন্মই হয়েছে সাধনা করার জন্য। যখনই এই ক্লান্তি আসে লোকনাথ মনে করে তার অতীতকে। অতীতের সব বঞ্চনা, অপমান, যন্ত্রণার স্মৃতি নতুন শক্তি দেয় তাকে। মানুষকে ঘেন্না করার শক্তি। চোখ বোজে লোকনাথ। হু হু করে পিছিয়ে যায় অনেক অনেক বছর আগে।
তখন তার বয়স কত? বছর কুড়ি হবে। সেই প্রথমবার টের পেয়েছিল মানুষ আসলেই বেজন্মা। জন্ম প্রক্রিয়াটাই অমন নোংরা বলে মানুষ জন্মায় পাঁকগন্ধ বুকে নিয়ে। মানুষের মনের ভেতরটা তাই যৌনাঙ্গের মতোই পিচ্ছিল, দুর্গন্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে।
ছোট থেকেই লোকনাথের ঝোঁক ছিল পুজোআচ্চার ওপর। লোকনাথের বাবা-মা আবার দু’জনেই পুরনো কমিউনিস্ট। তাদের বাড়িতে ঠাকুরের আসন ছিল না। তার বদলে ছিল কাঠের আলমারি বোঝাই বই। এমন বাড়ির ছেলের নাম লোকনাথ হয়েছিল কারণ ঠাকুমা। তিনি আবার ছিলেন লোকনাথ বাবার অন্ধ ভক্ত। ছোট থেকেই লোকনাথ অদ্ভুত প্রকৃতির। বেশির ভাগ সময়টাই সে চুপ করে বসে থাকত। মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছিল তাকে বই পড়ানোর, গান শেখানোর, আঁকা শেখানোর। কিন্তু কিছুই লোকনাথের ভালো লাগত না। অথচ তার স্মৃতিশক্তি ছিল মারাত্মক। একবার কিছু দেখলে সে ভুলত না। যত ঠাকুর দেবতা আছে সবার পুজোর মন্ত্র ছিল তার কণ্ঠস্থ। লুকিয়ে লুকিয়ে এসব বই কিনত সে। একটা সময়ের পর বাবা-মা হাল ছেড়ে দিয়েছিল। লোকনাথ বুঝত মা কিংবা বাবা কেউই তাকে পছন্দ করে না। তাদের সবটুকু ভালোবাসা ছিল বোনকে ঘিরে। বোনও বেড়ে উঠছিল মা-বাবার মনের মতো করেই। সে যে অবহেলিত তা নিয়ে লোকনাথের কোনও কষ্ট ছিল না। ঘরের এক কোণে বসে মনে মনে মা কালীর ধ্যান করতে পারলেই সে আর কিছু চাইত না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘরে থাকতে আর ভালো লাগত না লোকনাথের। স্কুলের পাট চুকেছিল অনেক আগেই। কলেজে ভর্তি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। পাতাভর্তি গাঁজাখুরি লেখা পড়তে বয়েই গেছে লোকনাথের। সে তখন ঘুরে বেড়ায় শ্মশানে শ্মশানে। শ্মশানের মধ্যে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য আছে। যা একটু একটু করে ঢুকে যেত লোকনাথের মাথার মধ্যে। আগুন জ্বালিয়ে মা কালীর স্তব করত লোকনাথ। মধ্যবিত্ত পাড়ায় এসব খবর চাপা থাকে না। রটে গেল লোকনাথ তন্ত্রসাধনা করে। লোকজন লোকনাথকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। বাবা-মা আগে থেকেই মাঝে মাঝে একটা কথা বলত। তারা বলত, লোকনাথ আমাদের ছেলে নয়। মনে হয় বদলাবদলি হয়ে গেছে। এবার পাড়াসুদ্ধু লোকের সামনে সে কথা বলতে শুরু করল। লোকনাথেরও মনে হতে লাগল সে এ বাড়ির আশ্রিত। মূল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পেছনের দিকে যেখানে ভাড়াটেরা থাকত সেখানেই একটা ছোট ঘরে নিজের সংসার গুছিয়ে নিল সে। আসলে তখনই বাড়ি ছাড়ার মতো মনের জোর ছিল না তার।
এভাবেই দিন কাটছিল। মা, বাবা, বোন কেউ লোকনাথের সঙ্গে কথা বলত না। সেও ঘাঁটাত না ওদের। ততদিনে লোকনাথ স্বপাক খেতে শুরু করেছে। তবে হ্যাঁ, চাল, ডাল, আলু বাড়ি থেকেই আসত। দাওয়ায় নামিয়ে রেখে চলে যেত কাজের লোক। সবাই যেন লোকনাথকে ভয় করতে শুরু করেছিল। শুধু ভয় করত না একজন। উল্টোদিকের ঘরে ভাড়া থাকত কমল হালদার বলে একটা লোক। সে তার বউ রেখা আর তিন বছরের ছেলে সুমনকে নিয়ে থাকত। কমল কী কাজ করত লোকনাথ জানে না। সকাল হলেই সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেত। ফিরত অনেক রাত করে। রেখা ভারী ভালো ব্যবহার করত লোকনাথের সঙ্গে। লোকনাথের থেকে সে বড়জোড় বছর পাঁচেকের বড় হবে। লোকনাথকে সে ঠাকুরমশাই বলে ডাকত। মাঝে মাঝেই দুপুরবেলা ছেলের হাত ধরে লোকনাথের দাওয়ায় এসে দাঁড়াত। বলত, কী রান্না হচ্ছে ঠাকুরমশাই?
লোকনাথ হাঁড়ির সরা তুলে দেখাত, এই তো সেদ্ধভাত।
রেখা বলত, কী করে রোজ সেদ্ধভাত খাও ঠাকুরমশাই? আমি আজ কাঁঠালের বিচি দিয়ে ডিমের ডালনা রেঁধেছি। খাও না একটু।
লোকনাথ হেসে মাথা নাড়ত।
অনুযোগের সুরে রেখা বলত, কেন? আমার হাতে খেলে তোমার জাত যাবে?
বেশ সহজ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল রেখা আর লোকনাথের মধ্যে। রেখা রোজ সকালে লোকনাথের দাওয়ায় ফুল তুলে রেখে দিত। বিকেলের রোদ মরে এলে লোকনাথের ঘরের বাইরেটায় এসে বসত। চুল বাঁধতে বাঁধতে সংসারের নানা গল্প করত। বলত, স্বামীর সঙ্গে তেমন সদ্ভাব নেই। কমল তাকে বাপের বাড়ি যেতে দেয় না।
চুপচাপ শুনত লোকনাথ। জাগতিক ব্যাপারে তার আগ্রহ বরাবর কম। নয়তো সে বুঝতে পারত কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে রেখা চকিতে যেভাবে তার দিকে তাকায় তাকে আর যাই হোক স্বাভাবিক দৃষ্টি বলা চলে না। লোকনাথ বুঝতে পারেনি রেখা আসলে জমি তৈরি করছিল। কিন্তু সংসার জীবনে অভিজ্ঞ রেখা বুঝেছিল এই খামখেয়ালি ঠাকুরমশাইকে দুঃখের গল্প শুনিয়ে লাভ হবে না। তাই সে ঠিক করে ফেলেছিল বড় ঘা দেবে।
সেটা ছিল একটা গরমকালের বিকেল। লোকনাথ চৌকিতে শুয়ে ঝিমোচ্ছিল। হঠাৎ কানে এসেছিল চাপা গলায় রেখা ডাকছে, ঠাকুরমশাই। ও ঠাকুরমশাই।
ধড়মড় করে উঠে বাইরে এসেছিল লোকনাথ। রেখা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের সামনেই। মুখটা বিকৃত করে সে বলেছিল, হাঁটুর কাছে খুব ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে পেকে উঠেছে। একটু দেখবে গো?
কোনও সন্দেহ না করেই লোকনাথ ঘরের ভেতর ডেকে নিয়েছিল রেখাকে। লোকনাথের চৌকিটা বেশ উঁচু। সেটার ওপরেই পা ঝুলিয়ে বসেছিল রেখা। লোকনাথ সরল মনে বলেছিল, কী হয়েছে গো?
পরনের কাপড়টা হাঁটু অবধি তুলে দিয়েছিল রেখা। নিজের হাঁটুর ওপরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল, এই যে এইখানে। ঘরে তেমন আলো ছিল না। অস্বস্তি হলেও ঝুঁকে দেখতে গেছিল লোকনাথ আর তখনই ভয়ংকর কাণ্ডটা করেছিল রেখা। দু’ হাতে লোকনাথের মাথাটা ধরে গুঁজে দিয়েছিল নিজের উরুসন্ধিতে। এক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিল লোকনাথ। কিন্তু সেই বিহ্বলতা কাটতেই ঘেন্না পেয়েছিল সে। সামুদ্রিক শ্যাওলার মতো এক ভিজে ভাব বিবমিষা জাগিয়ে তুলেছিল তার সারা শরীর জুড়ে। এক ধাক্কায় রেখাকে সরিয়ে দিয়েছিল সে কিন্তু সামলাতে পারেনি। রেখার গায়ের ওপরেই বমি করে দিয়েছিল।
পরের দিন তার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছিল রেখা। ক্ষমা করেওছিল লোকনাথ। কিন্তু মেয়েদের মনের ভেতর কী চলছে সে কথা দেবতারাও বুঝতে পারে না, সেখানে লোকনাথ তো সামান্য মানুষ। তখনও লোকনাথ মানুষ ছিল।
ধীরে ধীরে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল রেখার সাথে। দু’জনের কেউই ভুলেও ওই প্রসঙ্গ মুখে আনত না। কিন্তু লোকনাথ এবারও বুঝতে পারেনি রেখা আবার জমি তৈরি করছে। গায়ে বমি করে দেওয়ার অপমান সে ভুলতে পারেনি। আজ অবধি অমন ভয়াবহ ভাবে কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। তাই ভয়াবহ এক প্রতিশোধের অপেক্ষায় ছিল সে। তারই জমি তৈরি হচ্ছিল।
আবার একটা বিকেল। অবশ্য তখন বর্ষা পার হয়ে শরৎকাল এসে পড়েছে। আবার বাইরে থেকে ডেকেছিল রেখা। লোকনাথ বাইরে বেরোতে বলেছিল, একটা অনুরোধ করব ঠাকুরমশাই?
সন্দেহের চোখে রেখার দিকে তাকিয়েছিল লোকনাথ। একটা ঘৃণ্য বিকেলের স্মৃতি তাকে বিরক্ত করছিল। রেখা বলেছিল, তুমি তো জানো সুমনের বাবা আমাকে বাপের বাড়ি যেতে দেয় না। মা-বাবা নাতির মুখ দেখার জন্য হাপিত্যেশ করে। আজ একটা সুযোগ এসেছে। সুমনের বাবা আজ ফিরবে না। আমি বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে চলে চলে আসতে পারব।
তখনও অনুরোধটা বুঝতে পারছিল না লোকনাথ। বলেছিল, আমায় কী করতে হবে?
রেখা বলেছিল, এখানে অনেকেই কমলের চেনা। আমি সুমনকে নিয়ে বেরোলে ঠিক ওর কানে খবর পৌঁছে যাবে। তুমি যদি সুমনকে নিয়ে একটু আগে বেরিয়ে শ্মশানের কাছে অপেক্ষা করো খুব ভালো হয়। আমি পৌঁছে যাব।
খুবই সাধারণ প্রস্তাব। আপত্তি করার কোনও কারণ দেখতে না পেয়ে লোকনাথ রাজি হয়ে গেছিল। কিন্তু ওই রাজি হওয়াই কাল হল। লোকনাথ সুমনকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রেখা রটিয়ে দিল তার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন লোকনাথকে বাচ্চাটার সাথে দেখেছিল। তারা বলে দিল, লোকনাথ বাচ্চাটাকে নিয়ে শ্মশানের দিকে গেছে। এটারই অপেক্ষায় ছিল রেখা। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে আছাড় খেয়ে কেঁদে পড়ল, ও আমার ছেলেকে বলি দেবে গো। আমার ছেলেটাকে বাঁচাও।
সেই সময়ের নিস্তরঙ্গ জীবন কিছু একটা নতুন খবর পেলেই নেচে উঠত। তার ওপর লোকনাথকে কেউই তেমন পছন্দ করত না। সঙ্গে সঙ্গে লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি হয়ে গেল। আর ভাগ্যের এমনই ফের সেদিনই শ্মশানের কাছে বাচ্চাটাকে নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে শ্মশান লাগোয়া কালীমন্দিরে ঢুকেছিল লোকনাথ। বাচ্চাটার কপালে এঁকে দিয়েছিল প্রসাদী সিঁদুরের টিপ। লোকজন ওই অবস্থাতেই উদ্ধার করেছিল লোকনাথ আর বাচ্চাটাকে। রেখা লোকনাথকে মার খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু শাস্তির পরিমাণটা বেশি হয়ে গেল। লোকনাথ মার তো খেলই। বাবা-মা ত্যাজ্য করল তাকে। জুতোর বাড়ি মেরে বার করে দিল বাড়ি থেকে। সেই শুরু হল লোকনাথের ভবঘুরে জীবন।
প্রথমটায় কেমন যেন দিশাহীন হয়ে পড়েছিল লোকনাথ। কী থেকে কী হল কিছুই বুঝতে পারছিল না। পরে ধীরে ধীরে সবটা পরিষ্কার হল তার কাছে। কিন্তু কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না তার। অসহ্য রাগ বুকের মধ্যে পুষে রাখল লোকনাথ আর সেই শুরু হল তার মানুষকে বিশেষ করে মেয়েমানুষকে ঘেন্না করা।
ভাদুড়ি মশায় বলতেন, লোকনাথের হাতির মতো স্মৃতিশক্তি। কিচ্ছু ভোলে না। সত্যিই ভোলেনি লোকনাথ। অনেক বছর পরে রাক্ষস কিংবা অসুর হওয়ার পরে সে খুঁজে বার করেছিল রেখাকে। না মারেনি। হাত দুটো কবজি থেকে কেটে নিয়েছিল আর কেটে নিয়েছিল জিভটা। মরে গেলে রেখার প্রায়শ্চিত্ত হত কী করে?
কত্তা।
সরিতের ডাকে ভাবনার ঘোরটা ছিঁড়ে গেল লোকনাথের। এতক্ষণে আবার বেশ মনে জোর পেয়েছে সে। ঘুরে তাকাল সরিতের দিকে। এখন আর সে চোখে রাগ নেই। বরং একটা ক্ষমাসুন্দর ভাব ফুটে উঠেছে। এই ছেলেটাকে বড় পছন্দ করে লোকনাথ। কাজ করতে গেলে ভুলচুক তো হবেই। আর এই তো ভুল করার বয়স। কম বয়সে লোকনাথও কি ভুল করেনি? সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল রমার আত্মাকে অরক্ষিত রেখে দিয়ে। এই ভুল যদি সে না করত তা হলে তিতাস নামের মাগিটা তার এত বছরের সাধনায় জল ঢেলে দিতে পারত না। যদিও এবার আর সে ভয় নেই। সে আপদ চুকে গেছে। নিজেই নিজের কপাল পুড়িয়েছে ভাগ্না। এই আনন্দে লোকনাথ খানিক হেসে নিল। এই যে সে তিতাসের এত বড় সর্বনাশ করেছে, রমা থাকলে কি চুপ করে বসে থাকত? থাকত না। যে করে হোক ওই ভাদুড়ি বুড়োকে জানিয়ে দিত।
লোকনাথের চোখ দেখে বুঝি খানিকটা সাহস পেল সরিত। পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, এবার কী হবে কত্তা? ক’টা দিন তো চুপ করে থাকতেই হবে। মাগিটা রিপোর্টার। পুলিশের কাছে তো যাবেই।
তা যাবে। তুই কি পুলিশকে ভয় খাস?
চোয়াল শক্ত হল সরিতের, তোমাকে ছাড়া সরিত কাউকে ভয় পায় না কত্তা। তবে কী জানো তো, ওই জেলের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে হবে ভাবলেই দম আটকে আসে।
তোরে আমি জেলে যেতেও দেব না। তোরে আমার দরকার। কিন্তু কী করে পুলিশের চোখ এড়ানো যায় সেইটাই ভাবছি। মাগিটার ছবি আছে তোর কাছে? দেখাতে পারবি একবার?
পারব কত্তা। একটা মিনিট সময় দাও। আমি একটা ফোন জোগাড় করে আনছি। মেয়েটা আছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
দৌড়ে গিয়ে একটা ফোন নিয়ে এল সরিত। তারপর একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতেই খুঁজে পেয়ে গেল রোশনির অ্যাকাউন্টটা। ফোনটা বাড়িয়ে দিল লোকনাথের দিকে, এই যে কত্তা মাগিটার অ্যাকাউন্ট।
ফোনটা একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে সরিতের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে লোকনাথ বলল, মেয়েটা তোর নাম জানে?
না কত্তা, আমি ওকে নিজের নাম বলিনি। বলেছিলাম আমার নাম গেনু।
হুম। আঙুল দিয়ে ধুলোর ওপর আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল লোকনাথ।
আচমকা সরিত বলে উঠল, উপায় আছে কত্তা।
কী উপায়?
একটু হেসে সরিত বলল, ধরো পুলিশ আমাকে ধরে নিল। মেয়েটা এসে আমাকে শনাক্তও করল। এরপর আমি যদি বলিও আমার একটা যমজ ভাই আছে, যাকে অবিকল আমার মতো দেখতে, পুলিশ কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? করবে না। কারণ বিপদে পড়ে বাঁচার জন্য সবাই এ ধরনের আবোলতাবোল কথা বলে।
বাঁকা একটা হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের মুখে। তার পর সে বলল, তুই তো দিনে দিনে গেনুরেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিস বাপ। নিজের ভাইরে জুয়োর ঘুঁটি করতে বোধ হয় গেনুও পারত না। তোর বুদ্ধিটা মন্দ না। কিন্তু তড়িৎ? তারে কতটা ভরসা করা যায়? সব বলে দেবে না তো পুলিশরে? বললেই কিন্তু চিত্তির।
লোকনাথের চিন্তা উড়িয়ে দিল সরিত, ধুর, ও আমাদের ব্যাপারে কতটুকু জানে? যা বলেছি করে গেছে। ভেতরের কথা ও কিছুই জানে না। তাই পুলিশ আমার নাগাল পাবে না। আর এসব তো অনেক পরের কথা। তড়িৎ যদি সব জানতও তা হলেও পুলিশকে কিছু বলত না। কারণ ও জানে, আমার নামে চুকলি খেলে আমি ওর গলা কেটে দেব।
খিক খিক করে হেসে লোকনাথ বলল, এইটা ঠিক বলেছিস। ও তোরে যমের মতো ভয় পায়। মাঝে মাঝে ঘর বন্ধ করে তুই ওরে মারিস না কি?
উত্তর দিল না সরিত। একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার ওপর আর তোমার রাগ নেই তো?
মাথা নাড়ল লোকনাথ, উঁহু। তবে এবার থেকে একটু বুঝেশুনে চলিস।
উঠে দাঁড়াল সরিত। মুখটা বিকৃত করে বলল, ওই মাগিটাকে তো আমি মারবই কত্তা। খুব বেশি সময় লাগবে না। তবে আমার জন্য তোমার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে আমি একটা কাজ করেছি।
কী রে?
পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করল সরিত। তাতে কয়েকটা কাগজের পুরিয়া। সেগুলো হাতে নিয়ে বলল, ছ’টা বাচ্চার চুল আছে কত্তা। ফেরার পথে ফুটপাথ ঘুরে ঘুরে সুস্থ, সবল, তোমার বলে দেওয়া সুলক্ষণ মিলিয়েই জোগাড় করেছি। সব ক’টারই বয়স নয়ের কম। তোমার তো ভদ্রঘরের বাচ্চা না হলে মন ওঠে না। কিন্তু এগুলোও খারাপ না বিশ্বাস করো। কাজ শুরু করে দাও কত্তা। যা করার একবারে করে ফেলো।
একটুক্ষণ সরিতের দিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। সরিতের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে বলল, এই জন্য তোরে আমি গেনু বলে ডাকি। কাজের কাজ করেছিস। তবে ওখান থেকে একটা বাচ্চার চুল ফেলে দে।
কেন কত্তা?
তেরো নম্বর বাচ্চাটারে এভাবে মারলে হবে না। ওরে জ্যান্ত লাগবে।
