২৩
কলকাতায় বড্ড দূষণ। রাতের তারাদের স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় না। সেই ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে লোকনাথ। পাশে বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। লোকনাথ জানে, এতক্ষণে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন ভাদুড়ি মশায়। তিতাসকে খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। এটাই তো সে চেয়েছিল। সমস্তটা তার প্ল্যানমাফিক চলছে। যে মুহূর্তে সরিত মোবাইল ফোন থেকে রোশনির ছবি দেখিয়েছিল সেই মুহূর্তে খেলার ছক বদলে ফেলেছিল লোকনাথ। রোশনি পল্লবের একটা ছবি দিয়ে লিখেছিল, ‘আজ প্রিয় লেখকের সাথে দেখা হওয়ার দিন।’ ছবিটা দেখেই লোকনাথ বুঝতে পেরেছিল, রোশনির সাথে পল্লবের যোগাযোগ আছে। আর পল্লবের সাথে যোগাযোগ আছে মানেই ভাদুড়ি স্যারের সাথে যোগাযোগ হতেও মেয়েটার বেশি সময় লাগবে না। তার ওপর মেয়েটাকে নিজের নাম ‘গেনু’ বলে কাজটা আরওই সহজ করে দিয়েছিল সরিত।
সুদেবের বাড়িতে সুদেবের মেয়ে পড়ে যাওয়া দাঁত দেখাতে এসেছিল। সেই দেখেই ধীরে ধীরে লোকনাথের মনে পড়ে গিয়েছিল অধীত বিদ্যা। এই যে সে তেরোটা বাচ্চাকে মারতে চাইছে এও এক প্রাচীন মেসোপটেমীয় তন্ত্র। ওই সময়টায় এই তন্ত্রগুলোই তার মাথার মধ্যে ঘুরছিল। তাই তিতাসের ওপরেও প্রয়োগ করেছিল দেবী ইনান্নার অভিশাপ। কিন্তু দুটো যে এভাবে মিলে যাবে লোকনাথ কখনও ভাবেনি। তেরো নম্বর বাচ্চাটাকে যেখানে সেখানে মারলে সিদ্ধি আসবে না। মারতে হবে নরকে নিয়ে গিয়ে। বাচ্চাটাকে উপহার দিতে হবে নরকের পাহারাদারদের। তার জন্য খুলতে হবে নরকের দরজা। নরকের দরজা এমনি এমনি খোলা যায় না। তার জন্য লাগে দেবী ইনান্নার হাতের দণ্ড। এ সবই লোকনাথ ভাদুড়ি স্যারের থেকে জেনেছে। স্যার বলেছিলেন, হাজার হাজার বছর ধরে ওই দণ্ড কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু লোকনাথ বিশ্বাস করে, এই তন্ত্র যখন আছে, এই যখন তন্ত্রে কাজ হচ্ছে তখন ওই দণ্ডও আছে। সে জন্যই তো হুগলির শ্মশানে সরিতকে তার বিভূতি দেখিয়েছিল। সে জানত, এই অশক্ত শরীরে দেবীর দণ্ড খোঁজার ধকল সে নিতে পারবে না। শক্তপোক্ত লোক চাই তার। সরিতের মধ্যে সে অমিত সম্ভাবনা দেখেছিল। সরিত গেনুর মতো প্রভুভক্ত নয় লোকনাথ জানে। সে এও জানে, ক্ষমতা পেলে সরিত তাকে সরিয়ে দেবে। তাই তো সে আজও সরিতকে মন্ত্রদীক্ষা দেয়নি। নাকের সামনে সেই নয় নম্বর কুমিরছানার মতো আশা দুলিয়ে রেখেছে।
রোশনির সাথে পল্লবের যোগাযোগ আছে বুঝতে পেরেই সরিতের মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল লোকনাথ। তড়িৎকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে হবে এ কথা সরিতের মুখ থেকে বেরোলেও আসলে তার মাথার মধ্যে বসে কথাটা বলেছিল লোকনাথই। আসলে সে ভাদুড়ি স্যারকে বোঝাতে চেয়েছিল, তিতাসের অন্তর্ধানের পেছনে সে রয়েছে। সে বুঝতে পেরেছিল, রোশনি পল্লবকে বলবে, গেনু নামের একটা ছেলে তাকে মারতে এসেছিল। আর এই গেনু নামটা শুনলেই ভাদুড়ি স্যার বুঝবেন, লোকনাথ ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে। এর মধ্যেই তড়িৎ ধরা পড়ে যাবে আর ভাদুড়ি স্যার নিজে চোখে দেখতে আসবেন গেনুকে। তড়িতকে দেখলেই তিনি বুঝে যাবেন, এ সে নয়। কিন্তু কে সে, সেটা জানতে বুড়ো ঢুকে পড়বে তড়িতের মাথার মধ্যে আর জেনে ফেলবে লোকনাথ কোন তন্ত্র প্রয়োগ করে তিতাসকে নরকে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাচ্চা মারার ব্যাপারটা বুড়ো জানতে পারবে না। কারণ এ কথা তড়িতও জানে না।
এবার বুড়ো তিতাসকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। লোকনাথকে খোঁজার পেছনে বুড়ো সময় নষ্ট করবে না। এ এমনই এক তন্ত্র তিতাসকে নরক থেকে বার করে আনতে গেলে ওর প্রেমিক ওই পল্লব নামের ছেলেটা মরবে। সে যে খুশি মরুক, লোকনাথের কিছু এসে যায় না। আসল কথাটা হল, নরকের দরজা খোলার জন্য বুড়োই এবার খুঁজে বার করবে দেবী ইনান্নার দণ্ড। দেবী ইনান্নার দণ্ড খুঁজে বার করার জন্য সরিত বা তড়িতের থেকে ভাদুড়ি স্যার বা তাঁর ওই ছেলেমেয়েগুলো যে বেশি যোগ্য এ নিয়ে লোকনাথের কোনও সন্দেহ নেই। পারলে নিজেই সে নিজের পিঠ চাপড়ে দিত। খেলাটা সে দারুণ সাজিয়েছে। লোকনাথ জানে, আজ বা কাল ভাদুড়ি স্যার দেবীর ওই দণ্ড উদ্ধার করে ফেলবেন আর তার পর সে ওটা চুরি করবে। নরকের দরজা খুলে ফেলে তেরো নম্বর বাচ্চাটাকে উপহার দেবে নরকের পাহারাদারদের। অবশেষে তার সিদ্ধি হবে। অবশেষে।
উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। ভোর হয়ে আসছে। জবাকুসুম রঙের আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’ হাত জড়ো করে কপালে ঠেকাল সে। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির উদ্দেশে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করল। অস্ফুটে বলল, আশীর্বাদ করো গুরুদেব, যেন তোমার শিষ্য সিদ্ধিলাভ করে। সবই গুরুকৃপা। সবই গুরুকৃপা।
(আদি পর্ব সমাপ্ত)
