রন্ধন-যজ্ঞ

রন্ধন-যজ্ঞ

খবর এসেছে লন্ডনে এক বিরাট রন্ধন-যজ্ঞ হবে। সে-যজ্ঞে পৃথিবীর আঠারোটি দেশ আপন আপন সুস্বাদু রান্না পেশ করবেন। অতি উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু হায়, আমাকে বিচারকর্তা করে ডেকে পাঠাচ্ছে না কেন? রন্ধন-মার্গে সত্যের সন্ধানে আমি বিস্তর ইন্ধন পুড়িয়েছি, আকাশের অ্যারোপ্লেন, মাটির ট্রেন আর জলের জাহাজ–এই তিন সচল বস্তু ভিন্ন আর সবই তো আমি খেয়ে দেখেছি। তা-ও আবার দেশি-বিদেশি নানা কায়দায়। জর্মন কায়দায় রান্না ভারতীয় ‘রাইস-কারি’ (অতিশয় অখাদ্য) খেয়েছি, শিখের বানানো বাঙালি লেডিকেনি খেয়েছি (সেফ পেল্লাদ-মারা গুলি– প্রহ্লাদকে খাইয়ে দিলে হিরণ্যকশিপুকে আর ভাবতে হত না), আরব বেদুইনের হাতে ‘পাকানো’ দিল্লির বিরিয়ানি খেয়েছি, জাপানির স্বহস্তে তৈরি চেঙ্গিসখানি কাবাব ভি খেয়েছি (এর নির্মাণকৌশল একদিন সবিস্তর নিবেদন করব– আহা, অতি খাসা জিনিস), আর কত বলব!

তা সে-কথা যাক গে, সে নিয়ে দুঃখ করে কোনও লাভ নেই, গুণীর আদর কি আর এ মূঢ় সংসার করেছে কিংবা করবে?

লন্ডন থেকে আরও খবর এসেছে, ভারতীয় ‘টিম’ চলবে শ্রীমতী ভট্টাচার্য, শ্রীমতী বসু এবং শ্ৰীমতী রায়ের কর্তৃত্বে। তিনজনই বাঙালি, কাজেই বাঙালি হিসেবে, হে পাঠক, তোমার-আমার দু জনেরই মনে বিমল আনন্দ অনুভূত হল, এ-কথা অস্বীকার করে খামোখা মিথ্যেবাদী হতে যাব কেন? কে না জানে, আজ বাঙালি সর্বত্র অনাদৃত, কেন্দ্রীয় সরকার তাকে উপেক্ষা করে, বিদেশে তার খ্যাতি-প্রতিপত্তি শনৈঃ শনৈঃ কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পাল-পরবে শ্রাদ্ধ-নিমন্ত্রণে সে প্রায় ব্রাত্য– অপাঙক্তেয় হতে চলল। এরই মধ্যিখানে যদি বিশ্ব-রন্ধন-যজ্ঞে তিন বঙ্গরমণী ভারতের প্রতিভূ হিসেবে আমন্ত্রণ পান, তবে কোন বাঙালির ছাতি তিন ফুট ফুলে উঠবে না?

কিন্তু আমার নিবেদন, গর্ব অনুভব করেছি বটে কিন্তু আনন্দিত হইনি।

আমি বাঙালি, আমি এই ‘দেহলিপ্রান্তে’ বসেও বাঙালি-রান্না খাই। আমি আতপ চালের ভাত, কিঞ্চিৎ ঘৃত, সোনা মুগের ডাল (দিল্লিতে অতিশয় নিকৃষ্ট), সর্ষে বাটায় মাছের ঝাল ইত্যাদি খেয়ে থাকি। বাঙালির অন্যান্য রান্না নিয়েও আবার দম্ভের অন্ত নেই, কিন্তু বিশ্বের দরবারে যদি আমাদের অর্থাৎ ভারতীয় রান্নার কেরানি দেখাতে হয় তবে শুধু বাঙালি হেঁশেল দেখালেই চলবে না।

হ্যাঁ, আলবত, অতি অবশ্য আমি স্বীকার করি, বাঙালির সর্ষে-ইলিশ, মালাই-চিংড়ি, ডাব-চিংড়ি, বাঙালি বিধবার নিরামিষ (বিশেষ করে ‘বোষ্টমের পাঁঠা’ এঁচোড়), জলখাবারের লুচি, আলুর দম, সিঙাড়া, মাছের ডিমের বড়া, মোচার পুর দেওয়া সমোসা ইত্যাদি, তার পর ছানার মিষ্টি, রসগোল্লা, লেডিকেনি, সন্দেশ, চিনিপাতা দই, মিহিদানা-সীতাভোগ আরও কত কী! (মুদ্রাকর মহাশয়, আপনার জিভে জল আসছে, অথচ এ-লেখা কম্পোজ না করে আপনার বাইরে যাবার উপায় নেই, তদুপরি আজকের দিনে আপনি-আমি কেউই এসব সুস্বাদু বস্তু চাখবার সামর্থ্য রাখিনে, অতএব অপরাধ নেবেন না। এমনকি, আমাদের উচ্ছেভাজা, আমের অম্বল, কিসমিস-টমাটোর টক (প্রধানত বীরভূম, মেদিনীপুর অঞ্চলের) নগণ্য জিনিস নয়, ভোজনরসিক মাত্রেই জানেন।

আর পিঠে–তার ফিরিস্তি আর দেব না।

 কিংবা যাকে বলে ‘ফেনসি-খানা’ বিশেষ জেলা বা মহকুমার আপন বৈশিষ্ট্য। বাইরের– এমনকি, বাঙলা দেশের ভেতরের লোকই যেগুলো জানে না, যেমন মনে করুন ব্যাঙের ছাতা, ইংরেজিতে যাকে বলে মাশরুম, মেদিনীপুর এ-বস্তুর পাক্কা কদরদার, ভোজনরাজ ফরাসিও এর নামে অজ্ঞান, কিংবা পুব-সিলেটের ‘চোঙা-পিঠে’ (একরকম হাল্কা বাঁশের চোঙায় ভেজা চাল ভরে দিয়ে সে-চোঙা খোলা আগুনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঝলসানো হয়, তার পর চোঙা ভেঙে ফেললে একখানা আস্ত লম্বা টুকরো বেরিয়ে আসে–এক ফুট লম্বা; খেতে হয় শুকনো মালাই কিংবা করকরে কইমাছ ভাজার সঙ্গে), কত বলব!

শুঁটকি? নাক সিটকাচ্ছেন তো? কিন্তু আমার বিশ্বাস শুঁটকির আপন মূল্য আছে। ইংরেজ, ফরাসি, জর্মন সব ভোজন-রসিকজনই ‘স্মোকড-ফিস’ অর্থাৎ শুঁটকির কদর জানেন।

আরও কত কী!

কিন্তু ভুললে চলবে না যে, বাঙালি মাছ, নিরামিষ, পিঠে, সন্দেশ সুচারুরূপে তৈরি করতে জানলেও সে পারে না এবং একদম পারে না মাংস রাঁধতে।

বাঙালি-বাড়িতে মাংস খেতে গেলে আমার চোখে জল আসে। মাংস আর ঝোল নন্-কো-অপারেশন করে বসে আছেন– এদিকে শক্ত মাংস ওদিকে টলটলে ঝোল। মাংসের নিতান্ত আপন ‘সোওয়াদ’ আছে বলেই খাওয়া যায়, কিন্তু আসলে অখাদ্য।

কিংবা মাংস-চালে মিশিয়ে বিরিয়ানি পোলাও বাঙালি রাঁধতে জানে না (বাঙালির উপাদেয় ঘি-ভাত, মটরশুঁটি-ঘি-ভাত অন্য জিনিস) অথবা মাংসে-তরকারিতে মিলিয়ে আলু-গোশৎ, মটর-গোশৎ, গোবি (কপি)-গোশৎ বাঙালি বিলকুল চেনে না।

একেবারে কেউই পারে না–একথা আমি বলব না। ঢাকার নবাববাড়ি, সিলেটের কাজীবাড়ি এবং মজুমদার-বাড়ি (শুনেছি–খাইনি), মুর্শিদাবাদের ও মাটিয়াবুরুজের নবাববাড়ি এসব বস্তু সত্যই ভালো রাঁধেন। আর পারে উত্তম মুর্গি-ঝোল রাঁধতে গোয়ালন্দ, নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর জাহাজের খালাসিরা; যে একবার খেয়েছে, সে কখনও ভুলতে পারে না।

কিন্তু এসব মাংস-রান্না বড়ই সীমাবদ্ধ, বাঙলা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি। আমার আশ্চর্য বোধ হয়, বিক্রমপুরের মেয়ে প্রতি বৎসর গোয়ালন্দি জাহাজে করে কলকাতা-হস্টেলে যায়, যাবার সময় জাহাজে ‘রাইস-কারি’ খায়, সে রাঁধতে-বাড়তেও জানে, কিন্তু জাহাজের ওই মুর্গি-ঝোল সে কখনও রাঁধতে পারল না!

মাত্র একটি বাঙালি কাঁপালিককে আমি চিনি, যিনি সত্যই মাংস রাঁধতে জানতেন। পাঁঠার মাংস কষে তিনি পেঁয়াজ-রতন-লঙ্কা দিয়ে যে অপূর্ব, না অভূতপূর্ব ‘মহাপ্রসাদ’ রাঁধতেন তার সঙ্গে তুলনা দেবার মতো সুখাদ্য আমি এ জীবনে কখনও খাইনি। কিন্তু তিনি ব্যত্যয়। তিনি এখন সেই লোকে, বিবেচনা করি, যেখানে আহারাদির কোনও ঝামেলা নেই, তাই আমাদের শহরে এখন আর কেউ মহাপ্রসাদের সন্ধান পায় না। আমার মতো দু একজন এখনও তার বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় তার স্মরণে চোখের জল ফেলে।

অথচ দেখুন, পশ্চিম-ভারতে বহুতর তরো-বেতঝরা মাংস রান্না হয়। নানা রকমের সুরুয়া (সুপ), শিক-শামি-টিকিয়া-বুড়ি-আফগানি-মিশ্রি-নরগিস কত রকমের কাবাব, ছ-সাত রকমের পোলাও, বিরিয়ানি, কুর্মা, কালিয়া, পসিন্দা, গুদা, কলিজা, তন্দুরিমুর্গি, মুর্গিমুসল্লম, মর্গিশাহি, রওগন যুষ, তার পর মাংসে-তরকারিতে মেশানো আলু-গোশৎ গোবি-গোশ দইয়ে মাংস-মাখানো রায়তা-গোশৎ, মাংস কুচি কুচি করে কোফতা, কিমা এবং তার থেকে কোফতা ঝোল, কিমা-ঝোল, বাহান্ন রকমের সমোসা, এবং আরও কত কী।

এককথায় আমরা বাঙালি যে-রকম মাছ দিয়ে পঁয়ষট্টি রকমের ভেল্কিবাজি দেখাই, এরাও তেমনি মাংস দিয়ে নিপুণ বোল চিকন কাজ দেখাতে জানে।

আমার মনে সন্দেহ জাগছে বাঙালি রমণীরা লন্ডনে এসব রান্না রাঁধবেন কী করে?

কিংবা পার্সিদের ধনে-শাক? উপাদেয় বস্তু।

মাছের রাজা আমরা, কিন্তু ভৃগুকচ্ছ পার্সিদের রান্না ইলিশ-মশলাও তো ফেলনা নয়। মাছটিকে ঠিক মধ্যিখানে লম্বালম্বি কেটে ফাঁকা জায়গাটা সবুজ পেশা মশলা দিয়ে ভরে গোটা মাছটাকে কলাপাতায় মুড়ে আগুনে সেঁকা হয়। তিনখানা আড়াই-সেরি আস্ত ইলিশ খেয়েও আপনার পেটের অসুখ করবে না, এর বাড়া কী প্রশংসা আছে বলুন?

গুজরাতিদের পতৌড়ি। ঘোলের ভিতর বেসন ভিজিয়ে রাখবেন রাত্রিবেলা। সকালে তাই দিয়ে চাপাটির মতো পাতলা রুটি বানাবেন, তেলে ভেজে নিয়ে ফালি ফালি করে কেটে ‘রোল অপ’ করে নেবেন। মুখে দিলে মাখনের মতো মিলিয়ে যাবে। নিরামিষের ভিতর এ-রকম মুখরোচক বস্তু এ-ভারতে কমই আছে। মিষ্টির ভিতর শ্রীখণ্ড এবং দুধ-পাক।

মারাঠিদের দহি-ভাত। বেহারিদের আচার। তামিলদের মালে-গাটানি সুপ, রসম, ইডলি-ডোসে। কাশ্মীরিদের বসন্তঋতুর বাচ্চা ভেড়ার কাবাব। পাঞ্জাবিদের হালুয়া, লসসি; আরও কত প্রদেশের কত অনবদ্য ‘অবদান’!

ক্রিকেট-টিমে আর রন্ধন-টিমে কোনও তফাত নেই। ক্রিকেটে এগারো জন নাইডু পাঠানো হয় না–তা তিনি যত ভালো ব্যাটসম্যানই হোন না কেন। ফাস্ট মিডিয়ম স্লো গুগলি বোলার, উত্তম উইকেট কিপার, এমনকি, না-ব্যাটসম্যান না-বোলার শুধুমাত্র ফিল্ডার (যথা ভাইয়া) দু একজন রাখতে হয়।

অতএব এই রন্ধন-যজ্ঞে ভারতের সর্বপ্রদেশ থেকে বহুতর ভীমসেনকে পাঠাতে হবে।