পোলেমিক

পোলেমিক

কলকাতাতে বর্ষা বসন্ত আছে বটে, কিন্তু তাতে করে কলকাতাবাসীর জীবনযাত্রায় কোনও প্রকারের ফেরষ্কার হয় না। হৈ-হুল্লোড়, পার্টি-পর্ব, কেনাকাটা, মারামারি একই ওজনে চলে। দিল্লিতে কিন্তু ভিন্ন ব্যবস্থা। এখানে দুই ঋতু গ্রীষ্ম আর শীত। শীতকালে এন্তার দাওয়াত-নেমন্তন্ন, দিনে দশটা করে মিটিং, হপ্তায় দুটো করে আর্ট-প্রদর্শনী, আজ ভরতনাট্যম, কাল কথাকলি, পরশু যেহুদি মেনুহিন, আর এক গাদা সঙ্গীত-সম্মেলন, কবিসঙ্গম, মুশাইরা। গ্রীষ্মকালে এ সবকিছুতে মন্দা পড়ে যায়, শুধু যেসব দেশের বাৎসরিক পর্ব গরমে পড়েছে, সেসব দেশের রাজদূতেরা বাধ্য হয়ে রিসেপশন দেন, আর সবাই শার্ক স্কিন আর কালো বনাতের মধ্যিখানে প্রচুর পরিমাণে ঘামেন। পার্টিগুলোর জলুসেরও খোলতাই হয় না, কারণ ডাকসাইটে সুন্দরীরা পাহাড়-পর্বতে ঘুরতে গেছেন পার্টিতে যদি রঙবেরঙের শাড়ির ব্যবহারই না থাকল তবে সে পার্টি অতি নিরামিষ (নিরস্তু তো বটেই; এসব পার্টিতে জল মানা)। তাই পাঁচজন পার্টি থেকে ভদ্রতা রক্ষা করেই তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন।

এসব হল নিউ দিল্লির কাহিনী। পুরনো দিল্লিতে কিন্তু একটা জিনিসের অভাব কখনও হয় না। প্রায় প্রতিদিনই কোনও-না-কোনও নাগরিককে, অভিনন্দন করার জন্য কোনও-না-কোনও পার্কে তাঁবু আর শামিয়ানা খাটিয়ে, দিগধিড়িঙ্গে লাউডস্পিকার ঝুলিয়ে যা চেল্লাচেলি আরম্ভ হয় তাতে পাড়ার লোক ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে একে অন্যের সঙ্গে কথা পর্যন্ত কওয়া যায় না।

এরকম একটা অভিনন্দন-পার্টিতে আমি দিনকয়েক পূর্বে গিয়েছিলাম। যে দু জনকে অভিনন্দন করা হল, আমি তাঁদের নাম শুনিনি, দিল্লির কজন লোক তাদের নাম শুনেছে তা-ও বলতে পারব না।

দু জনারই যে প্রশস্তি গাওয়া হল, তা শুনে আমার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটি ছোট লেখার কথা মনে পড়ল। এ লেখাটি সচরাচর কেউ পড়েন না বলে উদ্ধৃতির প্রলোভন সম্বরণ করতে পারলুম না।

‘কবিকুলতিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ এই ছদ্মনামে বিদ্যাসাগর মহাশয় লিখেছেন :

‘আমি এ স্থলে– নাথ বিদ্যারতুকে নদীয়ার চাঁদ বলিলাম। কিন্তু শ্ৰীমতী যশোহরহিন্দুধর্মরক্ষিণীসভাদেবী– মোহন বিদ্যারত্নকে নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদীয়ার চাঁদ বলিয়াছেন। উভয়েই বিদ্যারত্ন উপাধিধারী, উভয়েই স্ব-স্ব বিষয়ে সর্বপ্রধান বলিয়া গণ্য, বিদ্যাবুদ্ধির দৌড়ও উভয়েরই একই ধরনের। সুতরাং উভয়েই নবদ্বীপচন্দ্র অর্থাৎ নদীয়ার চাঁদ বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হবার যোগ্য পাত্র, সে বিষয়ে সংশয় নাই কিন্তু এ পর্যন্ত এক সময়ে দুই চাঁদ দেখা যায় নাই। সুতরাং একজন বই, দুইজনের নদীয়ার চাঁদ হওয়ার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একজন একবারেই বঞ্চিত হইবেন, সেটাও ভালো দেখায় না; এবং এই উপলক্ষে দু জনে হুড়াহুড়ি গুঁতাগুঁতি করিয়া মরিবেন সেটাও ভালো দেখায় না। এজন্য আমার বিবেচনায় সমাংশ করিয়া দু জনকেই এক এক অর্ধচন্দ্র দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া বিদায় করা উচিত। শ্রীমতী যশোহরহিন্দুধর্মরক্ষিণীসভাদেবী আমার এই পক্ষপাতবিহীন ফয়তা ঘাড় পাতিয়া লইলে আর কোনও গোলযোগ বা বিবাদ-বিসংবাদ থাকে না। এক্ষণে তার যেরূপ মরজি হয়।’

নিত্যি নিত্যি কারণে-অকারণে হৈ-হুল্লোড় করার অভ্যাস দিল্লিবাসী বাঙালির ওপরও বেশ কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে। আজ এখানে সাহিত্যসভা, কাল ওখানে বর্ষামঙ্গল প্রায়ই এসব ‘পর্ব’ হয়।

এবং অনেক সময় মনে হয়েছে, এসব পর্বে সত্যকার কাজ যেন ঠিকমতো হচ্ছে না।

তাই আমি চেষ্টা করেছি, ছোট গরি ভেতর অল্প সংখ্যক লোক নিয়ে প্রতি সপ্তাহে কিংবা প্রতি পক্ষে ‘স্টাডি সার্কাল’ বসাবার, কিন্তু দুঃখের বিষয় এ যাবৎ কৃতকার্য হতে পারিনি। আমার বয়স হয়েছে তদুপরি আমি খ্যাতনামা সাহিত্যিক নই, কাজেই আমার দ্বারা এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পত্তন সম্ভবপর নয়, অথচ এর প্রয়োজন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।

কেন্দ্র হিসেবে দিল্লির মাহাত্ম্য ক্রমেই বাড়ছে। কেন্দ্রের হাতে অর্থ আছে এবং সে অর্থের কিছুটা প্রাদেশিক সরকারও পান–সাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সেবার্থে। বাংলার প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রের কাছ থেকে বাংলা সাহিত্যের জন্য কত টাকা বাগাতে পারবেন, সে তাঁরা জানেন, কিন্তু আমরা যারা দিল্লিতে আছি, এ বাবদে আমাদেরও যথেষ্ট কর্তব্য আছে। আমরা যদি ছোট ছোট কর্মঠ সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারি, তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের কর্মতৎপরতা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। আজ যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমাদের দরদের অভাব, তার প্রধান কারণ আমরা সাহিত্যের সত্যকার চর্চা করিনে।

তার অন্যতম জাজ্বল্যমান উদাহরণ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও আমরা বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের জন্য কিছুই করে উঠতে পারিনি, অথচ সেখানে রুশ ভাষা শেখাবার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।

এদিকে আবার দিল্লিতে ব্যাঙের ছাতার মতো একটা জিনিস বড় বেশি গজাচ্ছে। এঁরা হচ্ছেন আর্ট ক্রিটিক সম্প্রদায়। এঁরা ছবি বোঝেন, মেনুহিন শোনেন, আবার আলাউদ্দিন সায়েবকেও হাততালি দেন; এঁরা ভরতনাট্যম আর মণিপুরি নিয়ে কাগজে কপচান, চীনা সেরামিক এবং দক্ষিণ-ভারতের ব্রোঞ্জ সম্বন্ধে এঁদের জ্ঞানের অন্ত নেই।

এঁদের একজন তো সবজান্তা হিসেবে এক বিশেষ গণ্ডিতে রাজপুত্রের আদর পান, বিলক্ষণ দু পয়সা তাঁর আয়ও হয়। তা হোক, আমার তাতে কণামাত্র আপত্তি নেই– পারলে আমিও ওঁর ব্যবসা ধরতুম।

কিন্তু আমার দুঃখ ভদ্রলোকটি বই বাংলা এবং বাঙালি-বিদ্বেষী। অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল এবং তাঁদের শিষ্য-উপশিষ্যেরা যে ‘বেঙ্গল স্কুল’ গড়ে তুলেছেন, সেটাকে মোকা পেলেই এবং মাঝে মাঝে না পেলেও বেশ কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেন।

তাঁর মতে যামিনী রায়, যামিনী রায়, এবং আবার যামিনী রায়। বাঙলা দেশের আর সব মাল বরবাদ, রদ্দি।

ইনি যেসব ‘আর্ট সমালোচনা’ প্রকাশ করেন, তার সুস্পষ্ট প্রতিবাদ হওয়া উচিত। যারা এসব জিনিসের সত্য সমঝদার, তাঁদের উচিত বেরিয়ে এসে আপন দেশের সুসন্তানদের কীর্তি বারবার স্বীকার করা। ‘ডেকাডেন্স’ বা ‘গোল্লায় যাওয়া’র অন্যতম লক্ষণ আপন দেশের মহাজনকে অস্বীকার করা বা খেলো করে দেখানো।

এ-জাতীয় লেখাকে ‘পোলেমিক’ বলে–বাংলায় ‘মসীযুদ্ধ’ বলতে পারি। এবং মসীযুদ্ধে বাঙালির পর্বত প্রমাণ ঐতিহ্যসম্পদ আছে। ভারতচন্দ্রের পদ্যময় পোলেমিক, আর বাংলা গদ্য তো আরম্ভ হল খাঁটি মসীযুদ্ধ দিয়ে। রামমোহন তো কলমের লড়াই লড়লেন, হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গোড়াদের সঙ্গে। তার পরের বাঘ বিদ্যাসাগর। তিনি যে পোলেমিক লিখেছেন, সে কথা লিখতে পারলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আইনজীবী নিজেকে ধন্য মনে করবেন- অধমের মতে পোলেমিকে বিদ্যাসাগর মশাই মিলটনের বাড়া। আর মসীযুদ্ধে ব্যঙ্গ কী করে প্রয়োগ করতে হয় তার উদাহরণ তো আপনারা একটু আগে ‘অর্ধচন্দ্র’ মানে স্পষ্ট দেখতে পেলেন। তার পর তিন নম্বরের মল্লবীর বঙ্কিম। তিনি হেস্টি সাহেবের (নাম ঠিক মনে। নেই) বিরুদ্ধে সনাতন হিন্দুধর্মের হয়ে যে লড়াই লড়লেন সে তো অতুলনীয়। বরঞ্চ বলব, ‘কৃষ্ণচরিত্র’-এর চেয়েও বড় ক্যানভাসে কাজ করেছেন বঙ্কিম এ-মসীযুদ্ধে এবং এ সত্যও আজ স্বীকার করব যে, আজ যদি কোনও হেস্টি পুনরায় দেখা দেয় তবে তার সঙ্গে ও-রকম পাণ্ডিত্য আর ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে (এখানে সাহিত্যিক বঙ্কিমের কথা হচ্ছে না– সে সাহিত্যিক যে নেই সেকথা স্কুলের ছোঁড়ারা পর্যন্ত জানে) লড়নেওলা আজ বাঙলা দেশে নেই।

তার পর রবীন্দ্রনাথ; তিনিও তো কম লড়েননি। তবে তাঁর রুচিবোধ বিংশ শতাব্দীর ছিল বলে তাঁর লেখাতে ঝাঁজ কম; কিন্তু ইংরেজের বিরুদ্ধে লেখা চিঠিতে কী তিক্ততা, কী ঘেন্না!

গল্প শুনেছি উর্দুর কবি-সম্রাট গালিব সাহেব তার প্রতিদ্বন্দ্বী জওহ্ সাহেবের একটি দোহা মুশাইরায় (কবি-সঙ্গমে) শুনে বারবার জওকে তসলিম করে বলেছিলেন, ‘আপনি দয়া করে ওই দুটি ছত্র আমায় দিয়ে দিন, আর তার বদলে আমি আমার সম্পূর্ণ কাব্য আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি।’

রবীন্দ্রনাথের ওই শেষ চিঠির পরিবর্তে পৃথিবীর যে-কোনও পোলেমিস্ট তাঁর সব পোলেমিক দিতে সোল্লাসে প্রস্তৃত হবেন।

শরৎচন্দ্র যদি তাঁর মসীযুদ্ধ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে না করে সে-যুগের আর যে কোনও লোকের সঙ্গে করতেন, তবে তিনিও মসীযোদ্ধা হিসেবে নাম কিনে যেতে পারতেন।

তাঁর ‘নারীর মূল্য’ পোলেমিকের প্রথম চাল। বাঙলা দেশে এ-পুস্তকের বিরুদ্ধে কলম ধরলে তিনি যে কী মাল ছাড়তেন, তার কল্পনা করতেও আমি ভয় পাই। ধর্মে বিবেকানন্দ পোলেমিস্ট, ব্যঙ্গ কবিতায় দ্বিজেন্দ্রলাল।

এতখানি ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কোনও বাঙালি এইসব ভুইফোড় ‘আর্ট ক্রিটিক’দের জোরসে দু কথা শুনিয়ে দেন না কেন??