দিল্লি স্থাপত্য

দিল্লি স্থাপত্য

যারা এই শীতে প্রথম দিল্লি যাচ্ছেন কিংবা যারা পূর্বে গিয়েছেন কিন্তু পাঠান মোগলদের দালান-কোঠা, এমারত-দৌলত দেখবার সুযোগ ভালো করে পাননি, এ লেখাটি তাদের জন্য। এবং বিশেষ করে তাঁদের জন্য যাঁদের স্থাপত্য দেখে অভ্যাস নেই বলে ওই রস থেকে বঞ্চিত। লেখাটিতে কিঞ্চিৎ ‘মাস্টারি মাস্টারি’ ভাব থেকে যাবে বলে গুণীজনকে আগের থেকেই হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি তাঁরা যেন এটি না পড়েন।

কোনও কালে যে ব্যক্তি গান শোনেনি সে যদি হঠাৎ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শুনে উদ্বাহু হয়ে মৃত্য না করে তা হলে চট করে তাকে বেরসিক বলা অন্যায়। বাঙলা দেশে এখানে-ওখানে ছিটেফোঁটা স্থাপত্য আছে বটে, কিন্তু একই জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণে নেই বলে স্থাপত্যের যে ক্রমবিকাশ এবং সামগ্রিক রূপ তার রস বুঝতে সাহায্য করে তার সম্পূর্ণ অভাব। বিচ্ছিন্নভাবে যে বিশেষ একটি মন্দির, মসজিদ বা সমাধি রসসৃষ্টি করতে পারে না, তা নয়। তাই তুলনা দিয়ে বলতে পারি, জগতের কোনও সাহিত্যের সঙ্গে যদি আপনার কিছুমাত্র পরিচয় না থাকে, তবে সাধারণত ধরে নেওয়া যেতে পারে যে উটকো একখানা ফরাসি উপন্যাসের রস আপনি গ্রহণ করতে পারবেন না। রসবোধের জন্য ঐতিহাসিক ক্ৰমবিকাশ-জ্ঞান অপরিহার্য কি না এ প্রশ্ন নন্দনশাস্ত্রের অন্যতম কঠিন প্রশ্ন। সে গোলকধাঁধার ভিতর একবার ঢুকলে আর দিল্লি যাবার পথ পাবেন না– আর ‘দিল্লি দূর অস্ত’ তো বটেই।

কবিতা, সঙ্গীত, স্থাপত্য, ভাস্কর্যের মূল রস একই ইংরেজিতে যাকে বলে ইসথেটিক ডিলাইট। কিন্তু এক রসের চিন্ময় রূপ (যথা কাব্যের) যদি অন্য রসের মৃন্ময় রূপে (যথা ভাস্কর্য, স্থাপত্যে) টায় টায় মিলছে না দেখেন তবে আশ্চর্য হবেন না। এদের প্রত্যেকেই মূল রস প্রকাশ করে আপন আপন ‘ভাষায়’, নিজস্ব শৈলীতে এবং আঙ্গিকে। একবার সেটি ধরতে পারলেই আর কোনও ভাবনা নেই। তার পর নিজের থেকেই আপনার গায়ে রসবোধের নতুন নতুন পাখা গজাতে থাকবে, আপনি উড়তে উড়তে হঠাৎ দেখবেন তাজমহলের গম্বুজটিও আপনার সঙ্গে আকাশপানে ধাওয়া করেছে– নিচের দিকে তাকিয়ে দেখবেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল যেন ক্রমেই পাতালের দিকে ডুবে যাচ্ছে।

স্থাপত্যের প্রধান রস– প্রধান কেন, একমাত্র বললেও ভুল বলা হয় না, অন্যগুলো থাকলে ভালো, না থাকলে আপত্তি নেই তার কম্পজিশনে, অর্থাৎ তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যেমন ধরুন, গম্বুজ, মিনার, আর্চ (দেউড়ি), ছত্রি (কিয়োসক, পেভিলিয়ন), ভিত্তি এমনভাবে সাজানো যে দেখে আপনার মনে আনন্দের সঞ্চার হয়। তুলনা দিয়ে বলতে পারি, সঙ্গীতেও তাই। কয়েকটি স্বর– সা, রে, গা, মা, ইত্যাদি এমনভাবে সাজানো হয় যে শোনামাত্রই আপনার মন এক অনির্বচনীয় রসে আপুত হয়।

এই সামঞ্জস্য যখন সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, তখনই স্থাপত্য সার্থক। এবং স্থাপত্যের এই অনিন্দ্য সামঞ্জস্য যদি কাব্যে কিংবা উপন্যাসে পাওয়া যায় তবে বলা হয়, কাব্যখানিতে আরকিটেক্টনিকাল মহিমা আছে– মহাভারতে আছে, ফাউষ্টে আছে এবং উয়োর অ্যান্ড পিসে আছে; জ্যাঁ ক্রিস্তফ উত্তম উপন্যাস কিন্তু এ-গুণটি সেখানে অনুপস্থিত। লিরিক বা গীতিকাব্যে যদিও কম্পজিশন থাকে– তা সে যতই কম হোক না কেন, তাতে আরকিটেক্টনিকাল বৈশিষ্ট্য থাকে না।(১)

স্থাপত্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তার পর গুণীরা বলেন, এবং সার্থক স্থাপত্যে স্থপতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর নিখুঁত সামঞ্জস্য করার পর সেগুলোকে অলঙ্কার সহযোগে সুন্দর করে তোলেন। অধম একথা সম্পূর্ণ স্বীকার করে না। কিন্তু এ গোলকধাঁধায়ও সে ঢুকতে নারাজ। দিল্লির দিওয়ান-ই-খাস ও দিওয়ান-ই-আমে অলঙ্কারের ছড়াছড়ি, তুগলুক যুগের স্থাপত্যে অলঙ্কার প্রায় নেই– পাঠক দিল্লি দেখার সময় এই তত্ত্বটি সম্বন্ধে সচেতন থাকবেন।(২) অথচ দুই-ই সার্থক রসসৃষ্টি।

এই সামঞ্জস্য যদি খাড়াই-চওড়াই– অর্থাৎ মাত্র দুই দিক নিয়ে হয় তবে সেটা ছবি। শুধু সামনের দিক থেকে দেখা যায়। তিন দিক নিয়ে–তিন ডাইমেনশনাল–হলে সেটা ভাস্কর্য কিংবা স্থাপত্য। কিন্তু অনেক সময় মূর্তির পিছনদিকটা অবহেলা করা হয় বলে সেটাকে শুধু সামনের দিক থেকে দেখতে হয়। গড়ের মাঠের যেসব মূর্তি ঘোড়সওয়ার নয় সেগুলো পিছন থেকে দেখতে রীতিমতো খারাপ লাগে (বস্তুত এই সমস্যা সমাধানের জন্যই অনেক নিরীহ লোককে ঘোড়ায় চড়ানো হয়েছে) এবং বাসটগুলো পিছন থেকে রীতিমতো কদাকার বলে সেগুলোকে দেওয়ালের গায়ে ঠেলে দেওয়া হয় যাতে করে পিছন থেকে দেখবার কোনও সম্ভাবনাই না-থাকে। বিদ্যাসাগরের মূর্তিটি জলের কাছে রয়েছে বলেই ওই সমস্যাটির সমাধান হয়েছে– জলে সাঁতরাতে সাঁতরাতে মূর্তির পিছনদিকে তাকাবে কজন লোকে?

কিন্তু স্থাপত্যের বেলা সেটি হবার জো নেই। স্থাপত্য এমন হবে যে সেটাকে যেন সবদিক থেকে এবং বিশেষ করে যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। কোনও জায়গা থেকে যদি, ধরুন, মনে হয়, দুটো মিনার এক হয়ে গিয়ে কেমন যেন দেউড়িটাকে ঢেকে অপ্রিয়দর্শন করে তুলেছে তবে বুঝবেন স্থপতি আর্টের কোনও একটা সমস্যার ঠিক সমাধান করতে পারেননি বলেই এস্থলে তাল কেটেছেন, অর্থাৎ রসভঙ্গ করেছেন।

মসজিদ মাত্রেরই একটা খুঁত, ঠিক এই কারণে থেকে যায়। শাস্ত্রের হুকুম মসজিদের পশ্চিম দিক যেন বন্ধ থাকে, যাতে করে নমাজিদের সামনে কোনও বস্তু তার দৃষ্টিকে আকর্ষণ না-করতে পারে। ফলে বাধ্য হয়ে স্থপতিকে পশ্চিম দিকে দিতে হয় খাড়া পাঁচিল। এটার সঙ্গে আর বাদবাকি তিন দিক কিছুতেই খাপ খাওয়ানো যায় না বলে, মসজিদ শুধু তিন দিক থেকে দেখা যায়। ধর্মতলার টিপু সুলতানের মসজিদ কিছু উত্তম রসসৃষ্টি নয়– দক্ষিণি ঢঙের গম্বুজগুলোই যা দেখবার মতো কিন্তু পাঠক সেটাকে একবার প্রদক্ষিণ করলেই সমস্যাটা বুঝে যাবেন। দিল্লির পুরনো মসজিদে-মসজিদে পাঠক দেখবেন, স্থপতি কতরকম চেষ্টা করেছেন এই সমস্যা সমাধানের।

সমাধি, রাজপ্রাসাদ, বিজয়স্তম্ভ সম্বন্ধে শাস্ত্রের কোনও বাধাবন্ধক নেই। তাই সেগুলোতে এ অপরিপূর্ণতা থাকা মারাত্মক। সচরাচর থাকেও না।

পূর্বেই নিবেদন করেছি সার্থক স্থাপত্য যেকোনো জায়গাতে, যেকোনো দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখা যায়। কিন্তু তবু প্রশ্ন ওঠে, সবচেয়ে ভালো কোন জায়গা থেকে দেখা যায়? উচ্চাঙ্গ মোগলস্থাপত্য মাত্রেই স্থপতি এর নির্দেশ নিজেই দিয়ে গিয়েছেন। স্থাপত্যে পৌঁছবার। বেশকিছুটা আগে যে প্রধান তোরণদ্বার (দেউড়ি-গেটওয়ে) থাকে– এরই উপর নহবতখানা– তার ঠিক নিচে দাঁড়ালেই স্থাপত্যের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সাধারণত ছবি এ-জায়গা থেকেই ভালো ওঠে। আর যদি নিজের রসবোধ তার সঙ্গে সংযোজন করতে চান, তবে একটু পিছিয়ে গিয়ে দেউড়ির আচঁসুদ্ধ ছবি তুললে তাতে ইসথেটিক ইফেকট” আসবে– যদিও মূল স্থাপত্যের কিছুটা হয়তো তাতে করে কাটা পড়বে।

এ সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু আমার মনে হয় স্থাপত্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গত সে আলোচনা তোলাই সঙ্গত।

***

দিল্লির স্থাপত্য তার রাজবংশানুযায়ী ভাগ করা যায়।

 ॥১॥ দাস বংশ

কুতুব মিনার, কওতুল-ইসলাম মসজিদ, ইলতুতমিশের সমাধি। (কওওতুল-ইসলাম মসজিদের আঙিনায়– সেহন- চন্দ্ররাজা নির্মিত একটি শতকরা নিরানব্বই ভাগের লৌহস্তম্ভ আছে। এটি ও মসজিদের থামগুলো হিন্দুযুগের। –সবকটি কুতুবের গা ঘেঁষে।

॥ ২ ॥ খিলজি-বংশ

আলাউদ্দিন খিলজি নির্মিত ‘আলা-ই-দরওয়াজা’- কুতুবের গা ঘেঁষে। আলাউদ্দিন কিংবা তাঁর ছেলের (‘দেবল-দেবীর’ বল্লভ) তৈরি মসজিদ দিল্লি–মথুরা ট্রাঙ্ক রোডের উপর (নিউ দিল্লি থেকে মাইলখানেক) নিজামউদ্দিন আউলিয়ার(৩) দরগার ভিতর(৪)।

॥ ৩ ॥ তুগলুক-বংশ

গিয়াসউদ্দীন তুগলুক(৫) নির্মিত আপন সমাধি–-কুতুব থেকে মাইল তিনেক দূরে তাঁরই নির্মিত তুগলুকাবাদের সামনে। তুগলুকাবাদ।

ফিরোজ তুগলুক নির্মিত হাউজ খাস– দিল্লি থেকে কুতুব যাবার পথে রাস্তার ডানদিকে। ফিরোজ নির্মিত ফিরোজশাহ-কোটলা– দিল্লি এবং নয়াদিল্লির প্রায় মাঝখানে (অন্যান্য দ্রষ্টব্যের ভিতর এখানে আছে একটি অশোকস্তম্ভ; ফিরোজ এটাকে দিল্লিতে আনিয়ে উঁচু ইমারত বানিয়ে তার উপরে চড়ান)।

৪. সৈয়দ এবং লোদি-বংশ

লোদি গার্ডেনস নয়াদিল্লির লোদি এসটেটের গা ঘেঁষে– ভিতরে আছে, (ক) মুহম্মদ শাহ সৈয়দের কবর, (খ) সিকন্দর লোদির তৈরি মসজিদ এবং মসজিদের প্রবেশগৃহ, (গ) অজানা কবর এবং (ঘ) সিকন্দর লোদির কবর।

ইসা খানের কবর– হুমায়ুনের কবরের বাইরে। যদিও পরবর্তী যুগের, তবু লোদিশৈলীতে তৈরি।

॥ ৫॥ মোগল-বংশ

বাবুর কিছু তৈরি করার সময় পাননি। কেউ কেউ বলেন, পালম অ্যারপোর্টের সামনে যে দুর্গের মতো সরাই এটি তাঁর হুকুমে তৈরি। এতে দ্রষ্টব্য কিছুই নেই।

হুমায়ুনও এক পুরনো কিলা (ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের পিছনে) ছাড়া কিছু করে যেতে পারেননি। পুরনো কেল্লারও কতখানি তার, কতখানি শের শা’র, বলা শক্ত। কেল্লার ভিতরে মসজিদটি কিন্তু শের শা’র তৈরি এবং এর শৈলী পাঠান-মোগল থেকে ভিন্ন। সাসারামে শেরের কবর সৈয়দ-লোদি শৈলীতে।

হুমায়ুনের বিধবার– আকবরের মাতার– তৈরি হুমায়ুনের কবর। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগার সামনে, দিল্লি-মথুরা রোডের ওপাশে।

আকবরের কীর্তি-কলা আগ্রাতে– সেকেন্দ্রা ফতহ্-পুর সিক্রি, আগ্রা দুর্গ। ওই সময়ে তৈরি দিল্লিতে আছে আৎকা খান, আজিজ কোকলতাশ, আব্দুর রহীম খান-খানা ও আদহম্ খানের কবর।

শাহাজাহান– দিল্লি দুর্গ বা লাল কিলা। তার-ই সামনে চাঁদনি চৌকের কাছে জাম-ই মসজিদ।

ঔরঙ্গজেব– লাল কিলার ভিতর মোতি মসজিদ।

ঔরঙ্গজেবের ভগ্নী রৌশনারার নিজের তৈরি সমাধি– রৌশনারা-গার্ডেনসের ভিতর।

ঐতিহাসিক মাত্রেই জানেন, ঔরঙ্গজেবের পরের বাদশাদের অর্থ ও প্রভাব দুই-ই কম ছিল বলে এঁরা প্রায় কিছুই করে যেতে পারেননি। যেটুকু আছে তাতে আলঙ্কারিক সৌন্দর্য যথেষ্ট বটে, কিন্তু স্থাপত্যের লক্ষণ প্রায় নেই– স্থপতি সে-চেষ্টা করেনওনি। এর ভিতর উল্লেখযোগ্য জাহানারা, মুহম্মদ শাহ বাদশাহ রঙ্গিলা, এবং দ্বিতীয় আকবরের (ইনি রাজা রামমোহনকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়ে বিলেত পাঠিয়েছিলেন) কবর। তিনটিই নিজামউদ্দিনের দরগার ভিতরে। মোগল স্থাপত্যের ‘শেষ নিশ্বাস’ সফদর-জঙ্গের সমাধি ও তৎসংলগ্ন মসজিদ– কুলোকে বলে এটার মার্বেল আব্দুর রহীম খানখানার কবর থেকে চুরি করা। ইমারতটি যদিও অপেক্ষাকৃত বৃহৎ তবু তার সৌন্দর্য নিম্নশ্রেণির, রুচির বিলক্ষণ অধোগতি এতে স্পষ্ট ধরা পড়ে। ছবিতে হুমায়ুনের কবর, তাজমহল, এমনকি আকা খানের ছোট কবরটির সঙ্গে তুলনা করলেই পাঠক আমার বক্তব্য বুঝতে পারবেন। আকা খানের কবরটি আমার বড় প্রিয় স্থাপত্য। দিল্লির লোক এ কবরটির খবর রাখে না, কারণ এটি নিজামউদ্দিনের দরগার এক নিভৃত কোণে পড়ে আছে।

দিল্লিতে তিনটি বড় দরগা আছে। প্রথমটি কুত্ত্বউদ্দিন বখতিয়ার কাকির। ইনি কুত্বউদ্দীন আইবকের গুরু ছিলেন। অনেকের ধারণা আইবক গুরুর স্মরণে কুতুব মিনার নির্মাণ করেছিলেন। দরগাটি কুতুব মিনারের কাছেই এবং ‘কুতুব সাহেব’ নামে পরিচিত।

দ্বিতীয়টি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার এবং তৃতীয়টি নাসিরউদ্দিন ‘চিরাগ দিল্লি’র। দরগাটি দিল্লি থেকে মাইল তিনেক দূরে।

প্রথমটির পত্তন দাস-আমলে, দ্বিতীয়টির খিলজি আমলে এবং তৃতীয়টির তুগলুক আমলে। সেই যুগ থেকে শেষ-মোগল পর্যন্ত এসব দরগাতে বহু ভক্ত নানা ইমারত গড়েছেন বলে অল্পের ভিতর সব স্থাপত্যেরই নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু চোখ কিছুটা না বসা পর্যন্ত এসব জায়গায় গবেষণা করা বিপজ্জনক।

কুতুব মিনার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার। ইংরেজ পর্যন্ত একথা স্বীকার করেছে। আশ্চর্য মনে হয় যে, এর পূর্ববর্তী নিদর্শন এদেশে নেই, ইরান-তুরানেও নেই। বহু স্থপতির বহু একসপেরিমেন্টের সম্পূর্ণ ফায়দা উঠিয়ে তাজ নির্মিত হল– কিন্তু মিনারের ক্ষেত্রে কুতুব প্রথম এবং শেষ একত্সপেরিমেন্ট। এ ধরনের বিজয়স্তম্ভ পূর্বে কেউ করেনি; কাজেই গুণীজনের বিস্ময়ের অবধি নেই যে, হঠাৎ স্থপতি এ সাহস পেল কোথা থেকে? কানিংহাম, ফার্গুসন, কার স্টিফেন, স্যর সৈয়দ আহমদ অনেক ভেবে-চিন্তেও এর কোনও উত্তর দিতে পারেননি।

কুতুব পাঁচতলার মিনার। প্রথম তলাতে আছে ‘বাঁশি’ ও ‘কোণে’র পর-পর সাজানো নকশা। দ্বিতীয় তলাতে শুধু বাঁশি, তৃতীয় তলাতে শুধু কোণ; চতুর্থ ও পঞ্চম তলাতে কী ছিল জানার উপায় নেই, কারণ বজ্রাঘাতে সে দুটি ভেঙে যাওয়ায় ফিরোজ তুগলুক (যিনি ‘অশোকস্তম্ভ’ দিল্লি আনেন; ইনি যেমন নিজে সোসাহে ইমারত বানাতেন ঠিক তেমনি অকাতরে অন্যের ইমারত মেরামত করে দিতেন– দিল্লির অতি অল্প রাজাতেই এই দ্বিতীয় গুণটি পাওয়া যায়। সে দুটি মার্বেল দিয়ে মেরামত করে দেন। পঞ্চমটিতে নাকি আবার সিকন্দর লোদিরও হাত আছে। মিনারের মুকুটরূপে সর্বশেষে (যেখানে এখন আলো জ্বালানো হয়) কী ছিল সে সম্বন্ধে রসিকজনের কৌতূহলের অন্ত নেই।(৬) দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা মিনারকে স্থপতি কী রাজমুকুট পরিয়েছিলেন সেখানেও তিনি তাল রেখে শেষরক্ষা করতে পেরেছিলেন কি না, তার যে অদ্ভুত কল্পনাশক্তি মিনারের সর্বাঙ্গে স্বপ্রকাশ সে-কল্পনাশক্তি দিয়ে তিনি দর্শককে কোন দ্যুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কে জানে?

ইমারত তৈরি করা কত সোজা! কারিগরের হাতে সেখানে কত অজস্র মাল-মশলা! গম্বুজ, থাম, আর্চ, ছত্রি, মিনারেট, ছজ্জা (ড্রিপস্টোন), কার্নিস, ব্র্যাকেট কত কী! তার তুলনায় একটা সোজা খাড়া স্তম্ভে সৌন্দর্য আনা কত শক্ত! এখানে শিল্পী সফল হয়েছেন শুধু সেটাকে কয়েকটি তলাতে বিভক্ত করে, সামঞ্জস্য রেখে প্রতি তলায় তাকে একটু ছোট করে করে, গুটিকয়েক ব্যালকনি লাগিয়ে দিয়ে এবং মিনারের গায়ে কখনও ‘বাঁশি’, কখনও ‘কোণে’র নকশা কেটে। ‘প্রপশনে’র এরকম চূড়ান্ত পৃথিবীর আর কোনও মিনারে পাওয়া যায় না।

আর তার গায়ের কারুকার্যও অতি অদ্ভুত। বাঁশি এবং কোণের উপর দিয়ে সমস্ত মিনারটিকে কোমরবন্ধের মতো ঘিরে রয়েছে সারি সারি লতা-পাতা, ফুলের মালা, চক্রের নকশা। এগুলো জাতে হিন্দু এবং এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে একসারি অন্তর অন্তর আরবি লেখার সার– সেগুলো জাতে মুসলমান। কিন্তু উভয় খোদাইয়ের কাজই যে হিন্দু শিল্পী করেছেন সে বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। গোটা মিনারটির পরিকল্পনা করেছে মুসলমান, যাবতীয় কারুশিল্প করেছে হিন্দু ভারতবর্ষে মুসলমানদের সর্বপ্রথম সৃষ্টিকার্যে হিন্দু-মুসলমান মিলে গিয়ে যে অদ্ভুত সাফল্য দেখিয়েছিল সে-মিলন পরবর্তী যুগে কখনও ভঙ্গ হয়নি, কভু-বা মুসলমানের প্রাধান্য বেশি, কোনও ইমারতে হিন্দুর প্রাধান্য বেশি। আটশত বৎসর একসঙ্গে থেকেও হিন্দু-মুসলমান চিন্তার ক্ষেত্রে, রাজনীতির জগতে সম্পূর্ণ এক হয়ে যেতে পারেনি, কিন্তু কলার প্রাঙ্গণে (স্থাপত্য, সঙ্গীত এবং নৃত্যে) প্রথমদিনেই তাদের যে মিলন হয়েছিল আজও সেটি অটুট আছে।

কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর কোনও মিনার কখনও মাথা খাড়া করেনি। দীর্ঘ আট শতাব্দী ধরে বহু বাদশা বহু ইমারত গড়েছেন কিন্তু ‘কুতুবের চেয়েও ভালো মিনার গড়ব’ এ সাহস কেউ দেখাননি। যে ইংরেজ দিল্লিতে সেক্রেটারিয়েট, রাজভবন গড়ে, কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানিয়ে নিজেকে অতুল বিড়ম্বিত করেছে সে-ও বিলক্ষণ জানত কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনও স্থপতির কর্ম নয়। (৭)

আলাউদ্দিন খিলজির মতো দুঃসাহসী রাজা ভারতবর্ষে কমই জনেছেন। একমাত্র তিনিই চেয়েছিলেন, কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দিতে। তাই কুতুবের দ্বিগুণ ঘের দিয়ে তিনি আরেকটি মিনার গড়তে আরম্ভ করেন– বাসনা ছিল মিনারটি কুতুবের দ্বিগুণ উঁচু হবে। ইমারত মাত্রেরই একটা অপটিমাম সাইজ আছে– অর্থাৎ যার চেয়ে বড় হলে ইমারত খারাপ দেখায়, ছোট হলেও খারাপ দেখায় (সর্ব কলাতেই এ সূত্র প্রযোজ্য; কিন্তু স্থাপত্যের বেলা এটা অন্যতম মূলসূত্র)– কাজেই আলাউদ্দিনের চূড়া ডবল হলে ফল কী ওতরাতো বলা কঠিন। তা সে যা-ই হোক, মিনারের কাঠামোর কিছুটা শেষ হতে-না-হতেই ওপারের ডাক খিলজির কানে এসে পৌঁছল, যে পারে খুব সম্ভব মিনার হাতে নিয়ে লাঠালাঠি চলে না।

আপন মহিমায় নিজস্ব ক্ষমতায় যে স্তম্ভ দাঁড়ায় তার নাম মিনার, এবং মসজিদ, সমাধি কিংবা অন্য কোনও ইমারতের অঙ্গ হিসেবে যে মিনার কখনও থাকে, কখনও থাকে না, তার নাম মিনারেট মিনারিকা। কুতুবের পর পাঠান-মোগল বিস্তর মিনারেট গড়েছে; কিন্তু সেগুলোও কুতুবের কাছে আসতে পারে না। তাজের মিনারিকা ভুবনবিখ্যাত; কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি শিল্পী সেখানে নতমস্তকে হার মেনে নিয়ে সেটাকে সাদামাটার চরমে পৌঁছিয়ে খাড়া করেছেন। পাছে লোকে তাঁর মিনারিকার সঙ্গে কুতুবের তুলনা করে লজ্জা দেয় তাই তিনি সেটাকে গড়েছেন এমন ন্যাড়া করে যে দর্শকের মন অজান্তেও যেন কুতুবকে স্মরণ না করে। না হলে যে তাজের সর্বাঙ্গে গয়নার ছড়াছড়ি তার চারখানা মিনারিকাস্তম্ভে ‘নোয়াটুকু’র চিহ্ন নেই কেন? ওদিকে দেখুন, হুমায়ুনের সমাধি-নির্মাতা ছিলেন আরও ঘড়েল–তিনি তাঁর ইমারতটি গড়েছেন মিনারিকা সম্পূর্ণ বর্জন করে।

দিল্লি-আগ্রার বহু দূরে, কুতুবের আওতার বাইরে, গুজরাতের রাজধানী আহমদাবাদে আমি একটি মিনারিকা দেখেছি যার সঙ্গে কুতুবের কোনও মিল নেই এবং বোধহয় ঠিক সেই কারণেই তার নিজস্ব মূল্য আছে। রাজা আহমদের– এঁরই নামে আহমদাবাদ– বেগম রানি সিপ্রির মসজিদে একটি মধুরদর্শন মিনারিকা বহু ভূপর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গুজরাত এবং রাজপুতানার মেয়েরা তাদের বাহুলতা মণিবন্ধে যে বিচিত্র-আকার, বিচিত্র-দর্শন অসংখ্য বলয়-কঙ্কণ পরে এ মিনারিকা যেন সেই কমনীয়তায় অনুপ্রাণিত। রাজেশ্বরী সিপ্রি যেন তাঁরই অনুপম হাতখানি নভোলোকের দিকে তুলে ধরেছেন ভুবনেশ্বরের ললাটে তিলক পরিয়ে দেবেন বলে।

কুতুবের সঙ্গে সঙ্গে– আসল কুতুব তৈরি হয় প্রথম তলা থেকে নমাজের আজানের জন্য– নির্মিত হয় কুওওতুল ইসলাম মসজিদ। এ মসজিদে এখন দর্শনীয় তার উন্নতদর্শন তোরণ (আর্চ) এবং স্তম্ভগুলো। ভারতীয় কারিগর তখনও জোড়ের পাথর (কি-স্টোন) তৈরি করে তার গায়ে গায়ে চৌকো পাথর লাগিয়ে আর্চ বানাতে শেখেনি বলে(৮) আর্চের সঙ্গে জোড়া বাকি ইমারত ভেঙে পড়েছে, কিন্তু রসের বিচারে এ আর্চটি এখনও অতুলনীয়। এর শান্ত গাম্ভীর্য, আপন কৌলীন্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত ঋজু অবস্থিতি নিতান্ত অরসিকজনেরও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। পরবর্তী যুগে বহু জায়গায় বিস্তর আর্চ নির্মিত হয়েছে, কিন্তু এর প্রসাদগুণ এখনও অতুলনীয়।

এবং এর গায়ে যে হিন্দু কারুকার্য তার সুনিপুণ দক্ষতা, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং মন্দাক্রান্তা গতিচ্ছন্দ দেখে যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। যেন অজন্তা-ইলোরার চিত্রকর শিলাকর দু জনে মিলে প্রাণের আনন্দে এর প্রতিটি রেখা প্রতিটি বক্র প্রতিটি চক্র এঁকে চলেছে। এদের নিশ্চয়ই বলা হয়েছিল যে মুসলমান স্থাপত্যে পশুপক্ষী আঁকা বারণ। সেইটে মেনে নিয়ে কী আশ্চর্য নৈপুণ্যে ‘শেষনাগ’ মতিফকে এরা সাপ না বানিয়েও সাপ এঁকেছে সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় কলার সঙ্গে এরা কুরানের হরফও খোদাই করেছে সমান দক্ষতা নিয়ে। উভয়ের সংমিশ্রণ অপূর্ব, রসসৃষ্টি অসামান্য।

কুওওতুল ইসলাম মসজিদের থামগুলো হিন্দু বৌদ্ধ ও জৈন মন্দির থেকে নেওয়া। এদের গায়ে দর্শক বিস্তর পশুপক্ষী, বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্য এবং অন্যান্য দেব-দেবীর নানা মূর্তি দেখতে পাবেন। মসজিদ গড়ার সময় এগুলোর গায়ে পলেস্তরা লাগিয়ে মূর্তিগুলো ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। পলেস্তরা খসে যাওয়াতে এখন আবার দেখা যাচ্ছে।

এভাবে প্রতিটি ইমারত নিয়ে খুঁটিয়ে আলোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তা হলে দশ-ভলুমি কেতাব লিখতে হয়– এবং সেগুলো কেউ পড়বে না। আমার উদ্দেশ্য– বাকি ইমারতগুলো দর্শক যেন নিজে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন।

যেমন, কুওওতুল ইসলামের গম্বুজ রসের ক্ষেত্রে নগণ্য– তার পরের ইমারত ইলতুৎমিশের সমাধিতে সেটা ভেঙে পড়ে গিয়েছে– খিলজি যুগে সেটা সুন্দর হতে আরম্ভ করেছে, তুগলুক যুগে গম্বুজ রীতিমতো রসসৃষ্টি করে ফেলেছে; সৈয়দ-লোদি যুগে সে পৃথিবীর আর দশটা গম্বুজের সঙ্গে পাল্লা দিতে আরম্ভ করেছে, হুমায়ুনের গম্বুজকে তো কেউ কেউ তাজের চেয়েও ভালো বলেছেন, আর তাজের তন্বঙ্গ গম্বুজ, শুনি, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ। দেখলে পরে তার ক্ষীণ কটিকে নাকি জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।

কিংবা আর্চের উত্থান-পতন দেখুন। কিংবা দেখুন ছত্রির আবির্ভাব ক্রমবিকাশ। হুমায়ুনের কবর ও তাজের ছাতের উপরকার ছত্রির মতো ছত্রি পৃথিবীর আর কোথাও পাবেন না। স্থাপত্যে ছত্রির ব্যবহার মুসলমানেরা এদেশে এসে শিখল। তাই এদেশের স্থাপত্যের স্কাই-লাইন ইরান-তুরানের স্থাপত্যকে এ-বাবদে অনায়াসে হার মানায়।

কিংবা দেখুন, ভিতরকার কারুকার্য, যার পরিসমাপ্তি তাজের ‘মর্মরম্বপ্নে’।

দাস-যুগের শেষের দিকে মুসলিম জিওমেট্রিক ডিজাইনের বাড়াবাড়ি হয়েছিল, খিলজি-যুগে ভারসাম্য ফিরে পেল।

তুগলুক যুগে পাবেন দার্চ–শক্তিশালী স্থাপত্যের পরিপূর্ণতা! অলঙ্কার এখানে বাহুল্যরূপে বর্জিত। দেয়াল বাঁকা– যেন পিরামিডের ঢঙে ট্যারচা করে একে আরও মজবুত করার চেষ্টা হয়েছে, গম্বুজও শক্তির পরিচায়ক। লাল পাথর, কালো শ্লেট (তখনও কালো মার্বেল এ-দেশে আসেনি) এবং মর্মরের ধবল– এই তিন রঙের খেলা নিয়েই স্থপতি এখানে অলঙ্কারহীন দৃঢ়তার একঘেয়েমি ভেঙেছেন। গিয়াসউদ্দিন তুগলুকের কবর এরই প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।

সৈয়দ-লোদি বংশদ্বয়ের অর্থ ও প্রতিপত্তি দুই-ই ছিল সামান্য। তাই এঁদের কলা-প্রচেষ্টা ছোট ইমারতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। ওদিকে ইরান-তুরানের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বলে সে-দিক থেকে নব নব অনুপ্রেরণাও আসছিল না। ফলে তাদের স্থাপত্যে হিন্দুপ্রাধান্য বেশি এবং ছোট ইমারতে অলঙ্কারের প্রয়োজন বড় ইমারতের চেয়ে বেশি। কম্পজিশনেও এই প্রথম হিন্দুপ্রভাব স্পষ্ট হয়ে এল। বস্তুত এই আটকোণওলা ইমারত এবং আটদিকের ঘেরা বারান্দা বৌদ্ধস্তূপ এবং তার প্রদক্ষিণচক্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়। হিন্দুরা স্তম্ভ-নির্মাণে চিরকালই দক্ষ, ছত্রিও তাদেরই সৃষ্টি। হিন্দু ছজ্জা (ড্রিপস্টোন এগিয়ে আসা কার্নিসের মতো) ছাতের বৃষ্টি ছড়িয়ে দেবার জন্য এদেশে প্রয়োজন–ইরানে দরকার নেই বললেও চলে– সে-সব এসে এখানে ইমারতের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। তুগলুক প্রভাব এখানে অতি সামান্য কেবলমাত্র ট্যারচা স্তম্ভে কিছুটা পাওয়া যায়। সৈয়দ-লোদি স্থাপত্য দেখে মানুষ হতবাক হয় না সত্য, কিন্তু এর এমন একটা কমপেক্টনেস বা ঠাস-বুনুনি আছে যা অন্য স্থাপত্যে বিরল। অল্প দিয়ে রসসৃষ্টিতে সৈয়দ-লোদি প্রথম না হলেও প্রধানদের একজন।

মোগল-যুগ আরম্ভ হল হুমায়ুনের কবর দিয়ে। সেখানে ইরান-তুরানের প্রাধান্য। কিন্তু ছবি এবং পদ্মফুলের ডিজাইন এখানে প্রচুর এবং কারুকার্যেও হিন্দুপ্রাধান্য বেশি। কিন্তু এতে ইরানি ভাব এত কমে গিয়েছে যে, কোনও কোনও ইমারতে কার প্রাধান্য বেশি কিছুতেই স্থির করা যায় না। সেকেন্দ্রার গম্বুজ শেষ করার পূর্বেই আকবর ইহলোক ত্যাগ করেন– তাই বলা শক্ত সম্পূর্ণ সমাধি মনে রসের কোন ভাবের উদয় করে দিত। দিওয়ান-ই-খাস্ ও আম্ যে অলঙ্কারের চূড়ান্তে পৌঁছে গিয়েছে সে সত্য তো পৃথিবীর সবাই স্বীকার করে নিয়েছে। এতদিন বলা হত, পাঠান স্থাপত্যে স্থপতি ও স্বর্ণকার একজোটে কাজ করেছেন। দিওয়ান-ই-খাস ও আম দেখে লোকে বলল, এইবারে এসে জহুরিও যোগ দিয়েছেন। মোগল-কলা এত বিচিত্র ও ভিন্নমুখী যে, তাকে গুটিকয়েক সূত্রে ফেলা প্রায় অসম্ভব। তবে স্থাপত্যের বিকাশ দেখতে হলে সবচেয়ে উত্তম পন্থা হুমায়ুনের কবর ও তাজ দুটি মিলিয়ে দেখা। দুটোর গম্বুজ মিলিয়ে দেখুন, ছত্রিগুলো কার ভালো (এখানে বলা উচিত হুমায়ুনের ছত্রিগুলো নীল টাইলে ঢাকা ছিল; এখন উঠে গিয়ে কালো হয়ে গিয়েছে– তাই আগে ছিল গম্বুজ মর্মরের সাদা, পুরো ইমারত লাল পাথরের আর ছত্রিগুলোর গম্বুজ নীল; তাজে তিনই মার্বেলের); হুমায়ুনের ভিত্তিতে এক সার আর্চ (তার ভিতর দিয়ে নিচে যাওয়া যায়), তাজে তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে মাত্র; গুলদন্তাজ (মিনারিকারও ছোট মিনারিকা যার শেষ হয় অধস্কুট পদ্মকোরকে) দুই ইমারতেই একরকম; নির্মাণকালে হুমায়ুনে ছিল লাল-সাদা-নীলের সামঞ্জস্য, তাজ শুভ্র-ধবল এবং সবচেয়ে বড় পার্থক্য– হুমায়ুনে মিনারিকা নেই, তাজের চার কোণে চারটি। আপনার কোনটি ভালো লাগে? আর এই শৈলীর অধঃপতন দেখতে হলে দেখুন সফদরজঙ্গের কবর ওয়েলিংডন অ্যারোড্রামের কাছে।

স্পষ্ট দেখছি হুমায়ুনে দার্ঢ্য, তাজে মাধুর্য।

তার কারণ, অনেক ভেবে আমি মন স্থির করেছি, হুমায়ুনের সমাধি নির্মাণ করেছেন তার বিধবা স্বামীর জন্য। তাই তাতে পৌরুষ সমধিক। তাজ নির্মাণ করেছেন বিরহকাতর স্বামী– প্রিয়ার জন্য। তাই সেটিতে লালিত্য বেশি।

————

১. ‘আধেক ঘুমে নয়ন চুমে’ গানটি সার্থক, এবং এই নীতির প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।

২. ‘তুলসীর মূলে যেন সুবর্ণ দেউটি উজলিল দশ দিক’– এবং পিকবরবর নব-পল্লব মাঝারে দুটিই সার্থক। প্রথমটিতে অলঙ্কার নেই। অলঙ্কারের বাড়াবাড়ি হলে কাব্য দুর্বল হয়ে পড়ে। মেঘদূতের তুলনায় যেরকম গীত-গোবিন্দ।

৩, ৪. ‘দৃষ্টিপাতে’ উল্লিখিত ‘দিল্লি দূর অস্ত’ কাহিনীর নায়কদ্বয়। গিয়াসের ছেলে ‘পাগলা’ রাজা মহম্মদ তুগলুকের তৈরি ‘আদিলাবাদ’-এর ভগ্নাবশেষে বিশেষ কিছু দেখবার নেই। মুহম্মদ এবং নিজামউদ্দিনের মিত্র কবি-ম্রাট আমির খুসরৌ (দেব-দেবীর প্রেমের কাহিনী ইনিই প্রথম ফারসিতে লেখেন) এবং প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনির কবর নিজামউদ্দিনের দরগার ভিতর।

৫. ইলতুতমিশের কন্যা সম্রাজ্ঞী রিজিয়ার যে কবর দিল্লিতে আছে সেটি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকেরা সন্দেহ প্রকাশ করেন।

৬. গেল শতকের গোড়ার দিকে এক ইংরেজ মেজরের হাতে কুতুবের মেরামতির ভার পড়ে। ব্যালকনি (গ্যালারির) রেলিঙগুলো ছিল বলে তিনি সেখানে চারপাপড়ির নিজস্ব নকশা দিয়ে রেলিঙ বানান নিচের হানিকুম্ অর্থাৎ মৌমাছির চাকের নকশা মূল স্থপতির এবং মাথায় নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত একটা মুকুট পরান। সেইটে দেখে দিল্লি-ওলারা সত্রাসে তারস্বরে চিৎকার করেছিল। বহু বৎসর পরে লর্ড কার্জন সেই মুণ্ডটি কেটে নিচে নামিয়ে দূরে সরিয়ে রাখেন।

৭. অক্টরলনি মনুমেন্টে কোনো কলাপ্রচেষ্টা নেই বলে সেটাকে কুতুবের সঙ্গে তুলনা করা অন্যায়– সেটাকে চটকলের চোঙার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বড়বাজারের দালানকোঠার সঙ্গে কেউ তাজের। তুলনা করে না।

৮, ইঞ্জিনিয়ারিঙ স্থাপত্যের অংশ বটে কিন্তু বিশুদ্ধ স্থাপত্য-রস আস্বাদনের সময় তার স্থান অতি নিচে। আর্চ, ডোম বানাতে ‘কি-স্টোন’ ইত্যাদি ইঞ্জিনিয়ারি ব্যাপার পাঠক চেম্বার অভিধান দেখেই বুঝে নিতে পারবেন। এসব স্থাপত্যের পশ্চাতে কী অদ্ভুত ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিল আছে তার আলোচনা আমি আদপেই করিনি। যেমন, কুতুবের আসল কেরামতি যে এত অল্প গোড়া (বেস্) নিয়ে এত উঁচু মিনার আর কোথাও হয়নি। অদ্ভুত ভারসাম্যই (ব্যালান্স) তার কারণ। এ যেন বাজিকর হাতের আঙুলের ডগায় বিশগজি বাঁশ খাড়া করে রেখেছে। ইঞ্জিনিয়ারি হিসেবে কণামাত্র ভুল থাকলে কুতুব হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেত।