প্রব্রজ্যা

প্রব্রজ্যা

রিয়োকোয়ানের বয়স যখন সতেরো তখন তাঁর পিতা রাজধানীতে চলে যাওয়ায় তিনি গ্রামের প্রধান নির্বাচিত হলেন। তার দুই বৎসর পরে রিয়োকোয়ান সংসার ত্যাগ করে সঙ্ঘে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

ধনজন সুখসমৃদ্ধি সর্বস্ব দিয়ে যৌবনের প্রারম্ভেই কেন যে রিয়োকোয়ান সংসার ত্যাগ করলেন তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফিশার প্রচলিত কিংবদন্তি বিশ্লেষণ করেছেন। কারও মতে রিয়োকোয়ানের কবিজন সুলভ অথচ তত্ত্বান্বেষী মন জনপদপ্রমুখের দৈনন্দিন কূটনৈতিক কার্যকলাপে এতই ব্যথিত হত যে তিনি তার থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে সঙ্রে শরণ নেন; কারও মতে ভোগবিলাসের ব্যর্থতা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরে তিনি সংসার ত্যাগ করেন।

রিয়োকোয়ান নাকি এই সন্ধ্যায় তাঁর প্রণয়িনী এক গাইশা(১) তরুণীর বাড়িতে যান। এমনিতেই তিনি গাইশাদের কাছে থেকে প্রচুর খাতিরযত্ন পেতেন, তার ওপর তখন তিনি গ্রামের প্রধান। গাইশা তরুণীরা রিয়োকোয়ানকে খুশি করার জন্যে নাচল, গাইল– প্রচুর মদও খাওয়া হল। কিন্তু রিয়োকোয়ান কেন যে চিন্তায় বিভোর হয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিলেন তার কোনও কারণ বোঝা গেল না। তার প্রিয় গাইশা তরুণী বারবার তার কাছে এসে তাঁকে আমোদ-আহ্লাদে যোগ দেওয়াবার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই কোনও ফল হল না। তিনি মাথা নিচু করে আপন ভাবনায় মগ্ন রইলেন।

প্রায় চার শ টাকা খরচ করে সে রাত্রে রিয়োকোয়ান বাড়ি ফিরলেন।

পরদিন সকালবেলা রিয়োকোয়ান বাড়ির পাঁচজনের সঙ্গে খেতে বসলেন না। তখন সকলে তাঁর ঘরে গিয়ে দেখে, তিনি কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। কী হয়েছে বুঝবার জন্য যখন কম্বল সরানো হল তখন বেরিয়ে এল রিয়োকোয়ানের মুণ্ডিত মস্তক আর দেখা গেল তার সর্বাঙ্গ জাপানি শ্রমণের কালো জোব্বায় ঢাকা।

আত্মীয়-স্বজনের বিস্ময় দূর করার জন্য রিয়োকোয়ান বিশেষ কিছু বললেন না, শুধু একটুখানি হাসলেন। তার পর বাড়ি ছেড়ে পাশের কশজি সঙ্রে (মন্দির) দিকে রওয়ানা হলেন। পথে তার বলুভা গাইশার বাড়ি পড়ে। সে দেখে অবাক, রিয়োকোয়ান শ্রমণের কৃষ্ণবাস পরে চলে যাচ্ছেন। ছুটে গিয়ে সে তাঁর জামা ধরে কেঁদে, অনুনয়-বিনয় করে বলল, “প্রিয়, তুমি এ কী করেছ! তোমার গায়ে এ বেশ কেন?’

রিয়োকোয়ানেরও চোখ জলে ভরে এল। কিন্তু তবু দৃঢ় পদক্ষেপে তিনি সঙ্ঘের দিকে এগিয়ে গেলেন।

হায়, অনন্তের আহ্বান যখন পৌঁছয় তখন সে ঝঞ্ঝার সামনে গাইশা-প্রজাপতি ডানা মেলে কি বল্লভকে ঠেকাতে পারে?

ফিশার বলেন, এসব কিংবদন্তি ভঁর মনঃপূত হয় না। তার মতে এগুলো থেকে রিয়োকোয়ানের বৈরাগ্যের প্রকৃত কারণ পাওয়া যায় না।

ফিশারের ধারণা, রিয়োকোয়ান প্রকৃতির দ্বন্দ্ব থেকে সন্ন্যাসের অনুপ্রেরণা পান। তিনি যে জায়গায় জন্মগ্রহণ করেন, সে জায়গায় প্রকৃতি গ্রীষ্ম-বসন্তে যেরকম মধুর শান্ত ভাব ধারণা করে ঠিক তেমনি শীতকালে ঝড়-ঝঞ্ঝার রুদ্র রূপ নিয়ে আঘাত আবেগ দিয়ে জনপদবাসীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ফিশারের ধারণা, রিয়োকোয়ানের প্রকৃতিতে এই দুই প্রবৃত্তিই ছিল; একদিকে ঋজু শান্ত পাইনবনের মন্দ-মধুর গুঞ্জরণ, অন্যদিকে হিম ঋতুর ঝা-মথিত বীচিবিক্ষোভিত সমুদ্রতরঙ্গের অন্তহীন উদ্বেল উচ্ছ্বাস।

প্রকৃতিতে এ দ্বন্দ্বের শেষ নেই– রিয়োকোয়ান তাঁর জীবনের দ্বন্দ্ব সমাধানকল্পে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। ফিশার দৃঢ়কণ্ঠে একথা বলেননি– এই তাঁর ধারণা।

মানুষ কেন যে সন্ন্যাস নেয় তার সদুত্তর তো কেউ কখনও খুঁজে পায়নি। সন্ন্যাসী-চক্রবর্তী তথাগত জরা-মৃত্যু দর্শনে নাকি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন; আরও তো লক্ষ লক্ষ নরনারী প্রতিদিন জরা-মৃত্যু চোখের সামনে দেখে, কিন্তু এই তারা তো সন্ন্যাস নেয় না? বার্ধক্যের ভয়ে তারা অর্থসঞ্চয় করে আরও বেশি, মৃত্যুভয়ে তো বৈদ্যরাজের শরণ নেয় প্রাণপণে–ত্রিশরণের শরণ নেবার প্রয়োজন তো তারা অনুভব করে না। যে জরা-মৃত্যু বুদ্ধদেবকে সন্ন্যাস এবং মুক্তি এনে দিল সেই জরা-মৃত্যুই সাধারণ জনকে অর্থের দাস এবং বৈদ্যের দাস করে তোলে।

গাইশা তরুণীর প্রেমের নিষ্ফলতা আর ক্ষণিকতা হৃদয়ঙ্গম করে রিয়োকোয়ান সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাই-বা কী করে হয়? প্রেমে হতাশ হলেই তো সাধারণ মানুষ বৈরাগ্য বরণ করে– রিয়োকোয়ানের বেলা তো দেখতে পাই গাইশা প্রণয়িনী তাঁকে করুণ কণ্ঠে প্রেম নিবেদন করে সন্ন্যাস-মার্গ থেকে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করছে।

এবং অতি সামান্য কারণেও তো মানুষ সন্ন্যাস নেয়। কন-ফুৎসিয় কেন সন্ন্যাস গ্রহণ করেন তার কারণ ছন্দে বেঁধে দিয়েছেন :

মসৃণ দেহ উচ্চপৃষ্ঠ উদ্ধত বলীয়ান
বৃষ চলিয়াছে ভয়ে তার কাছে কেহ নহে আগুয়ান
সে করিল এক ধেনুর কামনা অমনি শৃঙ্গাঘাত
 আমি লইলাম ভিক্ষাপাত্র; সংসারে প্রণিপাত!
(–সত্যেন দত্ত)

 এবং এসব কারণের চেয়েও ক্ষুদ্রতর কারণে মানুষ যে সন্ন্যাস নেয় তার উদাহরণ তো আমরা বাঙালি জানি। ‘ওরে বেলা যে পড়ে এল’– অত্যন্ত সরল দৈনন্দিন অর্থে এক চাষা আর এক চাষাকে এই খবরটি যখন দিচ্ছিল তখন হঠাৎ কী করে এক জমিদারের কানে এই মামুলি কথা কয়টি গিয়ে পৌঁছল। শুনেছি, সে জমিদার নাকি অত্যাচারীও ছিলেন এবং এ কয়টি কথা যে পূর্বে কখনও তিনি শোনেননি সে-ও তো সম্ভবপর নয়। তবে কেন তিনি সেই মুহূর্তেই পালকি থেকে বেরিয়ে একবন্ত্রে সংসার ত্যাগ করলেন?

সমুদ্রবক্ষে বারিবর্ষণ তো অহরহ হচ্ছে, শুক্তিরও অভাব নেই। কোটি কোটি বৃষ্টিবিন্দুর ভিতর কোনটি মুক্তায় পরিণত হবে কেউ তো বলতে পারে না, হয়ে যাওয়ার পরেও তো কেউ বলতে পারে না কোন শুক্তি কোন মুক্তায় মুক্তি পেল।

রাজার ডাকঘর অমলের জানালার সামনেই বসল কেন? অমলই-বা রাজার চিঠি পেল কেন?

শুধু পতঞ্জলি বলেছেন, ‘তীব্র সংবেগানামাসন্ন:’ (১, ২৯)। অর্থাৎ যাঁদের বৈরাগ্য ভাব প্রবল তারাই চিত্তবৃত্তি নিরোধ করে মোক্ষ পান। কিন্তু কাদের বৈরাগ্য ভাব প্রবল হয় আর কেনই-বা প্রবল হয় তার সন্ধান পতঞ্জলি তো দেননি।

তাই বোধহয় শাস্ত্রকাররা এই রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘সন্ন্যাসের সময়-অসময় নেই। যে মুহূর্তে বৈরাগ্য ভাবের উদয় হয় সেই মুহূর্তেই সন্ন্যাস গ্রহণ করবে।’

রিয়োকোয়ান উনিশ বৎসর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।

এ প্রসঙ্গে ফিশার বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে রিয়োকোয়ানের সন্ন্যাস গ্রহণ স্বার্থপরতা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি জনসাধারণের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তার থেকে তাঁকে স্বার্থপর বলা চলে না।’

এই সামান্য কথাটিতেই ফিশার ধরা দিয়েছেন যে তিনি ইয়োরোপীয়। সন্ন্যাস গ্রহণ কোনও অবস্থাতেই স্বার্থপরতার চিহ্ন নয়। অন্তত ভারতবর্ষে নয়।

সর্বস্ব ত্যাগ করে শান্তির সন্ধানে যাঁরা আত্মনিয়োগ করেন, তাঁদের সম্মুখে কী কী বাধাবিপত্তি উপস্থিত হতে পারে, তার বর্ণনা ভারতবর্ষের সাধকেরা দিয়ে গিয়েছেন। সংসার ত্যাগের প্রথম উত্তেজনায় মানুষ যে তখন সম্ভব-অসম্ভবের মাঝখানে সীমারেখা টানতে পারে না, সে সাবধানবাণী ভারতীয় গুরু বারবার সাধনার ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন এবং সবচেয়ে বেশি সাবধান করে দিয়ে গিয়েছেন উকট কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে।

ভারতবর্ষ নানা দুঃখ-কষ্টের ভিতর দিয়ে এইসব চরম সত্য আবিষ্কার করতে পেরেছে বলেই পরবর্তী যুগের ভারতীয় সাধকের ধ্যান-মার্গ অপেক্ষাকৃত সরল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু চীন-জাপান প্রভৃতি বৌদ্ধভূমি ভারতবর্ষের এ ইতিহাসের সঙ্গে সুপরিচিত নয়। তারা নিয়েছে আমাদের সাধনার ফল– আমাদের পন্থা যে কত পতন-অভ্যুদয় দ্বারা বিক্ষুব্ধ, তার সন্ধান ভারতবর্ষের বাইরে কম সাধকই পেয়েছেন। তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যে অসম্ভবের প্রত্যাশা করতে গিয়ে ভারতবর্ষের বাইরে বহু নবীন সাধক সাধনার দৃঢ় ভূমি থেকে বিচ্যুত হন।

রিয়োকোয়ানের জীবনী-লেখক অধ্যাপক ফিশারের বর্ণনা হতে তাই দেখতে পাই, তিনি সঙ্গে প্রবেশ করে কী অহেতুক কঠোর কৃসাধনের ভিতর দিয়ে নির্বাণের সন্ধানে আত্মনিয়োগ করলেন। স্বয়ং বুদ্ধদেব যেসব আত্মনিপীড়ন বর্জনীয় বলে বারবার সাধককে সাবধান করে দিয়েছেন, বহু জাপানি সঙ্গে সেই আত্মনিপীড়নকেই নির্বাণ লাভের প্রশস্ততম পন্থা বলে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল।

ফিশার বলেন, ‘সঙ্ঘের চৈত্যগৃহে কুশাসনের উপর পদ্মাসনে বসে দেওয়ালের দিকে মুখ করে নবীন সাধককে প্রহরের পর প্রহর আত্মচিন্তায় মনোনিবেশ করতে হত। একমাত্র আহারের সময় ছাড়া অন্য কোনও সময়েই দেয়াল ছাড়া অন্য দিকে চোখ ফেরাবার অনুমতি তাদের ছিল না। একটানা কুড়ি ঘন্টা ধরে কখনও কখনও তাদের ধ্যানে নিমজ্জিত থাকতে হত এবং সেই ধ্যানে সামান্যতম বিচ্যুতি হলে পিছন থেকে হঠাৎ স্কন্ধোপরি শুরুর নির্মম লড়াঘাত।’

ধ্যানে নিমজ্জিত হবার চেষ্টা যাঁরাই করেছেন, তাঁরাই জানেন, প্রথম অবস্থায় নবীন সাধক ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। একেই বলে জড়-সাধনা এবং পতঞ্জলি তাই যে উপদেশ দিয়েছেন, তার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অল্প সময়ে ফলোভের আশা করা সাধনার প্রতিকূল। অত্যধিক মানসিক কৃসাধনের ফলে কত সাধক যে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যান, সে কথা ভারতীয় গুরু জানেন বলেই শিষ্যকে অতি সন্তর্পণে শারীরিক ও মানসিক উভয় সাধনাতে নিযুক্ত করে ধীরে ধীরে অগ্রগামী হতে উপদেশ দেন।

আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে, রিয়োকোয়ান সঙ্রে উৎকট কৃসাধনায় ভেঙে পড়েননি। নয় বৎসর ধ্যান-ধারণার পর তাঁর গুরুর মৃত্যু হয়। রিয়োকোয়ান তখন সঙ্ ত্যাগ করে, পর্যটকরূপে বের হয়ে যান। রিয়োকোয়ানের পরবর্তী জীবনযাপনের পদ্ধতি দেখলে স্পষ্টই অনুমান করা যায়, তিনি অত্যধিক কৃসাধনের নিষ্ফলতা ধরতে পেরেছিলেন বলেই সঙ্ ত্যাগ করে পর্যটনে বাহির হয়ে যান।

দীর্ঘ কুড়ি বৎসর রিয়োকোয়ান ধ্যান-ধারণা ও পর্যটনে অতিবাহিত করেন। তাঁকে তখন কোন সব দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছিল, তার সন্ধান আমরা কিছুটা পাই তাঁর কবিতা থেকে; কিন্তু সেগুলো থেকে রিয়োকোয়ানের সাধনার ইতিহাস কালানুক্রমিকভাবে লেখবার উপায় নেই।

কিন্তু একটি সত্য আমরা সহজেই তাঁর কবিতা থেকে আবিষ্কার করতে পারি। দ্বন্দ্ব থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি রিয়োকোয়ান কখনও পাননি। মাঝে মাঝে দু-একটি কবিতাতে অবশ্য রিয়োকোয়ানকে বলতে শুনি, তিনি শান্তির সন্ধান পেয়েছেন, কিন্তু পরক্ষণেই দেখি ভিন্ন কবিতায়। তিনি হয় নববসন্তের আগমনে উল্লসিত, নয় বাদলের মাঝখানে দরিদ্র চাষার প্রাণান্ত পরিশ্রম দেখে বেদনানুভূতিতে অবসন্ন। আমার মনে হয়, রিয়োকোয়ান যে চরম শান্তি পাননি, সেই আমাদের পরম সৌভাগ্য। নির্ঘ জীবনের সন্ধান যারা পেয়েছেন, তাঁদের তো কবিতা রচনা করবার জন্য কোনও আবেগ থাকার কথা নয়। শান্ত রস এক প্রকারের রস হতেও পারে, কিন্তু সে রস থেকে কবিতা সৃজন হয় কি না তা তো জানিনে এবং হলেও সে রস আস্বাদন করবার মতো স্পর্শকাতরতা আমাদের কোথায়? দাক্ষিণাত্যের আলঙ্কারিকেরা তাই শঙ্করাবরণকে সন্ন্যাস রাগ বলে সঙ্গীতে উচ্চ স্থান দিতে সম্মত হন না। তাঁদের বক্তব্য সন্ন্যাসীর কোনও অনুভূতি থাকতে পারে না, আর, অনুভূতি না থাকলে রসসৃষ্টিও হতে পারে না।

রিয়োকোয়ানের কবিতা শঙ্করাবরণম্ বা সন্ন্যাস রাগে রচিত হয়নি। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ কুড়ি বৎসর সাধনা ও পর্যটনের পর যখন তিনি খবর পেলেন যে, তাঁর পিতা জাপানের রাজনৈতিক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাবার জন্য আত্মহত্যা করেছেন তখন এক মুহূর্তেই তাঁর সমস্ত সাধনা-ধন তাঁকে বর্জন করল।

খ্রিস্ট বলেছেন, ‘The foxes have holes and the birds of the air have nets; but the Son of man hath not where tolay his head’ অর্থাৎ মুক্ত পুরুষের জন্মভূমি নেই, আবাসভূমিও নেই। কিন্তু পিতার মৃত্যুতে রিয়োকোয়ান বিচলিত হয়ে হঠাৎ যেন বাল্যজীবনে ফিরে গেলেন।

হেথায় হোথায় যেখানে যখন আমি
তন্দ্রামগন– সুপ্তির কোলে আপনারে দিই ছাড়া
 সেই পুরাতন নিত্যনবীন স্বপ্নের মায়া এসে
গুঞ্জরে কানে, চিত্ত আমার সেই ডাকে দেয় সাড়া।
এ স্বপ্ন নয়, ক্ষণেকের খেদ, উড়ে-যাওয়া আবছায়া
এ স্বপ্ন হানে আমার বক্ষে অহরহ একই ব্যথা।
ছেলেবেলাকার স্নেহ ভালোবাসা, আমার বাড়ির কথা!

 এ কি শ্রমণের বাণী, এ কি সন্ন্যাসের নিরাবলম্বতা!

ফিশার বলেন, ‘মাতৃভূমির আহ্বান রিয়োকোয়ানকে এতই বিচলিত করে ফেলল যে তিনি স্বগ্রামের দিকে যাত্রা করলেন। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনকে সান্ত্বনা দেবার জন্য তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল।’

অসম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের মনে হয়, সান্তনা দেবার চেয়ে হয়তো সান্তনা পাওয়ার জন্যই তার হৃদয় তৃষাতুর হয়েছিল বেশি। আত্মজনের সঙ্গসুখ শ্ৰমণ রিয়োকোয়ান কখনও ভুলতে পারেননি; সে সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া ‘ক্ষণেকের খেদ’ নয়, চিত্তাকাশে ‘উড়ে-যাওয়া আবছায়া’ নয়, সে বেদনা অবচেতন মনে বাসা বেঁধে ক্ষণে ক্ষণে নির্বাণ অন্বেষণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু এই ক্ষুদ্র হৃদয়-দৌর্বল্যের হাতে নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলে কবি রিয়োকোয়ান শ্ৰমণ রিয়োকোয়ান হতে পারতেন না। কবি ও শ্রমণের মাঝখানে যে অক্ষয় সেতু রিয়োকোয়ান নির্মাণ করে গিয়েছেন, সে সেতু আমাদের কাছে চিরবিস্ময়ের বস্তু, সেই সেতুর বিশ্বকর্মা তিনি কখনওই হতে পারতেন না।

ফিশার বলেন, কিন্তু বাড়ির কাছে পৌঁছে রিয়োকোয়ান থমকে দাঁড়ালেন, নিজের আচরণে লজ্জিত হলেন এবং চিত্তসংযম আয়ত্ত করে দৃঢ় পদক্ষেপে দ্বিতীয়া প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন। ফিশার বলেন, বোধহয় রিয়োকোয়ানের সন্ন্যাসবৃত্তি তাঁর নীচাসক্তি থেকে প্রবলতর ছিল বলেই শেষ মুহূর্তে তিনি স্বগ্রামে প্রবেশ করলেন না। তাই হবে। কারণ, উপেন দুই বিঘে জমি কিছুতেই না ভুলতে পেরে শেষকালে যখন আপন বাস্তুভিটায় ফিরে এল, তখন সে দুটি আমের লোভ সম্বরণ করতে পারল না। আর যে চিত্ত সন্ন্যাসের দৃঢ় ভূমি নির্মাণে তৎপর সে চিত্ত ক্ষণিক দুর্বলতার মোহে স্বগৃহে ফিরে এলেও গৃহ-সংসারের প্রকৃত রূপ হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ও প্রবাসের দূরত্বে যে গৃহ তার কাছে মধুময় বলে মনে হয়েছিল (‘নিকটে ধূসর-জর্জর অতি দূর হতে মনোলোভা’) তার বিকট রূপ দেখে সে তখন পুনরায় ‘আমি লইলাম ভিক্ষাপাত্র সংসারে প্রণিপাত’ বলে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে।

বৌদ্ধ দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখতে গেলে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন সন্ন্যাসধর্মকে ক্ষুণ্ণ করে না। স্বয়ং বুদ্ধদেব বোধিলাভের পর কপিলাবস্তুতে ফিরে এসেছিলেন। শ্ৰমণ রিয়োকোয়ান বোধিলাভ করতে পারেননি বলেই স্বগ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।

এই সময় রিয়োকোয়ানের পিতার নিজের হাতের লেখা একটি কবিতা পুত্রের হাতে এসে পড়ে; কবিতাটি তিন লাইনে লেখা জাপানি হাক্কু পদ্ধতিতে রচিত :

কী মধুর দেখি রেশমের গাছে ফুটিয়াছে ফুলগুলি;
কোমল পেলব করিল তাদের
ভোরের কুয়াশা-তুলি!

রিয়োকোয়ানের মৃত্যুর পর এই কবিতাটি পাওয়া গিয়েছে। আর এক প্রান্তে রিয়োকোয়ানের নিজের হাতে লেখা, ‘হায়, এই কুয়াশার ভিতর বাবা যদি থাকতেন! কুয়াশা সরে গেলে তো বাবাকে দেখতে পেতুম।’

বোধহয়, এই সময়কারই লেখা আরেকটি কবিতা থেকে রিয়োকোয়ানের মনের সংগ্রাম স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে :

এই যে জীবন, এই যে মৃত্যু প্রভেদ কোথাও নাই,
 যে জন জানিল তার কাছে বাঁচা হয়ে ওঠে মধুময়।
কিন্তু হায় রে মাটি দিয়ে গড়া অন্ধ আমার হিয়া
ফিরে চারিদিকে– রিপুর ঝঞ্ঝা যখন যেদিকে বয়।
দুর্বার রণ! তার মাঝখানে শিশু আমি, অসহায়
ধুকধুকবুকে বাজে ‘ভুল’ বাজে ‘ঠিক’–
চরম সত্য স্মরণ ছাড়িয়া লুপ্ত হয়েছে হায়!

এই দ্বন্দ্বই তো চিরন্তন দ্বন্দ্ব। সর্বদেশের সর্বকালের বহু লোক এই দ্বন্দ্বের নিদারুণ বর্ণনা দিয়েছেন। সত্য দেখতে পেয়েছি, কিন্তু আমার রিপু যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে– এই প্রতিবন্ধক ভিতরের না বাইরের, তাতে কিছুমাত্র আসে-যায় না, রাধার বেলা শাশুড়ি ননদী, হাফিজের বেলা–

প্রেম নাই প্রিয় লাভ আশা করি মনে
হাফিজের মতো ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে!

এ দ্বন্দ্বের তুলনা দিয়েছেন সব কবিই আপন হৃদয় দিয়ে। পূর্ববঙ্গের কবি হাসান রাজা চিড়ে-ভানার সঙ্গে তুলনা দিয়ে বলেছেন–

হাসনজানের রূপটা দেখি ফালদি ফালদি উঠে
চিড়া-বারা হাসন রাজার বুকের মাঝে কুটে।

রিয়োকোয়ান কান পেতে বুকের ধুকধুকে শুনতে পেয়েছেন ‘ভুল, ঠিক’, ‘ভুল, ঠিক’, ‘ভুল, ঠিক’!

এ তো গেল রিয়োকোয়ানের মনের দ্বন্দ্বের কথা, কিন্তু বাইরের দিকে রিয়োকোয়ানের জীবন অত্যন্ত সহজ গতিতেই চলেছিল। আহার শয়ন বাসস্থান সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ নির্বিকার ছিলেন বলে সন্ন্যাস আশ্রমের অভাব-অনটন তাঁকে কিছুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর ভ্রাম্যমাণ জীবন সম্বন্ধে জাপানে বহু গল্প প্রচলিত আছে এবং সে গল্পগুলোর ভিতর দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায়, শ্ৰমণ রিয়োকোয়ান আর কিছু না হোক, খ্যাতি-প্রতিপত্তি, বিলাস-ব্যসনের মোহ সম্পূর্ণ জয়লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু এই গল্পগুলোর কয়েকটি অনুবাদ করার পূর্বে বলে নেওয়া ভালো যে, বৃদ্ধ বয়সে বিয়োকোয়ান স্বগ্রামের দিকে ফিরে আসেন, আর পাশের পাহাড়ের এক পরিত্যক্ত আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেই জরাজীর্ণ গৃহে বহুকাল ধরে কেউ বসবাস করেনি, তার অর্ধেক ধসে গিয়েছে, বাকিটুকু লতাপাতার নিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে, কিন্তু ফিশার বলেন, বহু বৎসরের পরিভ্রমণে শ্রান্ত-ক্লান্ত শ্রমণের কাছে এই ধ্বংসস্তূপই শান্তিনীড় বলে মনে হল।

এই প্রত্যাবর্তন নিয়ে ফিশার দীর্ঘ আলোচনা করেননি। আমাদেরও মনে হয়, করার কোনও প্রয়োজন নেই। গৃহী হোন আর সন্ন্যাসই হোন, বার্ধক্যে আশ্রয়ের প্রয়োজন। রিয়োকোয়ানের বেলা শুধু এইটুকু দেখা যায় যে, সর্বসষ্মের দ্বার তাঁর সামনে উন্মুক্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি শ্রমণমণ্ডলীর প্রধান তো হতে চানই নি(১), এমনকি কারও সেবা পর্যন্ত গ্রহণ করতে পরামুখ ছিলেন।

রিয়োকোয়ানের প্রত্যাবর্তন-সংবাদ পেয়ে তাঁর ভাই-বোনেরা তাঁকে গৃহে ফিরিয়ে নেবার চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হতে পারেননি।

বুদ্ধদেব কপিলাবস্তুতে ফিরেছিলেন বটে, কিন্তু রাজপ্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করেননি।

এই সময়ের লেখা একটি কবিতাতে রিয়োকোয়ানের শান্ত মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় :

এই তো পেয়েছি শান্তিনিলয়, খরতাপ হেথা নাই,
জীবন-সাঁঝের শেষ কটি দিন কাটাব হেথায় আমি
স্বপ্নের মোহে, কল্পনা বুনে। গাছেতে ছায়াতে হেথা
আমারে রাখিবে সোহাগে ঘিরিয়া– কাটাব দিবস-যামী।

————

১. ‘গাইশা’ ঠিক বেশ্যা বা গণিকা নহে; মৃচ্ছকটিকের বসন্তসেনা অথবা প্রাচীন গ্রিসের ‘হেটেরে’ শ্রেণীয়া।

২. জাতকের গল্পে আছে, এক বৃদ্ধ শ্রমণ কোনও সন্নে আশ্রয় গ্রহণ করতে চাইলে সেই সঙ্ঘের প্রধান শ্রমণ ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন। হয়তো জাতকের এই গল্পটি রিয়োকোয়ানের অজানা ছিল না, ফিশার বলেন, রিয়োকোয়ান বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন এবং জাতক বৌদ্ধধর্মের কতখানি স্থান অধিকার করেছে, সেকথা অমরাবতী, সাঁচীর ভাস্কর্য-স্থাপত্য দেখলে আজও চোখের সামনে। পরিষ্কার হয়ে ওঠে।