(৯) নেসেসারি ইভিল
সেদিন বেসে ফিরে বেশ কিছুক্ষণ নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইল ইন্দ্র। মাথার ভিতর হাজারটা সাইক্লোন যেন একসঙ্গে পাকিয়ে উঠছে। ঠান্ডা মাথায় এখনও অব্দি ঘটে-যাওয়া সব ঘটনা পরপর সাজাতে চেষ্টা করতে লাগল। কীভাবে যেন ঝড়ের গতিতে সবকিছু হয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় থিতু হয়ে ভাবার সময়টুকু পায়নি ইন্দ্র। আজ মনের ভিতর জমে থাকা সব উৎকণ্ঠা যেন ইন্দ্রর মাথার ভিতরটা বিষিয়ে দিচ্ছে। উঠে গিয়ে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে ও। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট কাগজের মোড়কটা বের করে খোলে। ছোট্ট শক্ত কোনও একটা জিনিস একটা সাদা চিরকুট দিয়ে মোড়ানো। মোড়কটা খুলতেই হাত কেঁপে যায় ইন্দ্রর। হঠাৎ গলার ভিতরটা শুকিয়ে আসে। ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। কোনওরকমে সামনের চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়ে। ইন্দ্রর হাতে ধরা লিলির মাথার ক্লিপ। ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে দুই হাঁটুর মধ্যে গুঁজে ফুঁপিয়ে ওঠে ইন্দ্র। ধনুকের মতো বেঁকে-থাকা পিঠ নিশ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, সে চেয়ার ছেড়ে নীচে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। ওর হাতে ধরা লাল রঙের স্টিলের ক্লিপটা। লিলির ভীষণ পছন্দের ছিল সেটা। আগের বছর দুর্গাপুজোর সময় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে এটা কিনে দিয়েছিল ইন্দ্র। সে একমনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ক্লিপটা দেখতে থাকে। ওর চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে নেমেছে মাটিতে। পাশেই মেঝেতে পড়ে-থাকা কাগজটাও হাওয়াতে তিরতির করে উড়ছিল। ইন্দ্র হাত বাড়িয়ে সেটা কুড়িয়ে নেয়। ছোট্ট একটা কাগজে লেখা কয়েকটা লাইন :
অভিমন্যু মহাবীর, বন্দে দেবজন
সহস্র হস্তীসম তার দৃঢ় সে মনন।
সম্মুখে উপস্থিত এক অত্যন্ত অত্যয়
নাহি জানে মুক্তিপথ, তবু মনে বরাভয়।
প্রবেশিল চক্রব্যূহে তার শৌর্য দুর্নিবার
শোনো বীরত্ব নহে, ইহা কহে বুদ্ধি অপ্রখর।
নীচে একটা ছোট্ট আঁকা। তার পাশে তারিখ আর সময় লেখা। তারিখ আগামীকালের। আর সময় সন্ধ্যা সাতটা পনেরো। পাশের ছবিটা একঝলক দেখেই চিনতে পারল ইন্দ্র। ইন্ডিয়া গেটের ছবি। ইন্দ্ৰ কাগজটা মুড়িয়ে পকেটে রাখল। তারপর মেঝেতেই চোখ বুজে চুপচাপ শুয়ে থাকল।
*
ইন্ডিয়া গেট বিশাল বড় জায়গা নিয়ে। মূল স্থাপত্যটাই বিশাল, তাকে ঘিরে বিশাল মাঠ। সেখানে রীতিমতো মেলা বসে গিয়েছে। দুটো বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করছে, তাদের বাবা-মা মাঠে খবরের কাগজ পেতে বসে হালকা আড্ডায় মেতেছে। আরও অনেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে, দাঁড়িয়ে। টুকরো টুকরো গল্প অনাবিল হাসি, বাদাম ভাজার খোলা ভাঙার শব্দ, চিপসের প্যাকেটের খচম্য আওয়াজ। ইন্দ্র এসব থেকে বেশ কিছুটা দূরে একলা বসে। কানে ইয়ারফোন গোঁজা। বেশ কিছুক্ষণ আগে অব্দিও এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঠাওর করার চেষ্টা চালাচ্ছিল যে, কে হতে পারে সেই সম্ভাব্য পত্রপ্রেরক। কারও হাবভাব বিন্দুমাত্র সন্দেহজনক ঠেকলেই খুব ভালো করে তার গতিবিধির ওপর নজর রাখছিল। কিন্তু বলা বাহুল্য, এখনও অব্দি সে হতাশই হয়েছে। কবজি উলটে হাতঘড়ির ডায়ালে একবার চোখ বোলায় ইন্দ্র। প্রায় আটটা বাজে। নাহ্। সে লোক আর আসবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় ইন্দ্র। ইতিমধ্যে এক বাদামওয়ালা এসে তাকে বাদাম গছানোর তাল করছিল। দৃঢ়কণ্ঠে তাকে প্রত্যাখ্যান করে বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক এমন সময়ে পিছন থেকে একটা ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়াল। সেই বাদামওয়ালা! চোখের ইশারায় তাকে অনুসরণ করতে বলে সে সোজা হাঁটা লাগাল পিছনের দিকে। ইন্দ্র বেশ অবাক হয়ে গেল। কারণ এই লোকটাকে সে আসার পর থেকেই দেখছে। আশপাশের অনেককেই বাদাম বেচল, ইন্দ্রকেও আগে দু-বার বাদাম বিক্রি করার চেষ্টা করেছে, ইন্দ্র গুরুত্ব না দিয়ে হাতের ইশারায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
বেশ কিছুটা হেঁটে পিছনের দিকে এসে পৌঁছোল ওরা। একটা ছোট্ট পার্ক মতো, এখন অবশ্য প্রায় জনশূন্য। কিছুটা দূরে দূরে গাছের গুঁড়ির চারপাশ সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। তাদের মধ্যে দু-একটির নীচে প্রেমিক-প্রেমিকা বসে প্রেমালাপ করছে। অস্পষ্ট গুঞ্জন ভেসে আসছে সেদিক থেকে। লোকটি কাঁধ থেকে ঝাঁকাটা নামিয়ে রেখে বেশ সশব্দে একটা নিশ্বাস ফেলে সেইরকমই একটা সিমেন্ট-বাঁধানো চাতালে মৌতাতি আমেজে পা তুলে হাঁটু মুড়ে বসল। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল, তারপর বাকি প্যাকেটটা ইন্দ্রর দিকে বাড়িয়ে ধরল। ইন্দ্র সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করায় লোকটা মুচকি হেসে বলল, “আমি কিন্তু জানি, আপনি স্মোক করেন না। তবু অফার করাটা দস্তুর তাই করলাম। বাজে জিনিস, মশাই। একদম বাজে জিনিস, খাবেন না।” কথা শেষ করে মাথা উঁচু করে ঠোঁটটা গোল করে শূন্যে ধোঁয়ার রিং ছাড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। একঝলক দমকা বাতাস এসে ধোঁয়াটাকে ঘেঁটে দিয়ে চলে গেল। লোকটা একটু বিরক্তির সঙ্গে ‘ধুস!’ বলে উঠে দাঁড়াল। তারপর ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়াল বৈঠকি গলায় বলল, “তাহলে চলুন!”
“কোথায়? আমি আর কোথাও…” ইন্দ্র কথা শেষ করতে পারে না—হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শিসের মতো আওয়াজ কানে আসে ইন্দ্রর, সঙ্গে সঙ্গেই একটা ছোট্ট সুচালো কিছু এসে গেঁথে যায় তার বাহুতে। ব্যাপারটা বোঝার আগেই হঠাৎ চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে থাকে, এক-সমুদ্র ক্লান্তি এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ইন্দ্রকে। ইন্দ্র ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে তারপর আস্তে আস্তে জ্ঞান হারায়।
জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের পরিবেশ কেমন ধোঁয়া-ধোঁয়া লাগে ইন্দ্রর। বেশ কিছুটা সময় লাগে তার ধাতস্থ হতে। তারপর আস্তে আস্তে চোখের সামনে সম্পূর্ণ ঘরটা যেন একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে। সে বসে আছে একটা সোফার ওপর। ঘরটা প্রায় ফাঁকা। ইন্দ্র যে সোফায় বসে আছে, তার ঠিক মুখোমুখি একটা দরজা। দরজার ডানদিকে একটা ছোট্ট টেবিল, টেবিলের ওপর একটা হ্যারিকেন রাখা। সেই হ্যারিকেনের আবছা কালচে-হলুদ আলোয় তার নিজের ছায়া পিছনের দেওয়ালে এক বিশাল কালো অবয়ব তৈরি করেছে। হ্যারিকেনের আগুনের সরু শিখার মৃদু মৃদু কম্পন সেই কালো অবয়বের মধ্যে যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেটাও ওই আলোকশিখার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৃদু মৃদু দুলছে। ইন্দ্রর মুখোমুখি মোটা কাঠের দরজা। দরজার ডান পাশে আরেকটা কাঠের চেয়ার রাখা। মজবুত গড়ন, মোটা কাঠের হাতল। এতটা দূরে বসেও ইন্দ্র স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ। ততক্ষণে তার মনে পড়ে গিয়েছে যে সে অপহৃত হয়েছে, আর সেই ব্যাপারটা অনুধাবন করামাত্র তার সারা শরীর বেয়ে একটা ভয়ের শিহরন খেলে গেল। এক ঝটকায় সোফা থেকে উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার হাত-পা বাঁধা নেই বটে, কিন্তু শরীর যেন সায় দিচ্ছে না। একটা অদ্ভুত নেশার বাঁধনে যেন বন্দি হয়ে রয়েছে তার শরীর। মস্তিষ্কের নির্দেশ মানতে চাইছে না কিছুতেই। ইন্দ্ৰ বুঝল, সেই ইনজেকশনের মধ্যে দিয়ে তার ওপর কোনও মাদকদ্রব্য প্রয়োগ করা হয়েছে। আজ থেকে কয়েক মাস আগে হলে এই মুহূর্তে ইন্দ্র নিজের ওপর সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যেত। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ইন্দ্র আবিষ্কার করল যে, এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তার নার্ভ একদম ঠান্ডা রয়েছে। সে সোফা ছেড়ে আর ওঠার চেষ্টা করল না। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ঘরটাকে ভালো করে দেখতে লাগল। সোফা, চেয়ার এবং দূরে ওই টেবিলের ওপর রাখা হ্যারিকেনটা ছাড়া ঘরে অন্য কোনও আসবাব নেই। ইন্দ্র মাথা ঘুরিয়ে সোফার পিছনের দেওয়ালটা দেখল। তার নেশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চোখের সামনে সবকিছু হঠাৎ হঠাৎ মৃদু দুলে উঠছে। মাঝে মাঝে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সে দু-হাতে চোখ কচলে দেওয়ালের গায়ে হাত বোলাতে লাগল। অসমান খসখসে দেওয়াল। দেওয়ালে প্লাস্টার করা হয়েছে, কিন্তু তার ওপর রঙের পরত চাপেনি। ইন্দ্রর ডান পাশের দেওয়ালে একটা বেশ বড় জানালা। জানালার পাল্লা বন্ধ। ইন্দ্র নিজের শরীরটাকে প্রায় টেনেহিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে চলল সেই জানালার কাছে। সে জানে, দরজা বাইরে থেকে শক্ত করে বন্ধ রয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ঘরের জানালা সাধারণত ভিতর থেকেই বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকে। বাইরে থেকে বন্ধ করা যায় এমন জানালা সে অন্তত এখন অব্দি দেখেনি।
জানালার সামনে পৌঁছে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ছিটকিনি খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল ইন্দ্র। সেটা হাতে ঠেকতেই এক ঝটকায় ছিটকিনিটা খুলে ফেলে জানলার পাল্লা ঠেলে খুলতে গিয়েও পারল না। সেটা যেন কিছুতে আটকে গেল। এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারল ইন্দ্র। জানালার পাল্লা দুটি বাইরে থেকে ছিটকিনি আটকানো না হলেও মোটা মোটা চ্যালা কাঠ ফ্রেমের সঙ্গে পেরেক দিয়ে আটকে বাইরে থেকে জানালাটা বন্ধ করে রাখা আছে। সেই কাঠের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ইন্দ্র বুঝল, সে যেখানে বন্দি রয়েছে, সেই বাড়িটা একটা জঙ্গলের মধ্যে। সম্ভবত কোনও পাহাড়ি এলাকায়। বাইরে থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক ভেসে আসছে। ইন্দ্রর মাথার ঝিমঝিম ভাবটা এখন খানিকটা কমেছে। সে পায়ে পায়ে ফিরে গিয়ে আবার সেই সোফাতে বসে পড়ল। তার মাথায় এখন বয়ে চলেছে অজস্র চিন্তার স্রোত। সে যে সেই চিরকুটের নির্দেশমতো ইন্ডিয়া গেট-এর নীচে এসেছিল, সেটা টিমের বাকি কেউ জানে না। অর্থাৎ কোনওভাবেই তাদের পক্ষে তাকে উদ্ধার করতে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। ইন্দ্র এই মুহূর্তে অন্তত তার মুক্তির অন্য কোনও সম্ভাবনা দেখতে পায় না। হঠাৎ তার চিন্তার তার কেটে যায় উলটোদিকের দরজায় একটা খুটখুট শব্দে। দরজাটা বাইরে থেকে খোলা হচ্ছে। ইন্দ্র শরীরটাকে সোফার ওপর সম্পূর্ণ এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করেন একজন ব্যক্তি। ইন্দ্রর চোখ বন্ধ তাই তাকে দেখার উপায় নেই, কিন্তু সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে, সেই ব্যক্তি সামান্য খুঁড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছেন। পা-টাকে মেঝের সঙ্গে টেনে টেনে হাঁটায় জুতোর সঙ্গে মেঝের ঘর্ষণে একটা ঘ্যাসঘেঁসে শব্দ উঠছে। লোকটা দরজার পাশে রাখা সেই চেয়ারটাকে সশব্দে টেনে নিয়ে ইন্দ্রর সামনে বসে পড়েন। তারপর হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠে বলেন, “আপনি চোখ খুলে সোজা হয়ে বসতে পারেন, ডঃ ইন্দ্র। ঘরের কোণে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, আপনার সমস্ত অ্যাকটিভিটির ওপর লক্ষ্য রাখা হচ্ছে পাশের ঘর থেকে।”
ইন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরে চোখ খুলে পিঠ সোজা করে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে বসে। লোকটা ইংরেজিতেই কথা বলছেন। ইংরেজির উচ্চারণ ব্রিটিশ বা আমেরিকানদের মতো না হলেও কথার টানে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তিনি ভারতীয় নন। লোকটা আবার হালকা চালে বলে ওঠেন, “আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ওপর খুব রেগে আছেন। আপনাকে এভাবে নিয়ে আসা উচিত হয়নি, সেটা আমি মানছি, কিন্তু ট্রাস্ট মি, আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলা ভীষণ প্রয়োজন ছিল। তাই এইসব অকারণ হয়রানি পোহাতে হল আপনাকে। এজন্য আমি যারপরনাই লজ্জিত। যা-ই হোক, আমার নাম লিওনার্দো। আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার সঙ্গে আমার কিছু জরুরি আলোচনা রয়েছে, সেগুলো শেষ হয়ে গেলেই আপনাকে আবার সসম্মানে দিল্লিতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আশা করি, আমাদের এই ধৃষ্টতা আপনি নিজ গুণে মাফ করে দেবেন।”
লোকটার কথা অসম্ভবরকম মার্জিত, ভদ্র। কেটে কেটে থেমে থেমে কথা বলেন। যেন একটা বাক্য শেষ করার পর একটু সময় নিয়ে ভেবে নেন, পরের কথাটা ঠিক কী বলতে চলেছেন। ভদ্রলোক অসম্ভবরকম মোটা। পরনে টু-পিস স্যুট। হাতের দশ আঙুলেই আংটি। ঠোঁটের কোণে সবসময় এক টুকরো মুচকি হাসি। ইন্দ্র একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ভদ্রলোকের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ দু-জনেই চুপচাপ। তারপর ইন্দ্রই মুখ খুলল, “আপনি আমায় কেন এভাবে ধরে এনেছেন, আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি আপনার খুব একটা কাজে আসব না।”
ইন্দ্রর কথা শুনে লোকটা হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। বিশাল ভুঁড়ি দুলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হেসে হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভীষণ গম্ভীর মুখে বললেন, “আসুন আমার সঙ্গে।”
লোকটা চেয়ার ছেড়ে ধীরপায়ে উঠে গেলেন দরজার কাছে। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা ছিল, লোকটা ভিতর থেকে দরজায় মৃদু টোকা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। লোকটা এবার মাথা ঘুরিয়ে ইন্দ্রর দিকে তাকালেন, তারপর চোখের ইশারায় তাকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিলেন। ইন্দ্র নিজের সোফা ছেড়ে উঠে এল। লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের করিডর বরাবর হেঁটে চললেন বাড়ির মূল ফটকের দিকে। ইন্দ্র লোকটার পিছু পিছু বেরিয়ে এল ঘর থেকে। লম্বা করিডর, দুইপাশে আরও দুটো ঘর। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দু-জন ব্যক্তি। আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা। মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে। কোমরের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচু হয়ে আছে। লোকটা সোজা এগিয়ে গিয়ে সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে। দরজা খুলে কাঠের ব্যালকনি। সেখানে এসে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে গেল ইন্দ্র। তারা যেন এক অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল এক পাহাড়ের পাথুরে খাঁজে এই বাড়িটা বানানো। ব্যালকনি থেকে সরু পাথুরে রাস্তা নেমে গেছে পাহাড়ের গায়ে খাঁজ বরাবর। একপাশে খাড়া উঁচু পাথরের দেওয়াল, অন্যদিকে গভীর খাদ। লিওনার্দো ব্যালকনির কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিলেন। ইন্দ্র এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। রেলিঙের ওপারে তাকাতেই মাথাটা দুলে উঠল। কাঠের রেলিং আঁকড়ে ধরে ভারসাম্য বজায় রাখল ইন্দ্র। ব্যালকনির ঠিক নীচেই গভীর খাদ। এতটাই গভীর যে, তাদের কিছুটা নীচ থেকেই ঘন ধূসর কুয়াশা নীচের দৃশ্য যেন ঘেঁটে দিয়েছে। লিওনার্দো পায়ে পায়ে নেমে গেলেন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচের সরু বিপজ্জনক রাস্তায়। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে ইন্দ্রও নেমে এল নীচে। বেরোনোর আগে দরজার পাশে হেলান দিয়ে রাখা একটা লাঠি হাতে নিয়েছেন লিওনার্দো। সেটাতেই ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছেন পাহাড়ের গা ঘেঁষে। প্রথম প্রথম ডানদিকে অতল খাদের দিকে চোখ পড়লেই শিউরে উঠছিল ইন্দ্র। এখন বেশ কিছুটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল জুড়ে সবুজ জঙ্গল। কচি সবুজ ফার্ন, নাম-না-জানা অর্কিডে রংবেরঙের ফুল ফুটেছে। পাথরের খাঁজে খাঁজে শ্যাওলা জমেছে। ইন্দ্ৰ সন্তর্পণে পা ফেলছে। মাথার ওপর তাকিয়ে যেন আরও অবাক হয়ে গেল সে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে উঁচু উঁচু গাছ মাথার ওপর ছাতার মতো বিস্তৃত। সেই গাছের পাতা থেকে টুপটাপ শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ছে ইন্দ্রর কাঁধে, হাতে, মাথায়। দূর থেকে পাখির কিচিরমিচির ছাপিয়ে কর্কশ ময়ূরের ডাক ভেসে আসছে। ওদের মাথার ওপর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দিয়ে উড়ে চলেছে একজোড়া গ্রেটার ইন্ডিয়ান হর্নবিল। যেন চুপিসারে পিছু নিয়েছে তাদের।
লিওনার্দো বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে একটা উঁচু পাথরের সামনে এসে থামলেন। প্রকৃতির খেয়ালে একটা পাথর যেন ঢালু পাহাড়ের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তেও কোনও এক অজানা মন্ত্রবলে থমকে গিয়েছে। পাথরের ওপরটা চ্যাপটা, মসৃণ। লিওনার্দো পাথরের খাঁজে পা রেখে পাথরটার ওপরে উঠে দাঁড়ালেন। অত ভারী শরীর নিয়ে উঠতে গিয়ে একসময় প্রায় ভারসাম্য হারাচ্ছিলেন। ইন্দ্র অজান্তেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তার আর দরকার পড়ল না। তিনি হাতের লাঠিটা পাশে রেখে পাথরের শেষ প্রান্তে আরাম করে পা ঝুলিয়ে বসলেন। ইন্দ্রও ততক্ষণে উঠে এসেছে সেই পাথরের ওপর। সে-ও লিওনার্দোর পাশে পা ঝুলিয়ে বসে। ওর পায়ের নীচে অসীম শূন্য। কিন্তু ওর আর ভয় করছে না। এই পুরো সময়টা ওরা নিজেদের মধ্যে। একটাও কথা বলেনি। ইন্দ্র নিজে থেকে হয়তো কথা বলতও না। ওর কেমন যেন মনে হচ্ছে এই মায়াময় পরিবেশে ওরা অনাহূত অনুপ্রবেশকারী। মানুষের গলার আওয়াজ শুনলে হয়তো এই গাছ, দূরের ওই পাহাড়, মাথার ওপরের ওই হর্নবিল দুটো ভারী অসন্তুষ্ট হবে। ইন্দ্র মাথা উঁচু করে দু-হাতে ভর দিয়ে শরীরটাকে পাথরের গায়ে এলিয়ে দেয়।
লিওনার্দোই প্রথম মৌনতা ভেঙে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করেন, “ডঃ ইন্দ্ৰ, আপনি নেসেসারি ইভিলে বিশ্বাস করেন?”
