(২৫) ইউ টক টু মাচ
বৃষ্টি থেমেছে অনেকক্ষণ। মাটি খোঁড়ার উপযুক্ত কিছু সঙ্গে না-থাকায় শুধু ধারালো চ্যাপটা পাথর দিয়ে মাটি খুঁড়তে অসুবিধে হয়েছে অনেকটাই। ইভানির শরীরটাকে মাটিচাপা দিয়ে পাশের একটা পাথরের ওপর বসে হাঁপাচ্ছিল ইন্দ্র আর রঘুবীর। ইন্দ্রর চিবুক বেয়ে ঘামের বিন্দু ঝরে পড়ছে বুকের ওপর। মাথা নীচু করে ইভানির কবরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ইন্দ্র। রঘুবীর এসে পিঠে হাত রাখলেন। নীচুস্বরে বললেন, “এবার যেতে হবে।”
ইন্দ্র উত্তর দেয় না। শুধু মুখ তুলে শুকনো হাসে। পাশে রাখা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে চলতে শুরু করে পাহাড়ের খাড়াই বেয়ে। বৃষ্টি হয়ে পথ আরও পিচ্ছিল, আরও দুর্গম। সাবধানে পা ফেলে এগোতে হচ্ছে। পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি জঙ্গল ভীষণ গভীর। এখানে বোধহয় সারা বছরই সূর্যের আলো পৌঁছোয় না। পায়ের তলার মাটি পচা পাতা পড়ে অদ্ভুতরকম নরম। পা ফেললে সরে সরে যাচ্ছে। এক রকমের বাঁদরের মতো প্রাণী অনেকক্ষণ ওদের মাথার ওপরে উঁচু উঁচু গাছের ডালে ডালে চলেছে। যেন পাকা গোয়েন্দার মতো সন্তর্পণে ওদের ফলো করছে। ইন্দ্র মাথা তুলে তাকালেই ঘন লতাপাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে নিমেষে। রঘুবীর হাতে ধরা একটা ছোট ধারালো ছুরি দিয়ে সরু সরু ডালপালা কাটতে কাটতে এগোচ্ছেন। তাঁকে অনুসরণ করছে ইন্দ্ৰ।
পাহাড়ের চূড়াটা তুলনায় চ্যপটা। বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে একটামাত্র বুড়ো গাছ ছাড়া আর কোনও গাছপালা নেই, শুধু হাঁটু অবধি ঘন ঘাসের আস্তরণ। মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে-থাকা গাছটার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওরা। কালচে-বাদামি রঙের ঝুরি নেমেছে দিগন্তবিস্তৃত ডালপালা থেকে। গাছের কাণ্ড দেখা যাচ্ছে না। ইন্দ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। গাছের কাণ্ড এবার দৃশ্যমান হয়েছে। সে অবাক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। কাণ্ডটা যেন অবিকল একজন মানুষের অবয়ব। দুটো হাত মাথার ওপরে তোলা। সেই হাতের আঙুলগুলো যেন প্রসারিত হয়ে পরিণত হয়েছে বিশাল ডালপালায়। গাছের সবজেটে বাদামি কাণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে একটা মুখ। তাতে চোখ-নাক অস্পষ্ট হলেও হাঁ-করা মুখে যেন সহস্র বছরের যন্ত্রণাক্লিষ্ট এক অসহায় বন্দি মানুষের আর্তি। আর তার বুকের কাছে এক বিশাল গর্ত। সেই গর্তে বসানো আছে একটা কালো হয়ে-আসা কাচের সিলিন্ডার। এত দূর থেকেও সেই সিলিন্ডারের ভিতর গোল করে গুটিয়ে-রাখা হলদেটে পৃষ্ঠাগুলো দেখা যাচ্ছে। ইন্দ্র পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে সেই মূর্তির দিকে। মূর্তির ভিতর থেকে কি ভেসে আসছে একটা অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ? নাকি ভুল শুনছে সে?
“হ্যালো ডক্টর ইন্দ্রজিৎ।” পিছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর শুনে ফিরে তাকাল ইন্দ্ৰ। পিছনে দাঁড়িয়ে লিওনার্দো। মুখে একটা জ্বলন্ত চুরুট, ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি। রঘুবীরও ওঁকে হঠাৎ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন।
“বলুন। আপনাকেই খুঁজছিলাম। সময় যখন আপনার হাতের মুঠোয়, তখন আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ঠিক কখন কোথায় আমরা এসে উপস্থিত হব। চাইলে তো আমাদের বাধাও দিতে পারতেন।”
“বাধা! বাধা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, স্যার। আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ড সময়ের নিয়মের সুতোয় বাঁধা। স্বাভাবিক ঘটনাক্রমকে ফোর্সফুলি বেন্ড করতে গেলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। এবং কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক। আমি শুধু এই ঘটনাক্রমের অতন্দ্র প্রহরী। আমার কাছে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একটা বিশাল জিস পাজলের মতো। আসলে কী জানেন তো, আমাদের টাইমলাইন অনেকটা ভঙ্গুর পাতের মতো। নিজের ইচ্ছেমতো বেঁকিয়ে নেওয়া যায়, সে কথা মিথ্যে নয়। তবে তা রাতারাতি নয়। ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে।”, কথা শেষ করে লিওনার্দো পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন গাছের দিকে। মাথার ওপরের ঘন ডালপালার ফাঁক চুঁইয়ে-আসা আলো লিওনার্দোর নেভি ব্লু স্যুটের ওপর কাটাকুটি খেলেছে। অন্যদিন লিওনার্দোর কথার মধ্যে একটা স্বভাবসিদ্ধ কৌতুকের ছাপ থাকে। কিন্তু আজ তাঁর গলা ভারী, গম্ভীর। যেন এক রোমাঞ্চকর নাটকের শেষ অঙ্ক। একটা একটা করে জট খুলবে ঘন বুনোটের।
হাত বাড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে কাচের সিলিন্ডারটার ওপর আঙুল বোলালেন লিওনার্দো। দূর থেকে কোনও এক অজানা প্রাণীর তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে আসছে। গভীর অরণ্যে বিরাজমান নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিচ্ছে সেই বাঁশির মতো সুর। ইন্দ্র একটু থেমে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, এখনও অবধি আপনি কিন্তু বলেননি আপনি কে? লিওনার্দো কি আপনার আসল নাম?’
লিওনার্দো উত্তর দেন না। উলটে আরও একটা প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা ইন্দ্রজিৎ, আপনার কখনও সর্বশক্তিমান হতে ইচ্ছে হয় না?” লিওনার্দো এখন যেন এই গহিন অরণ্যেরই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার গলা গমগম করে ওঠে। মনে হয় যেন বহু দূর থেকে কেউ প্রশ্নটা করছে।
“হয় না, এ কথা বলব না। সম্ভবত সবার মনেই সেই বাসনা থাকে। অনেকে প্রকাশ করে না হয়তো। কিন্তু থাকে নিশ্চয়ই।”
“হুম।”
“কিন্তু আপনি নাকি টাইম ট্রাভেল করতে পারেন বলে শুনলাম। সেই রহস্যটা জানতে পারি কি?” রঘুবীরের গলায় অবিশ্বাসের সুর স্পষ্ট।
লিওনার্দো পিছন ঘুরে রঘুবীরের দিকে তাকান। তারপর এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বলেন, “আপনি ওয়ার্মহোলের নাম শুনেছেন?”
“শুনেছি। কিন্তু সেসব তো শুধু কল্পবিজ্ঞানেই সম্ভব! তা-ই নয় কি?”
“হুম। কঠিন প্রশ্ন। ওয়ার্মহোল কি সত্যিই থাকতে পারে? নাকি সেটা শুধুই ফিজিক্স আর ম্যাথের কঠিন কঠিন থিয়োরির মাঝে লুকিয়ে-থাকা রূপকথা! আচ্ছা ধরুন, তর্কের খাতিরে ধরে নিই এগুলো শুধুই রূপকথা নয়। তাহলে প্রশ্ন হল, আমরা কী করে ওয়ার্মহোলের অ্যাক্সেস পাব? আমি একটু সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছি। হালে আইনস্টাইনের থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি আবিষ্কারের আগে অবধি মানুষের ধারণা ছিল, স্পেস হল একটা সলিড সারফেসের মতো। যেখানে পৃথিবী-সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহনক্ষত্র বা গ্যালাক্সি শায়িত আছে। কিন্তু আদপে সেটা নয়। স্পেস আর সময় একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছে। আর এই ব্রহ্মাণ্ড মোটেই রিজিড নয়। অর্থাৎ যদি আপনি স্পেস অথবা টাইম কোনও একটাকে নিজের ইচ্ছেমতো মোল্ড করতে পারেন, তাহলে তাদের অন্যটার মধ্যের গ্যাপ কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়। অর্থাৎ থিয়োরিটিক্যালি, স্পেস-টাইমের মাঝে একটা এমন ব্রিজ তৈরি করা সম্ভব, যেটা চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতেই আপনাকে অন্য কোনও জায়গায় বা অন্য কোনও সময়ে এনে ফেলতে পারে। অ্যান্ড দ্যাট ইজ মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, হোয়াট উই মিন বাই ওয়ার্মহোল।”
কথা শেষ করে ইন্দ্রর পাশে দাঁড়িয়ে দূরে আঙুল দিয়ে দেখান লিওনার্দো। ফিশফিশিয়ে বলেন, “ইন্দ্রজিৎ, ওই যে দূরে দেখছেন, ওইখানে ওই বিশাল ঘুমন্ত প্রাণীটার পিঠের ওপর এসে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা ঠিক এই সময়ে। দেখতে পাচ্ছেন?”
ইন্দ্র দেখতে পায়, দূরে বিশাল কালো একটা ঘুমন্ত প্রাণীর পিঠে খুব অস্পষ্ট দুটো প্রাণী দেখা যাচ্ছে। অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায় না। এত দূর থেকে দুটো ক্ষুদ্র পিঁপড়ের মতো দেখাচ্ছে। ইন্দ্ৰ অবাক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। অবশ্য এখন অনেক কিছুতেই সে আর অবাক হয় না।
লিওনার্দো ততক্ষণে আবার বলতে শুরু করেছেন, “যদি স্ট্রিং থিয়োরি দিয়ে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখবেন, আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে, বা বলা ভালো আমাদের এই পৃথিবীতেই একাধিক এইরকম ওয়ার্মহোল অলরেডি রয়েছে। তারা শুধু অপেক্ষা করছে আবিষ্কৃত হওয়ার। বিগ ব্যাং হওয়ার ঠিক পরপরই আমাদের ব্রহ্মাণ্ডে তৈরি হওয়া কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন প্রকৃতির খেয়ালে সারা ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এইরকম অসংখ্য ওয়ার্মহোল তৈরি করে রেখেছে। আর তাদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে কসমিক স্ট্রিংস। এবার ব্যাপার হল, ধরুন, আপনি এইরকমই মহাবিশ্বের ছড়িয়ে-থাকা অসংখ্য ওয়ার্মহোলের কোনও একটার অ্যাক্সেস পেয়ে গেলেন। তাহলে পৃথিবীর যে কোনও জায়গা থেকে যে-কোনও জায়গায় বা এক সময় থেকে অন্য সময়ে পৌঁছে যেতে আপনার এক মুহূর্তও সময় লাগবে না। কিন্তু…”
কিছুক্ষণ থেমে মুচকি হেসে আবার কথা শুরু করলেন লিওনার্দো, “পৃথিবীতে অসাধারণ লোভনীয় সবকিছুর পরেই একটা করে কিন্তু থেকে যায়। এক্ষেত্রে সব থেকে বড় সমস্যা হল এই, যে এইসব অসংখ্য ওয়ার্মহোলের কোনওটাই এক জায়গায় বা সময়ে স্থির নয়। আলোর থেকেও দ্রুতবেগে সময় এবং স্থানের সাপেক্ষে সেগুলো নিজেদের অবস্থান পালটে চলেছে। এবং সেটা এতটাই দ্রুত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটা দেখা বা আবিষ্কার করা অসম্ভব। যদি আপনি কোনও মিরাকিউলাস উপায়ে এইরকমই কোনও একটা ওয়ার্মহোলের কোনও ওপেন এন্ড দিয়ে ঢুকেও পড়েন, তাহলেও আপনার অভীষ্ট গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগেই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল ওয়ার্মহোলের অপর প্রান্ত বন্ধ করে দেবে। ফলত আপনি টাইম-স্পেসের একটা প্যারালাল প্যারাডক্সে অনন্তকাল জুড়ে স্রেফ ঝুলে থাকবেন।
“যা-ই হোক, এখন কথা হল, যদি আপনি হঠাৎ এমন কোনও শক্তি পেয়ে যান, যার ফলে এই ওয়ার্মহোলগুলো ইচ্ছেমতো স্টেব্ল করতে পারেন তাহলেই কেল্লাফতে। ওই পৃষ্ঠাগুলো আপনাকে সেই শক্তির হদিস দিতে পারে। কিন্তু সেই শক্তির মূল্য দিতে হবে।”
“কী মূল্য?” ইন্দ্ৰ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে।
“সবকিছু। প্রকৃতির খেয়ালে হস্তক্ষেপ করা অপরাধ। স্বয়ং মৃত্যু নেমে আসবে শাস্তি দিতে। ইন্দ্রজিৎ, আপনার কাছে সেই হোলি নেল আছে তো? যেটা আমি দিয়েছিলাম? সময় এসে গেছে। আমি আমার সবটুকু দিয়ে দীর্ঘ সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অপার শক্তিকে রক্ষা করে এসেছি। নাও ইট’স টাইম….” কথা শেষ করার আগেই লিওনার্দোর মুখ থেকে ছিটকে এল একটা চাপা আর্তচিৎকার। মুখ থেকে উঠে এল টাটকা রক্তের ধারা। ইন্দ্র দেখল, লিওনার্দোর বুক বরাবর আমূল বিঁধে রয়েছে একটা শানিত ছুরি। সেই রক্তের ছিটে এসে পড়েছে রঘুবীরের মুখে, ঠোঁটে, গলায়। রঘুবীর হিসহিসে গলায় বললেন, “ইউ টক টু মাচ।”
