(২৭) আ নিউ বিগিনিং
এপ্রিল, ১৩১৪। ব্ল্যাক সি:
ততক্ষণে সাক্ষাৎ শয়তানরূপী আন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছেন লিওর সামনে। লিও তখনও দুই হাঁটু ভাঁজ করে মেঝেতে বসে। মাথা ঝুঁকে আছে বুকের ওপর মেঝেতে তখনও লাল চটচটে রক্তের পরত। কিছু জায়গায় সে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে-বাদামি বর্ণ ধারণ করেছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে লিওর সামনে দাঁড়ায় সেই করালদর্শন যমদূত। তারপর তার তীক্ষ্ণ বাঁকানো নখযুক্ত আঙুলগুলো আস্তে আস্তে বোলাতে থাকে লিওর গলার কাছে। লিও নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকেন অন্তিম আঘাতের। ঠিক সেই মুহূর্তে দুটো বিশাল ডানার ছায়া ওদের মাথার ওপরে গর্জে ওঠা বিদ্যুতের আলোকে ঢেকে দেয়। অবাক দৃষ্টিতে মাথা তুলে সেদিকে তাকায় লিও। তার দু-চোখ ঝলসে যায় উজ্জ্বল সোনালি আভায়। আন্দ্রেও মুহূর্তের অসাবধানতায় চমকে উঠে মাথা তুলে তাকান ওপরের দিকে। আকাশ আলোকিত করা বিদ্যুতের ঝলক ছাপিয়ে একটা অতিকায় ছায়া নেমে আসছে তাদের জাহাজ লক্ষ্য করে। এই সুযোগ। লিও নিজের আস্তিনের আড়ালে লুকিয়ে-রাখা পবিত্র পেরেক বের করে সমূলে গেঁথে দেয় শয়তানের বুকে। গগনভেদী আর্তনাদে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শয়তানের এক ঝটকায় ছিটকে পড়ে লিও। ততক্ষণে আন্দ্রে ওপর নেমেসিসের মতো নেমে এসেছে সোনালি পালকযুক্ত এক বিশাল পাখি। রাজকীয় তার চেহারা। বিশাল ডানা ছড়িয়ে সে এসে বসে জাহাজের মাস্তুলে। সেই চাপে সম্পূর্ণ জাহাজ একদিকে হেলে যায়। জর্জ ছুটে আসে আক্রমণ করার অভিপ্রায়ে। মুহূর্তের মধ্যে সেই অতিকায় পাখির তীক্ষ্ণ নখর ছিন্নভিন্ন করে দেয় জর্জের দেহ। লিও দেখে আন্দ্রেরূপী শয়তানের মধ্যে থেকে একটা নীল আলো ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে সেই অতিকায় পাখির মধ্যে। লিওনার্দো মাথা নীচু করে সেই পাখিকে সম্মান জানায়। হে সর্বশক্তিমান, পৃথিবীতে যখন ক্ষমতার লোভ বা প্রতিশোধের স্পৃহা মানুষের মনুষ্যত্বকে ছাপিয়ে যাবে, যখন শক্তির সমতা বিঘ্নিত হবে, তখন আপনি এভাবেই নেমে আসবেন স্বয়ং মৃত্যুর রূপ ধারণ করে বিশালকায় পাখিটা ততক্ষণে ডানা মেলে রাতের আকাশের কোণে জমে থাকা অন্ধকারে বিলীন হয়েছে। তার শরীর থেকে খসে-পড়া একটা সোনালি পালক ঝরে পড়েছে ডেকের ওপর। লিওনার্দো সেই পালকটাকে কুড়িয়ে নিয়ে ভক্তিভরে মাথায় ঠেকান।
.
অক্টোবর, ২০২১। কলকাতা খিদিরপুর অঞ্চল:
খিদিরপুরে বস্তি এলাকায় একটা অদ্ভুত স্পোর্ট চলে, যার খবর আমরা তথাকথিত এলিট কলকাতাবাসী পাই না। খিদিরপুরের চোরাবাজার থেকে যে রাস্তাটা ডকের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক হেঁটে বাঁদিকে একটা সরু ইটের গলির প্রায় শেষ প্রান্তে বিশাল টিনের ছাউনি-দেওয়া হলঘর। বাইরে থেকে একঝলক দেখে মনে হয় কোনও গোডাউন। কিন্তু কাছে আসতেই ভিতর থেকে মানুষের সমবেত উল্লাস কানে আসে। সে উল্লাসে মিশে আছে আদিম হিংস্রতা। গোডাউনের ভিতর একটা ছোট স্টেজকে ঘিরে একটা ছোটখাটো ভিড়। ঘরের এককোণে একটা লম্বা টেবিল। সেখানে দু-জন মধ্যবয়সি লোক লম্বা খাতা, পেন, ছোট ছোট বেগুনি এবং গোলাপি টিকিট আর টাকার ব্যাগ নিয়ে বসে। সেই টেবিল, থুড়ি, কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন। সবাই নিজেদের পছন্দমতো প্রতিযোগীর ওপর দাঁও লাগাতে ব্যস্ত। এ প্রতিযোগিতা আমাদের চেনা কোনও প্রতিযোগিতা নয়। মানে ইট’স নট আ জেন্টলম্যান’স গেম। এখানে দু-জন মানুষ নিজেদের শেষনিঃশ্বাস অবধি নিজেদের মধ্যে মরণপণ লড়াই করে যায়, আর সেই প্রাণঘাতী লড়াই দেখে উল্লাস উপভোগ করেন চারপাশে ঘিরে থাকা এই মানুষজন। তাদের ওপর বাজি লাগিয়ে চলে জুয়ার মৌতাত। আমাদের চেনাজানা ঝাঁ-চকচকে শহরের মধ্যে এ যেন একটা আলাদা পৃথিবী। এর পরিবেশ আলাদা, আইনকানুন আলাদা। স্বাভাবিকত্ব আর অস্বাভাবিকত্ব এখানে মিলেমিশে একাকার। এখন ঘড়িতে রাত্রি প্রায় সাড়ে বারোটা। আজকের শেষ ম্যাচ চলছে, উত্তেজনার পারদ চরমে। যে দু-জন স্টেজের ওপর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মত্ত, তাদের মধ্যে একজন আমাদের এই কাহিনির ডার্ক হর্স, ডক্টর ইন্দ্রজিৎ। এখন অবশ্য তার পরিচয় রুহান নামে। তার মুখ ঢাকা রয়েছে একটা হুডিতে। উচ্চতা প্রায় ছয় ফুটের ওপর। দোহারা গড়ন, কিন্তু দেহসৌষ্ঠবে চোখ পড়লেই বোঝা যায়, কী অপরিসীম শক্তি ওই শরীরী কাঠামোতে বন্দি করে রেখেছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর আকার কমসে কম তার দ্বিগুণ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে যে কেউ নিশ্চিতভাবে বলবে যে ওই বৃহদাকার দানবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে এই ছিপছিপে চেহারার যুবকের মুখোমুখি সংঘাত বাতুলতা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা সেই মানুষজনের বেশির ভাগই চোখ বুজে দাঁও লাগাচ্ছে ওই ছিপছিপে গড়নের যুবকের ওপর। তার একটা কারণ হয়তো লড়াই শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই ওই দানবাকৃতি প্রতিযোগী আমাদের ডার্ক হর্সের সামনে কোনওভাবেই সুবিধা করে উঠতে পারছে না। সামনে জড়ো-হওয়া ভিড়ের মধ্যে পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও রয়েছে, তারই মধ্যে একজন চিৎকার করে ‘রুহান’ অর্থাৎ আমাদের ডার্ক হর্স-এর নাম ধরে জয়ধ্বনি দেয়। রুহান সেই ভক্তের দিকে ফিরে চোখ টিপে ভ্রূ নাচায়, আর সেই মুহূর্তের ভগ্নাংশের অন্যমনস্কতার সুযোগে রুহানের দানবাকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বী স্টেজের একপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে দুই পা জড়ো করে রুহানের পেটে সজোরে আঘাত হানে। রুহান স্টেজ থেকে নীচে ছিটকে পড়ে যায়। এহেন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বিহ্বল হয়ে জয়ধ্বনি দিতে-থাকা জনগণ হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা তারপরেই রুহান আবার একলাফে উঠে আসে স্টেজের ওপর। ততক্ষণে তার প্রতিযোগী তাকে আরও একবার আঘাত হানার জন্য তৈরি হয়েছে। দুরন্ত রিফ্লেক্সে নিজের মুখের দিকে ধেয়ে-আসা ঘুসিটা অদ্ভুত কায়দায় এড়িয়ে গিয়ে এক ঝটকায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে যায় রুহান, তারপর অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় নিজের শরীরটাকে প্রায় হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে স্টেজের অপর প্রান্তে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর পিছনে চলে আসে। তারপর লাফিয়ে উঠে হাতের কনুই দিয়ে প্রতিযোগীর ঘাড় আর কাঁধের সংযোগস্থলে সজোরে আঘাত হানে। লোকটা এরকম অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তৈরি ছিল না। সে কাঁধ ধরে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। রুহান কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাকে আবার আক্রমণ করার বদলে বেশ কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে স্টেজের কোনায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। লোকটা এবার আস্তে আস্তে টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায়। এবার রুহান হিংস্র শ্বাপদের মতো একলাফে লোকটার সামনে এসে চোয়াল বরাবর একটা ঘুসি চালায়। অতর্কিত আক্রমণে লোকটা নিজের ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায়, তারপর আবার ছুটে আসে রুহানকে আক্রমণ করার জন্য। রুহান হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ে ভাঁজ-করা হাঁটুটাকে অক্ষ বানিয়ে এক ঝটকায় নীচের সম্পূর্ণ শরীরটাকে চক্রাকারে একবার ঘুরিয়ে নেয়। ছুটন্ত লোকটার পায়ে গিয়ে আঘাত করে রুহানের সামনের দিকে বাড়িয়ে-রাখা অপর পা। টাল সামলাতে না পেরে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা। রুহান ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। সে মুহূর্তের মধ্যে লোকটার বাঁ হাত দুই হাঁটুর মধ্যে বন্দি করে শক্তিশালী বাহুর ফাঁসে তার গলা টিপে ধরে। লোকটা অনেকক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করার পর অবশেষে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর যখন রুহান বুঝতে পারে যে, প্রতিপক্ষ জ্ঞান হারিয়েছে, তখন হাতের ফাঁস আলগা করে পায়ে পায়ে স্টেজ থেকে নীচে নেমে আসে। জনতার হর্ষধ্বনি তখন আকাশ ছুঁয়েছে। উন্মত্ত ভিড়ের মধ্যে থেকে একদল লোক রুহানকে কাঁধে চাপিয়ে হর্ষধ্বনি দিতে দিতে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর। স্টেজের পিছনদিকে একটা পার্ক করে-রাখা গাড়ির বনেটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে ইন্দ্র ওরফে রুহান। ঠোঁটের কোণে ঝুলছে সিগারেট। হঠাৎ নিকষকালো অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে আসে একটা ছায়ামূর্তি। চাপাস্বরে বলে, “আপনি কি রুহান?”
“না। আপনার শ্বশুর। কী দরকার?”
“একটা কেস ছিল।”
“হুম। তো কাজের কথায় আসুন। কত সাল?”
“আজ্ঞে ২০৩২। রাতের অন্ধকারে কেউ একের পর এক খুন করে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও কিছু কূলকিনারা করতে পারছি না, স্যার।”
ঠোঁটের কোণ থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে ঘষে নিবিয়ে দেয় রুহান। ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি।
***
