(১৫) লং ওয়ে টু গো বেবি!
ভোর পাঁচটা নাগাদ ট্রেন থেকে নামতেই ভোরের নরম আলো ইন্দ্রদের স্বাগত জানাল। এই পাহাড়-ঘেরা স্বপ্নের দেশে একটু দূরে দাঁড়িয়ে দুই হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছে ইভানি। ছোট্ট স্টেশন, দূরে কুয়াশার ছেঁড়া চাদরের ফাঁক দিয়ে শ্যাওলা রঙের পাহাড়ের চূড়া দেখা যায়। বছরের মাঝামাঝি সময়েও বেশ শিরশিরানি ঠান্ডা। ইন্দ্রর পরনে একটা পাতলা সোয়েটশার্ট, তার ওপর মেরুন রঙের পুলওভার। ইভানি জিসের ওপর একটা লেদার জ্যাকেট পরেছে। হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা বাদামি বুট আর আকাশি সানগ্লাসে ইভানিকে ঝকঝকে স্মার্ট দেখাচ্ছে। বারবার দুই হাত জোড় করে মুখের কাছে ধরে ওম নিচ্ছে। চোখের সানগ্লাস ঝাপসা। স্টেশন চত্বর থেকে বাইরে আসতেই কয়েকজন ড্রাইভার কাম গাইড এসে ঘিরে ধরল। নৈনিতাল, ভীতাল করতে করতে ইন্দ্রর ব্যাগ ধরে রীতিমতো টানাটানি শুরু করেছে। ইন্দ্র অসহায় করুণ মুখে ইভানির দিকে তাকিয়ে। ইভানি মুখে কিছু বলছে না, শুধু দূরে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে মিটিমিটি হাসছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে গোটা দৃশ্যটা ইভানির পক্ষে বেশ উপভোগ্য।
গ্রামের নাম ঝেওলিকোট। কাঠগোদাম থেকে নৈনিতালের রাস্তায় প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশেক এসে ডানদিকে সরু রাস্তা ধরল ওদের সাদা ইনোভা। সবুজ বন, মাঝে সর্পিলাকার পিচের রাস্তা। এখনও মাথার ওপর রোদ নিস্তেজ। খানিকটা খাড়াই পথে ওঠার পর একটা বেশ বড় বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় গাড়িটা। পাথরের ওপর কাঠের কাঠামো। পাশে অনেকটা জায়গা ঘেরা কাঠের বেড়া দিয়ে, সেখানে হয়তো আগে গবাদি পশু চরে বেড়াত, এখন খালি। জায়গায় জায়গায় বেড়া ভেঙে গিয়েছে। বাড়ির পিছনের দিকে বেশ খানিকটা অংশ জুড়ে একসময় যত্ন করে সাজানো বাগান ছিল। এখন বুনো ঝোপ আর আগাছায় ঢেকে আছে। তার মধ্যে থেকেই দু-একটা অযত্ে বেড়ে-ওঠা ফুলগাছ উঁকি দিচ্ছে। স্পষ্টই বোঝা যায়, এটা একসময় কোনও বিত্তবানের আদরের ফার্মহাউস ছিল, এখন পরিত্যক্ত। মূল দরজার সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে নুড়ি বিছানো। গাড়ি এসে দরজার সামনে শব্দ করে থামতেই একজন লম্বা ছিপছিপে প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে তাদের জিনিসপত্রগুলো গাড়ির ডিকি থেকে বের করে ভিতরে নিয়ে গেলেন। ইন্দ্র গাড়ি থেকে নেমে দুই হাত দু-দিকে ছড়িয়ে বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিল। বাইরের ফটক থেকে গবাদি পশুর সেই খামার পেরিয়ে মূল বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। পাথুরে রাস্তা থেকে খানিকটা উঁচুতে বারান্দা, কাঠের রেলিং। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসে সুদৃশ্য কাঠের দরজা। দরজার ওপর সিংহের মুখের আদলে ডোর নকার। যদিও সবেতেই সময় আর অযত্ন ছাপ ফেলে গেছে। ইন্দ্র দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকতে যাবে, পিছনে শব্দ পেয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখে, আরও একটা গাড়ি মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। একটা সাদা স্করপিও থেকে নামলেন আলফা আর পাই। গামা অবশ্য বেশ কিছুক্ষণ আগেই চলে এসেছেন। বাড়িটা বড় অদ্ভুত জায়গায়, মূল জনপদ থেকে অনেকটাই বিচ্যুত। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে যেদিকে দু-চোখ যায়—শুধু সুউচ্চ সব্জেটে পাহাড় আর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে-যাওয়া গভীর খাদ। এ ছাড়া আর কোনও জনপ্রাণী চোখে পড়ে না।
*
“আমি কিন্তু কোনও সম্পর্কে জড়াতে রাজি নই। সম্পর্ক এলেই অধিকার আসে। ইভানির ওপর কারও অধিকার নেই। কোনওদিন থাকবে না।” ইন্দ্রর চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলে ইভানি। তার চোখের মণি কাঁপছে তিরতির। অস্থির চোখের কোলে জল টলমল, যেন আলতো টোকায় বাঁধ ভাঙবে অকস্মাৎ। ইন্দ্ৰ দু-হাতে তার হাত দুটো ধরে বুকের কাছে আনে। সন্ধ্যা নামছে পাহাড়ের ওপারে, পাখিরা হঠাৎ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছে তাদের ডেরায়। একজোড়া গাউর এমনভাবে ঘন জঙ্গল ভেঙে দৌড়ে গেল যেন মহাপ্রলয় আসন্ন। ইন্দ্র আর ইভানি শুয়ে আছে এক বিশাল পাথরের ওপর। এক নামহীনা অন্তঃসলিলা নদীর তীরে পূর্ণবয়স্ক চিতার মতো বিশ্রামরত এই বিশাল পাথর। অবশ্য পাথর না বলে টিলা বললেও অত্যুক্তি হয় না। মাথাটা চ্যাপটা। দু-জন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে থাকতে পারে অনায়াসে। তাদের ডেরা থেকেও প্রায় কিলোমিটারখানিক গভীর জঙ্গলের ভিতরে। আজ সকালেই রেইকি করতে এসে পাথরটা আবিষ্কার করেছে ইন্দ্র। এ এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পৃথিবী। শহর কলকাতার বুকে গঙ্গার বাঁধানো ঘাটে কংক্রিটের সিঁড়িতে বসে হাতে বাদামভাজা আর গলায় গুনগুন সুর তুলে যাঁরা সূর্যাস্ত দেখেন, তাঁদের কাছে রুক্ষ শুষ্ক ভয়ংকর এই পৃথিবী ভীষণ অচেনা। হয়তো বা পরিত্যাজ্যও। এখানে প্রকৃতি মায়াবী, ভীষণ ব্যক্তিত্বময়ী কোনও বিদুষীর মতো। কাছে টেনে নিতে সংকোচ হয়। মনে হয়, দূর থেকে দেখি, অনুভব করি, প্রাণ ঢেলে ভালোবাসি। তাকে দেখা যায়, ছোঁয়া যায়, তবু নিজের বলে দাবি করতে দ্বিধাবোধ জন্মায়। ঠিক যেমন ইভানি। চাওয়া যায়, ছোঁয়া যায়, কিন্তু পাওয়া যায় কই! ইন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর পাশ ফিরে ইভানির গলার দাগটার উপর আঙুল বোলায় ধীরে ধীরে।
“তুমি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলে? এটা তো দড়ির দাগ। নাইলনের দড়ি কেটে বসে গেলে তবেই এরকম পার্মানেন্ট দাগ হয়ে যায়।”
“হ্যাঁ, মিস্টার জেমস বন্ড। এটা দড়িরই দাগ।” ইন্দ্রর চুলে বিলি কাটতে কাটতে ইভানি বলে।
“বুঝলাম। তাহলে এই হল আপনার সম্পর্কে না জড়ানোর অজুহাত। পুরোনো ব্যথা!” ইন্দ্র অনুমান করেছিল, এই কথায় ইভানি রেগে যাবে। কিন্তু তার বদলে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে। তারপর যেন অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলে, “জীবনটা কি হিন্দি সিনেমার প্লট নাকি যে নায়ক-নায়িকার বিরহ ছাড়া আর কিছু থাকতে নেই? আর আমি দেবদাস টাইপের পাবলিক নই। এ অন্য কেস।”
“কী কেস? আমিও একটু শুনি।”
ইভানি উত্তর না দিয়ে উঠে বসল। দূর থেকে একটা নাম-না-জানা প্রাণীর ডাক ভেসে আসছে। ভীষণ মিষ্টি মায়া-ধরানো একটা ডাক। ইভানি অন্যমনস্ক হয়ে সেই ডাক শুনছে। একটু পরে ইন্দ্রর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে প্রায় ফিশফিশিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কীসের ডাক জানো?”
ইন্দ্ৰ মাথা নাড়ে। ইভানি কতকটা স্বগতোক্তির সুরে বলে, “আমিও জানি না। কী ভীষণ সুন্দর না ওই ডাকটা? মনে হয় যেন কাছে ডাকছে। আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়, প্রাণীটা নিশ্চয়ই ভীষণ সুন্দর হবে?”
“হ্যাঁ। যে প্রাণীর ডাক এত সুন্দর, তাকে দেখতেও নিশ্চয়ই ভীষণ সুন্দর হবে।”
“না-ও তো হতে পারে। হয়তো দেখলে সেই প্রাণীটা ভীষণ কুৎসিত। তোমার চোখের সামনে এসে যখন দাঁড়াল তখন তোমার মনে ভালোবাসার বদলে ঘৃণার উদ্রেক হল। তখন?”
“বাব্বাহ্! তুমি আবার আমাকে ভাবুক বলো। নিজে কী!” কথা শেষ করে ইন্দ্ৰ সশব্দে হাসতে থাকে।
ইন্দ্র তখনও চিত হয়ে শুয়ে ছিল, ইভানি এক ঝটকায় ইন্দ্রর শরীরের ওপর উঠে বসে। তারপর ইন্দ্রর কোমরের দু-পাশে দুই হাঁটু রেখে ঝুঁকে পড়ে ইন্দ্রর মুখের সামনে। ইভানির কোঁকড়ানো চুল এসে পড়েছে ইন্দ্রর সারা মুখে। ইন্দ্রকে অবাক করে দিয়ে সে হঠাৎ মাথার পিছনদিকে হাত নিয়ে যায়, তারপর এক ঝটকায় খুলে আনে সেই কোঁকড়ানো একমাথা চুল। ইন্দ্র দ্যাখে ইভানির চোখের ওপর থেকে গোটা মাথা সম্পূর্ণ মসৃণ। সে হতচকিত হয়ে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। ইভানি এবার হাঁ করে মুখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে নিজের দুটো দাঁতের পাটি বের করে আনে সযত্নে। ইন্দ্র বারুদ্ধ। ইভানি আরও নীচু হয়ে ইন্দ্রর শরীরের সঙ্গে নিজের শরীর মিশিয়ে দিয়ে ইন্দ্রর বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। একটু হালকা চালে বলল, “বাজের শব্দে ঠিক নয়, বৃষ্টিতে ভিজতে ভয় পাই। যদি নকল চুলের আঠা ধুয়ে গিয়ে মাথা থেকে আলগা হয়ে যায়। কমব্যাট ট্রেনিং এড়িয়ে যাই, পাছে বাঁধানো দাঁতের পাটি খুলে আসে অসাবধানতায়। সাইড এফেক্ট অফ রেডিয়েশন থেরাপি। ফোর্থ স্টেজ, মেরেকেটে আর মাস দুয়েক। বুঝলেন মিস্টার বন্ড?”
ইন্দ্র উত্তর দেয় না। শুধু ওর চোখের কোল বেয়ে একটা জলের রেখা গড়িয়ে নামে পাথুরে মাটিতে। ইভানি ডান হাত বাড়িয়ে সেই জলের ফোঁটা তর্জনীর ডগায় নেয়। শেষবেলার নরম সোনালি রোদে সেই জলবিন্দু চিকচিক করছে।
“যেদিন প্রথম শুনলাম হঠাৎ করে যেন সবকিছু তছনছ হয়ে গিয়েছিল। ভীষণ যন্ত্রণা হয় মাঝে মাঝে, জানো? ধরো, কোনওদিন ওষুধ খেতে ভুলে গেলাম, পেটের ভিতর সবকিছু যেন দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। কিছু মুখে দিলে বমি হয়ে যায়। প্রত্যেকদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, আজ আবার রাত আসবে তো? আবার সূর্য ডুবতে দেখব? আবার নিজের বালিশে মুখ গুঁজে কোলবালিশটাকে জড়িয়ে ধরে আরও একটা স্বপ্ন দেখব তো? মৃত্যু যাদের কাছে এক ঝটকায় আসে, তারা ভাগ্যবান। কিন্তু যদি সে কাউকে পিছু ধাওয়া করে নিয়ে বেড়ায়, যদি রোজ রাতে কড়া নাড়ে দরজায়, যদি প্রত্যেকদিন ঘুম ভেঙে চোখ খুলেই মন হিসাব কষে, এটাই শেষ ঘুম ছিল কি না, তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ নেই। একসময় মনে হয়েছিল, আর না। তিলে তিলে দগ্ধে মরার থেকে এক লহমায় সব শেষ করে দেওয়াটা অনেক ভালো। কিন্তু যখন গলায় দড়ির ফাঁস চেপে বসতে লাগল ক্রমশ, দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগল, মনে হতে লাগল, আর কয়েক সেকেন্ড পর আর হাসতে পারব না, চিৎকার করতে পারব না, নিজের খেয়ালে দু-কলি গুনগুন করতে পারব না, তখন আবার হঠাৎ ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছে করল। আবার খালি পায়ে নরম ঘাসের ওপর দৌড়োতে ইচ্ছে করল, নরম বালিশে মাথা গুঁজে কাঁদতে ইচ্ছে করল, নিজের ঠোঁটে অন্য আরেকটা উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করল। ততক্ষণে দরজা ভেঙে মা, বাবা, আরও দু-একজন প্রতিবেশী ঢুকে পড়েছেন ঘরে, পরের স্মৃতিটুকু কেমন ঘোলাটে হয়ে গেছে।” এবার নিজের চোখের কোণ মুছে নেয় হাতের তালুর উলটো পিঠে। তারপর ভাঙা গলায় বলে, “একদম কাঁদবে না বাল। আমি তো সবে আমার জীবন শুরু করেছি। লং ওয়ে টু গো বেবি, লং ওয়ে টু গো।”
