(২১) অ্যান ওয়ারিয়ার অ্যান্ড হার ব্যাটেল স্কারস

(২১) অ্যান ওয়ারিয়ার অ্যান্ড হার ব্যাটেল স্কারস

ডাইভিং স্যুটের ভেলক্রো লাগাতে লাগাতে আলফা বললেন, “মিস্টার ডেল্টা, আপনাকে বলেছিলাম মনে আছে যে, নাইট টেম্পলারদের একজন মেম্বার কোডেক্স গিগাস-এর পৃষ্ঠাগুলো চুরি করে পালিয়েছিল? পরবর্তীকালে সে সেটাকে স্মাগ্ল করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং কিছুদিনের মধ্যেই পুলিশ কাস্টডিতে রহস্যজনকভাবে তার মৃত্যু হয়। তবে তার আগেই আমাদের মিস্টার পাই পুলিশ কাস্টডিতে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং ওই গুহার ভিতর সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা নিয়ে নেন। তবে আমার ধারণা, আতঙ্কে হোক বা পুলিশি অত্যাচারে, লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কারণ সে সেই জায়গা সম্পর্কে যা যা বলেছে, তার বেশির ভাগেরই কোনও মাথামুণ্ডু নেই। যেমন যে ভল্টে কোডেক্স গিগাস-এর পৃষ্ঠাগুলো সংরক্ষিত আছে, সেটা নাকি পাহারা দিচ্ছে স্বয়ং ডেভিল। তবে এইসব গাঁজাখুরি বাদ দিলে যেটুকু সলিড ইনফর্মেশন আমরা পেয়েছি তা থেকে ওই গুহার ভিতরের জগৎ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেছে। যা-ই হোক, আসল কথায় আসি। আমাদের মিশনে টোটাল চারটে স্টেপ থাকছে। যদি আমার অভিজ্ঞতা খুব ভুল না হয় তাহলে সম্পূর্ণ মিশনটা কমপ্লিট হতে আমাদের সময় লাগবে খুব বেশি হলে এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। আমরা প্রত্যেকটা স্টেপ যদি পারফেক্টলি ফলো করতে পারি, তাহলে আজ দুপুরের মধ্যে আমাদের হাতে থাকবে কোডেক্স গিগাস-এর সেই হারিয়ে যাওয়া বারোটা পৃষ্ঠা। যা-ই হোক, যেটা বলছিলাম, আমাদের মিশনের চারটে স্টেপ আরও একবার রিভিজিট করে নিই।

স্টেপ ওয়ান, ইনফিলট্রেশন। আমরা লেকের একপ্রান্ত দিয়ে নেমে জলের তলা দিয়ে অন্য প্রান্তে পৌঁছে ওদের ওয়েস্ট পাইপের এগজিট পয়েন্ট দিয়ে ভিতরে ঢুকব। যে জায়গায় এসে ওয়েস্ট পাইপ ওদের গুহার মূল করিডরে এসে মিলেছে, সেখানে পৌঁছে আমরা অপেক্ষা করব। যে মুহূর্তে দেখব আশপাশে কোনও গার্ড নেই, তখনই আমরা ভিতরে ঢুকব। সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে আমরা সিসিটিভি ক্যামেরার নজরে না পড়ে যাই। অবশ্য সেই কাজটা বিটার দায়িত্ব। শি নোজ হোয়াট টু ডু।

এইবার আমাদের সেকেন্ড স্টেপ, ব্লেন্ড ইন। আমরা মূল করিডরে ঢোকার আগে এই ডাইভিং স্যুট খুলে নেব। ভিতরে আমাদের পরনে রয়েছে ওদের গার্ডদের পোশাক। আমরা সেখানে ঢুকে গার্ডদের ভিড়ে নিজেদের মিশিয়ে নেব, তারপর দুটো টিমে ভাগ হয়ে যাব। একটা টিমে থাকব আমি এবং পাই, আর অন্য টিমে থাকবে বিটা, গামা এবং ডেল্টা। তোমাদের কাজ হবে প্রথমে জ্যামারটাকে খুঁজে সেটাকে ডিসএব্ল করা এবং খোঁজ করা যে, ওরা পৃষ্ঠাগুলোসহ সিলিন্ডারটা যে ভল্টে রেখেছে, সেটার লকিং সিস্টেম ম্যানুয়াল নাকি ডিজিটাল। যদি ডিজিটাল হয় তাহলে বিটা নিজের জাদু দেখাবে, আর যদি ম্যানুয়াল হয় সেটা ভাঙার জন্যও আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ এক্সপ্লোসিভ রয়েছে।

যখন তোমরা এই কাজগুলো করবে, তখন আমাদের কাজ হবে যতটা সম্ভব সন্তর্পণে এবং নিঃশর্তে একের পর এক গার্ডদের সরিয়ে ফেলা। জ্যামার ডিসএল হতেই আমরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারব। তখন শুরু হবে আমাদের অপারেশনের থার্ড স্টেপ, হাইস্ট।

এরপরেই শুরু হবে আসল খেলা। কারণ সেই লোকটার কথা অনুযায়ী ভল্টের ভিতরটা নাকি ইটসেল্ফ একটা গোলকধাঁধা। সে সম্বন্ধে ডিটেইলে আমি আমি এখনই কিছু বলছি না। লোকটা যা যা ইনফর্মেশন আমাদের দিয়েছে, তার সব হয়তো পারফেক্ট নয়, কারণ লোকটার মেন্টাল কন্ডিশন ওয়াজ নট অ্যাট ইটস বেস্ট। কিন্তু তার কথা থেকে এটুকু অন্তত বোঝা গিয়েছে যে, সেই গোলকধাঁধায় ঢুকতে গেলে সমাধান করতে হবে ইতিহাস বা মিথলজি সংক্রান্ত কোনও ধাঁধা। সেটাই সল্ভ করে তোমাদের এগোতে হবে। আর এখানেই মিস্টার ডেল্টা উইল ড্র হিজ জব। সবশেষে সিলিন্ডারটা হস্তগত করে আমরা আবার ফিরে আসব আমাদের এন্ট্রি পয়েন্টের কাছে। এরপর আমাদের ফাইনাল স্টেপ অর্থাৎ এক্সট্রাকশন। সেফলি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা মিট করব আবার এখানে। আই থিংক এভরিথিং ইজ ক্লিয়ার টু ইউ নাও।”

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। গাড়ি একটা ঝাঁকুনি দিয়ে এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলের মাঝবরাবর মাখনের মতো পিচের রাস্তায় এসে পড়ে। এখান থেকে লেক প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। আলফা গাড়ি টপ গিয়ারে ফেলে অ্যাক্সিলারেটরে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। প্রায় মিনিট দশ পর একসময় পিচের রাস্তা শেষ হয়। ডানদিকে সরু পায়ে-চলা রাস্তা নেমে গেছে। আলফা এবার পিচের রাস্তা থেকে গাড়িটাকে বাঁদিকে ঝোপজঙ্গলের মধ্যে নামিয়ে দেন। বেশ কিছুটা এগিয়ে ঘন জঙ্গুলে এলাকা দেখে সেখানে গাড়িটাকে সন্তর্পণে পার্ক এমনভাবে করেন, যাতে চট করে লোকের নজরে না পড়ে। তারপর তারা হেঁটে এসে চওড়া রাস্তা পেরিয়ে নেমে যায় ডানদিকের সেই পায়ে-চলা রাস্তায়। এখান থেকে প্রায় কিলোমিটারখানিক হাঁটার পর পড়বে সেই লেক। ওরা পায়ে-চলা রাস্তা ধরে না হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে গাছের ফাঁকে ফাঁকে যতটা সম্ভব নিজেদের আত্মগোপন করে খুব সন্তর্পণে এগোতে থাকে। ঘড়িতে এখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। পাহাড়ি জঙ্গলে এত সকালে সূর্যরশ্মি প্রকট হয় না। খুব মিঠে লালচে আলো জঙ্গলের আকাশছোঁয়া পাইন গাছগুলোর তৈলাক্ত কাণ্ডের ফাঁক গলে শূন্যে আলোছায়ার এক বিষণ্ণ পেইন্টিং তৈরি করেছে। ইন্দ্রদের পায়ের চাপে শুকনো পাতায় মচমচ আওয়াজ উঠছে। এই অপূর্ব সুন্দর পরিবেশে সেই আওয়াজ মায়াবী শোনাচ্ছে। অবশ্য এখন প্রাকৃতিক নৈসর্গ উপভোগ করার সময় তাদের নেই। তারা সর্বক্ষণ চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে চলেছে লেকের উদ্দেশে। সকলের হাতেই উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র।

ইন্দ্র ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা ইভানি, হঠাৎ সামনে কোনও গার্ড চলে এলে সরাসরি বুকে বা পেটে গুলি না করে পায়ে করলে চলবে? মানে আমি বলছিলাম, ক্যাজুয়ালটিজ যত কম রাখা যায়, ততই ভালো। তা ছাড়া বেচারা গার্ডগুলো তো আর…”

“নিজের পায়ে গুলি করে ফ্যালো না, তাহলেই হবে,”, ইন্দ্রর কথার মাঝে বলে ওঠে ইভানি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রর মনে হয় নেহাত কলিকাল, না হলে এতক্ষণে ওর ভস্ম হয়ে যাওয়া আটকায় কে! আর কিছু বলার সাহস হয় না ইন্দ্রর। সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নজর রাখতে রাখতে এগোতে থাকে।

হঠাৎ একটা ঝকঝকে ইস্পাতের ফলা চোখের পলকে ইন্দ্রর কাঁধ ছুঁয়ে পাশের গাছের কাণ্ডে এসে গেঁথে যায়। ইন্দ্র চমকে উঠে মাটিতে বসে পড়ে। বাকি সবাই একসঙ্গে মাথা নীচু করে বসে পড়ে ঝোপের আড়ালে। সঙ্গে সঙ্গে ঝোপঝাড় ভেঙে কারও এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। পায়ের শব্দে বোঝা যায় একজন নয়, এগিয়ে আসছে কমপক্ষে দু-জন। তারা সম্ভবত ইন্দ্ৰ ছাড়া বাকিদের দেখতে পায়নি। অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে এদিকে। পিছনের জঙ্গল আর ইন্দ্রদের মাঝে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা, শুধু হাঁটু-ছোঁয়া লম্বা লম্বা ঘাসে ঢাকা। সেটা পেরোনোর সময়েই তাদের ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইন্দ্ররা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে সেই সুযোগের। ইন্দ্র মাথা ফিরিয়ে পিছনে তাকায়। তখনও পিছনের গাছে বিঁধে রয়েছে ছুরিটা। ইস্পাতের তীক্ষ্ণ ফলা গাছের কাণ্ড চিরে ভিতরে গেঁথে গিয়েছে ইঞ্চিখানেক। ইন্দ্রর শরীরে এসে বিধলে তার ভাগ্যে দুঃখ ছিল, সেই কথা মনে করেই একবার কেঁপে ওঠে সে। লোকগুলো কিন্তু ঝোপ যেখানে শেষ হয়েছে, সেই সীমারেখার কাছে এসেই থমকে দাঁড়ায়। শুকনো

পাতার ওপরের খচমচ পায়ের শব্দ আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভবত খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলে অসুরক্ষিত হয়ে পড়বে, সেই আশঙ্কাতেই ধীরে ধীরে আবার পিছু হটতে শুরু করে তারা। আলফা পাইকে চাপা গলায় বলেন, “পাই, জলদি যাও, ওদের থামাও। কোনওভাবে ওরা পালিয়ে গেলে বেসে খবর চলে যাবে। তখন আমাদের পক্ষে গুহায় ঢোকা অসম্ভব হয়ে যাবে।”

গামা নীচু গলায় জিজ্ঞেস করেন, “পাই একা যাবেন? আমিও যাই ব্যাকআপ হিসেবে?”

আলফা গামার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “মাত্র দু-জনকে ম্যানেজ করতে পাইয়ের ব্যাকআপ লাগবে না। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট হি ইজ কেপেবল অফ।”

এর পরের এক থেকে দেড় মিনিট যেন একটা ছোটখাটো ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। পাই মুহূর্তের মধ্যে তিরের ফলার মতো ছিটকে ঢুকে পড়েন। উলটোদিকের সেই ঘন জঙ্গলের আলোছায়ার আড়ালে। পরবর্তী কয়েক সেকেন্ড নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা। তারপর হঠাৎ দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা বড় ঝোপ সশব্দে নড়ে ওঠে। তাকে অনুসরণ করে কানে আসে একটা ভোঁতা আঘাতের আওয়াজ। কেউ একজন যেন আর্তচিৎকার করতে গিয়েও সুযোগ পায় না। তার আগেই সেই বড় কাঁটাঝোপ ভেঙে সশব্দে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও অতর্কিত আক্রমণ এবং প্রতি-আক্রমণের শব্দ। এবারেও আক্রমণকারী নিজেই একটা চাপা শব্দ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার ভারী দেহ শুকনো পাতার ওপর আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যায়। আর তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরেই ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট ধরিয়ে কাঁধের কাছের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে জঙ্গলের আলো-আঁধারি কাটিয়ে বেরিয়ে আসেন মিস্টার পাই।

লোকের কাছে পৌঁছে সবাই থমকে দাঁড়ায়। সামনে টলটল করছে কালচে-সবুজ স্থির জল। ওপর থেকে দেখলে মনে হয়, একটা বিশাল সব্‌জেটে কাচের পাত যেন সন্তর্পণে বসানো আছে সেই লেকের ওপর। ওরা পাঁচজন একে একে জলে নামতে থাকে। প্রথমে আলফা, তারপর একে একে পাই, গামা এবং ইন্দ্র। জলের কাছে এসে হাঁটুজলে নেমে থমকে দাঁড়িয়ে যায় ইভানি। হাতে অক্সিজেনের মাস্কটা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বাকিরা ততক্ষণে জলের পৃষ্ঠতলের নীচে মিলিয়ে গিয়েছে, ইভানি অসহায়ের মতো হাঁটুজলে স্থির দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। যেন কিছু একটা খুঁজছে। হঠাৎ ওর ঠিক সামনে একটু দূরে জলের বুদ ওঠে। স্থির জলের চাদর ফুঁড়ে মাথা তোলে ইন্দ্র। সাঁতরে পাড়ের দিকে এসে পায়ে পায়ে উঠে আসে ইভানির দিকে। ইভানির সামনে এসে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রাখে তার। ইভানির দু-চোখ অস্থির, গলার কণ্ঠনালি তিরতির করে কাঁপছে। যেন কিছু বলতে চাইছে প্রাণপণে। গলার কাছে এসে শব্দগুলো ভাষা হারাচ্ছে। ইন্দ্র মৃদু হাসল। তারপর ইভানির কম্পিত ঠোঁটে ডুব দিল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। ইন্দ্ৰ হাত বাড়িয়ে একটানে খুলে আনে ইভানির নকল চুল। তার সারা শরীর কেঁপে ওঠে, কিন্তু সে চোখ খোলে না। ইন্দ্র ইভানির ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে এসে কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশিয়ে বলে, “অ্যান ওয়ারিয়র শুড বি প্রাউড অফ হার ব্যাট্ল স্কারস।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *